(Ong Bong Chong 13)
সত্যজিতের শঙ্কু আশ্চর্য সমস্ত যন্ত্রের উদ্ভাবক, ওষুধের আবিষ্কার কর্তা।
অথচ শঙ্কু, ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক মহলে অবিশ্বাস যেন খানিক থেকেই গিয়েছিল। শঙ্কুকে বিজ্ঞানী বলতে অনেকেই নারাজ। শঙ্কু তাঁর ১৩ই জুনের ডায়েরিতে কথাটা বেশ খুলেই লিখেছিল। ‘নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’-র কাহিনির সূত্রে শঙ্কুর মন্তব্য, ‘সেই সঙ্গে বৈজ্ঞানিকদের মধ্যেই আবার এমন লোকও আছে, যারা আমাকে বৈজ্ঞানিক বলে মানতেই চায়নি। তাদের ধারণা, আমি একজন জাদুকর বা প্রেতসিদ্ধ গোছের কিছু; বৈজ্ঞানিকদের চোখে ধুলো দেবার নানারকম মন্ত্রতন্ত্র আমার জানা আছে, আর তার জোরেই আমার প্রতিষ্ঠা।’
আরও পড়ুন: অংবংচং পর্ব ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২
শঙ্কুর প্রতি এই অভিযোগের কথা শুনে সত্যজিতের পাঠকদের ভিন্নার্থে ফেলুদার কথা মনে পড়বে। ফেলুদা তার মগজাস্ত্রের জোরে জাদুকর, প্রেতসিদ্ধ, মন্ত্রতন্ত্র জানা লোভী মানুষদের শায়েস্তা করেছে। ফেলুদার কাহিনিতে তার নানা নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার থেকে একটা উদাহরণ। ‘গোরস্থানে সাবধান’-এ ছিল কলকাতার ভণ্ড প্রেতচর্চাকারীর দল। প্রেতচর্চা সমিতির প্রধান অ্যারাকিস। ‘তার সঙ্গী দুটো ইহুদি, একটা পার্সি।’ বৃহস্পতিবার তাদের আত্মা নামানোর মিটিং বসে। কেউ আত্মা নামাতে চাইলে আগাম বিশ টাকা দিতে হয়, আত্মা নামলে আরও একশো।

এই আত্মা নামানোর ব্যবসা-ঘরের অন্ধকার বুজরুকি থেকে ফেলুদা সশরীরে উদ্ধার করে এনেছিল টমাস গডউইনের কাসকেট। সেই বাক্সের ভেতরে ছিল একটা রুপোর নস্যির কৌটো, একটা সোনার চশমা, সাদা পাইপ, আর চারটে লাল চামড়ায় বাঁধানো খাতা। প্রতিটির উপর সোনার জল দিয়ে লেখা ‘ডায়রি’ শব্দটি। এগুলি শার্লট গডউইনের খাতা। ১৮৫৮ থেকে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের।
ফেলুদার বিবরণে ভিতরে মুক্তোর মতো হাতের লেখা, তেমনই স্বচ্ছন্দ ভাষা। জানা যাচ্ছে, শার্লট তখন নিজে সেলাইয়ের কাজ করে আর কার্পেট বুনে কলকাতার মেমসাহেবদের কাছে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে। সত্যজিতের কসমোপলিটন মন দেশ বিদেশের মানুষকে বুঝতে চায়। ভারতবর্ষের সামাজিক জীবনে এই নানা জাতের নানা বর্ণের মানুষের বিচিত্র অবস্থানকে পর্যবেক্ষণ করতে চায়।

মহাবিদ্রোহের পরবর্তী বছরের খবর যে ডায়েরিতে আছে, তার মূল্য টাকা দিয়ে বিচার করা যায় না। আত্মা নামানো চোর-ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সেই অমূল্য সম্পদ উদ্ধার করেছে ফেলুদা। শুধু ডায়রিই উদ্ধার করেনি, পরে উদ্ধার করেছে পান্না, চুনি এবং নীলা বসানো নস্যির কৌটো। ‘কালো মুখ করে চোর অ্যারাকিস চোরের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।’ দিয়ে গেল আসল নস্যির কৌটো। আর মার্কাস গডউইন তাঁকে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলিয়ে নিলেন, যদি সামনের বিষ্যুদবার আবার নকল প্রেতাত্মার খটখটানি শোনেন, তা হলেই পুলিশে খবর দেবেন।
তার দেখার জগৎ আর উদ্ভাবনের জগৎ দুই মিলেমিশে আছে। উদ্ভাবনের জগৎ দেখার জগৎকে দখল করতে চায় না। শঙ্কুর অনেক আবিষ্কারই আকস্মিকতার উপর নির্ভরশীল।
শঙ্কু কিন্তু ফেলুদার হাতে নাকাল হওয়া জাদুকর, প্রেতসিদ্ধ, মন্ত্রতন্ত্র জানা লোভী মানুষ নয়।
শঙ্কু বিজ্ঞানের ‘অপর’ এক ঘরানার সাধক। পুরনো ভারতীয় ঋষিদের সম্বন্ধে তার মনে শ্রদ্ধার অবধি নেই। একদিকে সত্যজিতের ফেলুদা ভণ্ড মছলিবাবার আঁশ ছাড়াচ্ছে, একদিকে সত্যজিতের ‘মহাপুরুষ’ ছবিতে বিরিঞ্চিবাবা নাকাল হচ্ছে, অপরদিকে শঙ্কু তার সর্বরোগহর ওষুধ তৈরি করছে এক নির্লোভ সন্ন্যাসীর দেওয়া ভেষজের সাহায্যে। ভণ্ড ধর্ম, গণশত্রু হিন্দুত্ব, মন্দিরের চরণামৃতের ব্যবসা এ হল এক আর ঋষিকল্প দৃঢ়তা, নির্লোভ আনন্দময় প্রকৃতিলগ্নতা আর এক।
সত্যজিৎ এভাবেই বিষয়টি সাজাচ্ছেন, দুই পক্ষে। প্রকৃতির অন্তর্গত গাছপালা, মানুষ ছাড়া অপরাপর প্রাণী এদেরকে শঙ্কু সহযোগী সহচর বলে মনে করে। কোনও প্রাণীর আশ্চর্য শক্তিকে বিজ্ঞানের কৌশলে তার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অর্থের বিনিময়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে না। প্রকৃতি প্রাণীবিশেষকে যা শক্তি ও সামর্থ দিয়েছে, তার সবটুকু বিজ্ঞানী হিসেবে শঙ্কু বিশ্লেষণ করতেও নারাজ। বিজ্ঞানের সবজান্তাপনায় শঙ্কুর বিশ্বাস নেই। বিজ্ঞানেরও সীমা আছে, একথা শঙ্কু মানে। আর একথা মানে বলেই শঙ্কুর ভেতরে কাজ করে দুটি মন। একটি মন দিয়ে সে চারপাশকে অবাক হয়ে দেখে, আরেকটি মন দিয়ে সে উদ্ভাবন করে।

তার দেখার জগৎ আর উদ্ভাবনের জগৎ দুই মিলেমিশে আছে। উদ্ভাবনের জগৎ দেখার জগৎকে দখল করতে চায় না। শঙ্কুর অনেক আবিষ্কারই আকস্মিকতার উপর নির্ভরশীল। এমনকী শঙ্কুর সহচর নকুড়বাবুর আশ্চর্য শক্তিও আকস্মিকভাবে অধিগত হয়েছিল।
নকুড়বাবু শঙ্কুকে বলে, ‘তা দেড় মাসই হবে। খুব জল হচ্ছিল সে দিন, আর সঙ্গে মেঘের ডাক। দুপুর বেলা। দাওয়ায় বসে গোলা তেঁতুলের আচার খাচ্ছি, হঠাৎ দেখি সামনে বিশ হাত দূরে মিত্তিরদের বাড়ির ভেরেণ্ডা গাছের পিছনে একটা আগুনের গোলার মতো কী যেন শূন্যে ঘোরাফেরা করছে। বললে বিশ্বাস করবেন না, তিলুবাবু, গোলাটা এল ঠিক আমারই দিকে। যেন একটি জ্যোতির্ময় ফুটবল।’
যদি কেউ অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তি অপকার্যে ব্যবহার করেন, তাহলে সত্যজিৎ তারই বিরুদ্ধে অপর প্রাকৃতিক শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ন্যায়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখেন।
এই জ্যোতির্ময় ফুটবলের শক্তিতেই নকুড়বাবু লোককে যা নেই তাও দেখাতে পারেন। তবে কখনও এই শক্তি অপকার্যে প্রয়োগ করেন না। যদি কেউ অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তি অপকার্যে ব্যবহার করেন, তাহলে সত্যজিৎ তারই বিরুদ্ধে অপর প্রাকৃতিক শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ন্যায়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখেন।
‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’ ছবিতে তাই হয়েছিল― বালকের প্রাকৃতিক শাণিত সত্যদৃষ্টিতে অপকার্যে রত জাদুকরের জারিজুরি ভঙ্গ হয়েছিল। এই অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী মানুষ বা পশু যে কেউ হতে পারে। নকুড়বাবু যেমন আশ্চর্য প্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী, তেমনই আশ্চর্য প্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী শঙ্কুর দেখা আশ্চর্যন্তু ইয়ে। খুব দ্রুত অভিযোজনের ক্ষমতা ধরে সে। কখনও পশু, কখনও পাখি। এইভাবে লোভী মানুষের কবল থেকে মুক্তি পায় সে।

এই প্রাকৃতিক শক্তির অধিকারেই যেন শঙ্কু উদ্ভাবন ক্ষমতা লাভ করেছে। শঙ্কু লেখে, ‘আমার আবিষ্কারগুলো কেন আমি সারা পৃথিবীর ব্যবহারার্থে ছড়িয়ে দিইনি। তার কারণ আর কিছুই না― আমার তৈরি জিনিসগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী বা হিতসাধক… এর কোনওটাই কারখানায় তৈরি করা যায় না। এগুলো সবই মানুষের হাতের কাজ, এবং সে মানুষও একটি বৈ আর দ্বিতীয় নেই। তিনি হলেন ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু।’
পড়লে মনে হবে এ বুঝি শঙ্কুর অহংকার! একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, অহংকার নয় প্রকৃতির শক্তির আশ্চর্য আধার হিসেবে শঙ্কু নিজেকে তুলে ধরছে। প্রকৃতির আশ্চর্য শক্তি তার মধ্যেই বিশেষ রূপে প্রকাশ পেয়েছে।
আধ্যাত্মিক বৈজ্ঞানিকতা নাকি প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিকতা? অনেক সময় শঙ্কুর সামনেই উদ্ভাবিত যন্ত্র অন্যরকম আচরণ করে। যন্ত্রকে সেই সামর্থ্য বিজ্ঞান দেয়নি, প্রকৃতি দিয়েছে।
কী বলা যায় একে? আধ্যাত্মিক বৈজ্ঞানিকতা নাকি প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিকতা? অনেক সময় শঙ্কুর সামনেই উদ্ভাবিত যন্ত্র অন্যরকম আচরণ করে। যন্ত্রকে সেই সামর্থ্য বিজ্ঞান দেয়নি, প্রকৃতি দিয়েছে। সত্যজিতের শঙ্কু এক অর্থে মানবিক সায়েন্স ফ্যান্টাসি। সেই মানববাদ কেবল মানুষকে নিয়ে নয়, প্রকৃতিকে নিয়েও। সেই মানববাদের কেন্দ্রে প্রকৃতিলগ্ন মানুষ।
সত্যজিতের এই ফ্যান্টাসি একদিক দিয়ে সবজান্তা বিজ্ঞানবাদের প্রকৃতি বিনষ্টকারী ক্ষমতাসর্বস্ব কৌতূহলকে প্রতিহত করে। আবার পাশাপাশি এও মনে হয়, শঙ্কুর এই প্রকৃতি-বিশ্বাসের পথে ‘অপবিজ্ঞান’ প্রবেশ করবে না তো! সত্যজিৎ এক হাতে শঙ্কু অপর হাতে ফেলুদা দুইকে নিয়ে যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন, সেই সামঞ্জস্য বজায় রাখার মতো মগজ কজনেরই বা আছে?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত