(Ong Bong Chong 12)
ইংরেজি liberal শব্দটিকে আমরা ব্যবহারে উচ্চারণে বাংলা করে নিয়েছি। কথায় বার্তায় বলি ‘তিনি খুবই লিবারেল মানুষ।’ মূলত খাওয়াদাওয়া, জামাকাপড় পরা ইত্যাদিতে যাঁর বাছবিচার নেই, তিনি লিবারেল। বিশেষ করে উনিশ শতকে ডিরোজিওর বাঙালি ছাত্ররা আচার আচরণ ও খাওয়াদাওয়ায় রক্ষণশীল সমাজকে আঘাত করে প্রগতিশীলতা দেখিয়েছিলেন। তারপর থেকেই হয়তো বাঙালি শিক্ষিত ভদ্রজনেরা খাওয়াদাওয়া আর জামাকাপড়ের বিপ্লবকেই প্রগতিশীল উদারতা বলে ভাবেন। বিদেশে অবশ্য লিবারেল শব্দটির পিছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের নানা ইশারা মিশে আছে।
আরও পড়ুন: অংবংচং পর্ব ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১
জীবনে ও রাজনীতিতে যাঁরা লিবারেল, তাঁরা অপরের মত সম্বন্ধে ‘সহনশীল’ (tolerant)। অর্থনীতিতে এর প্রয়োগ আরেক রকম। পছন্দের স্বাধীনতা সেখানে বেশি― এ দেশে নয়ের দশকে যখন খোলা বাজার বা মুক্ত অর্থনীতির হাওয়া এসে লেগেছিল, তখন ক্রেতার সামনে পছন্দ করে বেছে নেওয়ার জন্য অনেক অনেক জিনিস চলে এল। পেস্ট অনেকরকম, সাবান অনেকরকম। চোখের সামনে খুলে গেল নির্দিষ্ট দুটি সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেলের সঙ্গে আরও আরও টিভি চ্যানেল। টাকা দিলেই দেখার স্বাধীনতা, কেনার স্বাধীনতা, পছন্দের স্বাধীনতা। এতেই মুক্তি, এই অর্থনৈতিক উদার ব্যবস্থা।

এই যে লিবারেলের প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা উদার শব্দটিকে ব্যবহার করলাম, একে আমরা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায় বলতে পারি ‘নূতন কথা গড়া’। উদার এই সংস্কৃত শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হত লিবারেল এই ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে, যখন উদার শব্দটি ব্যবহৃত হতে শুরু করল তখন তার আগের অর্থ গেল বদলে। নতুন অর্থ এসে লাগল তার দেহে। একেই বলে পুরনো শব্দের নূতন নির্মাণ। এভাবেই নূতন কথা গড়া হয়। প্রশ্ন হল উদার শব্দটি বঙ্গসংস্কৃতিতে যখন লিবারেলের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হত না, তখন কী ছিল এর মানে?
বিদ্যাসাগরের সংকলিত অভিধান ‘শব্দমঞ্জরী’র সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। বিদ্যাসাগরের ‘শব্দমঞ্জরী’ অভিধানে উদার দিয়ে অনেকগুলি এন্ট্রি আছে। উদার, উদারচরিত, উদারচিত্ত, উদারচিত্ততা, উদারপ্রকৃতি, উদারস্বভাবতা সেখানে পাওয়া যাবে। বিদ্যাসাগর উদার শব্দের অর্থ হিসেবে লিখেছিলেন, ‘সরল, অকপট, ঋজু। মহৎ, উন্নত। দয়ালু, বদান্য।’ উদারচরিত বলতে বুঝিয়েছিলেন, ‘যাহার আচরণে ও ব্যবহারে রাগ দ্বেষ হিংসা ঈর্ষ্যা খলতা কপটতা তুচ্ছাশয়তা নীচপ্রবৃত্তি প্রভৃতি দোষ লক্ষিত হয় না।’

সন্দেহ নেই বিদ্যাসাগর উদারচরিত মানুষ ছিলেন। পিতা ঠাকুরদাস তাঁকে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করেছিলেন দুটি কারণে। প্রথমত, হিন্দু কলেজের ছাত্ররা যেভাবে খাওয়াদাওয়া আচার আচরণে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে, সামাজিক নিয়ম মানছে না, সেই শিক্ষা ঈশ্বর পাক, ঠাকুরদাস তা চাননি। দ্বিতীয়ত, সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য লাভ করে ঈশ্বর যদি আইনের ডিগ্রি নেয়, তাহলে অনেক টাকা উপার্জন করতে পারবে।
রামমোহন বিধবাদের জীবনের অধিকার দিয়েছিলেন, বিদ্যাসাগর শারীরিক প্রকৃতির স্বাভাবিক অধিকারকে শাস্ত্র ও আইন সিদ্ধ করেছিলেন। মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থার জন্য তাঁর উদ্যোগের অবধি ছিল না।
ঠাকুরদাসের উদ্দেশ্য যাই থাক সংস্কৃত কলেজে শিক্ষালাভ করে বিদ্যাসাগর দয়ালু, বদান্য হয়েছিলেন। যদিও কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য কথায় কথায় জানিয়েছিলেন, পণ্ডিতমশাই অর্থাৎ বিদ্যাসাগর একটু সাহেব ঘেঁষা ছিলেন আর যে সমস্ত সাহেবের সঙ্গে তাঁর সখ্য, অন্য ভারতীয়দের সঙ্গে সেই সাহেবদের যাতে সখ্য না-হয় সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন, তবু এই একটি নেতিবাচক দিক ছাড়া তাঁর আর তেমন দোষ কোথায়? আর এটিও মানুষী দুর্বলতা, দোষ বলা যায় না। কৃষ্ণকমলও ঠিক দোষ বলতে চাননি, স্বভাব বোঝাতে চেয়েছিলেন।

বিদ্যাসাগর ধুতি-চাদর পরতেন। আহারে বিলাস ছিল না। বর্ণাশ্রম মানতেন না। বাগদি মায়ের গায়ে মাথায় খড়ি উঠছে দেখে পরম যত্নে এই ব্রাহ্মণ তাঁর মাথা তৈল নিষিক্ত করেছিলেন। কাণ্ডজ্ঞান থেকে বুঝতে পেরেছিলেন পতি বিয়োগ হলে স্ত্রী শরীর পাষাণবৎ হয়ে যায় না। তাই বিধবাদের বিবাহের জন্য পরাশর সংহিতা উদ্ধার করে আইন পাশ করিয়েছিলেন। পরাশর সংহিতা সমাজের চোখ বদলের জন্য, নিজের কাছে কাণ্ডজ্ঞানসঞ্জাত অনুভবই মুখ্য। স্ত্রীশরীরের স্বাধীন অধিকার রক্ষা করা চাই।
রামমোহন বিধবাদের জীবনের অধিকার দিয়েছিলেন, বিদ্যাসাগর শারীরিক প্রকৃতির স্বাভাবিক অধিকারকে শাস্ত্র ও আইন সিদ্ধ করেছিলেন। মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থার জন্য তাঁর উদ্যোগের অবধি ছিল না। এই বিদ্যাসাগরের চেহারা এমনই সাধারণ ছিল যে, পথেঘাটে মানুষজন চিনতে পারতেন না। উড়ে কুলি বলে ঢিপ-কপাল মানুষটিকে চালিয়ে দেওয়া যেত।

এই উদারচরিত বিদ্যাসাগরের মুণ্ডপাত অবশ্য একালের বিপ্লবী লিবারেলরা করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের শিক্ষানীতি ঔপনিবেশিক পলিটিকাল মতলবের অনুকূল, তাতে মুক্তি নেই, এ কথা উঠেছিল। মুক্তি অবশ্য কোথায় আছে কে জানে? সবাই তো মুক্তির পথই খুঁজছেন, যাঁর যেমন ক্ষমতা আর বিবেচনা। ঈশ্বর ঈশ্বর মানতেন না। বিদ্যাসাগর পরকাল নিয়ে ঠাট্টা করতেন। তাঁর ইহজাগতিক কাণ্ডজ্ঞান তাঁকে উপযোগবাদী ব্যবস্থাপনা তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নিজেকে মহাপুরুষ বলে ভাবার কিম্বা নিজের মহাপুরুষ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কোনও বাসনা তাঁর ছিল না।
বিদ্যাসাগরকে বাঙালি গ্রহণ করেছে, বিদ্যাসাগরকে দয়ার সাগর বলে গ্রহণ করতে তাঁদের কোনও সমস্যা হয়নি। অতি বিপ্লবীদের ভাঙাভাঙির পরও বিদ্যাসাগর বাঙালি সমাজে আদৃত।
জীবনের প্রথম পর্বে যত বেশি সমাজ সংস্কারে মন দিয়েছিলেন, জীবনের প্রান্তপর্বে তত সক্রিয় ছিলেন না। ঔপনিবেশিক ভারতে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হচ্ছিল, সে বিষয়ে তিনি মোটের উপর নীরব। ভদ্রলোক নাগরিকদের প্রতি আস্থা কমে গিয়েছিল। সাঁওতালদের প্রতি ভালবাসা জেগেছিল। নগর থেকে দূরে সাঁওতালদের মধ্যে দিনযাপনের সেই ছবি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পরবর্তীকালে ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় স্মৃতিগদ্যে লিখেছিলেন। শাস্ত্রী মশাই উনিশ শতকের আলো দেখেছিলেন, বিশ শতকে তিনিও নীরব। উনিশ শতকের কথা ভাবেন, লেখেন তখন।
বিদ্যাসাগরকে বাঙালি গ্রহণ করেছে, বিদ্যাসাগরকে দয়ার সাগর বলে গ্রহণ করতে তাঁদের কোনও সমস্যা হয়নি। অতি বিপ্লবীদের ভাঙাভাঙির পরও বিদ্যাসাগর বাঙালি সমাজে আদৃত। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মায়েরা-মেয়েরা তাঁকে ভালবাসেন। মধুসূদন তাঁর বীরাঙ্গনা কাব্য বিদ্যাসাগরকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই কাব্যে স্বাধীন মেয়েদের কথা আছে। তারা কথায়-চিন্তায় স্বাধীন। মধুসূদনের জীবন সাধারণ বাঙালির কাছে আদৃত নয়। মধুসূদনের খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া, মাদ্রাজে প্রথমা স্ত্রী ও সন্তানকে ফেলে হেনরিয়েটার কাছে চলে আসা, অবিবেচকের মতো খরচ এইসব বাঙালির প্রিয় নয়।

মধুসূদন আর বিদ্যাসাগর দু’জনের তুলনা করলে একেলে খাওয়া-পরার লিবারেলরা মধুসূদনকেই তাদের সগোত্রের মানুষ বলে ভাবতে চাইবে। মধুসূদন অবশ্য খাওয়া-পরার স্বাধীন স্বেচ্ছাচারকে সমালোচনা করে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ নামের প্রহসন লিখেছিলেন। সেই প্রহসন বাঙালিরা খুব একটা পড়ে না, মেঘনাদবধ কাব্যের কথা ভাবে ও জানে। মধুসূদনের ভিতরে যে স্বেচ্ছাচার মাত্র ছিল না, নিগূঢ় নিয়মের প্রতি দায় ছিল, তা অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী কবিতা পড়লে বোঝা যায়।
উদারচরিত বিদ্যাসাগরের জীবন অনুসরণ করা সহজ নয় বলেই হয়তো তাঁর মূর্তির মুণ্ডু কেটে লিবারেল বিপ্লবী বাঙালি নিজেদের প্রগতিশীলতা প্রকাশ করতে চেয়েছিল।
লিবারেল কঠিন শব্দ। উদার আরও কঠিন। দুই শব্দের ভিতরের গুণগুলি বিচার করা চাই।
উদারচরিত বিদ্যাসাগরের জীবন অনুসরণ করা সহজ নয় বলেই হয়তো তাঁর মূর্তির মুণ্ডু কেটে লিবারেল বিপ্লবী বাঙালি নিজেদের প্রগতিশীলতা প্রকাশ করতে চেয়েছিল।
লোক দেখানো লিবারেলদের বিরোধিতার জন্য লোকদেখানো রক্ষণশীলতা রমরমিয়ে ছড়াতে পারে, তবে বিদ্যাসাগরের মতো উদারদের এই দুই পক্ষের সঙ্গেই মনের মিল হওয়ার নয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত