(Eli Cohen 18)
প্রকৃত অর্থে জেরুজালেম পর্বের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এলি কোহনের মোসাদের এজেন্ট নম্বর ০৮৮ হয়ে ওঠার কাহিনি। মোসাদের তখন প্রয়োজন ছিল এমন এক লৌহকঠিন এজেন্টের যে বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রাখবে, সন্দেহের বশে যদি অন্যপক্ষ তুলে নিয়ে গিয়ে শত অত্যাচারও করে, তাহলেও তার মুখ খোলাতে পারবে না। ইজরায়েলি কাউন্টার ইনটেলিজেন্স শিনবেতের হেফাজতে হাইফার কারাগারে ওই চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মোসাদের সেই শর্তও পূরণ করেন এলি। এবার তাই মোসাদও নড়েচড়ে বসল এই মিশরীয় প্রতিভাবান ইহুদিকে নিয়ে। শিনবেত ও মোসাদের অধিকর্তা ইসের হারেলও বুঝলেন তাদের হাতে এসে পড়েছে এলি নামক এক না-কাটা হীরকখণ্ড। এখন প্রয়োজন শুধু ঘষে মেজে এর উজ্জ্বলতা বাড়ানো। তাহলেই হারেলের লক্ষ্যপূরণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে এই ছোকরা।
শুরু হল এলি কোহেন অষ্টাদশ পর্ব
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭)
জর্ডন নদীর জল
বিংশ শতকের মধ্যভাগ, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আর এর সবচেয়ে বেশি আঁচ পড়েছিল পশ্চিম এশিয়াতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে খান খান হলে মূলত বিজয়ী ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি পুরো অঞ্চলটাই নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়। যুদ্ধে জিতেও ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স তখন সামরিক ও আর্থিক দিক থেকে এতটাই ভঙ্গুর যে, তাদের পক্ষে পশ্চিম এশিয়াতে হুকুমত চালানো সম্ভব নয়। ফলে একে মিশর, ইরাক, সিরিয়া স্বাধীনতা পেয়ে গেল, এবং নবজাতক ইজরায়েল হয়ে দাঁড়াল তাদের পয়লা নম্বর দুশমন।
১৯৪৮ সালে একযোগে বেন গুরিয়নের দেশকে আক্রমণ করেও যখন বিশেষ সুবিধা হল না, তখন পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলো ইজরায়েলকে ভাতে মারার জন্য অন্য চাল চালল।

এই চালটা কী, সেটা বলার আগে ইজরায়েলের ভৌগোলিক মানচিত্র একটু বোঝা দরকার। দেশটার পূর্ব ভাগের সীমানার অনেকটা জুড়ে রয়েছে জর্ডন নদী, যা দুই পড়শি দেশ সিরিয়া ও জর্ডনের সঙ্গে ইহুদি ভূমির সীমানাও নির্ধারণ করছে। ২৫১ কিমি দৈর্ঘ্যের এই নদী উত্তর ইজরায়েলে দান ও হাসবানি নদীর সংগমস্থল থেকে বেরিয়ে সি অব গ্যালিলি হয়ে ডেড সি-তে পড়েছে। বিশাল নেগেভ মরুভূমিতে সেচের কাজে জল নেওয়ার জন্য ইজরায়েল পাইপলাইনের সাহায্যে জর্ডন নদী থেকে জল নেওয়ার পরিকল্পনা করল।
পড়শি আরব দেশগুলো এই পরিকল্পনা বানচাল করতে উঠে পড়ে লাগল। বিভিন্ন আরবি শীর্ষ বৈঠকে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু হল কীভাবে ইজরায়েলি পাইপলাইন প্রকল্প অঙ্কুরেই বিনাশ করা যায়। বাধ্য হয়ে মোসাদও নড়েচড়ে বসল। হারেলের বুঝতে বাকি রইল না, আরবি পড়শিরা ইজরায়েলি প্রকল্প ধ্বংস করতে তলে তলে জোট বাঁধছে। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে সিরিয়া। তাই সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে এমন ডাকাবুকো এজেন্ট দরকার যে, হাঁড়ির খবর আনতে পারবে।
মোসাদ বুঝে গেল যে এজেন্ট তারা খুঁজছিল, তা তারা পেয়ে গিয়েছে। কারণ সিরিয়ার সেনা তলে তলে কী মতলব আঁটছে, তার হদিশ পেতে হলে দামাস্কাসের সেনাবাহিনী আর সরকারের উঁচু মহলের সঙ্গে দহরম মহরম করতে হবে।
এই সময়ই মিশর থেকে পালিয়ে আসা এলি নজরে আসে। দীর্ঘকায় ছোকরা। যথেষ্ট সুদর্শন। গড়গড় করে ইংরাজি, ফরাসি, আরবি আর হিব্রু বলতে পারে। প্রাথমিক নাড়াচাড়া করতে গিয়েই দেখা গেল, ছোকরার অসাধারণ স্মৃত্বিশক্তি। ফটোগ্রাফিক মেমোরি যাকে বলে। দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পরে এলিকে দরাজ সার্টিফিকেটও দিল মোসাদের প্রশিক্ষকরা।
তবুও না আচালে বিশ্বাস নেই। সত্যিকার ফিল্ডে নামলে কী করে, তা দেখতে দিন দশেকের জন্য জেরুজালেম পাঠানো হল। আর এখানেই এজেন্ট হিসাবে এলি তাঁর প্রতিভার ঝলক দেখালেন। অনায়াসে মিশে গেলেন শহরের মান্যগণ্য মহলে। আর হাইফা পর্ব তো ছিলই, যা এলির কষ্টসহিষ্ণুতা আর মানসিক দৃঢ়তার ছাপ রেখে গেল।

মোসাদ বুঝে গেল যে এজেন্ট তারা খুঁজছিল, তা তারা পেয়ে গিয়েছে। কারণ সিরিয়ার সেনা তলে তলে কী মতলব আঁটছে, তার হদিশ পেতে হলে দামাস্কাসের সেনাবাহিনী আর সরকারের উঁচু মহলের সঙ্গে দহরম মহরম করতে হবে। মিশতে হবে তাদের উচ্চকোটির মহলে। তবেই গোপন তথ্যের হদিশ মিলবে। আর কেউ পারলে, সেটা পারবে একমাত্র এলি কোহেন।
কিন্তু তেল আভিভ থেকে সরাসরি দামাস্কাস গেলে এলি বিপদে পড়তে পারে। কোনও সময়ে সন্দেহ হলে অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করলে সব ফাঁস হয়ে যেতে পারে। এলির সঙ্গে ইজরায়েলি সংযোগের কোনও চিহ্ন রাখা চলবে না। তাই যা কিছু করতে হবে, ধাপে ধাপে করতে হবে।
কামেল আমিন থাবেতের নাম উল্লেখ করলেই সিরীয়রা বলে, ‘ওহ সেই বুয়েন্স এয়ার্সের দিলদরিয়া ব্যবসায়ী তো। যে কোনও পার্টির জান ও। তেমনি কেউ বিপদে পড়লে প্রথম যে এগিয়ে আসবে, সে হল কামেল আমিন থাবেত।’
প্রথমেই ইজরায়েল থেকে সিরিয়া পাঠানো হল না এলিকে। ইউরোপ হয়ে আর্জেন্টিনা গেলেন তিনি। সেখানে মাস দশেক থাকলেন, ভিন্ন এক সিরীয় ব্যবসায়ী কামেল আমিন থাবেতের পরিচয়ে। সেখানে বেশ কয়েকজন প্রবাসী প্রভাবশালীর সঙ্গে দিব্বি ভাবও জমিয়ে ফেললেন। পরে এই পরিচয় সিরিয়া পর্বে বেশ কাজেও এল। তারপর যেন দেশের টানে বুয়েন্স এয়ার্স ছাড়লেন কামেল আমিন থাবেত। সবাই জানল, কামেল আমিন থাবেত চললেন দামাস্কাস।
অর্থাৎ কামেল আমিন থাবেতের অতীত প্রকাশ করা হল সিরীয় পরিচিতদের কাছে। যাতে কামেল আমিন থাবেতের নাম উল্লেখ করলেই সিরীয়রা বলে, ‘ওহ সেই বুয়েন্স এয়ার্সের দিলদরিয়া ব্যবসায়ী তো। যে কোনও পার্টির জান ও। তেমনি কেউ বিপদে পড়লে প্রথম যে এগিয়ে আসবে, সে হল কামেল আমিন থাবেত।’

তাই সব দিক ভেবেই কামেল আমিন থাবেত নামক চরিত্রটা রূপায়ণ করে মোসাদ।
জালমান এলিকে কামেল আমিন থাবেত নামক চরিত্রের বিশদে যা বলেছিলেন তা হল অনেকটা এই রকম—
‘তোমার নাম কামেল। তোমার বাবার নাম আমিন থাবেত। তাই তোমার পুরো নাম কামেল আমিন থাবেত। তোমরা আদতে সিরীয়। তোমার মায়ের নাম সাইদা ইব্রাহিম। তোমার জন্ম লেবাননের বেইরুটে। তোমার এক বোনও আছে। তোমার যখন বছর তিনেক বয়স, তখন তোমার পরিবার বেইরুট থেকে উত্তর মিশরের বন্দর নগরী আলেকজান্দ্রিয়াতে চলে আসে। এর বছরখানেক বাদে তোমার বোন মারা যায়। তোমার বাবার কাপড়ের ব্যবসা ছিল।
১৯৬১ সালের জুলাই মাসে বুয়েন্স এয়ার্স থেকে দেশে ফেরার পথ ধরেন এলি। কিন্তু সেটাও ইউরোপ ঘুরে। প্রথমে যান জুরিখ। সেখান থেকে আরেক উড়ানে মিউনিখ।
১৯৪৬ নাগাদ তোমার কাকা আর্জেন্টিনা চলে যায়। কিছুদিন বাদে কাকা তোমার বাবাকে ডাকে। ১৯৪৭ সালে পুরো থাবেত পরিবার আর্জেন্টিনায় চলে যায়। সেখানে তোমার বাবা কাকা মিলে কাপড়ের দোকান খোলে। কিন্তু তা বেশি দিন চলেনি। ব্যবসায় লালবাতি জ্বলে যায়। ১৯৫৬ নাগাদ বাবা মারা যান। তার মাস ছয়েকের মধ্যে মাও চলে যান। তুমি কাকার সঙ্গে একটা ট্রাভেল এজেন্সি চালাতে থাকো। তারপর নিজেই ব্যবসা খোলো। এই ব্যবসা রমরম করে চলছে। অর্থ্যাৎ তুমি রইস ব্যবসায়ী।’
১৯৬১ সালের জুলাই মাসে বুয়েন্স এয়ার্স থেকে দেশে ফেরার পথ ধরেন এলি। কিন্তু সেটাও ইউরোপ ঘুরে। প্রথমে যান জুরিখ। সেখান থেকে আরেক উড়ানে মিউনিখ। মিউনিখ বিমানবন্দরে আরেক মোসাদ এজেন্ট জেলিঙ্গার আসে তার সঙ্গে দেখা করতে। তাকে ইজরায়েলি পাসপোর্ট দেয় জেলিঙ্গার। অগস্টের প্রথম দিকে বাড়ি ফিরলেন এলি। নাদিয়াকে বললেন, মাস কয়েকের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন।

তা বলে এই সময়টা বাড়ি বসে থাকতে আসেননি এলি। মোসাদ এজেন্ট ইহুদার কাছে রেডিও সিগনাল শোনা, তার বার্তা উদ্ধার করা, বার্তা পাঠানো সবই শিখতে শুরু করলেন। প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হলেও দ্রুত তা দূর করলেন এলি। পাশাপাশি সামরিক অস্ত্র, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তর ও তাদের কাজ, রণকৌশল এসব নিয়ে খুঁটিয়ে পড়াশোনা করলেন। আর পড়া শুরু করলেন তৎকালীন সিরীয় রাজনীতি নিয়ে। ফলে কয়েক মাস বাদে তাত্ত্বিক আর ফলিত দুই বিভাগেই পারদর্শী হয়ে উঠলেন এলি।
সিরিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তত এলি কোহেন ওরফে কামেল আমিন থাবেত।
ব্রিটেনের স্যর মার্ক স্টাইকস আর ফ্রান্সের জর্জ পিঁকোর মধ্যে যে চুক্তি হল, তাতে ফ্রান্সের ভাগে পড়ল সিরিয়া লেবানন আর ইরাকের মধ্যভাগ।
সিরিয়ার ঘূর্ণাবর্ত
ইজরায়েলের উত্তরের পড়শি সিরিয়ায় তখন চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা। দামাস্কাসের কোন রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে এলি গিয়ে পড়বেন, তা বোঝার জন্য সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এখানে দু’চার কথা বলাই যায়।
আদতে পশ্চিম এশিয়ার টালমাটাল পরিস্থিতির বর্তমান মূল লুকিয়ে রয়েছে ১৯১৬ সালে ইঙ্গ-ফরাসি এক গোপন সমঝোতায়। ১৯১৪ সালে শুরু হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। একদিকে ইঙ্গ-ফরাসি-রুশ মিত্র পক্ষ, অন্যদিকে জার্মানি, বুলগেরিয়া আর প্রায় অন্তিম দশায়শায়িত দুই সাম্রাজ্য অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও অটোমান-কে নিয়ে অক্ষ পক্ষ। ১৯১৬ সাল যুদ্ধের যা পরিস্থিতি তাতে মিত্রপক্ষের তীব্র আক্রমণের মুখে জার্মান নেতৃত্বাধীন ফ্রন্ট পিছু হঠছে। এই পরিস্থিতিতে ইংলিশ চ্যানেলের দু’পাড়ের পড়শি পশ্চিম এশিয়ার ভেঙে পড়া অটোমান সাম্রাজ্য কালনেমির লঙ্কাভাগ করতে নেমে পড়ল।

ব্রিটেনের স্যর মার্ক স্টাইকস আর ফ্রান্সের জর্জ পিঁকোর মধ্যে যে চুক্তি হল, তাতে ফ্রান্সের ভাগে পড়ল সিরিয়া লেবানন আর ইরাকের মধ্যভাগ। যুদ্ধের পরে প্যারিস শান্তি বৈঠকে বিজয়ী পক্ষে যেহেতু ইঙ্গ-ফরাসিরাই বসে, তাই সিরিয়া আর লেবাননের ম্যাণ্ডেট বা দায়িত্বভার পাওয়ার জন্য মুখিয়ে ফ্রান্স।
তবে সে পথে প্রথম থেকেই কাঁটা ছিল। ১৯১৬ সাল থেকে মক্কা, মদিনাসহ পশ্চিম সৌদি আরবের হেজাজের শাসক ছিলেন মহম্মদের বংশধর হোসেমাইট রাজবংশের শরিফ হুসেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল অটোমানদের অবর্তমানে পুরো পশ্চিম এশিয়ায় রাজ করা। ইংরেজরাও তাঁকে পিঁকো-স্টাইকস চুক্তির ব্যাপারে কার্যত অন্ধকারে রেখে তাঁর উচ্চাকাঙ্খাকে নিজেদের স্বার্থে মদত দিয়ে যাচ্ছিল। বস্তুত অটোমান সুলতানের বিরুদ্ধে ১৯১৬ সালে শরিফ হুসেন যে বিদ্রোহ করেন, তাতে পিছন থেকে মদত ছিল ব্রিটিশদের। কিন্তু শরিফ হুসেন যত গর্জালেন, তত বর্ষাতে পারলেন না।
১৯২০ সালে হুসেনের আরেক পুত্র ফইজলকে সিরিয়ার রাজা করা হল। ফরাসিরা অবশ্য ফইজলকে টিঁকতে দিল না। নিরুপায় হয়ে ইংরেজরা ১৯২১ সালে ইরাকের রাজা করল ফইজলকে।
ইরাক ও সিরিয়ার তাঁর বিদ্রোহের বিশেষ প্রভাব দেখা গেল না। হাটে হাঁড়ি ভাঙল ১৯১৭ সালের ব্রিটেনের ব্যালফুর ঘোষণাপত্র, যাতে প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের স্বাধীন ভূমি করতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রইল। ফলে শরিফ হুসেন কট্টর ইঙ্গ-ফরাসি বিরোধী হলেন। যুদ্ধশেষে তাই ইঙ্গ-ফরাসি অঙ্গুলিহেলনে ১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির টেবিলে শরিফ হুসেনের জায়গা হল না। সম্ভবত বৈঠকে উপস্থিত তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সম্মতি পেয়ে হুসেনপুত্র আমীর ফইজল পারিস শান্তি চুক্তির টেবিলে ঠাঁই পেলেন।
গণ্ডগোল বাঁধল যখন পিঁকো-স্টাইকস চুক্তির ধাঁচে ব্রিটেন ও ফ্রান্স পশ্চিম এশিয়ায় অটোমান সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করতে চাইল। এতে ফইজল আপত্তি তুললেন। বললেন সিরিয়া আর প্যালেস্তাইনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হোক। স্থানীয় জনগন কী চায়, সেটা জানা আবশ্যক। ফ্রান্স আর ব্রিটেনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন সেই প্রস্তাবে সায় দিয়ে হেনরি কিং আর চার্লস ক্রেনকে নিয়ে দুই সদস্যের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গড়লেন। কিং-ক্রেন কমিটি রিপোর্ট দিল প্যালেস্তাইন বা সিরিয়া কেউই পশ্চিমি আধিপত্য চায় না। তাতে অবশ্য চিঁড়ে ভিজল না। ইঙ্গ-ফরাসি ব্লক আমলই দিল না কিং-ক্রেন কমিটির রিপোর্টকে। স্থানীয় জনগণকে উপেক্ষা করে পশ্চিম এশিয়ায় পশ্চিমি শক্তি থাবা বসাল।

অসন্তোষের বীজও বপন হল।
ব্রিটিশ অবশ্য তাদের একমাত্র তুরুপের তাস শরিফ হুসেনকে একদম খালি হাতে ফেরাল না। হেজাজের সুলতান হিসাবে শরিফ হুসেন রয়ে গেলেন। অন্যদিকে হুসেনের আরেক পুত্র আবদুল্লাকে প্যালেস্তাইনের পড়শি ট্রান্সজর্ডনের আমির করা হল। ১৯৪৬ সালে আবদুল্লা হলেন জর্ডনরাজ।
১৯২০ সালে হুসেনের আরেক পুত্র ফইজলকে সিরিয়ার রাজা করা হল। ফরাসিরা অবশ্য ফইজলকে টিঁকতে দিল না। নিরুপায় হয়ে ইংরেজরা ১৯২১ সালে ইরাকের রাজা করল ফইজলকে।
এর মধ্যে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। খোদ ফ্রান্সই তখন জার্মানির দখলে চলে যায়। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত নাৎসীপন্থী ফরাসিদের দখলে থাকে সিরিয়া।
ফইজলকে তাড়িয়ে দামাস্কাসে জাঁকিয়ে বসল ফরাসিরা। ক্ষমতায় বসলেন আফ্রিকা বিজেতা ফরাসি জেনারেল হেনরি জোসেফ ইউজিন গোহো। কিন্তু অল্প কয়েক মাসের ক্ষমতায় থেকে ফইজল সিরিয়া জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করেছিলেন। সিরিয়ার সব প্রান্ত থেকে ১২০ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রথম সংসদ সিরীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করেন, যার প্রধান হলেন ফইজল। কিং-ক্রেন কমিটির রিপোর্ট আলোচনা করল কংগ্রেস, যাতে প্যালেস্তাইন ও লেবাননকে নিয়ে অখণ্ড সিরিয়া গড়া যায়। দেশের জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারও গড়ল এই কংগ্রেস।
ফরাসিরা ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য সেই সংসদের অপমৃত্যু হল। ১৯২২ সালে সিরিয়ার জাতীয়তাবোধ যাতে আর মাথাচাড়া না দিতে পারে, তার জন্য দেশটাকে দামাস্কাস, আলেপ্পোসহ এই তিনটে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আর জাবাল দ্রুজ ও আলাউইকে পৃথক অঞ্চলে ভাগ করে ফেলা হল। তাতেও অবশ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি আয়ত্তে এল না। একের পর এক বিদ্রোহ, বিক্ষোভ চলতেই থাকল। ১৯৩০-এ প্রথম সিরীয় রিপাবলিক ঘোষণাও করল ফ্রান্স। উদ্দেশ্য একটাই, নিজেদের মনপসন্দ কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে পর্দার আড়াল থেকে শাসন করা। পর শেষমেশ ১৯৩৬ সাল নাগাদ সিরিয়াকে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিও দিল। কিন্তু ওসব যে ফাঁকা আওয়াজ, তা বুঝতে সিরীয়দের বেশিদিন লাগেনি। ফলে দেশব্যাপী অচলাবস্থা চলতেই থাকে।
এর মধ্যে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। খোদ ফ্রান্সই তখন জার্মানির দখলে চলে যায়। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত নাৎসীপন্থী ফরাসিদের দখলে থাকে সিরিয়া। এরপর ফরাসিরা ফিরে এলেও বেশিদিন আর সিরিয়া তাদের অধীনে থাকেনি। ১৯৪৬ সালে সিরিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।
তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সিরিয়া টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী এসেছেন আর গিয়েছেন। কোনও স্থায়ী সরকার গড়ে ওঠেনি। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। নিয়মিত দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে দামাস্কাসের চত্ত্বরে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে।
৫০ এর দশকের মাঝামাঝি এসে সিরীয় সরকারেও প্রভাব বিস্তার করে ফেলে বাথ পার্টি। ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বরের দু’দফার নির্বাচনে মাইকেল আফলাকের নেতৃত্বাধীন বাথ পার্টি ১৪২ সদস্যের সংসদে ২২টি আসন পায়।
চক্রবূহে ঢোকার পথ বাথ পার্টি
তাহলে এলি কোহেনের সিরিয়ার রাজনৈতিক মহলে ঢোকার ছিদ্র পথ কী হবে? অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক হল বাথ পার্টি।
বাথ পার্টির হালহকিকৎ একটু জানা দরকার। ১৯৪০ নাগাদ দামাস্কাসে এক বিতর্ক সভা সোসাইটির পত্তন করেন মাইকেল আফলাক আর সালাহ বিতার নামে দুই স্কুল শিক্ষক। পশ্চিমী উপনিবেশের শৃঙ্খল ভেঙে আরব দুনিয়াকে এক করা ছিল এর লক্ষ্য। স্বাভাবিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় বিশ্বাসী বাথ পার্টি রাজতন্ত্রেরও বিরোধিতা করে। কারণ তৎকালীন শাসক নিজেদের টিকে থাকার জন্যই ইঙ্গ-ফরাসির মতো ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। ফলে একইসঙ্গে পশ্চিমী উপনিবেশবাদ ও তাদের পদলেহনকারী আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ আকৃষ্ট হয় বাথ পার্টির প্রতি। ক্রমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বাথ পার্টির প্রতি সমর্থন বাড়ে, সেনাবাহিনীর উঁচু তলাতেও প্রভাব বাড়ে।
৫০ এর দশকের মাঝামাঝি এসে সিরীয় সরকারেও প্রভাব বিস্তার করে ফেলে বাথ পার্টি। ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বরের দু’দফার নির্বাচনে মাইকেল আফলাকের নেতৃত্বাধীন বাথ পার্টি ১৪২ সদস্যের সংসদে ২২টি আসন পায়। এই সময় মিশরের সঙ্গে ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক নামে কনফেডারেশন গড়ার কথা ওঠে। প্রথমে এই কনফেডারেশনের সমর্থক ছিল বাথ পার্টি। আফলেকের শ্লোগান ‘স্বাধীনতা, একতা, সমাজতন্ত্র’ ছিল মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসেরের গলাতেও। তাই নাসেরের নেতৃত্বে দুই দেশের গাঁটছড়ায় সমর্থন ছিল বাথ পার্টির।
কিন্তু কনফেডারেশন হওয়ার পর নাসের অন্য মূর্তি ধরেন। ১৯৫৮ নাগাদ সিরিয়াতে বাথ পার্টি প্রবল প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বাথ পার্টি ভেবেছিল, কনফেডারেশনের আমলে বকলমে সিরিয়া শাসন করবে তারাই। কিন্তু হল উল্টো। নাসের চেয়েছিলেন সিরিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাবে কেবলমাত্র কায়রো। ফলে বাথ পার্টির নেতারা নাসেরর রোষানলে পড়লেন। নাসেরের চাপে আফলাককে দল পর্যন্ত ভেঙে দিতে হল। ধরপাকড়ের ভয়ে বহু নেতা কর্মী হয় আত্মগোপন, নয় দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন।
কনফেডারেশন বিলুপ্ত হওয়ার পর সিরীয় সরকার আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাথ পার্টি পন্থী সামরিক অফিসাররা এক সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করল।
তবে সিরীয়রা মোটেও কায়রোর সব বিষয়ে ছড়ি ঘোরানো পছন্দ করল না। অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ল। নাসেরও ক্রমে বুঝতে পারলেন, যে পদ্ধতিতে তিনি মূলত মুসলিম অধ্যুসিত মিশর শাসন করেন, সেই পদ্ধতি মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ, ইহুদি, কুর্দ অধ্যুষিত সিরিয়াতে কার্যকরী হবে না। প্রকাশ্যে ভুলও স্বীকার করলেন নাসের। গঠিত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কনফেডারেশন পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটল।
এদিকে দলের বিলুপ্তি অনেকেই মেনে নেননি। সেনাবাহিনীর এক প্রভাবশালী অংশ বাথ পার্টির অনুগামীদের নিয়ে মিলিটারি কমিটি গড়ল। পরে বাথ পার্টিকে পুনরুজ্জীবিতও করা হল। কিন্তু মাইকেল আফলাকের পুরনো কর্তৃত্ব আর রইল না। তবে পরবর্তীকালের মিলিটারি কমিটির সেনা অভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল আফলাকের সম্মতিতেই হয়েছিল।
কনফেডারেশন বিলুপ্ত হওয়ার পর সিরীয় সরকার আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাথ পার্টি পন্থী সামরিক অফিসাররা এক সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করল।
বাথ পার্টি সিরিয়ায় ক্ষমতায় এল।
দিনক্ষণের হিসাব করলে দেখা যাবে, মিশর-সিরিয়া কনফেডারেশনের শেষের দিকে এলি কোহেনের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ। তখন বাথ পার্টি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সিরিয়ার এই টালমাটাল রাজনৈতিক ঢেউ সুদূর আর্জেন্টিনাতেও আছড়ে পড়ে।
এলির দেওয়াল লিখন পড়তে ভুল হয়নি। সিরীয় জাতীয়তাবাদের উত্তাল ঊর্মিমালায় তিনি তাঁর ভেলা ভাসিয়ে দিলেন।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস – ইজরায়েল- আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে – এলি কোহেন- দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন – আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন- হানান – আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
(৫) পিটার ম্যান্সফিল্ড, নিকোলাস পেলহাম – আ হিস্টরি অফ দ্য মিডল ইস্ট
(৬)মাইকেল বার – যোহার, নিসিম মিশাল
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত