(Eli Cohen 17)
এলি কোহেনের পুরো জীবনই যেন কোনও রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার। সেখানে রয়েছে পদে পদে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতি পথের অন্ধকার কোণে অপেক্ষা করছে মৃত্যু। এলি এমন এক জগতে প্রবেশ করেছিলেন যেখানে কোনটা মুখ, কোনটাই বা মুখোশ— চেনা বড় মুশকিল। এ এমন এক জগৎ যেখানে কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। প্রতিটা কাজ, প্রতিটা পদক্ষেপ ভেবে চিন্তে নিতে হয়। এই শিক্ষা চলার শুরুতেই হাইফার সেই অন্ধকার তিরিশ ঘণ্টা এলিকে দিয়ে গিয়েছিল।
শুরু হল এলি কোহেন সপ্তদশ পর্ব
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬)
অজানা নৈশ যাত্রা
ঘটনাটা ঘটল চতুর্থ দিনে।
সেটা ছিল এক শুক্রবারের সন্ধ্যা। জেরুজালেমের বাইরে হাইওয়েতে যে দম্পতিকে এলি সাহায্য করেছিলেন, ওই সন্ধ্যাবেলায় তাঁদেরই ম্যানসনে পার্টি ছিল। ভদ্রলোক জেরুজালেমের বড় বস্ত্রব্যবসায়ী। এই পার্টিতে যেতে বিশেষভাবে এলিকে নিমন্ত্রণ জানান তিনি।
এলির কাছে তো এটা মেঘ না চাইতেই জল। এটাই তো তিনি চান। জেরুজালেম তো আসাই এই কারণে। যতটা সম্ভব শহরের কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে দহরম মহরম করা। ফলে নিমন্ত্রণে সম্মতি জানাতে কোনও কাল বিলম্ব করেননি এলি।

জেরুজালেমে পা রাখা ইস্তক ইদঝাখের সঙ্গে সকালে বিকালে যোগাযোগে রয়েছে এলি। মিশরীয়-দক্ষিণ আফ্রিকীয় ব্যবসায়ী মার্সেল ক্যুঁবো পরিচয়ে জেরুজালেমে কতটা নেটওয়ার্ক বাড়াতে পারলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট ফোনে ইদজাখকে জানাতে হচ্ছে এলির। এ ছাড়াও মাঝে মধ্যেই হোটেলের ঘরে চিরকুট পাঠিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন ইদজাখ।
পার্টিতে আমন্ত্রণের কথা ইদজাখকে ফোনেই জানিয়েছিলেন এলি। শুনে তো ইদজাখ মহা খুশি।
শুক্রবারের সন্ধ্যার পার্টিটা শেষ হতে গভীর রাত হয়ে গেল। জেরুজালেমের উঁচু তলার সব মানুষে পার্টি একদম সরগরম। এলির অনেক গুণের মধ্যে একটা হল তিনি চট করে অপরিচিতের সঙ্গে ভাব জমাতে পারেন।
‘যাবে না মানে, আলবৎ যাবে। আর শোনো, এ কাপড়ের বড় ব্যবসাদার। ফলে কাপড় ব্যবসা সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করে যেও। ব্যবসাদার লোক, পার্টিতে আড্ডা মারতে মারতে ব্যবসার কথা তুলবেই। তখন যেন বোকাহাঁদা না হতে হয়।’
এলির মুখ ফসকে বেরোল, ‘ভাগ্যিস ডাক্তার নয়। তাহলে তো বলতে ডাক্তারি শাস্ত্র ঘেঁটে যাও।’
ক্লিক।
ও প্রান্ত থেকে ফোনটা কেটে গেল। বোঝাই গেল এলির রসিকতা ইদজাখের তেমন মনে ধরেনি।
শুক্রবারের সন্ধ্যার পার্টিটা শেষ হতে গভীর রাত হয়ে গেল। জেরুজালেমের উঁচু তলার সব মানুষে পার্টি একদম সরগরম। এলির অনেক গুণের মধ্যে একটা হল তিনি চট করে অপরিচিতের সঙ্গে ভাব জমাতে পারেন। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পার্টি শেষ হওয়ার আগেই জেরুজালেমের উঁচু মহলে খবর চাউর হয়ে গিয়েছে এক মিশরীয়-দক্ষিণ আফ্রিকীয় তরুণ রইস ব্যবসায়ী শহরে এসেছেন।
হোটেলের ঘরে ঢুকে অবশ্য ফুরফুরে মেজাজটা বেশিক্ষণ রইল না। ঘরের ফোনটা সশব্দে তার উপস্থিতি জানান দিল।
‘হ্যালো’
ও প্রান্ত থেকে ইদজাখের বাজখাই গলা ভেসে এল, ‘বলি ছিলেটা কোথায়? কোনও পাত্তা নেই!’
‘আরে বস, আজ তো ওই পার্টিটা ছিল।’
‘ও’। ইদজাখের গলা একটু নরম হল। কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী। ফের ইদজাখের গলা চড়ল, ‘তা বলে এতক্ষণ! মাঝরাত অবধি!’
এর জন্য সত্যিই এলি প্রস্তুত ছিলেন না। পার্টিতে কয়েক পেগ বেশিই হয়েছে। মাথাটা ঝিম ধরে আছে। এখন দরকার ঘণ্টা কয়েকের জম্পেশ ঘুম।
‘আরে বস, প্রচুর হোমড়া চোমড়ারা এসেছিল। একটু ভাব জমাতে হবে না? তাই এ কথায় সে কথায় একটু দেরি হয়ে গেল।’
বলতে বলতে হঠাৎ এলির মনে হল, এত রাতে স্রেফ পার্টি থেকে দেরি করে আসার জন্য ফোন করার বান্দা ইদজাখ নয়। নিশ্চয়ই অন্য কোনও কারণ আছে।
তা অবশ্য জানতে এলির বেশিক্ষণ দেরি করতে হল না। বেশি ভণিতা করা ইদজাখের ধাতে নেই। সে ফিল্ডের মানুষ।

‘তোমাকে বেরোতে হবে।’
এর জন্য সত্যিই এলি প্রস্তুত ছিলেন না। পার্টিতে কয়েক পেগ বেশিই হয়েছে। মাথাটা ঝিম ধরে আছে। এখন দরকার ঘণ্টা কয়েকের জম্পেশ ঘুম।
‘বস, এত রাতে! পরে গেলে হয় না?’ নিরুপায় শেষ চেষ্টা করলেন এলি।
হোটেলের নিচে ফোর্ড গাড়িটা দাঁড়িয়েই ছিল। চালক তৈরিই ছিল। এলি বসতেই গাড়ি ছুটে চলল মধ্যরাতের শুনশান জেরুজালেমের রাস্তা ধরে। খানিক বাদে বিমানবন্দরে পৌঁছেও গেলেন এলি।
‘শোনো বৃথা তর্ক করে সময় নষ্ট কোরো না। চটপট রেডি হয়ে নাও। হোটেলের বাইরে একটা ফোর্ড গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা তোমাকে বিমানবন্দরে নিয়ে যাবে।’
‘কিন্তু যাবটা কোথায়?’
‘শোনো, এতসব বলার সময় নেই। এত রাতে গাড়ি নিয়ে চালক অপেক্ষা করছে। ঝটপট রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়।’
ক্লিক।
ইদজাখ ফোন কেটে দিল।
প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওভারকোটটা চাপিয়ে এলি বেরিয়ে পড়লেন।
হোটেলের নিচে ফোর্ড গাড়িটা দাঁড়িয়েই ছিল। চালক তৈরিই ছিল। এলি বসতেই গাড়ি ছুটে চলল মধ্যরাতের শুনশান জেরুজালেমের রাস্তা ধরে। খানিক বাদে বিমানবন্দরে পৌঁছেও গেলেন এলি।
টারম্যাকে দাঁড়িয়ে আছে একটা দু’আসনের ছোট বিমান। এলি চড়ে বসতেই রানওয়ে দিয়ে দৌঁড়াতে শুরু করল বিমানটা। দেখতে দেখতে মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে পড়ল বিমানটা। নিচে জেরুজালেমের আলো ক্রমশ ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল। বিমান মেঘের উপরে চলে এল। সামনে নিকষ কালো অন্ধকার।
এলি বুঝলেন বেশি ভেবে লাভ নেই। একেবারে নিখুঁত বন্দোবস্ত। সবাই জানে তারা কে কোথায় যাচ্ছে। কেবল তিনি ছাড়া। কে জানে এ কোন যাত্রা পথে চলেছেন তিনি।
গাড়িতে কোনও কথাই হয়নি ড্রাইভারের সঙ্গে। এলিও জানতেন, তাঁর গন্তব্য হল বিমানবন্দর। তাই তিনিও কোনও খোশ গল্পে উৎসাহ দেখাননি। কিন্তু বিমানের ব্যাপারটাই আলাদা। তিনি জানেনই না তিনি যাচ্ছেনটা কোথায়।
বিমানে সবেধন নীলমণি সহযাত্রী তো পাইলটই। তাই অগত্যা তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা আমরা যাচ্ছি টা কোথায়?’
পাইলটও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল কথা বলতে পেরে— ‘হাইফা।’
ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরনগরী হাইফার নাম শুনে এলির কৌতুহল আরও বাড়ল।

‘হাইফার কোথায়?’
‘আমরা নামব শহরের একটু দূরে এক বিমানঘাঁটিতে। চিন্তা নেই, ওখানে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।’
এলি বুঝলেন বেশি ভেবে লাভ নেই। একেবারে নিখুঁত বন্দোবস্ত। সবাই জানে তারা কে কোথায় যাচ্ছে। কেবল তিনি ছাড়া। কে জানে এ কোন যাত্রা পথে চলেছেন তিনি।
এই সব সাতসতেরো ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এলি, তা তিনি নিজেই জানেন না। ঘুম ভাঙল যখন বিমান হাইফার মাটি ছুঁল।
বিমানের দরজা খুলে দু’জন ঢুকল। দুজনেরই পরনে ওভারকোট, মাথায় কালো টুপি।
‘আসুন আমাদের সঙ্গে।’
‘কোথায়?’
‘সে গেলেই বুঝবেন।’
বিমানবন্দরের বাইরেই গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। একজন দরজা খুলে মৃদু ধাক্কা দিয়ে এলিকে গাড়িতে ঢোকাল। মনে মনে এলি অবাকই হলেন।
অন্ধকার হাইফার রাস্তায় গাড়িটা ছুটে চলেছে। গাড়িতে উঠে লোক দুটো একেবারে নিশ্চুপ। কেউ কোনও কথা বলছে না দেখে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য এলিই মুখ খুললেন, ‘নেহাৎ আমি আপনাদের জানি। না হলে ভাবতাম ড্যামন হিল জেলে নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে।’
সেই রাতে তাঁর অবাক হওয়ার সেই শুরু।
অন্ধকার হাইফার রাস্তায় গাড়িটা ছুটে চলেছে। গাড়িতে উঠে লোক দুটো একেবারে নিশ্চুপ। কেউ কোনও কথা বলছে না দেখে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য এলিই মুখ খুললেন, ‘নেহাৎ আমি আপনাদের জানি। না হলে ভাবতাম ড্যামন হিল জেলে নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে।’
(হাইফার উপকণ্ঠে দলিত এল কার্মেল অঞ্চলে অবস্থিত এই জেল হল হাইফার এক কুখ্যাত কারাগার। ব্রিটিশ আমলের এক তামাক কারখানা ও তার সংলগ্ন ঘোড়ার আস্তাবলকে ১৯৫৩ সালে ইজরায়েল এক কারাগারে রূপান্তরিত করে।)
লোকগুলো অবশ্য এসব কথায় মোটেও গলল না। বরং ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘মুখটা বন্ধ রাখলে তোমারই মঙ্গল।’
এলি অবশ্য এত সহজে দমবার পাত্র নন— ‘যাই বলুন, আমার কিন্তু পুরো ব্যাপারটা দারুণ লাগছে।’
যে লোকটা চালাচ্ছিল ড্রাইভারের সামনে আয়না দিয়ে এলির দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘যে জেলের নাম বললে, সেখানে জেরার মুখে পড়ো আগে। তারপর দেখব কাল সকালে কী বল।’ এলির বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
‘এই ট্রিপটার মানে কী? আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’
গাড়িতে এলি পিছনের সিটে বসে। পাশের জন মার্লবোরো সিগারেটের প্যাক খুলে এলিকে দিল।
তীব্র আলোয় ঘুম ভেঙে গেল এলির। একটা ঘরে তিনি রয়েছেন। সাদা ঘরের দেওয়াল। তাই মাথার উপরে আলোটা এত তীব্র লাগছে।
‘না জানলেই মঙ্গল।’
প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিলেন এলি।
‘আপনি নেবেন না?’
‘ধুস। অপেক্ষা করতে করতে দু’প্যাকেট উড়িয়েছি। আর না।’
সিগারেটে টান দিতে দিতে ঘুমে চোখ বুজে এল এলির। শেষ মনে আছে সিগারেটের ধোঁয়াটা গাড়ির মধ্যে কেমন ভাবে উঠছে।

আমার একটাই নাম— মার্সেল
তীব্র আলোয় ঘুম ভেঙে গেল এলির। একটা ঘরে তিনি রয়েছেন। সাদা ঘরের দেওয়াল। তাই মাথার উপরে আলোটা এত তীব্র লাগছে।
ভীষণ জল তেষ্টা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।
কোনওরকমে হামাগুড়ি দিতে দিতে জাগটার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন এলি। প্রায় পেয়েও গিয়েছিলেন নাগালের মধ্যে, যখন কেউ লাথি মেরে জাগটা ফেলে দিল।
জল। জল চাই।
একটু দূরে একটা জলের জাগ।
এলি দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন।
আশ্চর্য!
পারলেন না।
একরাশ ক্লান্তি তাঁকে ঘিরে ধরল।
কিন্তু জল তো তাঁর চাই-ই চাই।
কোনওরকমে হামাগুড়ি দিতে দিতে জাগটার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন এলি। প্রায় পেয়েও গিয়েছিলেন নাগালের মধ্যে, যখন কেউ লাথি মেরে জাগটা ফেলে দিল।
মেঝে জলে ভাসল।
‘গুড মর্নিং মার্সেল।’
এলি মুখ তুলে বক্তাকে দেখলেন। এক্ষুনি এই লোকটাই লাথি মেরে জল ভর্তি জাগটা ফেলল।
‘আমাকে এখানে আনা হয়েছে কেন?’
‘তোমাকে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের লোকেরা তুলে এনেছে। যতক্ষণ না বলছ তুমি কে, কী তোমার আসল পরিচয়, কাদের হয়ে তুমি কাজ কর, জেরুজালেমে এসেছই বা কেন, ততক্ষণ তুমি এখান থেকে কোথাও যেতে পারবে না।’
এলির মাথাটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। সবটা না বুঝলেও, এটুকু বুঝেছে সে বিশ্রীভাবে কোথাও ফেঁসেছে। হয়তো ইদজাখই ফাঁসিয়েছে। হয়তো আবার এটাও আরেকটা টেস্ট। চাপ দিলেই পেট থেকে কথা বেরোয় কি না, তা হাতে কলমে পরীক্ষা করা।
শোনো মার্সেল, বেশি ওপর চালাকি করতে যেও না। আমাদের উপর অর্ডার আছে তোমাকে তুলে এনে পেট থেকে কথা বার করার। যখন থেকে জেরুজালেমে পা রেখেছ, তখন থেকেই তোমার উপরে নজর আছে।
তা সে যাই হোক, মুখ খোলা চলবে না। সব পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকীয় পরিচয়ই তোতা পাখির মতো বলে যেতে হবে।
পরিস্থিতি একটু হাল্কা করতে এলি বললেন, ‘জেরা শুরুর আগে ড্রিঙ্কস পেলে ভাল হত। গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ।’
এত শাসানিতেও কোনও কাজ হচ্ছে না দেখে লোকটা এবার বেজায় খেপল।
‘শোনো মার্সেল, বেশি ওপর চালাকি করতে যেও না। আমাদের উপর অর্ডার আছে তোমাকে তুলে এনে পেট থেকে কথা বার করার। যখন থেকে জেরুজালেমে পা রেখেছ, তখন থেকেই তোমার উপরে নজর আছে। মিশরীয় তুমি। দক্ষিণ আফ্রিকার জাল পাসপোর্টে জেরুজালেমে ঢুকেছ।’
এলি বুঝল এ সহজ বান্দা নয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ফাটা রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে।
‘কী জানতে চাও?’
‘জেরুজালেমে তোমাকে কে পাঠিয়েছে?’
‘কে আবার পাঠাবে। নিজেই এসেছি।’
‘টুরিস্ট হয়ে?’
‘টুরিস্ট হয়ে।’
‘জালি পাসপোর্ট নিয়ে?’
‘কে বলেছে জালি পাসপোর্ট? এটাই আমার আসল পাসপোর্ট।’
লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল দুটো ষণ্ডা গোছের লোক নিয়ে। এসেই কর্কশ গলায় বলল, ‘জেরা শুরু কর। ওকে আইস টাবে চোবাও।’
লোকটা এবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘ডাহা মিথ্যা কথা। কেউ একজন তোমাকে এই পাসপোর্ট দিয়েছে। বলেছে লোকজনের সঙ্গে ভাব করতে। জেরুজালেম সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে।’
‘আপনারা ভুল করছেন।’
‘ভুল কি ঠিক, একটু পরেই বোঝা যাবে।’
লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল দুটো ষণ্ডা গোছের লোক নিয়ে। এসেই কর্কশ গলায় বলল, ‘জেরা শুরু কর। ওকে আইস টাবে চোবাও।’
এলিকে নগ্ন করে আইস টাবে ফেলা হল। হিমশীতল সেই ঠাণ্ডা। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে আসছিল এলির। কিন্তু মুখ খোলা হবে না।
লোকটার চিৎকার এলির কানে এল।
‘তোমার নাম কী?’
‘মার্সেল।’
‘আসল নাম বল।’
‘আমার একটাই নাম। মার্সেল।’
লোকটার হিসহিসে স্বরটা কানে এল, ‘বৃথা মিথ্যা বলছ। আচ্ছা আচ্ছা লোক এই আইস টাবে দশ মিনিট টিকতে পারে না।’
জ্ঞান হারানোর আগেও এলি বিড়বিড় করে গেলেন, ‘আমার একটাই নাম। মার্সেল।’
এলি জ্ঞান হারানোর পর লোকগুলো থমকে গেল। নিজেদের মধ্যে কথা বলে লোকটা বলল, ‘তুলে ফেল এবার।’
ঘণ্টা দুই বাদে এলিকে নিয়ে আসা হল এমন এক জায়গায়, যেখানে প্রস্রাব আর মলের গন্ধে টেকা দায়। লোকটা বলল, ‘আধ ঘণ্টা এই গন্ধ কেউ সহ্য করতে পারে না।’
এলিকে আইস টাব থেকে তোলা হল। খানিকক্ষণ ম্যাসাজ করে রক্ত সঞ্চালন ফিরিয়েও আনা হল।
তবে এলির দুঃস্বপ্ন তখনও শেষ হয়নি।
ঘণ্টা দুই বাদে এলিকে নিয়ে আসা হল এমন এক জায়গায়, যেখানে প্রস্রাব আর মলের গন্ধে টেকা দায়। লোকটা বলল, ‘আধ ঘণ্টা এই গন্ধ কেউ সহ্য করতে পারে না।’
এলিকে ঠেলে একটা মল ভর্তি চেম্বারে ঢোকানো হল। সঙ্গে শুরু হল জেরা।
এলিও ততক্ষণে স্থির করে নিয়েছেন, যা হয় হোক। কিছুতেই তিনি মুখ খুলবেন না।
তাই হল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা চলল। ওই দুর্গন্ধে যতক্ষণ এলির জ্ঞান ছিল ততক্ষণ তিনি আউড়ে গিয়েছেন, ‘আমার একটাই নাম। মার্সেল।’
ঘণ্টা তিরিশেকের পর জেরা থামল। ফের ম্যাসাজ করে এলির জ্ঞান ফেরানো হল। কিন্তু আশেপাশে কী হচ্ছে, তা বোঝার ক্ষমতা তখন এলির লোপ পেয়েছে।
অপহরণকারীরা আর ঝুঁকি নিল না। সেডেটিভ ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘণ্টাখানেকের জন্য এলির চেতনা লোপ করা হল। তারপর আবার একই রুটে গাড়ি আর বিমান করে এলির অর্ধচেতন দেহ জেরুজালেমে তাঁর হোটেলের ঘরে ফেরত পাঠানো হল।
বিগত ত্রিশ ঘণ্টা তোমার কোনও খোঁজ না পেয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। বিমানবন্দরের পর থেকে আর কিছু সত্যিই জানি না। যারা নিয়ে গিয়েছিল, তারা অন্য দফতরের। ওখানে আমার কথায় কোনও কাজ হবে না। আশা করি তুমি কিছু বলোনি।
হোটেলের ঘরে যখন এলির জ্ঞান ফিরল, তখন বেশ কিছুক্ষণ তার বুঝতে লাগল তিনি কোথায় রয়েছেন। আগের রাতের সেই আইস টাব, মলমূত্র ভর্তি চেম্বার সবই বিভীষিকা হয়ে রয়েছে এখনও। চোখ বন্ধ করলে লোকটার কর্কশ স্বরটা এখনও কানে বাজে।
কিন্তু যেটা খটকার, সেটা হল লোকগুলো আসলে কে? সত্যিই কি কাউন্টার ইনটেলিজেন্সের লোক? তাই যদি হবে, তাহলেও মোসাদের সঙ্গে কোনও সহযোগিতা নেই? দুম করে জেরার নামে মোসাদেরই কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? আরও আশ্চর্যের যেটা, সেটা সে বেরিয়েছিল ইদজাখের ডাকে, তারই গাড়িতে গিয়েছিল বিমানবন্দরে। এখন ইদজাখ জেনেবুঝে তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিল? সমস্ত যুক্তি কিন্তু তাই বলছে। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স তারই এজেন্টকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, আর ইদজাখ কিছুই জানে না, এটা তেল আভিভের বাচ্চারাও বিশ্বাস করবে না।
বিছানা থেকেই এলি দেখলেন, দরজার নিচে একটা কাগজ। কাগজ খুলে দেখলেন সেটা ইদজাখের চিরকূট।
তাতে লেখা—
বিগত ত্রিশ ঘণ্টা তোমার কোনও খোঁজ না পেয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। বিমানবন্দরের পর থেকে আর কিছু সত্যিই জানি না। যারা নিয়ে গিয়েছিল, তারা অন্য দফতরের। ওখানে আমার কথায় কোনও কাজ হবে না। আশা করি তুমি কিছু বলোনি।
জরায়েলের অভ্যন্তরীণ চর সংস্থা বা কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স শিনবেত ও বহির্জগতে চর সংস্থা মোসাদ ১৯৫২ থেকে টানা এগারো বছর ইসের হারেলের অধীন ছিল। ফলে ইদজাখ যে দুই সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাবের কথা বলছে, তা আসলে ধোপে টেকে না।
ইদজাখ কি তার সঙ্গে ডাবল গেম খেলছে? চিঠি থেকে তো পরিষ্কার ইদজাখ জানত, এলিকে নির্মম জেরার মুখে পড়তে হবে। না হলে মুখ না খোলার প্রসঙ্গই তুলত না।
ইতিহাস বলে, ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ চর সংস্থা বা কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স শিনবেত ও বহির্জগতে চর সংস্থা মোসাদ ১৯৫২ থেকে টানা এগারো বছর ইসের হারেলের অধীন ছিল। ফলে ইদজাখ যে দুই সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাবের কথা বলছে, তা আসলে ধোপে টেকে না।
এলি একটা বড় শিক্ষা পেলেন।
এই আলো আঁধারির জগতে নিজেকে ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস- ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে- এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত