(Ong Bong Chong 7)
মানুষটি চলে গিয়েছিলেন উনচল্লিশ বছর বয়সে। শিক্ষিত বাঙালি বাগ্মী সন্ন্যাসী। বিবেকানন্দ প্রয়াত হন ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে। কর্মময় তাঁর জীবন, কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে যে চিঠিপত্র লিখছিলেন, তার মধ্যে কখনও উঁকি দিচ্ছিল বিষণ্ণতা। নিজের কর্মময় জীবনকে যেন খানিক দূর থেকে দেখছেন। মেরি হেলকে লিখছেন, ‘জীবিকার জন্য এই সব মঞ্চ-বক্তৃতার কাজ করে করে আমি একেবারে ক্লান্ত। এ কাজ আমার ভাল লাগছে না। অবসর নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা, দেখি যদি কিছু চিন্তার কাজ করতে পারি।’
সন্ন্যাসীর জীবিকা! এ কথা সচেতন ভাবেই লিখেছিলেন তিনি। পাশ্চাত্যে ধর্মপ্রচারের যে কাজ তাঁকে করতে হয়েছিল, সে তো জীবিকাই। স্টার্ডি একসময় ছিলেন তাঁর বক্তৃতার এজেন্ট। হল বুক, বক্তৃতা শোনার জন্য টিকিট এসবের ব্যবস্থা করতেন স্টার্ডি, আর সেই ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থের একটা অংশ রাখতেন, বাকি দিতেন স্বামীজিকে। স্বামীজি সেই উপার্জিত অর্থ পাঠাতেন গুরুভাইদের। শিকাগো ধর্ম মহাসভার সাফল্যের পর এই ছিল তাঁর নিরুপায় জীবিকা।
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
ক্লান্ত লাগছিল বলে গুরুভাই তুরীয়ানন্দকে বিদেশে এনেছিলেন। যেখানে তিনি যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন, সেখানে তুরীয়ানন্দ গেলে সুবিধা। কাজের পারম্পর্য বজায় থাকবে। ২৫ জুলাই ১৯০০। নিউ ইয়র্ক থেকে তুরীয়ানন্দকে লিখছেন, ‘সমিতিগুলির কাজ আবার একটু শুরু করে দাও, এবং মিসেস হ্যান্সবার্গকে বলো, তিনি যেন সময়মতো সব চাঁদা আদায় করেন, আর টাকা তুলে ভারতে পাঠিয়ে দেন; কারণ সারদা জানিয়েছে, তাদের বড় টানাটানি চলছে।’

সংঘ হল সন্ন্যাসের সংসার। টানাটানি কাকে বলে, সে তো আর অজানা নয়। রামকৃষ্ণদেবের প্রয়াণের পর বরানগরের ভাঙা বাড়িতে প্রথম যে মঠ, সেখানে কীভাবে যে জীবন কাটাতে হত তাঁদের! বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখায় আছে তার বিবরণ। এমনিতে সবাই কৌপিন পরে থাকতেন। বাইরে যাওয়ার জন্য একটিই ছিল আলখাল্লার মতো বস্ত্র। যখন যাঁর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হত, সেটি পরে যেতেন। মাথার তলায় নরম নরম ইট বালিশ করে শুতেন। পাঁজায় পোড়ানোর রকম-ফেরের উপর ইট শক্ত বা নরম।

শীতের রাতে ঠান্ডা তীব্র হলে, মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে কুস্তি করে নেওয়া। শরীর গরম হয়। এই জীবন থেকে ধীরে ধীরে খানিকটা শ্রী ফিরছিল, তবে টানাটানি তো ছিলই। বিবেকানন্দ বুঝতে পারছিলেন, রামকৃষ্ণদেবের প্রয়াণের পর গুরুভাইদের ধরে রাখার জন্য সংঘের প্রয়োজন। সংঘ জীবনের জন্য টাকার দরকার। সেজন্যই বিদেশে বক্তৃতা দেওয়া।
তবে ক্লান্তি তো আসেই। শরীর সব সময় সঙ্গ দেয় না। যাঁরা অর্থ দিয়ে বক্তৃতা শুনতে আসছেন, তাঁদের কাছে বক্তব্যের বিষয়গুণ ও পরিবেশন পদ্ধতি দুইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। মনোগ্রাহী না হলে তাঁরা শুনবেন কেন? তবে কত আর কথা বলা যায়! এই জীবিকা থেকে তাই ছুটি চাইছেন। লিখেছেন, ‘আমি এখন জিরেন নিতে চললুম।’ এই জিরেনের কথা অন্যভাবেও আসছে। ২৮ আগস্ট, ১৯০০। নিবেদিতাকে লিখলেন, ‘ভালই হোক আর মন্দই হোক, আমরা সকলেই এ সংসারে নিজ নিজ অংশ অভিনয় করে যাচ্ছি। যখন স্বপ্ন ভেঙে যাবে, এবং আমরা রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে যাব, তখন এ-সব বিষয়ে আমরা প্রাণ খুলে হাসব।’ যেন বুঝতে পারছেন তাঁর পার্থিব জীবনের সময় ফুরোচ্ছে।

এই সময় বেশ কয়েকটি পোষ্য ছিল তাঁর। ৭ সেপ্টেম্বর ১৯০১। বিদেশ থেকে মঠে ফিরে গিয়েছেন। বেলুড়ে মঠ নির্মাণের কাজ চলছে। নিবেদিতাকে লিখছেন, ‘মঠের জমিতে যে বর্ষার জল দাঁড়ায়, তার নিষ্কাশনের জন্য একটি গভীর নর্দমা কাটা হচ্ছে। সেই কাজে খানিকটা খেটে আমি এইমাত্র ফিরলাম। কোনও কোনও জায়গায় বৃষ্টির জল কয়েক ফুট দাঁড়িয়ে যায়। আমার সেই বিশালকায় সারসটি এবং হংস-হংসীগুলি খুব স্ফূর্তিতেই আছে। আমার পোষা কৃষ্ণসারটি মঠ থেকে পালিয়েছিল এবং তাকে খুঁজে বের করতে আমাদের দিন-কয়েক বেশ উদ্বেগে কাটাতে হয়েছে। আমার একটি হংসী দুর্ভাগ্যক্রমে কাল মারা গেছে।’

জীবনের শেষ পর্বের এই চিঠিগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়, প্রচারকের বাইরের জীবন থেকে অন্তর্জীবনের কাছে ফিরছেন বিবেকানন্দ। কর্ম থেকে অবসর চাইছেন, মুক্তিও। সন্ন্যাসের সংসারে তাঁর যে ভূমিকা ছিল, তা এবার শেষ হোক এই বাসনা। নিবেদিতাকে একটি দুটি বাক্য লিখে পাঠাচ্ছেন কখনও কখনও। যেমন লিখলেন বেলুড় থেকে ৮ অক্টোবর ১৯০১ তারিখে। ‘জীবনের স্রোতে উঠছি, পড়ছি। আজ যেন কতকটা অবতরণের পথে।’ ২১ এপ্রিল ১৯০২। নিজের শরীরের খবর দিলেন চিঠিতে। ‘লোকে বলে, আমি বেশ আছি; কিন্তু এখনও বড় দুর্বল, আর জল্পান একেবারে নিষিদ্ধ। তবে এইটুকু হয়েছে যে, রাসায়নিক বিশ্লেষণে অনেকটা উন্নতি দেখা গেছে। পায়ের ফোলা প্রভৃতি একেবারে গেছে।’ শরীর অবশ্য থাকবে না। এর কিছুদিনের মধ্যেই আলো নিভে যাবে।

বিবেকানন্দের জীবনের শেষ পর্বের এই চিঠিগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় সন্ন্যাসের সংসারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিজেকে ক্রমশ মুক্ত করার পথচলা। কথার জীবিকা থেকে কথা না বলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ। জিরেন চাইছেন। মনে পড়ে যাবে বিদ্যাসাগরের কথাও, তিনিও তো ক্রমে তাঁর দানের সংসার থেকে সমাজ সংস্কারের সংসার থেকে দূরে যাচ্ছেন। ভদ্রবৃত্তের বাইরে সে যাত্রা। এই যে প্রত্যাহার, এই প্রত্যাহারের শক্তিতেই তো তাঁরা বিশিষ্ট। বাঙালি জীবনে একসময় এই অনায়াস সহজ প্রত্যাহারের অনুশীলন চোখে পড়ত। এখন আর চোখে পড়ে না। বাঙালিকে কথায় পেয়েছে। না-কথার বিশিষ্টতা তার আর অধিগত নয়। কথা না বলার আর্ট সে হারিয়েছে। বিবেকানন্দ ভূমিকার বাইরে গিয়ে যে হেসে ওঠার কথা লিখেছিলেন, সেই নির্মল মুক্তির হাসি বাঙালি ভুলেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত