(Ujjhomanush 8)
বিখ্যাত সাহিত্যিক, আমার মতে তুমুল ফুটবল দার্শনিক এদওয়ার্দ গালিয়ানো’র অতিবিখ্যাত বইয়ের নাম এই লেখার শিরোনামরূপে দিলাম কেন, তা বোঝা যাবে বোধ করি, লেখার অন্তে। তাই চলে যাই চরিত্রে।
পাট্রিস লুমাম্বা কঙ্গো’র বিখ্যাত সংগ্রামী নেতা, প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ছকভাঙা, নির্ভীক পথপ্রদর্শক ছিলেন, যাঁকে আমেরিকা ও বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিবাদস্বরূপ প্রাণ খোয়াতে হয়। সে এক বীভৎস অন্তের সাতকাহন। রক্তক্ষয়ী সে ইতিহাস চাইলে ঘেঁটে দেখতে পারেন, পাঠক। তবে তা নিয়ে আজ লেখা নয়, লেখা মিশেল কুকাকে নিয়ে। কঙ্গো ও গোটা বিশ্ব তাঁকে নাম দিয়েছে ‘লুমাম্বা ভিয়া’, সুপার ফ্যান। কী করেন তিনি? কঙ্গো’র ম্যাচ চলাকালীন রঙিন স্যুট পরে (যা কঙ্গো’র জাতীয় পতাকার রংয়ের) এক হাত তুলে, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন গ্যালারিতে। প্রায় নিশ্চল।
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭)
নিঃসন্দেহেই এমন ভঙ্গিতে দাঁড়ানোর ফলে তিনি ব্যাপক নজর কেড়েছেন। এতটাই, যে কঙ্গো’র খেলোয়াড়রা দেশের ফুটবল সংস্থার কাছে আবেদন করেছেন ও সম্মতি আদায় করেছেন, যাতে কুকা’কে বিশ্বকাপে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আসছেন। কঙ্গোয় ইবোলা ভাইরাস ছড়ানোর ফলে আপাতত কোয়ারাইন্টাইনে, তবে বিশ্বকাপের গ্যালারিতে তাঁকে দেখার অপেক্ষা মাত্র। ২০২৫-এর অ্যাফকন প্রতিযোগিতায় যেমন দেখা গিয়েছিল হইহই করে।

এখন, সে থাক। তাঁকে নিয়ে, বা তাঁর মতো এমন আরও ‘উন্মাদ’ ভক্তদের নিয়ে বিশ্বকাপ বা এমনই কোনও বড় প্রতিযোগিতার সময়, মেনস্ট্রিম মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু দিন লেখালেখি হয়। এই যেমন আমিও আজ। কুকা’র ক্ষেত্রে আরও যা ‘চমকপ্রদ’, তা হল তাঁর এ হেন আচরণের নেপথ্যকথা। তার সঙ্গে যে নিবিড় যোগ রয়েছে, পাট্রিস লুমাম্বা’র, যাঁকে দিয়ে এই লেখা আরম্ভ।
কুকা খেলার মাঠে ওই যে ডান হাত তুলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তা তো আসলে পাট্রিস লুমাম্বা’র বিখ্যাত দৃপ্ত কণ্ঠ, বুক চিতিয়ে প্রতিরোধ গড়ার ভঙ্গি। সেই অনবদ্য সাহসকে ফালাফালা করে কেটে, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। চাওয়া হয়েছিল লুমাম্বাকে, তাঁর স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে। কিন্তু এই এত বছর পর, প্রায় ৬৫ বছর পরও কি আসলে তা পারা গেল? গেল না, কারণ কুকা, আজও মাঠে, লুমাম্বা’র স্মৃতিকে চাগিয়ে দেন, লুমাম্বা’র মতো সেজে, ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে, দেশের পাশে।

কুকা’র এমন ছকভাঙা অবস্থান নিয়েও লেখালেখি হচ্ছে, হবে, কিন্তু যা হবে না আমি নিশ্চিত (ভুল প্রমাণিত হলে খুশিই হব), তা হল, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলেও, বা দৈনন্দিনের কুকা’কে খুঁজে ফেরা, খুঁজে চলা। কুকা আজ পাদপ্রদীপের আলোয়। কুকা কীভাবে ফিরিয়ে আনলেন লুমাম্বাকে, তা নিয়ে চর্চা। কিন্তু, আলো যখন সরে যায় বা আদৌ পড়ে না গায়ে, তখন কুকা কী করেন, কী ভাবেন, কেনই বা প্রথম দিন ভেবেছিলেন লুমাম্বা ‘হয়ে উঠবেন’, তা কি আমরা কখনও ভাবব?
সহজ কথা কি তিনি যে কাণ্ড ঘটাচ্ছেন, তা ঘটানো? সে কাজের মধ্যে দিয়ে কুকা যেভাবে একটি রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট করছেন, তা চাট্টিখানি কথা? আর আমরা যদি তা মনে রাখিও, রাখব তো শুধুমাত্র সাহসের ক্ষণটুকু
ওই যে কুকা’র অন্তরমহল, তা-ই কিন্তু এই শত আলোতেও সেই উহ্য হয়ে থেকে যায়। খেদ সেটাই। কুকাকে আমরা অধিকাংশই এক সুপার ফ্যান করে রেখে দেব বোধহয়, বা ফ্যানাটিক। বোঝার চেষ্টা করব না, কুকা’র দৈনন্দিন। ভিতরের লড়াইগুলো, টানাপেড়েন। সহজ কথা কি তিনি যে কাণ্ড ঘটাচ্ছেন, তা ঘটানো? সে কাজের মধ্যে দিয়ে কুকা যেভাবে একটি রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট করছেন, তা চাট্টিখানি কথা? আর আমরা যদি তা মনে রাখিও, রাখব তো শুধুমাত্র সাহসের ক্ষণটুকু, একা একা যখন তিনি সে সাহস জুগিয়েছিলেন, সঞ্চয় করেছিলেন, কে আর সে বেদনা খুঁড়তে চায়, বলুন না… কুকা সেখানে বোধ করি, বড় একাই রয়ে যাবেন।

যেমন একা থেকে যাবেন, আরও কিছু তথাকথিত ‘সুপার ফ্যান’ বা ফ্যানাটিক।
গল্পটা শুনেছি আমি। আরও বহু জন শুনেছেন আমার বিশ্বাস, যে, কলকাতার সাবেক বড় দলের এক অন্ধ সমর্থক একদিন যথাসময়ে মাঠে এসে পৌঁছননি। সে স্থান কখনও ফাঁকা থাকত না, দলের খেলা মানেই সেই ভদ্রলোককে ওখানে দেখা যাবেই। কিন্তু সে দিন তিনি নেই। খেলা শুরুর বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, কী ব্যাপার আজ এত দেরিতে? ভদ্রলোক নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, ছেলেকে দাহ করতে সময় লেগে গেল…।

ভাবতেই পারি না, সন্তান হারানোর শোক কোন গ্রহের ভয়। আর ভেবে মরি শুধু, এমন তীব্র ভাঙনের পরও, যে খেলা এই রূপ ‘শান্তি’ দেয় ছিন্নভিন্ন বিধ্বস্তকে, তা-ই বা কোন পর্যায়ের! যখন প্রথম শুনি এ গল্প, মনে হয়েছিল, একবার যদি তাঁর সঙ্গে দেখা করা যায়, একবার যদি তাঁর পাশে গিয়ে দু’দণ্ড বসা যায়। ইচ্ছে হয়েছিল বুঝতে চাওয়ার, এমন ভাঙন ধরার পরও কী করে, জাস্ট কী করে আপনি পারলেন প্রিয় দলের খেলায় আসতে, কী মনে হয়েছিল, কীভাবেই বা শান্তি পেলেন আপনি ইত্যাদি… মনে হয়েছিল, তাঁকে আড়াল থেকে ফলো করার… দেখার, যে তিনি কী করে নিজেকে ধরে রাখেন এরপর… ভেবেছিলাম, বসে বুঝব, তাঁর প্রিয় দল, তাঁর প্রিয় খেলা ফুটবলও কী করে জল আনে খরা-কবলিত প্রাণে।
সেই আকাশেই অতঃপর ধরার চেষ্টা করি, মোহনবাগান শিল্ডে পাঁচ গোল খাওয়ার পর, উমাকান্ত পালোধীর আত্মহত্যা, বা তাঁর রেখে যাওয়া সুইসাইড নোট, যে আগামী জন্মে মোহনবাগানী হয়ে ফিরে এ হারের প্রতিশোধ নেবে সে…
কিন্তু তারপর আর সাহস হয়নি। ওই প্রথমবার মনে হল, না থাক, উহ্যই থাক, সে সব। ওই ভদ্রলোকের আশ্চর্য ভুবনে ঢোকা নিষিদ্ধ হোক অন্যদের। ওই যে ইংরেজিতে বলে না— some things are better left unsaid…
তবুও সেই আকাশেই অতঃপর ধরার চেষ্টা করি, মোহনবাগান শিল্ডে পাঁচ গোল খাওয়ার পর, উমাকান্ত পালোধীর আত্মহত্যা, বা তাঁর রেখে যাওয়া সুইসাইড নোট, যে আগামী জন্মে মোহনবাগানী হয়ে ফিরে এ হারের প্রতিশোধ নেবে সে…
বিশ্বকাপের দিন, কত গল্প, ইতিহাস, খবরের সুনামিতে ভাসমান আশপাশ, উমাকান্ত বা ছেলেকে দাহ করেও খেলা দেখতে আসা ওই পিতা বা কুকা’রা, সেই কুয়াশাচ্ছন্ন হয়েই থেকে যান। অভ্যাস আমাদের আর বদলায় না। আর, অভ্যাস বদলায় না এমন ভিনগ্রহী অথচ সহজ জলের মতো ভাবনাজগতেরও। ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে এমন মানুষদের জন্যই আরও আলোকময় হয়। তাঁরা তাঁদের অতলান্ত আঁধার বুকের মধ্যে ধরে রাখেন বলে…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত