(Partha Ghosh)
জনপ্রিয় বাচিকশিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। কর্মক্ষেত্রে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের ঘোষক ছিলেন। অনেকদিন আকাশবাণীর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘গল্পদাদুর আসর’ পরিচালনা করেছেন। এসব ছাড়াও এই বাচিকশিল্পী দম্পতি কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন মঞ্চে আবৃত্তি পরিবেশন করে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষ, নাম দু’টির সঙ্গে ‘আবৃত্তি’ শব্দটি পরিপূরক হয়ে উঠেছিল! কখনও ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’, কখনওবা ‘কচ ও দেবযানী’-র দ্বৈত পরিবেশনা, আবার কখনও একক পরিবেশনা শোনা গেছে এই শহরের একাধিক প্রেক্ষাগৃহে।
আরও পড়ুন: শান্তিনিকেতনের রাণী
এই শহর, রাজ্য এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে তাঁদের ডাক এসেছিল সাগরপারেও। দু’জনের কথা একসঙ্গে বলা সম্ভব নয়, তাই আজ শুধু পার্থ ঘোষকে ঘিরে তৈরি হওয়া অজস্র স্মৃতির কথা বলব। কী করে জানি না, পার্থদার সঙ্গে একটা নিবিড় সঙ্গ গড়ে উঠেছিল। সবরকম কথা আর আলোচনা হত তাঁর সঙ্গে।
সূচনা হয়তো ছিল কোথাও একটা, যেমন দূরদর্শনে মা কাজ করতেন, সেই সূত্রে আসা-যাওয়া, দেখাসাক্ষাৎ তো ছিলই, আবার অন্যদিকে গৌরীদির মেজদা, বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক-গায়ক রবীন মজুমদার ছিলেন আমার বাবার খুব আপনার জন। বাবা এবং তাঁর বন্ধুদের কাছে রবীন মজুমদার ছিলেন একজন স্বপ্নের নায়ক! এসব কারণেই হয়তো পার্থদার পরিবার আর আমাদের পরিবার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল!

ওঁদের ‘উপমা’-র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা নিয়মিত যেতাম। বাবা সব অনুষ্ঠানের ছবি তুলে পার্থদাকে উপহার দিত। মনে আছে, পার্থদা একদিন মায়ের কাছে শুনেছিলেন যে, আমি শৈশবে দূরদর্শনে আবৃত্তির জন্য অডিশন দিয়ে প্রথম হয়েছিলাম। উনিই তখন আমাকে বলেন, প্রতি রবিবার যেন ইডেন গার্ডেনস সংলগ্ন আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের অফিসে চলে যাই, ওখানেই ডিউটি রুম সংলগ্ন একটা ঘরে উনি আবৃত্তি শেখাবেন।
মনে আছে, দিনটা ছিল ২২ শ্রাবণ, সকালে সঞ্চয়িতা হাতে করে গেলাম আকাশবাণীর অফিসে। প্রথম দিন পার্থদা শেখালেন, ‘সুপ্রভাত’ কবিতাটি। সেদিন অর্ধেক, আবার পরের রবিবার অর্ধেক। এইভাবেই শুরু হল। মাঝে মধ্যে কোনও কোনও দিন আকাশবাণীর পরিবর্তে ডাকতেন ওঁদের দমদম ক্যান্টনমেন্টের ধাপাপুকুরের বাড়িতে।
পার্থদা পুরনো শিল্পীদের গাওয়া গানগুলি গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন, আর শিল্পীরা গেয়েছিলেন কবি অনুমোদিত স্বরলিপির উপর ভিত্তি করে নির্মিত গানগুলি।
বাড়িটার সামনে ছিল এক বিরাট দীঘি। বসার ঘরের চারদিকে রংবেরংয়ের নানা আকৃতির পুতুল, বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা। সেসব পুতুল সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেছিলেন, পুতুল সংগ্রহ ওঁর একটা নেশা, আবার পাশাপাশি অতীতের গ্রামোফোন রেকর্ডও সংগ্রহ করতেন। বলাই বাহুল্য, তার মধ্যে বেশিরভাগই থাকত রবীন মজুমদারের রেকর্ড। ১৯৮৭ সালে আমরা যখন ইউরোপ বেড়াতে গেলাম, তখন ইংল্যান্ড থেকে পার্থদার জন্য দুটো পুতুল নিয়ে এসেছিলাম। পুতুল দু’টি কিনেছিলাম ব্রাইটন থেকে।
নানা বিষয় নিয়ে গল্প আর আবৃত্তি শেখা চলতে থাকল একসঙ্গে। একদিন পার্থদাকে অনুরোধ করলাম, আমার একটি প্রিয় কবিতা শেখাতে। কবিতাটি ছিল, ‘দুঃসময়’। ওই সময়ই পার্থদা এবং গৌরীদি ‘উপমা’-র পক্ষ থেকে আয়োজন করেছিলেন একটি অনুষ্ঠানের, ‘রবিবাবুর গান বনাম রবীন্দ্রসংগীত’। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। একেবারে চাঁদের হাট!

বিষয়টা হল অতীতের নামি শিল্পীরা যেমন রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আশ্চর্যময়ী দাসী, মানদাসুন্দরী দাসী, কে. মল্লিক প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের গানের উপর নিজেদের মতো সুরারোপ করে গাইতেন। তাঁরা যে কবিকে অশ্রদ্ধা করে এমনটা করতেন, তা নয়, আসলে সেই সময়ের চলটাই ওইরকম ছিল। পরে কবি অনুমোদিত স্বরলিপি অনুসারে রবীন্দ্রনাথের গান কী রূপ নিয়েছিল, সেটা বোঝাতেই এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন।
অনুষ্ঠানে পার্থদা পুরনো শিল্পীদের গাওয়া গানগুলি গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন, আর শিল্পীরা গেয়েছিলেন কবি অনুমোদিত স্বরলিপির উপর ভিত্তি করে নির্মিত গানগুলি। সেইসব স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, সরলা দেবী প্রমুখ। এই একই অনুষ্ঠান পার্থদা করেছিলেন দূরদর্শনে, কয়েকটি পর্বে। আবৃত্তি শেখার বছর দু’য়েক চলার পরে আমাকে ‘উপমা’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতেন।
সবাই জানেন, ‘কবি’র বেশিরভাগ গানই রবীন মজুমদার গেয়েছিলেন। আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পরে মেয়ের বাড়ি পার্থদার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেলের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। মনে হয়, পার্থদা ভালই সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন।
হেমন্ত স্মৃতি সংসদ গড়ে ওঠার পরে পার্থদা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নানারকম অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করতেন। যতদূর জানি তাঁর সঙ্গে ছবি বিশ্বাসের একটা আত্মীয়তা ছিল। আমি এককভাবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে উনি সবরকমভাবে সাহায্য করতেন। গানের রেকর্ড কিনতে চাইলে, ওঁদের বাড়ির কাছেই হিজ মাস্টার্স ভয়েজের অফিসের পাশের দোকানে নিয়ে যেতেন। কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে দক্ষিণ কলকাতায় এলে, মাঝে মধ্যে আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন পার্থদা।

মনে পড়ে, একবার আমরা দু’জনে মধ্য কলকাতার চোর বাজারে পুরনো রেকর্ডের দোকানে গিয়ে দেবকীকুমার বসু পরিচালিত ‘কবি’ সিনেমার কয়েকখানা রেকর্ড কিনেছিলাম। সবাই জানেন, ‘কবি’র বেশিরভাগ গানই রবীন মজুমদার গেয়েছিলেন। আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পরে মেয়ের বাড়ি পার্থদার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেলের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। মনে হয়, পার্থদা ভালই সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন।
তবে একটা জিনিস দেখতাম, সেটা হল পার্থদা এবং গৌরীদি সবাইকে বলতেন, ‘বুবান’ (আমার ডাকনাম) আমাদের আরেকটা ছেলে। সংস্কৃতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একাডেমি প্রাঙ্গণে পার্থদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তখনও বুঝিনি সেটাই ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা। আমাদের মতো শূন্য ঘরে রেখে যাওয়া ওঁর পুতুলগুলোও কি পার্থদাকে খোঁজে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত