(Ong Bong Chong 10)
আচ্ছা একটি ভাষা ভাল করে শিখলে, আর সে ভাষায় বইপত্র পড়ার সুযোগ ও ইচ্ছে থাকলে কি মনের জানলা খুলতে পারে? অন্য ভাষার কথা থাক, অন্তত যে ভাষা খানিক জানা, সেই বাংলা ভাষায় লেগে থাকলে কি মনের জানলা খুলবে? সন্দেহ নেই, খুলবে। বাংলা ভাষায়, বলতে নেই, নয় নয় করে অনেক কিছু হয়েছে, হচ্ছেও। সাহিত্য-ইতিহাস-সমাজ-বিজ্ঞান নানা বিষয়ে বাংলা ভাষায় বইপত্র লেখা হয়েছে। নানা স্তরের বই। আমরা তার খবরও সবসময় রাখি না। তাই কেউ যদি খুব ভাল করে বাংলা শেখেন, কোনও একটা জীবিকায় আত্মনিয়োগ করে ভাতকাপড়ের স্থিতি লাভ করেন ও বই পড়ে মনের জানলা খুলতে চান, তাহলে জানলা খুলবে।
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯
এর মানে এই নয় যে, অন্য ভাষা শেখার বিরোধিতা করছি। যাঁর ইচ্ছে আছে, সুযোগ আছে, সামর্থ্য আছে তিনি কেন শিখবেন না এই পৃথিবীর অজস্র ভাষা! একজন যত বেশি ভাষা জানবেন, তাঁর তত সুবিধে। তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটা কথা বেশ চলে― আপনি কীভাবে পড়েন? গভীরে ঢুকে না ভেসে ভেসে?

ধরা যাক, কেউ যদি বলেন আমি সমস্ত জীবন ধরে একটা বই পড়ার চেষ্টা করেছি, সেটি হল বাংলা মহাভারত ও সেই সূত্রে মহাভারতের অনুষঙ্গমুখর বই। তাহলে? যদি ঠিক মতো পড়েন ভেসে ভেসে না পড়ে, তাহলে তাঁর সমস্ত জীবন লেগে যাবে বাংলা ভাষায় রচিত মহাভারত ও মহাভারত অনুষঙ্গী বইপত্র পড়তে। একই কথা রামায়ণ সম্বন্ধেও বলা চলে।
এমনকী কেউ যদি বলেন, এদেশে ইংরেজরা আসার আগে বাংলা ভাষায় যা কিছু রচিত হয়েছিল, তা আমি পড়তে চাই। তাহলে উত্তর হল— চেষ্টা করুন, শেষ করা অসম্ভব, এক জীবনে হবে না। কথাটা মিথ্যে নয়। দশম শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এতগুলি বছর ধরে যা লেখা হয়েছে, তা কি এক জীবনে অধ্যয়ন করা যায়! এক বৈষ্ণব সাহিত্য পড়তে চাইলেই শেষ হবে না।

আমাদের মন আসলে উড়ে উড়ে যায়। এক জায়গায় স্থির থাকে না। তাই আমরা অধিকাংশ পাঠকই কোনও একটা বিষয়ে ডুব দিতে চাই না। ভেসে ভেসে নানারকম বিষয় পড়তে চাই। বাংলা ভাষায় সেই নানারকম বিষয় পড়ার কোনও অসুবিধে নেই। প্রশ্ন হল এই যে, পড়ার উপায় আছে বলছি, কিন্তু পড়তে চাইলে বইয়ের খোঁজ কোথায় কীভাবে পাওয়া যাবে? এখানেই অসুবিধে। বাংলা ভাষায় যাঁরা বই ছাপেন, বাংলা ভাষায় যাঁরা বই পড়েন, তাঁরা কখনও বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেননি।
অশোক উপাধ্যায়ের নাম অনেকেই জানেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে এই মানুষটির সাহচর্য অনেকেই পেয়েছেন। অশোকবাবুর প্রয়াণ বাঙালি পাঠক সমাজের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। মানুষটি গ্রন্থতালিকা প্রণয়ন করতেন।
বাংলা ভাষায় ভাল বিভিন্নরকম গ্রন্থতালিকা পাওয়া যায় না। একসময় অনেকেই চমৎকার গ্রন্থতালিকা প্রণয়ন করতেন। তাঁরা অনেকেই বিভিন্ন পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যেমন ধরা যাক, বাণী বসুর কথা। এই বাণী বসু একালের সুপরিচিত লেখিকা বাণী বসু নন। তাঁর তালিকাটির নাম, ‘বাংলা শিশুসাহিত্য: গ্রন্থপঞ্জী’। তিনি কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের বাংলা বিভাগের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট ছিলেন। বইয়ের ঘরেই তাঁর চাকরি।
সাহেবি আমলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রকাশকেরা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এক কপি করে অন্তত বই দিতেন। তাতে বইটি থাকত, নথিভুক্ত হত। বাণী বসু তাঁর তালিকায় সেই বইগুলির নামধাম দিয়েছেন। বইগুলি নানাভাবে বিষয়ানুযায়ী বর্গীকৃত করেছেন। এই তালিকা হাতে থাকলে কত বইয়ের যে খোঁজ পাওয়া যায়। এমন শিশু সাহিত্যের গ্রন্থপঞ্জী পরে আর কেউ করেননি।

অশোক উপাধ্যায়ের নাম অনেকেই জানেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে এই মানুষটির সাহচর্য অনেকেই পেয়েছেন। অশোকবাবুর প্রয়াণ বাঙালি পাঠক সমাজের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। মানুষটি গ্রন্থতালিকা প্রণয়ন করতেন। স্থানীয় ইতিহাসচর্চা করতে গেলে তাঁর গ্রন্থতালিকা অপরিহার্য, পড়তেই হবে। তাঁর এ-জাতীয় গ্রন্থতালিকার মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য ‘সাময়িকপত্রে বঙ্গদেশচর্চা/ জেলাভিত্তিক রচনাপঞ্জি’। এই রচনাপঞ্জি তো সহজে গড়ে তোলা যায়নি। দিনের পর দিন লাইব্রেরির মধ্যে সাময়িকপত্রের পাতা উলটে পালটে দেখেছেন। লেখাগুলির তালিকা তৈরি করেছেন। কোন সাময়িকপত্রে কী আছে, জানার উপায় নেই। দেখতে হবে খুঁজে। তারপর জেলাওয়াড়ি তালিকা।

এই ক্যাটালগ একসময় অশোক রায় করতেন, প্রবীর মুখোপাধ্যায় করতেন। ঐতিহাসিক পত্রিকায় নিয়মিত এ-জাতীয় গ্রন্থতালিকা ছাপা হত। প্রকাশকেরা গ্রন্থতালিকা গ্রন্থাকারে ছাপতে খুব একটা উৎসাহ পেতেন না। পাওয়ার কথা নয়। কীভাবেই বা পাবেন। এই জাতীয় ক্যাটালগ তো খুব বেশি লোক কিনতে চাইবেন না। তাহলে ছেপে কী হবে! এখন প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক কিছু সহজ হয়েছে। ক্যাটালগ তৈরি করে না ছেপে কেউ আপলোড করে দিতে পারেন। যাঁরা এ-বিষয়ে কী কী বই বা লেখা আছে জানতে চান, তাঁরা দেখে নেবেন। ছাপার খরচ তো লাগছে না।
বাংলা বইয়ের কমবয়স্ক পাঠক তৈরি হত বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ে। ভাল ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার উপর বেশ গুরুত্ব দেওয়া হত।
এভাবে চেষ্টা করলে বাংলায় বই পড়ার ইচ্ছে আরও বলবতী হবে।

বাংলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। অনেকে বলেন, গোটা বিশ্বে এই ভাষায় নানারকম জ্ঞানের চর্চা হয়েছে। একথা ঠিকই আমরা গেল গেল রব তুলি। অনেক রকম কাণ্ড তো হচ্ছেই। বাংলা বইয়ের কমবয়স্ক পাঠক তৈরি হত বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ে। ভাল ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার উপর বেশ গুরুত্ব দেওয়া হত।
সন্দেহ নেই বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় ব্যবস্থার হাল ভাল নয়। তবে কলকাতার বাইরে বিভিন্ন জেলায় এখনও বেশ কিছু বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার মধ্যেও নয় নয় করে বাংলা ভাষার উপরে গুরুত্ব দেয় বেশ কিছু স্কুল। এই সব আশার কথা। নৈরাশ্য গ্রাস করতে চাইবে, তবে আশা হারালে চলবে না। কেবল বাংলা ভাষায় কেউ যদি পড়তে চান, তাহলে তাঁর মনের জানলা খুলে যাওয়ার আয়োজন এখনও সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যায়নি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত