(Eli Cohen 15)
এলি কোহেন যখন আর্জেন্টিনা মিশন শেষে তাঁর জীবনের চূড়ান্ত সিরিয়া মিশনে যাচ্ছেন মোসাদের পরিকল্পনা মাফিক, তখন এই ইজরায়েলি চর সংস্থার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার গোড়ার দিকটা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যেতেই পারে। গুপ্তচর মুলুকের অন্তহীন রহস্যময়তার প্রহেলিকা কোহেন কাহিনির পরতে পরতে দেখা মিলবে।
শুরু হল এলি কোহেন পঞ্চদশ পর্ব।
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩)
এই কাহিনি শুরুর আগেই একটা কথা বলে নেওয়া ভাল। মোসাদের সঙ্গে এলির চাক্ষুষ পরিচয় অনেক পরে ইজরায়েলে হলেও গোপনে খবর সংগ্রহ করা ও গা ঢাকা না দিয়েও ইহুদি সংগঠনগুলোকে সাহায্য করার মতো কাজ আলেকজান্দ্রিয়াতে থাকাকালীনই এলি করেছেন। অর্থাৎ গুপ্তচর হওয়ার প্রাথমিক পাঠ আলেকজান্দ্রিয়ার গলিতেই এলি হাতেকলমে পেয়েছিলেন। মিশরীয় পুলিশও ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিল। ১৯৫৪ সাল নাগাদ এলিকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল মিশরীয় পুলিশ। কিন্তু প্রমাণ জোগাড় করতে না পারায় ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তাহলেও মিশরীয় পুলিশের সন্দেহভাজনদের তালিকায় এলি রয়েই গিয়েছিলেন। তাঁর উপর পুলিশের নজরদারি সমানে জারি ছিল। এলিও বুঝেছিলেন এই ‘চোর-পুলিশ মার্কা’ লুকোচুরি খেলা বেশিদিন চলবে না। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলেকজান্দ্রিয়া ছাড়লেন এলি। ইহুদি এজেন্সির সাহায্যে গোপনে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে ভূমধ্যসাগর ধরে এলেন ইজরায়েল।

জালমান একটা নাম
জালমান একটা নাম শুধু। কোনও পদবি নেই। অথচ এই পদবিহীন নামটাই এলি কোহেনের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্তের কাণ্ডারি। আদতে ঐতিহাসিক চরিত্রদের আশেপাশে অনেক চরিত্র থাকে যাদের নাম কোথাও নেই। আবার এইসব চরিত্র যদি না থাকত, তাহলে হয়তো মূল ঐতিহাসিক চরিত্রটাকেই কোনওদিন পাওয়া যেত না।
জালমান এই রকমই এক চরিত্র এলি কোহেনের জীবনে।
এলি সম্মতি জানালে আগন্তুক ঘরে ঢুকল। সামনের চেয়ার দেখিয়ে আগন্তুককে এলি বসতেও বলল। লোকটা বসে স্মিত হাসল।
পরিচয় কাহিনির ১৯৬০ সালের বসন্তের এক সকালে। কোহেন একমনে মাশবির ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সাপ্লাই দফতরে বসে অ্যাকাউন্টেন্টের কাজ করছিলেন, তখন তাঁর ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
‘ভিতরে আসতে পারি?’
এলি সম্মতি জানালে আগন্তুক ঘরে ঢুকল। সামনের চেয়ার দেখিয়ে আগন্তুককে এলি বসতেও বলল। লোকটা বসে স্মিত হাসল।
‘আমার নাম জালমান। ব্যস। আর কিছু জানার দরকার নেই।’
লোকটার কথা বলার ধরনটা একটু অদ্ভুত।
তারপর একটু ঝুঁকে এলির কাছে মুখটা এনে নিচুস্বরে লোকটা বলল, ‘জানি না, এখানে কথা বলা ঠিক হচ্ছে কি না। আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে আছি। সোজা কথায় আমি একজন ইনটেলিজেন্স অফিসার।’
‘ইনটেলিজেন্স অফিসার?’
‘হুঁ। মানছি কাজটা একটু হঠকে, কিন্তু বিস্তর ঘোরাঘুরি করতে হবে। আমি তো বলব কাজটার মধ্যে বেশ মজা আছে।’
এলির কেমন যেন লাগছিল। তাই একটু নির্লিপ্তভাব দেখিয়ে বলল, ‘তা আমার কাছে কী চান?’
‘মনে হয় না, চাকরির অফারটা নিতে পারব। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে, সম্প্রতি আমার বিয়ে হয়েছে। আপাতত আমি ওর সঙ্গেই থাকতে চাই। আর ঘোরা? এর মধ্যেই যে চক্কর কেটেছি তাতে তিন জন্মের ঘোরা হয়ে গিয়েছে।’
লোকটাও এলির সোজা মুদ্দেতে আসা জবাবে একটুও না ঘাবড়িয়ে ফের ফিসফিস করে বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে আমাদের সার্ভিসে আপনাকে জব অফার করতে।’
এবার এলির হকচকানোর পালা। তবু যথাসম্ভব শান্ত থেকে বলল, ‘ঠিক কী ধরনের কাজ?’
‘কাজটা দারুণ। ইউরোপে যেতে হবে। আরব দেশগুলোতেও যেতে হবে।’

এলি চুপ করে লোকটার কথা শুনল।
‘মনে হয় না, চাকরির অফারটা নিতে পারব। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে, সম্প্রতি আমার বিয়ে হয়েছে। আপাতত আমি ওর সঙ্গেই থাকতে চাই। আর ঘোরা? এর মধ্যেই যে চক্কর কেটেছি তাতে তিন জন্মের ঘোরা হয়ে গিয়েছে।’
লোকটা তবু হাল ছাড়ার পাত্র নয়। শেষ চেষ্টা করল, ‘আপনি এখানে যা পান, তার দ্বিগুণ দেব।’
‘না, তার কোনও দরকার নেই। যা পাই তাতে দিব্যি চলে যায়।’
আর কথা না বাড়িয়ে লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হাত মেলাল এলির সঙ্গে। তারপর দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
‘সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি কোনও জোর করতে চাই না। তবে একটা কথা বলি। আমার সঙ্গে যে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, তা কাউকে বলার দরকার নেই। এমনকি আপনার স্ত্রী নাদিয়াকেও না।’
সত্যি বলতে কি, লোকটাকে কিন্তু ঠগ জোচ্চর মনে হয়নি। হতেও পারে সত্যিই মোসাদ থেকে এসেছে। এইসব ভেবে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন এলি। লোকটার নাম নেওয়া তো দূর অস্ত।
এই কথাটা আগেই আন্দাজ করেছিল এলি। তাই লোকটাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ‘বুঝেছি। আপনি ভরসা করতে পারেন।’
লোকটা চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ ভাবলেন এলি। লোকটা নাদিয়া নামটাও তো জানে। তার মানে তাঁর সম্বন্ধে পুরো খোঁজখবর নিয়েই এসেছিল। কিন্তু এত লোক থাকতে তাঁকেই বা কেন? হাজার ভেবেও যখন কোনও কূলকিনারা পেলেন না, তখন ভাবাই ছেড়ে দিলেন এলি। নাদিয়াকে তো বলবেনই না। কী আবার সাত পাঁচ ভাবতে বসবে। আর সত্যি বলতে কি, লোকটাকে কিন্তু ঠগ জোচ্চর মনে হয়নি। হতেও পারে সত্যিই মোসাদ থেকে এসেছে। এইসব ভেবে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন এলি। লোকটার নাম নেওয়া তো দূর অস্ত।
তারপর কয়েক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। লোকটার কথা প্রায় ভুলেই মেরে দিয়েছিলেন এলি। পরের মাসের দশ তারিখে মাইনে পাওয়ার কথা। তা পেলেনও। সঙ্গে একটা বাড়তি খাম। সেটা এলি খুলে দেখলেন ভিতরে রয়েছে ভাঁজ করা একটা কাগজ, যাতে মিষ্টি ভাষায় তাঁর চাকরি রদের কথা বলা হয়েছে।
থম মেরে বসে রইলেন এলি। আবার বেকার। মিশর থেকে ইজরায়েল আসার পর থেকে একটার পর একটা চাকরি করছেন। কোথাও থিতু হতে পারছেন না। এই চাকরিটা পেয়ে ভেবেছিলেন, যাক এবার কিছুটা হলেও স্বস্তি থাকবে। কোথায় কী? সেই আবার চাকরি খুঁজতে হবে। ভাগ্যিস নাদিয়া চাকরি করে। কিন্তু পুরো সংসারের জোয়ালটা এবার ওই বেচারির ঘাড়েই পড়ল।
এলি সম্মতি জানানোর পরই জালমান ভিতরে এল। এলির সঙ্গে করমর্দন করে চেয়ার টেনে বসেও পড়ল। তারপর একটানা বলে গেল, ‘এইরকম রবাহুতের মতো দুম করে এসে আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য দুঃখিত।
চারপাশের পৃথিবীটাই বদলে গেল এলির। চিঠিতে দশ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দশ দিন বাদে কী হবে? এই চিন্তা কুরে কুরে খেতে লাগল এলিকে।
দু’দিন এরকম অস্থিরতায় কাটল এলির। নাদিয়াও এলির মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু এলিকে নিজে থেকে কিছু বলেননি। ভাবলেন, ওর একটু একা থাকা দরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে তৈরি করার জন্য।
তিনদিনের দিন এলি অফিসে বসে ক্যালকুলেটারে হিসাব করছিলেন। ফের দরজায় জালমানের আবির্ভাব।

‘সুপ্রভাত মিস্টার কোহেন। ভিতরে আসতে পারি?’
এলি সম্মতি জানানোর পরই জালমান ভিতরে এল। এলির সঙ্গে করমর্দন করে চেয়ার টেনে বসেও পড়ল। তারপর একটানা বলে গেল, ‘এইরকম রবাহুতের মতো দুম করে এসে আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য দুঃখিত। আপনি ভাবতেই পারেন, আপনাকে নেওয়ার জন্য সভ্যতা ভব্যতার ধার ধারছি না আমরা। আসল কথাটা হল, আপনার চাকরি যাওয়ার ব্যাপারটা গতকালই হঠাৎ জানতে পেরেছি। তাই চলে এলাম যদি আপনার কোনও সাহায্যে লাগি।’
অফিসের জনাপাঁচেক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে তাঁকে বাধ্য করা হচ্ছে না তো অফারটা নিতে? এলির মনে যে এই সন্দেহ দানা বাঁধছে, তাও বুদ্ধিমান জালমানের বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
এতক্ষণ এলি শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন, ‘আপনার এত লজ্জা পাওয়ার কোনও দরকার নেই। আমাদের জীবনে অনেক কিছুই হয়, যার উপরে আমাদের কোনও হাত থাকে না। আসলে আপনি একদম ঠিকঠাক সময়ে এসেছেন।’
তাই সাততাড়াতাড়ি সে বলে, ‘এটা ভুলেও ভাববেন না যে, আপনাকে পাওয়ার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রক আপনার অফিসে এই গণহারে চাকরিচ্যুত করিয়েছে। সে সব করার কোনও দরকারও নেই আমাদের। যাই হোক, আমার অফারটা কিন্তু এখনও আছে।’
এতক্ষণ এলি শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন, ‘আপনার এত লজ্জা পাওয়ার কোনও দরকার নেই। আমাদের জীবনে অনেক কিছুই হয়, যার উপরে আমাদের কোনও হাত থাকে না। আসলে আপনি একদম ঠিকঠাক সময়ে এসেছেন।’
এ বার জালমান অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
‘আমি নিশ্চিত এই নতুন চাকরি আপনার মনমতো হবে। আপনার স্ত্রীকেও আর চাকরি করতে হবে না। মাসিক মাইন হবে সাড়ে তিনশো ইজরায়েলি পাউন্ড। এই নতুন কাজের খুঁটিনাটি আপনাকে শেখানো হবে। তারপর ভাল লাগলে করবেন। না ভাল লাগলে করতে হবে না। নিজের নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে কেউ করতে বলবে না।’
এলি এমনিতে কম কথার মানুষ। জালমানের টানা লেকচারে একটু বিরক্তও হল।
‘আপনি একই কথা ফের বলছেন। আমি তো বললাম, আপনার অফার গ্রহণ করেছি।’
‘তাহলে ওই কথাই রইল। দিন কয়েকের মধ্যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আর হ্যাঁ, আমার সঙ্গে এই কথাবার্তা হয়ইনি।’
জালমান আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।
‘তাহলে ওই কথাই রইল। দিন কয়েকের মধ্যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আর হ্যাঁ, আমার সঙ্গে এই কথাবার্তা হয়ইনি।’
এলির জন্য মোসাদের রহস্যময় জগতের দরজা খুলে গেল।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য। ষাটের দশকে ইজরায়েলের মুদ্রা ছিল ইজরায়েলি পাউন্ড। তখন সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রারম্ভিক গড় বেতন ছিল বড় জোর আড়াইশো পাউন্ড। ফলে এলিকে মোসাদ যে বেশ ভাল আর্থিক প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য।
It Was Love At First Sight
এখানে এলি কোহেনের স্ত্রী নাদিয়ার সম্বন্ধে দু’চার কথা বলা যেতেই পারে। বাগদাদের এক উচ্চবিত্ত ইহুদি ব্যবসায়ী পরিবারে নাদিয়া মাজাল্ড জন্ম নেন। ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে ইউরোপ, আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়া থেকে ইহুদিদের তাঁদের ‘প্রোমিজড ল্যান্ডে’ যাওয়ার ঢল নামে। ১৯৫১ সালে সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে নাদিয়ার পরিবারও চলে আসে ইজরায়েলে। নবগঠিত রাষ্ট্রে তখন বাসস্থানের পরিকাঠামো গড়ে উঠছে। নাদিয়ার পরিবারকে তাই বাগদাদের প্রাসাদ ছেড়ে এসে, ছ-ছ’টা বছর ইজরায়েলে অস্থায়ী শিবিরে কাটাতে হল।
বহু বছর পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শাবাদ সোসাইটির এক ভাষণে নাদিয়া বলেন, ‘বাড়ির উল্টোদিকেই থাকতেন এলি। বিনয়ী। টাকপয়সা, বাড়ি গাড়ির প্রতি কোনও মোহ ছিল না।
তবে তাতে নাদিয়া দমে যাননি। অসুস্থ বাবা আর পুরো পরিবারকে দেখার জন্য, সামরিক বাহিনীতেও যোগ দেন।
বহু বছর পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শাবাদ সোসাইটির এক ভাষণে নাদিয়া বলেন, ‘বাড়ির উল্টোদিকেই থাকতেন এলি। বিনয়ী। টাকপয়সা, বাড়ি গাড়ির প্রতি কোনও মোহ ছিল না। সবার থেকে আলাদা। কম কথা বলত, কাজে করে দেখাত। It was love at first sight. We could not lift ourselves up from the chairs. We had an immediate connection.’
তেল আভিভে সিনেমা দেখা, বাত-আম সমুদ্র সৈকতে হাঁটার মতো ছ’মাসের প্রণয়পর্ব শেষে সিনোগ্যগে চার হাত এক হয়ে গেল ১৯৫৯ সালের ৩১শে অগস্ট। এলির বয়স তখন ৩৫, নাদিয়ার ২৪। দম্পতির মধ্যে এই ১১ বছর পার্থক্য নিয়ে পরে মজা করে নাদিয়া বলেছেন, এলি তাঁর জীবনে অর্ধেক স্বামী আর অর্ধেক পিতা ছিল। কোহেন দম্পতির প্রথম দুই কন্যাসন্তান হল সোফি আর ইরিত। তৃতীয় পুত্র সন্তান শাই যখন নাদিয়ার গর্ভে তখন সিরিয়া চরবৃত্তির দায়ে এলিকে দামাস্কাসে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলায়।
তবে যে প্রশ্নটা পরবর্তীকালে বারংবার উঠেছে তা হল, এলি না হয় নিজের কাজের স্বরূপ ঢেকে রাখার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে ঢাল বানিয়েছেন, কিন্তু নাদিয়া তাঁর ছ’বছরের দাম্পত্য জীবনে কি কিছুই বুঝতে পারেননি?
বাড়ির আর্থিক অবস্থা হঠাৎ ভাল হয়ে গেল। দামি দামি জিনিসপত্র আসতে শুরু করল। কারণ জানতে চাইলে এলি বলতেন বোনাস, ইনক্রিমেন্টের কথা।
নাদিয়ার পরবর্তীকালের সাক্ষাৎকারগুলোর নির্যাস যদি নেওয়া যায়, তাহলে ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম দাঁড়ায়— এলির কথাবার্তায় কাজকর্মে নাদিয়ার সন্দেহ যে হয়নি, তা নয়। কখনও ভেবেছেন, স্বামী হয়তো পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। কিন্তু এলিকে যতটা চেনেন তিনি, তাতে এটা মানতে তাঁর মন চায়নি।
১৯৬০ থেকে ১৯৬১ সাল অবধি একটা লম্বা সময় যখন কামেল আমিন থাবেতের পরিচয়ে এলি আর্জেন্টিনায় ছিলেন, তখন নাদিয়া তো কোনও খোঁজই পাননি। যাওয়ার সময় শুধু বলে গিয়েছিলেন, প্রশিক্ষণের জন্য ইউরোপ যাচ্ছেন। ফেরার পর এলি কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকতেন।
বাড়ির আর্থিক অবস্থা হঠাৎ ভাল হয়ে গেল। দামি দামি জিনিসপত্র আসতে শুরু করল। কারণ জানতে চাইলে এলি বলতেন বোনাস, ইনক্রিমেন্টের কথা।
রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এলি আরবিতে বিড়বিড় করতেন। সকালে এই নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে এলির জবাব ছিল এসব মিশরের দুঃস্বপ্ন।
চিঠিপত্র আসত জুরিখের এক পোস্ট বক্স থেকে। তাতে কোনও ঠিকানা লেখা থাকত না। নাদিয়া উত্তর দিতেন সেইসব চিঠির। ভাবতেন হয়তো দেশের প্রতিরক্ষার জন্যই এই গোপনীয়তা।
সিরিয়ায় কামেল আমিন থাবেত পরিচয়ে থাকাকালীন ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার এলি বাড়ি এসেছেন। প্রতিবারই আসার আগাম কোনও খবর না দিয়েই। নিয়ে এসেছেন দামি দামি ইউরোপীয় উপহার। নাদিয়া অবাক হয়ে দেখেন তাঁর ক্লিন শেভড স্বামীর পুরুষ্টু গোঁফ।
২০২৪ সালে নাদিয়া বলেছেন, ‘বিয়ে করেছিলাম এলি কোহেনকে। কবরে শায়িত করলাম কামেল আমিন থাবেতকে। আজও স্বামীকে সমাহিত করার জন্য অপেক্ষা করছি।’
এসবের পরেও তাঁর স্বামী যে সরাসরি মোসাদের হয়ে কাজ করছেন, এ কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি নাদিয়া। সেই সত্য তিনি জানতে পারেন দামাস্কাসে এলি ধরা পড়ার পর।
সম্প্রতি অনেক চেষ্টার পর এলির ঘড়িটা মোসাদ উদ্ধার করে নাদিয়াকে এনে দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এলির দেহাবশেষের কোনও খোঁজ মেলেনি। শোনা যায়, সিরিয়ার কোনও গোপন সমাধিক্ষেত্রে এলি শায়িত রয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বসির অল আসাদ জমানার পতনের পরে মার্কিন মদতপুষ্ট আহমেদ হুসেন অল-শারা দামাস্কাসে ক্ষমতাসীন হওয়ায় পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয় কি না, এখন সেটাই দেখার।
২০২৪ সালে নাদিয়া বলেছেন, ‘বিয়ে করেছিলাম এলি কোহেনকে। কবরে শায়িত করলাম কামেল আমিন থাবেতকে। আজও স্বামীকে সমাহিত করার জন্য অপেক্ষা করছি।’
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস- ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে- এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত