(Tamir Rice)
‘তামির রাইস
তামিরকে আমি তার মায়ের চোখ দিয়ে মনে রাখতে চাই
সে খেলাধুলা, বিজ্ঞান আর পড়তে ভালবাসে
সে লেগো নিয়ে খেলে, কার্টুন দেখে
করিডোর দিয়ে আসতে যেতে হয়তো তার মা তাকে জড়িয়ে ধরতেন
একটা দিনও যায় না যেদিন আমি তামিরকে মনে করি না
আট বছর পরেও আমরা এই অসহনীয় শোক বয়ে বেড়াচ্ছি,
তার নাম আমরা সবাই জানি— যা আমাদের গলায় আটকে যায়,
ভোরের আলোয় মাকড়সার জালে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো
তামির রাইস
তার নাম আমাদের ঠোঁটে শুধু একটি ক্ষমা প্রার্থনার চেয়ে বেশি হয়ে থেকে যাক
তার মুখ যেন শুধু এইটুকু মনে করিয়ে না দেয় যে হিংস্রতা শব্দটা এতটাই নিষ্ঠুর
যা কোনও ভাষায় কখনও পুরোপুরি বলা যায় না।
আমরা হয়তো বন্ধু হতে পারতাম, তামির আর আমি
সে আমার থেকে মাত্র এক বছরের বড়
আমরা হয়তো ল্যাব পার্টনার হতাম— টাইট্রেশন করতাম, নোট নিতাম
ভাবি, আচ্ছা তার হাতের লেখা কেমন হতো
হয়তো সে একজন আঁকিয়ে ছিল
গণিতের খাতা বা ইংরেজি প্রবন্ধের পাশে আঁকিবুঁকি করত
হয়তো সে খেলাধুলা ভালবাসত, ফুটবলে লাথি মারতে মারতে ফুলের পাপড়ি উড়িয়ে দিত রাস্তায়
তামির এ বছর গ্র্যাজুয়েট হতে পারত— এখন সে শুধু সংবাদে এক শোকগাথা
তার মুখ টিভিতে আটকে থাকে, ভাঙা রেকর্ডের মতো বারবার ফিরে আসে-
মানসী গর্গ (স্টুডেন্ট পোয়েট অফ ২০২২)’
আরও পড়ুন: সারা রাত ফোটাক তারা নব নব…
তামির রাইস। ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর, বারো বছর বয়সি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু তামির ক্লিভল্যান্ড, ওহায়োর একটি রিক্রিয়েশন সেন্টারের বাইরে খেলনা প্যালেট গান নিয়ে খেলছিল। একজন পথচলতি মানুষ তখন ৯১১ নম্বর কল করে বলেন, একজন লোককে বন্দুক হাতে রাস্তার লোকের দিকে তাক করতে দেখেছেন, খুব সম্ভব খেলনা বন্দুক। সেই কলের ভিত্তিতে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে, কোনও ওয়ার্নিং ছাড়া, কিছু খতিয়ে না দেখে, তামিরকে গুলি করে হত্যা করে। বারো বছরের একটি বালক। কেমন ছিল তামির? কেমন ছিল তার বারো বছরের জীবন? তামিরের মা সামিরার কথা কিন্তু সত্যি ওই কবিতার থেকে আলাদা কিছু নয়।

সে ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করত। বাস্কেটবল। আঁকতেও তার ভাল লাগত— সে আর্ট প্রোগ্রামের অংশ ছিল। পড়াশোনা করতে ভালবাসত। সামিরা তাকে সেই সব সুযোগ দিতে পেরেছিলেন, যা তিনি নিজে পাননি। তাকে মেন্টরিং ও টিউটরিংয়ে যুক্ত করেছিলেন— তাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতেন। ‘ব্যস্ত না থাকলে, বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে সেই আশংকায়। সে দুষ্টু ছিল, আদুরে-খুব হাসিখুশি, তাই তো মেয়েদের কাছেও খুব জনপ্রিয় ছিল। আমি জানতাম, ও বড় হয়ে কোনও ভাল খেলোয়াড় হবে, এত খেলাপাগল ছিল— কিন্তু সেই নিয়ে কথা বলার সুযোগটাও তো পেলাম না।’ যে সময় সামিরা এই কথাগুলো বলছেন, বেঁচে থাকলে তখন তামির হাই স্কুল শেষ করত। তার জীবনের পরের অধ্যায়টা শুরু হত। কত কী হতে পারত। তার বদলে ছয় বছর আগে, এক বিকেলে সামিরার দরজায় কড়া নেড়ে একটি ছেলে বলে যায়— তার ছেলেকে পুলিশ গুলি করেছে।
সামিরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন চোদ্দ বছর বয়সি ছেলেকে একটি পুলিশ গাড়ির পেছনে ধরে রাখা হয়েছিল। তামির মাটিতে, একটি গ্যাজিবোর কাছে পড়েছিল। চারদিকে পুলিশ ঘিরে রেখেছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল মাটি। সেই অবস্থাতে পুলিশ তাকে বলেছিল, শান্ত হতে, না হলে তাকেও পুলিশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে।

‘সেদিনটা আমার জন্য ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন ছিল। যেভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আমি চুপ থাকতাম কী করে? তারা যা-ই বলুক, এটা হত্যা, এটা খুন। নির্মমভাবে একটা জলজ্যান্ত প্রাণকে শেষ করে দেওয়া।’
তাঁর কথায়, আমেরিকায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ মা হওয়া খুবই মানসিক চাপের, সবসময় ভয় আর উদ্বেগে বাঁচা। কখন বাচ্চার সঙ্গে কী হয়। শুধু তো তিনি নন, আমেরিকা তাঁর মতো অনেক মায়ের জীবনকে অপরিসীম হাহাকারে, অন্তহীন ক্ষোভে ভরিয়ে দিয়েছে। সামিরা সেই ক্ষোভকে, সেই রাগকে রূপান্তর করেছেন মানুষকে সাহায্য করতে— তাঁর তামির রাইস ফাউন্ডেশন ব্যবহার করে পুলিশ সংস্কারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য। তামির এখনও হয়তো মানুষের মনে বেঁচে আছে, আর তিনি তার কণ্ঠস্বর। এইভাবেই একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গ মায়েদের হয়ে উঠতে হয়েছে তাঁদের মৃত সন্তানদের কণ্ঠস্বর।
২০১৪ সালের ১৭ জুলাই, এরিক গার্নারের মৃত্যু হয় পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সামান্য সংঘর্ষের পর। পুলিশ সন্দেহ করেছিল, গার্নার রাস্তায় অবৈধভাবে সিগারেট বিক্রি করছিলেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা প্যান্টালি এরিক গার্নারের গলায় হাত পেঁচিয়ে ধরেন। তারপর তারা ধস্তাধস্তি করতে করতে ফুটপাথে পড়ে যান। গার্নার বারবার বলতে থাকেন— ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’, কিন্তু কেউ সে কথায় ভ্রুক্ষেপ করেনি। তারপর গার্নার অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয়।

‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’— এই কথাগুলো ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের এক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। লক্ষ কণ্ঠস্বর গোটা আমেরিকা জুড়ে বলতে থাকে, তারা শ্বাস নিতে পারছে না। আর, আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন গোয়েনডোলিন কার, এরিকের মা। তিনি নিউইয়র্কের স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বৃহৎ আফ্রিকান-আমেরিকান পরিবারের একজন ম্যাট্রিয়ার্ক। গোয়েনডোলিনের জীবন শুরু হয় সাউথ ব্রুকলিনে। জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ইউনাইটেড স্টেটস পোস্টাল সার্ভিসেস, মেট্রপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটিতে কাজ করেছেন। তিন সন্তান, পনেরো জন নাতি-নাতনি এবং ছয় প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীসহ বিরাট পরিবার গড়ে তুলেছিলেন যে শহরে, সেই শহরের কাছেই ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন ছেলের হত্যার।
তিনি, তার মতো আরও মায়েরা মিলে তৈরি করেছেন গার্নার ফাউন্ডেশন, তার মধ্যে আছে ‘দিস স্টপস টুডে’ কর্মসূচি, যেখানে তার মতো রয়েছেন অন্য পরিবারের ভুক্তভোগীরাও।
তিনি একাধিক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর বহন করেছেন— যারা সবাই এরিকের মৃত্যুতে শোকাহত। একই সঙ্গে তিনি সেই সব মায়েদের হয়েও কথা বলে চলেছেন, যাঁদের সন্তানের মৃত্যু গণমাধ্যমের নজর পায়নি। তার ছেলের হত্যাকারী পুলিশ অফিসারকে পুলিশ বাহিনী থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল— তাও ২০১৯ সালের পর। কোনও শাস্তি হয়নি। তিনি লড়ে গেছেন। তিনি, তার মতো আরও মায়েরা মিলে তৈরি করেছেন গার্নার ফাউন্ডেশন, তার মধ্যে আছে ‘দিস স্টপস টুডে’ কর্মসূচি, যেখানে তার মতো রয়েছেন অন্য পরিবারের ভুক্তভোগীরাও।
তারা সাহায্য পায়, আশ্রয় পায়, দিশা খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। এছাড়াও, তিনি যোগ দিয়েছেন ‘মাদার্স অফ মুভমেন্টে’, অন্য সন্তান হারানো কৃষ্ণাঙ্গ মায়েদের সঙ্গে, যাঁরা রাজ্য থেকে ওয়াশিংটন সমস্ত জায়গায় আইন পরিবর্তন আর ন্যায় বিচারের দাবিতে লড়ছেন।

২০২২ সালে মিনিয়াপোলিস শহরে জর্জ ফ্লয়েডকে নির্মমভাবে হত্যা করে পুলিশ। অতিমারিকে অগ্রাহ্য করে গোটা আমেরিকা উত্তাল হয়ে ওঠে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ আন্দোলনে। গোয়েনও সামিল হন সেই আন্দোলনে। তিনি বলছিলেন, ‘জর্জ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে মাকে ডাকছিল। আমি যখন শুনি, জর্জের মা বেঁচে নেই, আমার মনে হচ্ছিল মরে যাওয়ার সময়ে সে আমেরিকার সব মাকে ডাকছিল।’ আর এই বোধটাই এত বছর ধরে জাগিয়ে রেখেছে তাঁকে, তাঁর মাতৃসত্তাকে। গোয়েন মাটিতে মিশে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, যেমনভাবে প্রত্যেকটা স্কুল শুটিংয়ের খবরে, প্রত্যেকটা ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুতে নতুন করে সন্তান হারানোর উপলব্ধি করেন নিকোল হকলি।
নিকোল হারিয়েছিলেন তার ছয় বছরের ছেলে ডিলানকে, যখন কানেকটিকাটে নিউটাউন শহরে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে বন্দুকধারী এক টিনেজার, তার ছেলের সঙ্গে গ্রেড ওয়ানের অন্যান্য শিশু আর তাদের টিচারদের অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিতে ছিন্নভিন্ন করে নিজেও আত্মহত্যা করে। কুড়ি জন শিশু। ছয় জন এডুকেটর। পাঁচ মিনিটে একশো চুয়ান্নটা বুলেট। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় একটা শান্ত শহরতলি।
এরপরেই নিকোল আর কয়েকজন অভিভাবক মিলে তৈরি করেন সংস্থা— স্যান্ডি হুক প্রমিজ। মনে আছে এদের সংগ্রাম এখনও। এদের পরিবারে ছিল আরও বাচ্চারা। আরও দায়িত্ব। তবুও ‘স্যান্ডি হুক প্রমিজ’ শুরু হয়, আগ্নেয়াস্ত্র আইন পরিবর্তনের, বিশেষত অ্যাসল্ট রাইফেল নিষিদ্ধ করার শপথ নিয়ে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের মধ্যেও আশা জেগেছিল। শিশুদের রক্ত লেগেছে প্রশাসনের হাতে। এবার বন্দুক আইন অত্যন্ত কঠোর হোক। প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন এই মা-বাবারা।

কানেটিকাট রাজ্যে সফল হয় তারা। কানেকটিকাটের গভর্নর গোটা আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে কঠোর আগ্নেয়াস্ত্রনীতি চালু করে। বিশেষত সাধারণ লোকের কাছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বিক্রি নিষিদ্ধ করার জন্য। এরপর তাঁরা গেলেন ওয়াশিংটনে। রাষ্ট্রপতি, সেনেটর বহু রাজনীতিকদের কাছে, কিন্তু হেরে গেলেন। বিল পাশ হল না। এরপর কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্দুকবাজরা ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করল নির্দোষ শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের।
২০২৫ সালেই অন্তত ৭৮টি স্কুল শুটিংয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে বত্রিশটা মৃত্যু আর একশো চব্বিশ জন আহত হয়েছে। নিকোলের কথায়, প্রতিবার যখন এরকম ঘটনা ঘটে, তাঁর হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়। তিনি বলেন ‘হিলিং একটা অদ্ভুত শব্দ, এবং আমি এটা খুব একটা ব্যবহার করি না। ডিলানের মৃত্যুর প্রায় ১৩ বছর পরেও আমি নিজেকে সুস্থ মনে করি না। কোনওদিনই আমার শোক নির্বাপিত হবে না। এ আসলে সামনে এগিয়ে চলা, কিন্তু ভুলে যাওয়া নয়।’

নিকোল বলেন, ‘এই ঘটনা বারবার ঘটছে বলে আমি ক্ষুব্ধ, বিশেষ করে যখন এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের অনেক উপায় আছে।’ স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, অভিভাবক, আত্মীয়, কোচ সবাইকে সচেতন করার জন্য তারা তৈরি করেছেন ‘লক্ষণগুলো চিনুন’ ট্রেনিং। আততায়ীরা যখন ভাবে এরকম কিছু ঘটনা ঘটাবে, তখন তাদের আচরণে, কথায়, ব্যবহারে সোশ্যাল মিডিয়াতে তার বহিঃপ্রকাশ হয়। তাই নিকোলের কথায়, সচেতনতা খুব প্রয়োজন, জানা দরকার এই লক্ষণগুলো কী হতে পারে। আর বিপদের আঁচ পেলে, কোনও বিশ্বাসযোগ্য মানুষকে বলা বা নিজের পরিচয় গোপন রেখেও কতৃপক্ষের কাছে পৌঁছনো দরকার। এইভাবে তাঁরা উনিশটি সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড আটকাতে পেরেছেন এখন পর্যন্ত। আইন সাহায্য করেনি, রাষ্ট্র পাশে দাঁড়ায়নি, তবু তৃণমূল স্তরে কিছু ঘটার আগেই আটকানোর চেষ্টা করছেন।
‘আমি চাই, অন্তত একবার আমরা শোককে রাজনীতির হাতিয়ার না বানাই
আমি চাই, অন্তত একবার আমরা দুঃখ সইবার শক্তিকে সাধুবাদ না দিই
আমি চাই, কোনও মাকে তার সন্তানের মৃত্যু দেখতে না হয়-’
সন্তানহারা মায়েরা আজও এই চেষ্টা করে চলেছেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
Mahua..sob ghotonagulo-e jana.. tobu abar chokh jole bhore gelo! Jani na benche thakakalin kono change dekhe jete parbo kina..Sudhui Kurnish janai haar na mene ekhono lore jayoa manushder..Songe tomakeo