(Ong Bong Chong 5)
বাংলা বছর ফুরিয়ে আসছে। চৈত্র ডুবলেই বৈশাখ জাগবে। বাজারে পয়লা নামবে। বাঙালি হাহাকার করবে। ভদ্রলোক বাঙালির হাহাকার, ‘নেই তো সেই বাঙালি’। সত্য। এই বাঙালি সেই বাঙালি নয়। এ তো একালের সমস্যা নয়, সেকালেরও সমস্যা। রাজনারায়ণ বসুর বইয়ের নাম ‘সেকাল আর একাল’। রাজনারায়ণ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার ও হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠার ফলে সামাজিক বদল ঘটার সময়কে ‘একাল’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আর তার আগের সময়কে বলেছিলেন ‘সেকাল’। সেকালের সঙ্গে একালের অনেক পার্থক্য। স্বাভাবিক, অনিবার্য। কাজেই ‘নেই তো সেই বাঙালি’ এ-কথা বললে কিছুই বোঝায় না। তবু এ-কথা বলা হবে।
বলিয়েদের একটি খাঁটি বাংলা প্রশ্ন করা দরকার। ‘সেই বাঙালি নেই বুঝলাম। কিন্তু তাতে প্রবলেমটা কী?’ এমনিতে প্রবলেম ইংরেজি শব্দ। ‘what’s your problem?’ নামে টমাস ওয়েডেলের বই আছে। অ্যামাজনে সার্চ দিলেই দেখা যায়। এই ইংরেজি problem শব্দটিকে বাঙালি বহুদিনই বাংলা করে নিয়েছে। বাংলা করতে গেলে শব্দের উচ্চারণ দেশজ করে নিতে হয়। নিজের ভাষার বিভক্তি যোগ করতে হয়। বাঙালি বহুকাল ধরে ‘প্রবলেমটা কী’ বলে। ইংরেজি problem আর তার সঙ্গে বাঙালির টা, দুয়ে মিলে problemটা। এ এখন বাংলা শব্দ। উচ্চারণে ও ব্যবহারে। এতে দোষের কিছু নেই। চিরকালই এমন হয়।

রাজনারায়ণ বসু লিখেছিলেন ‘সে কালের সাহেবরা অর্দ্ধেক হিন্দু ছিলেন।… তাঁহারা অনেক পরিমাণে এ দেশীয়দের আচার ব্যবহার পালন করিতেন। তখন সকাল বিকাল কাছারী হইত, মধ্যাহ্ন কালে সকলে বিশ্রাম করিত। মধ্যাহ্ন কালে কলিকাতা দ্বিপ্রহরা রজনীর ন্যায় নিস্তব্ধ হইত। তখনকার সাহেবরা পান খেতেন, আলবোলা ফুঁকতেন, বাইনাচ দিতেন ও হুলি খেলতেন।’ সেকালে যেমন হিন্দু সাহেব, একালে তেমন আম-বাঙালির প্রিয় বাংলা শব্দ ‘প্রবলেম’। তাতে প্রবলেমটা কী? প্রবলেম টেবিল, চেয়ার এই সবের মতো বাংলা শব্দ। হিন্দু সাহেব যেমন, তেমনি ‘প্রবলেমটা’ বাংরেজি। আগে বাংলা পরে ইংরেজি।
প্রশ্ন হল নতুন বাংলা বছরের আগে কেন এই ‘প্রবলেম’ ‘প্রবলেম’ করছি? তার একটা কারণ বাঙালির সামনে এখন হাজারটা ‘প্রবলেম’। বাংলা ভাষায় আমরা যেমন ‘প্রবলেম’ শব্দের সঙ্গে টা যোগ করেছি তেমনি উচ্চারণের সময় কেউ কেউ প্র-কে প করে দিয়েছেন। এমনিতে সংস্কৃত উপসর্গের তালিকায় ‘প্র’ আছে। প্র-দিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ। প্রণাম, প্রণয়, প্রবাল, প্রলয়। এর মধ্যে ‘প্রলয়’ ‘আবার প্রলয়’ বাঙালির দৃশ্য-বিনোদনে জনপ্রিয় সিনেমা ও সিরিজ। প্র-দিয়ে প্রবল, প্রলাপ, প্রচণ্ড, প্রকাণ্ড, প্রসাদ। তাতে অবশ্য বাঙালির কিছু যায় আসে না। বাঙালি মাঝে মাঝে প্র-কে র-ফলা ছাড়া করে বলে। বেশ করে। প্রবলেমটা কী? পবলেমটা কী?

রাজনারায়ণ লিখেছিলেন, ‘ষ্টুয়ার্ট নামে একজন প্রধান সৈনিক সাহেব ছিলেন, হিন্দুধর্ম্মের প্রতি তাঁহার বিলক্ষণ শ্রদ্ধা ছিল। তজ্জন্য অন্যান্য সাহেবরা তাঁকে হিন্দু ষ্টুয়ার্ট বলিয়া ডাকিত। তাঁহার বাটীতে শালগ্রামশিলা ছিল। তিনি প্রত্যহ পূজারি ব্রাহ্মণের দ্বারা তাহার পূজা করাইতেন।’ সেকালের সাহেবরা বাঙালিদের স্থান নাম বদলে দিয়েছে। বর্ধমান হয়েছে বার্ডওয়ান, বাঙালিরাও দিব্য সেক্ষপীয়র, মোক্ষমুলর নামে ডাক দিয়েছে।
দীনেশচন্দ্র সেন নাকি একবার ইংরেজি বক্তৃতায় আগাগোড়া সেক্ষপীয়র বলে গিয়েছিলেন। সাহেবদের মধ্যে কেউ কেউ মুখ টিপে হাসলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, গঙ্গাকে সাহেবরা যদি গ্যাঞ্জেস বলতে পারেন তাহলে তিনিও শেক্সপিয়র-কে সেক্ষপীয়র বলতে পারেন। স্বামী বিবেকানন্দ আবার তাঁর এক গুরুভাইকে গ্যাঞ্জেস বলে ডাকতেন। বিবেকানন্দ রসিক মানুষ। যেমন ইংরেজি, তেমনি বাংলা। বিলেতে সাহেবি টান-টোন, তাঁর ইংরেজি বক্তৃতা শুনে বিদেশিদের তাক লেগে যাচ্ছে। মার্গারেট নোবল, পরে যিনি নিবেদিতা, তিনি এদেশে এসে দেখলেন আচার্য তাঁকে নিতে এসেছেন। পরনে ভারতীয় সন্ন্যাসীর পরিধান।
ট্রেনে করে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় চলেছেন এক ‘প্রোমোটার’। বাঙালিরা অনেকেই ‘প্রোমোটার’কে ‘পোমোটার’ বলেন। সেই ‘প্রোমোটার’ ভদ্রলোকের আর কী দোষ আছে জানি না, কিন্তু র-ফলার দোষ নেই। দিব্য প্রবলেম বলেন, বাঙালি উচ্চারণে প্রবলেম। তিনি শান্তিনিকেতন থেকে হাওড়াগামী ট্রেনের এসি স্লিপার ক্লাসে শুয়ে শুয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। শান্তিনিকেতনে এখন সশব্দ নির্মাণ চলছে। নানারকম। ক্যাফে, ফ্ল্যাট, রেস্তরাঁ। বাঙালি ও অবাঙালি ‘প্রোমোটার’-এর কাছে শান্তিনিকেতন এখন সব হতে আপন।
জাহাজঘাটায় তিনি যে বিবেকানন্দকে দেখলেন তিনি অন্যরকম। বিদেশে এভাবে দেখেননি। দীনেশচন্দ্র, বিবেকানন্দ এঁরা বাঙালি ভদ্রলোক। এঁদের ‘কেসটা’ আলাদা। এঁরা দুই-ই পারেন। সাহেবও পারেন, দেশজও পারেন আবার ক্ষেত্র বিশেষে দো-আঁশলাও পারেন। দীনেশচন্দ্রের চাইতে বিবেকানন্দ অনেক বেশি পারেন। প্রতিভাতেও উচ্চতর। বাঙালির মধ্যে যাঁরা প্রবলেমটা ও পবলেমটা বলেন তাঁরা বিবেকানন্দ নন, দীনেশচন্দ্রও নন। তাতে কী? মোদ্দা কথা হল প্রবলেম বাংলা শব্দ। যেমন ইংরেজি case বাংলা। তার বড় বিচিত্র প্রয়োগ। ‘কেসটা কী বল দেখি?’ যেমন বাঙালি বলে, তেমন বন্ধু বন্ধুকে রেগে গিয়ে বলে ‘তুই আমায় কেস খাওয়ালি’। সাহেবরা এই অর্থে আর কবে case ব্যবহার করেছে। ইংরেজি case-কে বাঙালি কেশ-এর মতো উচ্চারণ করে। বাঙালির উচ্চারণে সংস্কৃত ‘কেশ’ আর ইংরেজি ‘case’ প্রায় এক। প্রবলেম নেই। নো প্রবলেম। নো পবলেম।

চৈত্র মাসে বাঙালির দু-টো প্রবলেমমূলক গল্প বলে বিদায় নেওয়া যাক।
ট্রেনে করে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় চলেছেন এক ‘প্রোমোটার’। বাঙালিরা অনেকেই ‘প্রোমোটার’কে ‘পোমোটার’ বলেন। সেই ‘প্রোমোটার’ ভদ্রলোকের আর কী দোষ আছে জানি না, কিন্তু র-ফলার দোষ নেই। দিব্য প্রবলেম বলেন, বাঙালি উচ্চারণে প্রবলেম। তিনি শান্তিনিকেতন থেকে হাওড়াগামী ট্রেনের এসি স্লিপার ক্লাসে শুয়ে শুয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। শান্তিনিকেতনে এখন সশব্দ নির্মাণ চলছে। নানারকম। ক্যাফে, ফ্ল্যাট, রেস্তরাঁ। বাঙালি ও অবাঙালি ‘প্রোমোটার’-এর কাছে শান্তিনিকেতন এখন সব হতে আপন।
তিনি অন্য এক ‘প্রোমোটার’-কে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান দিচ্ছিলেন, বলছিলেন লাভ করতে কিন্তু ঠিকঠাক জিনিস দিয়ে লাভ করতে। রান্নাঘরে নানারকম জিনিস চালাতে হয়, সে-জন্য ভাল তার লাগে। না-হলে পুড়ে যাবে। পার্টি প্রোমোটারকে ধরবে। তখন আবার ভাল তার লাগাতে হবে। দু-ফেরতা খরচ। সেই দু-ফেরতা খরচ মেটানো মুশকিল। এই সব বোঝাতে বোঝাতে তিনি বললেন, ‘প্রবলেমকে কখনও পেছনে দৌড়তে দেবেন না। এমন কাজ করলে প্রবলেম তো পেছনে দৌড়বেই। কোথায় কী লাগাতে হয় জেনে কাজ করুন।’
‘প্রোমোটার’ পেছনের প্রবলেমের কথা বলেছেন, শান্তিনিকেতনের এক চপ-বিক্রেতা সামনের প্রবলেমের কথা বললেন। যুদ্ধ লেগেছে। গ্যাস নেই। তিনি দাম দিয়ে গ্যাস কিনবেন না। নিজের চপ রোলের দামও বৃদ্ধি করবেন না। যতদিন জমানো কেরোসিন আছে, ততদিন চলবে।
প্রবলেমের এমন চিত্ররূপময় ব্যবহার শুনে পুরনো বছরের শেষে তাক লেগে গেল। মনের চোখে দেখলাম, প্রবলেম নামে একটি লিকলিকে রাগী বংশদণ্ডবৎ মানুষ পেছনে পেছনে দৌড়চ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল এককালে বাঙালি ‘পেছনে বাঁশ দেওয়া’ শব্দটি ব্যবহার করত। পেছন শব্দটিকে আরেকটি শব্দ দিয়েও কেউ কেউ প্রতিস্থাপিত করতেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় শব্দটি আছে। সেই ‘পেছনে বাঁশ দেবেন না’ ব্যবহারের নব রূপান্তর ‘প্রবলেমকে পেছনে দৌড়তে দেবেন না।’

খেয়াল করলাম প্রবলেম দু-রকম, পেছনের প্রবলেম আর সামনের প্রবলেম। যে প্রবলেম আমার নিজের তৈরি সেই প্রবলেম পেছনের প্রবলেম। দৌড়াচ্ছে, ঢুকেও যেতে পারে। আর যে প্রবলেম হঠাৎ এসে পড়ে, যার সৃষ্টিতে আমাদের হাত নেই, শক্তিশালী কোনও প্রাকৃতিক বা অনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রিক ঘটনার হাত আছে, তা সামনের প্রবলেম।
‘প্রোমোটার’ পেছনের প্রবলেমের কথা বলেছেন, শান্তিনিকেতনের এক চপ-বিক্রেতা সামনের প্রবলেমের কথা বললেন। যুদ্ধ লেগেছে। গ্যাস নেই। তিনি দাম দিয়ে গ্যাস কিনবেন না। নিজের চপ রোলের দামও বৃদ্ধি করবেন না। যতদিন জমানো কেরোসিন আছে, ততদিন চলবে। যখন ফুরোবে তখন রতনপল্লীর দোকান বন্ধ থাকবে। বললেন, ‘স্যার, গ্যাসই মেন পবলেম।’ বুঝলাম তিনি সামনের প্রবলেমের কথা বলছেন। এ যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির বাইরে থেকে আসা নিয়তির মতো। রাজা অউদিপাউস যে কাজ করেছেন, সে কাজ তিনি জেনে-বুঝে অপরাধ হিসেবে করেননি। পূর্ব নির্ধারিত নিয়তির হাতে তিনি দাস। গ্যাসের অভাবে খাওয়ার দোকান বন্ধ। এই ‘পবলেম’ সামনের ‘পবলেম’। দোকানদার নিজে তা সৃষ্টি করেননি। আর পেছনের প্রবলেম শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডির নিয়তির। ম্যাকবেথের উচ্চাশাই ম্যাকবেথের নিয়তি। তার পেছনে ধেয়ে আসছে তারই সৃষ্ট প্রবলেম। তারই হাতে উচ্চাশী খুনি ম্যাকবেথ পরাভূত।

সামনে নতুন বছর। বাংলা ভাষার প্রিয় শব্দ ‘প্রবলেম’ ও স্বরান্তরে ‘পবলেম’। সেই বাঙালি আর এই বাঙালি আলাদা। হবেই, অনিবার্য। তাতে কোনও প্রবলেম নেই। নো প্রবলেম। শুধু খুঁজতে হবে বাঙালির সমস্যার কারণ কোন প্রবলেম? সামনের না পেছনের? সামনের প্রবলেমে বাঙালির তত হাত নেই, তবু লড়তে হবে। গ্যাসের বদলে কেরোসিন দিয়ে কাজ চালাতে হবে। প্রয়োজনে হকের গ্যাস আদায় করতে হবে। কিন্তু পেছনের প্রবলেম? সে তো নিজের তৈরি। লাভ করুন, কিন্তু জিনিস ঠিক মতো দেওয়া চাই। প্রবলেমকে পেছনে দৌড়তে দেবেন না। নতুন বাংলা বছরে এই আম বাঙালির ব্রত হোক।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত