(Eli Cohen 19)
বুয়েন্স এয়ার্সের রেস্তোঁরা, ক্লাব, সিরীয় দূতাবাস জুড়ে এলি কোহেন তৈরি করেছিলেন তাঁর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যা তাঁর জন্য পরবর্তীকালে দামাস্কাসের সেনা আর প্রশাসনের উচ্চকোটি মহলের দরজা খুলে দেয়। এ যেন একাধিক স্টেজের রকেট। একের পর এক অংশ উড্ডয়নের প্রয়োজনীয় শক্তি যোগানোর পর সরে যাচ্ছে। বস্তুত বুয়েন্স এয়ার্সের নেটওয়ার্ক দামাস্কাস অভিযানের বুস্টার রকেট হিসাবেই কাজে লেগেছিল এলি কোহেনের।
শুরু হল এলি কোহেন উনবিংশ পর্ব।
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮)
ম্যাডাম তো দারুণ ইমপ্রেসড
“জেনারেল, এই হল কামেল আমিন থাবেত। সুদূর প্রবাসে থেকেও মনে প্রাণে সাচ্চা সিরীয়।”
১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সন্ধ্যা। বুয়েন্স এয়ার্সের অভিজাত আভেনিদা ভায়ামন্তেতে সিরীয় দূতাবাস। সেখানে সামরিক অ্যাটাসে জেনারেল আমিন অল-হাফেজের ডাকা সান্ধ্য পার্টি জমে উঠেছে। বুয়েন্স এয়ার্সের সব গণ্যমান্য প্রবাসী সিরীয়রা সেই পার্টিতে হাজির। বিশাল হল রীতিমত অতিথি অভ্যাগতদের ভিড়ে গমগম করছে।

এহেন সময়ে স্থানীয় সংবাদপত্র আরব ওয়ার্ল্ডের (মতান্তরে লা ব্যাণ্ডেরা আরবে বা দ্য আরব ফ্ল্যাগ) সম্পাদক আব্দুল লতিফ হাসান (মতান্তরে আব্দুল লতিফ অল-যচিন) নিজে উদ্যোগী হয়ে জেনারেল হাফেজের সঙ্গে এলি কোহেনকে আলাপ করানোর জন্য নিয়ে গেলেন।
এলি ভদ্রতাবশে স্মিত হেসে মাথা ঝোঁকালেন। আব্দুল লতিফ হাসান এলির দিকে চেয়ে বললেন, “কামেল, ইনি হলেন জেনারেল আমিন অল-হাফেজ। সিরীয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাসে।”
কিন্তু এলির হাল ছাড়লে চলবে না। যেনতেনপ্রকারেণ জেনারেলের সঙ্গে ভাব জমাতেই হবে। কে জানে, এই কার্যত নির্বাসিত জেনারেলই হয়তো দামাস্কাসের উচ্চকোটি মহলের দরজা খোলার চাবিকাঠি।
জেনারেলের সঙ্গে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন এলি। বলিষ্ঠ হাত। বোঝাই যায়, সমরাঙ্গণের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাহুর শিরায় শিরায়।
“আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আমার কাছে অতীব সম্মানের, জেনারেল।”
হাফেজও প্রত্যুত্তরে স্মিত হাসলেন। এলি বুঝলেন, এই সামরিক উর্দিধারী অতীব স্বল্পবাক। কেন জানি না, এলির মনে হল এই পার্টি, এই ভিড়, এই মেকি ভদ্রতার মোড়কে আবহাওয়ার সঙ্গে জেনারেল হাফিজ নিজেকে ঠিক মানাতে পারছেন না। আসলে তাঁর থাকার কথা অন্যত্র, অন্য ভূমিকায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে স্বদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে পড়ে রয়েছেন, মনে প্রাণে যে সরকারের বিরোধী, তারই হয়ে কূটনৈতিক দৌত্য করার জন্য।

কিন্তু এলির হাল ছাড়লে চলবে না। যেনতেনপ্রকারেণ জেনারেলের সঙ্গে ভাব জমাতেই হবে। কে জানে, এই কার্যত নির্বাসিত জেনারেলই হয়তো দামাস্কাসের উচ্চকোটি মহলের দরজা খোলার চাবিকাঠি।
পার্টিতে ঢুকেই জেনারেলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আসার চেষ্টা আরম্ভ করে দিয়েছেন এলি। হলে প্রবেশের পরই এদিক ওদিক তাকিয়ে এলির নজরে এল এক কৃষ্ণকায় সান্ধ্য লং গাউন পরিহিত মহিলার সঙ্গে আব্দুল লতিফ হাসান কথা বলছেন। পার্টিতে সম্পাদক হাসান ছাড়া আর চেনা কাউকে দেখতেও পেলেন না। অগত্যা গুটি গুটি পায়ে হাসানের পাশেই দাঁড়ালেন।
পরিচয়ের এত বাহুল্যে এলির হাসিই পাচ্ছিল। কিন্তু সে সব চেপে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন মহিলাকে। খাঁটি সিরীয় কায়দায় মহিলার হাত স্পর্শও করলেন। মাদাম হামিসার মুখে ম্লান স্মিত হাসি দেখা গেল।
একটু দ্বিধাগ্রস্থ কণ্ঠে বললেন, “আমি কি এই আলাপে ঢুকতে পারি?”
ঘটনার আকস্মিকতায় হাসান হয়তো একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে বললেন, “আরে স্বাগতম। পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি হলেন বুয়েন্স এয়ার্সের সবচেয়ে সুদর্শন আর হ্যান্ডসাম প্রতিভাবান কামেল আমিন থাবেত। আর কামেল, ইনি হলেন মাদাম হামিসা, আমাদের প্রিয় সামরিক অ্যাটাসে জেনারেল হাফেজের সহধর্মিণী।”
পরিচয়ের এত বাহুল্যে এলির হাসিই পাচ্ছিল। কিন্তু সে সব চেপে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন মহিলাকে। খাঁটি সিরীয় কায়দায় মহিলার হাত স্পর্শও করলেন। মাদাম হামিসার মুখে ম্লান স্মিত হাসি দেখা গেল।
এলি বুঝলেন, এবার তাঁর কিছু বলা দরকার।

“আপনার দীর্ঘ সুখীজীবন কামনা করি। আপনার আনন্দই আমাদের সবার আনন্দ।”
ফের মাদামের ওষ্ঠে দেখা দিল ম্লান স্মিত হাসি। ধীর কণ্ঠে মাদাম হামিসা বললেন, “আপনি ভালই প্রশংসা করতে পারেন। আর সত্যি বলতে কি আমারও প্রশংসা শুনতে বেশ লাগে।”
মিনিট কয়েক পরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানীয়তে ঠিক আর ক’টা বরফের কিউব দেবেন সেটা নিয়ে যখন ভাবছেন, তখন হাসান হাজির।
এলির বুঝতে বাকি রইল না মহিলা ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারিণী। এক লহমায় কোন কথার কী অর্থ, তা বুঝে ফেলেন। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ‘অশেষ ধন্যবাদ’ বলে রিফ্রেশমেন্ট কাউন্টারে চলে এলেন।
মিনিট কয়েক পরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানীয়তে ঠিক আর ক’টা বরফের কিউব দেবেন সেটা নিয়ে যখন ভাবছেন, তখন হাসান হাজির।
“আরে করেছেন কী! ম্যাডাম তো দারুণ ইমপ্রেসড।”

“আমি অনরড।”
একটু চুপ করে হাসান বললেন, “চলুন সামরিক অ্যাটাসের সঙ্গে পরিচয়টা করিয়ে দিই।”
সেই মুহূর্তে এলি বুঝলেন সব কিছু পরিকল্পনামাফিকই এগোচ্ছে।
হাফেজ নামা
এলি কোহেনের গুপ্তচর জীবনে এমন অনেক মানুষ এসেছে, যারা এই মিশরীয় ইহুদির জীবনের গতিপথই বদলে দিয়েছে। জেনারেল আমিন অল-হাফেজ সেরকমই এক চরিত্র। এলি কোহেনের সঙ্গে জেনারেলের আলাপ জমার আগে জেনারেল আমিন অল-হাফেজকে এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশদের সহায়তায় ফয়জল বিন হুসেন বা প্রথম ফইজল দামাস্কাসে ক্ষমতা দখল করে। কয়েকশো বছরের তুর্কি শাসনের পর সিরিয়া স্বাধীনতার স্বাদ পায়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা ছিল বড়ই ক্ষণস্থায়ী।
এলি কোহেনের চেয়ে বছর তিনেকের বড় আমিন অল-হাফেজের জন্ম ১৯২১ সালে প্রাচীন সিরীয় শহর আলেপ্পির এক সুন্নি পরিবারে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। কিন্ত তাতে ভবিতব্য ঠেকানো গেল না।
আদতে ১৯২১ সাল সিরীয় ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো বছর।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশদের সহায়তায় ফয়জল বিন হুসেন বা প্রথম ফইজল দামাস্কাসে ক্ষমতা দখল করে। কয়েকশো বছরের তুর্কি শাসনের পর সিরিয়া স্বাধীনতার স্বাদ পায়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা ছিল বড়ই ক্ষণস্থায়ী।
আদতে যুদ্ধজয়ের লাভ হেলায় হারাতে মোটেও রাজি ছিল না ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স। তাই পশ্চিম এশিয়ায় পরাজিত অটোমান সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করতে উদ্যোগী হল তারা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মূল কারিগর লর্ড জর্জ ন্যাথানিয়ল কার্জন (যাকে বাঙালি লর্ড কার্জন বলে চেনে) তখন ব্রিটেনের লয়েড জর্জের মন্ত্রীসভায় বিদেশ দফতর সামলাচ্ছেন। পশ্চিম এশিয়া ভাগ বাঁটোয়ার পরিকল্পনায় কার্জনের মুখ্য ভূমিকা ছিল।
১৯২০ সালে লন্ডনে বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি আর জাপানের মধ্যে বৈঠক হওয়ার পর ভাগ বাঁটোয়ারা পরিকল্পনার প্রাথমিক রূপ তৈরি হয়। তারপর এই চার বিজয়ী শক্তি ১৯২০ সালের ১৯ থেকে ২৬শে এপ্রিল ইতালির সান রেমোতে বসে সেই পরিকল্পনায় সিলমোহর দেয়। অজুহাত হিসাবে বলা হয়, একদা তুর্কিশাসিত পশ্চিম এশিয়া এখনও স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত নয়।
পশ্চিম এশিয়ায় তখন উত্তাল সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু একই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাত থেকে ভারত হাতছাড়া হওয়ায় ওয়েস্টমিনিস্টারের সেনার মেরুদণ্ডই ভেঙে গিয়েছে। তথৈবচ দশা ফ্রান্সেরও।
ফলে কলমের এক খোঁচায় সিরিয়ার সদ্য পাওয়া স্বাধীনতা হরণ করা হল। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফইজলের সেনার সঙ্গে ফরাসি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ফয়জল বাহিনী হেরে যায়। সিরিয়া ফরাসি শাসনাধীনে চলে যায়।
কিন্তু এই একতরফা সিদ্ধান্ত সিরিয়ার আমজনতা মেনে নেয়নি। দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয় ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে। আলেপ্পিও বাদ পড়েনি। ফলে এক উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিকায় অল-হাফেজ বড় হন। গণবিক্ষোভের আঁচও পড়ে তাঁর জীবনে। বিক্ষোভকারী দলের সঙ্গে মিশে ফরাসি সেনাকে পাথরও ছোঁড়েন কিশোর অল-হাফেজ।

চল্লিশের দশকে যখন আমিন অল-হাফেজের সেনা জীবন শুরু হচ্ছে, তখন পশ্চিম এশিয়ার একটা বড় অংশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। পদে পদে অবিচার, বঞ্চনার শিকার হওয়া যুব সমাজের ক্ষোভ ছাইচাপা আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে। সেই সময় এক সিরীয় খ্রিস্টান স্কুল শিক্ষক মাইকেল আফলক শোনালেন শিয়া সুন্নি ভেদাভেদ ভুলে আরব সংহতির কথা। বললেন সাম্যের কথা। বললেন জাতীয় সম্পদ জাতির কাজে ব্যবহারের কথা। জোর দিলেন ভূমি সংস্কারের উপর, যাতে কৃষি উন্নত হয়। আফলক দামাস্কাসে গড়ে তুললেন তাঁর বাথ পার্টি। শিয়া সুন্নি বিভাজনের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠা আমিন অল-হাফেজ মনে মনে বেশ আকর্ষিত হলেন এই নয়া রাজনৈতিক দর্শনে।
পশ্চিম এশিয়ায় তখন উত্তাল সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু একই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাত থেকে ভারত হাতছাড়া হওয়ায় ওয়েস্টমিনিস্টারের সেনার মেরুদণ্ডই ভেঙে গিয়েছে। তথৈবচ দশা ফ্রান্সেরও। ফলে একে একে মিশর, সিরিয়া, ইরাক স্বাধীন হয়েছে। কিন্ত সমস্যা বাঁধল যখন, ১৯৪৮ সালে ডেভিড বেন গুরিয়ন ইহুদিদের স্বাধীন বাসভূমি হিসাবে ইজরায়েলের নাম ঘোষণা করলেন। হিংস্র শ্বাপদের মতো নবজাতক রাষ্ট্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মিশর সিরিয়াসহ আরব দেশগুলো। কিন্তু আত্মপ্রকাশের অগ্নিপরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হল ইজরায়েল। পরাজয়ের গ্লানিতে তখনের জন্য পিছু হঠল পড়শি আরব দেশগুলো।
১৯৬১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নলোহির নেতৃত্বে নাসের বিরোধী এক সেনা অভুত্থান হয়। পরিণতিতে কনফেডারেশন ভেঙে গেল।
সেই পরাজয়ের বেদনা বড় বুকে বেজে ছিল আমিন অল-হাফেজের। তিনি বুঝলেন, যতদিন দুর্নীতিবাজ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন সিরিয়ার কোনও আশা নেই। সেই বেদনাই তাঁকে ঠেলে দিল নতুন দিনের ডাক দেওয়া বাথ পার্টির দিকে। পার্টিও তখন সিরীয় সেনার মধ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী, আর ইজরায়েল যুদ্ধে কমাণ্ডার হিসাবে তখন যথেষ্ট নামডাকও হয়েছে আমিন অল-হাফেজের। ফলে পার্টি তাঁকে সাদরে বরণ করে নিল।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল নাসেরের উদ্যোগে মিশর আর সিরিয়া যখন গাঁটছড়া বাঁধল, তখন সেনা কমান্ডার হিসাবে বেশ নাম করেছেন আমিন অল-হাফেজ। তাঁকেই ১৯৫৮ সালে কায়রোতে সিরীয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাসে করে পাঠানো হল। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মিশর-সিরিয়ার কনফেডারেশন থাকার পুরো সময়টাই আমিন অল-হাফেজের কায়রোতে কাটল। সেখানে যেমন বাথ পার্টির অনেক নেতার সঙ্গে খানাপিনা ওঠাবসা হল, তেমনি চোখের সামনে দেখলেন কনফেডারেশনের আড়ালে কীভাবে দামাস্কাসের ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে কায়রো। সেনাবাহিনীতেও মিশরীয় অফিসাররা ছড়ি ঘোরাতে শুরু করল। ফলে সিরীয় অসন্তোষ বেড়েই চলল।

১৯৬১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নলোহির নেতৃত্বে নাসের বিরোধী এক সেনা অভুত্থান হয়। পরিণতিতে কনফেডারেশন ভেঙে গেল। আমিন অল-হাফেজেরও কায়রো পর্ব শেষ হল। তিনি তল্পি গুটিয়ে দামাস্কাসে ফিরলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল।
স্বল্প সময়ের জন্য দু’দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়া নাজিম অল কুদসি প্রেসিডেন্টের তখতে বসলেন ১৯৬১ সালের ১২ ডিসেম্বর। দুঁদে রাজনীতিজ্ঞ কুদসি বিলক্ষণ জানতেন, একটু এদিক-ওদিক হলেই তাঁর সরকারও সেনা ওল্টাবে। বাথ পার্টি ছিল কুদসির আরেক দুশ্চিন্তার জায়গা। কনফেডারেশনের সময় কোণঠাসা হয়ে থাকা বাথ পার্টি যে ফের মাথাচড়া দেওয়ার চেষ্টা করবে, সে ব্যাপারেও কুদসি নিশ্চিত ছিলেন। তাঁর এও অজানা ছিল না যে, বহু সেনা কর্তাই তলে তলে বাথ সমর্থক। তাই তখতে বসেই কুদসি সেনা আর বাথ পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন। হাফেজের মতো অনেক বাথ সমর্থক প্রভাবশালী সেনা কর্তার নাম তার কাছে ছিল। এবার তাঁদের বেছে বেছে বিদেশি দূতাবাসে পাঠানো শুরু হল। হাফেজকে করা হল বুয়েন্স এয়ার্সে সিরীয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাসে। গালভরা পদমর্যাদা হলেও আসলে দামাস্কাস থেকে নির্বাসিত।
কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন কিছু তথ্য তিনি ইজরায়েলকে দিয়ে যান, যা তাঁর মৃত্যুর বছর দুয়েক পরের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আজও সিরিয়াকে সেই বিষময় ফল ভোগ করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ এলি কোহেন আর আমিন অল-হাফেজ প্রায় একই সময়ে বুয়েনর্স এয়ার্সে পা রাখলেন। এরপর ইতিহাস দু’জনকেই ফের দামাস্কাসে নিয়ে যাবে। একজন রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে বসবেন। আর একজনকে প্রকাশ্যে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হবে। কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন কিছু তথ্য তিনি ইজরায়েলকে দিয়ে যান, যা তাঁর মৃত্যুর বছর দুয়েক পরের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আজও সিরিয়াকে সেই বিষময় ফল ভোগ করতে হচ্ছে।
কিন্তু সে সব ভবিষ্যতের গর্ভে। আপাতত পার্টিতে ফেরা যাক।
জেনারেলের সঙ্গে ভাব জমানোর জন্য এলি কোহেন পা বাড়ালেন।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস – ইজরায়েল- আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে – এলি কোহেন- দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন – আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন- হানান – আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
(৫) পিটার ম্যান্সফিল্ড, নিকোলাস পেলহাম – আ হিস্টরি অফ দ্য মিডল ইস্ট
(৬) মাইকেল বার – যোহার, নিসিম মিশাল
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত