(Ujjhomanush 4)
সারেঙ্গী ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার যে পথটা, মানে একটা অ্যাসবেস্টস দেওয়া লম্বাটে ঘরের কাঠের ফ্রেমের দরজার ঠিক গা ঘেঁষে বসে থাকত আউ আউ পাগল। ফলে, আমার ডাক্তারখানায় ঢুকতে স্বাভাবিকভাবেই শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। সারেঙ্গী ডাক্তারের কাছে যেতে এমনিই কারও ভাল লাগার নয়, তাও যদি মিষ্টি ওষুধ দিত, কথা ছিল, কিন্তু অমন তেতো সিরাপ খেতে হবে মনে হলেই, জ্বর সিজ়ফায়ারের ডাক দিত স্বয়ং।
অবশ্য ডাক্তারখানা যাওয়া ঠেকানো গেলেই যে ওই তেতো সিরাপের থেকে মুক্তি ছিল, তা তো নয়। ওই যে রাতে কিছুতেই আমার জ্বর নামল না, মায়ের নিরন্তর জলপট্টি ও অন্যান্য ওষুধ সত্ত্বেও, বরং বেড়েই চলল আর, শীতের রাতে পাহাড় থেকে নেমে, আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে শেয়াল ডেকে চলল (যেমন ডেকেছিল আরও অনেক বছর পর, আমার বাবার যে বার মারণ শ্বাসকষ্ট হল, সে রাতে…), সে রাতে আমার ধারণা, আমার জিভ একাধিক তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিল! সৌজন্য সারেঙ্গী ডাক্তার।
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১), (২), (৩)
আমি সেরে উঠেছিলাম, তখন হয়তো আমি সাত-আট বা ছয়, আর পরে মা বলেছিল, সারেঙ্গী ডাক্তার (যদ্দুর মনে পড়ে, তখনই ষাট পেরিয়েছেন) ওই কালো কোট পরে ঠায় বসেছিলেন সন্ধে থেকে মাঝরাত পার করে, আমাদের খাটের পাশে একটা টুলে। অনেক সাধাসাধির পর কাপ দুয়েক চা আর থিন অ্যারারুট খেয়েছিলেন বোধহয়, আর কিচ্ছু না।

বাবা গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে এসেছিল, ব্যস্ত ডাক্তার, অবস্থা শুনে ডাক্তারখানা প্রায় খোলা রেখেই চলে এসেছিলেন। রাত দুটো-আড়াইটে নাগাদ যখন যুদ্ধ হাতে আসছে, বেরিয়েছিলেন তখন। ডাক্তারখানা বন্ধ করেছিলেন সারেঙ্গী ডাক্তারের অবর্তমানে, কম্পাউন্ডার কাকু, কিন্তু আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারেঙ্গী ডাক্তার, পরে শুনেছিলাম, বাড়িমুখো হওয়ার আগে গিয়েছিলেন ডাক্তারখানা। বাইরের কম পাওয়ারের ডুম জ্বেলে সেখানে তখনও অতন্দ্র প্রহরী যেন…কে আর, সেই আউ আউ পাগল। যে একবার ওই ডাক্তারখানার বাইরে, হাত থেকে পড়ে যাওয়া ক্রোসিনের শিশির ঢাকনা তুলে গম্ভীর মুখে আমায় এগিয়ে দিয়েছিল বলে আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলাম। নিইনি।
কিন্তু এই দেখুন, এত বছর পরেও আউ আউ উহ্য হয়ে যায়নি। সরি, যাননি। বা আমার মনে হচ্ছে হননি উহ্য, আসলে তো হয়েছেনই। যেমন হয়েছেন সারেঙ্গী ডাক্তার-ও, যেমনটা হয়ে থাকেন ছোট একটা মাইনিং টাউন বা মফস্বলের কতশত এমন জন। আপন অক্ষরেখা মেনে তাঁরা নিশ্চিতভাবেই হেঁটে চলে যান কোটের পকেটে তেতো সিরাপের শিশি নিয়ে, কোনও বিপন্নের শিয়রে বসবেন বলে। তারপর কালের নিয়মেই আঁধার তাঁবু তুলে নিয়ে পাড়ি দেবে ক্ষণিকের তরে কোনও অপেক্ষাঘরে, আর সারেঙ্গী ডাক্তারেরা পরিশ্রান্ত হয়ে প্রথমেই ফিরে যাবেন না গৃহ, যাবেন অবশ্যই অল্প ডুমের আলোয় অপেক্ষারত আউ আউ পাগলদের কাছে, যাঁকে জিম্মায় দেওয়া যায় অরক্ষিত সাতকাহন।
এইটা, এইটাই, আমরা বুঝে উঠতে পারিনি, বা বড় বিলম্বে বুঝলাম। যে, উহ্য ও স্পষ্টের এ দিনভাগের বাইরেও একটা নিজস্ব বিশ্ব আছে। সেটা একটা মানসিকতাও বটে। আউ আউ পাগল সে দিন যখন দেখেছিল (হ্যাঁ, ফের দেখেছিল-তেই ফিরলাম) আমি নিলাম না বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে ঢাকনা, খুব একটা বিচলিত সে হয়নি। একটা (প্রখর) আন্ডারস্ট্যান্ডিং কি ছিল আউ আউ-য়ের? তাই সে ঢাকনাটা বাবা-কে ধরিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে পাশের একটা হলদেটে সারমেয়র সঙ্গে গল্পে মজে গিয়েছিল? তারপরও বেশ কয়েকবার তো যেতেই হয়েছে আমায় ডাক্তারখানা, আর প্রতিবার, এখন বুঝতে পারি, আউ আউ ক্ষয়াটে দেওয়ালের সঙ্গে একরকম একাত্ম হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, আমায় দেখলেই।

একরকম আমার কাছে উহ্য হয়ে যাওয়ার চেষ্টা? আমার কল্যাণই তো তখন তাকে তাড়িয়ে ফিরছে, নয় কি? নইলে সে কেন লুকোবে নিজেকে, কেন এক প্রকার আত্মগোপন-প্রয়াসী হবে?
উহ্যভাবকে থোড়াই পরোয়া করা এমন এক বা একাধিক চরিত্র নিমেষেই উহ্যের আবরণ স্বেচ্ছায় চাপিয়ে নিচ্ছেন দেহ-মনে। এখানেই আমাদের উহ্য-স্পষ্ট ভাবনাপ্রবাহ গুলিয়ে অত্যাশ্চর্য এক ঘ্যাঁটে পরিণত হয়। ক্রমশ বুঝতে পারি, আমেরিকান ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার জোশুয়া সেফ্টেল, তাঁর ‘অল দ্য এম্পটি রুমস’ নামক মন-ভেঙে দেওয়া ছবিতে, যে ঘরে অন্তত ১৫ মিনিটের জন্য আমাদের এসে দাঁড়াতে বলেন, সেই ঘরের বাইরেরই বোধহয় অদৃশ্য কোনও আউ আউ পাগল বসে থাকে, থেকে আগলায়, মুছে যাওয়া কিছু শিশুর ফেলে আসা ঘ্রাণ।
সেফ্টেল-এর এই ছবি খুঁজে ফেরে বা গিয়ে পড়ে এমন কিছু শূন্য ঘরে, যা দিন কিছু আগেও ছিল গমগমে। তারপর কোনও এক সাংঘাতিক স্কুল শুটিংয়ের ঘটনায়, সে ঘর হারিয়েছে স্বর। স্কুলে কোনও এক ‘উন্মাদ’-এর আনতাবড়ি গুলি চালানোয় ১৪ বছরের ডমিনিক ব্ল্যাকওয়েল, ৯ বছরের হ্যালি স্ক্রাগস, ৯ বছর বয়সী জ্যাকলিন ক্যাজ়ারেস ও ১৫ বছরের গ্রেসি ম্যুলবার্গার মারা যায়। সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যান ও ফোটোগ্রাফার ল্যু বপ এই খালি ঘরে গিয়ে দাঁড়ান এই তথ্যচিত্রে। তাঁরা দেখেন ও আমাদের দেখান, ওই ঘরে এখনও ওভাবেই পড়ে রয়েছে বাচ্চাগুলির প্রিয় স্পঞ্জবব পেন্সিল পট, ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড, আয়নায় আঁকিবুকি কাটা, লন্ড্রি বাস্কেটে পড়ে থাকা না ধোয়া কাপড়…

রয়েছে বলতে, তেমনভাবেই রেখে দিয়েছেন মুছে যাওয়া শিশুদের বাবা-মা-আত্মীয়-পরিজন। প্রাণভাঙা দৃশ্য, অসহ্য অসহ্য সে বাস্তব। যে ঘর থেকে এই কিছু দিন আগেও উঠত কলরব, এখন বিনা দোষে, সেখানে এ অপার শূন্যতা। তবুও, বাবা-মা, চেয়েছেন এভাবেই থেকে যাক, চিহ্নগুলি। ছেড়ে যাওয়া গন্ধ। মানুষ কি ভয় করে? যে অসহ্য কষ্টের যা যা, তা যেন প্রতি সকালে মুখের সামনে না এসে পড়ে, তাই তো? কিন্তু এখানে কি সেই বিধ্বস্ত মা-বাবা চাইলেন না সে পথে হাঁটতে, যাতে বেঁচে থাকে অমন কষ্টের মধ্যেও যা ছিল একদা ঘোর সত্য? নয়তো, আমাদের স্বভাবই তো শোক বা শক ফুরিয়ে গেলে, এমন কিছুকে অম্লানবদনে উহ্য বানিয়ে ফেলা…
কারণ, আমরা তো কেউ আর আউ আউ পাগল হতে পারিনি বা সারেঙ্গী ডাক্তার, যে অল্প ডুমের আলোয়, ক্ষয়ে যাওয়া দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে রাত কাবার হয়ে গেলেও জেগে বসে থাকব, কারণ কেউ আমার জিম্মায় ছেড়ে গিয়েছে শত শত অরক্ষিত সাতকাহন…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত