(Musafir Cafe)
সিরিজ: মুসাফির ক্যাফে
অভিনয়ে: বিক্রান্ত ম্যাসি, বেদিকা পিন্টো, মহিমা মাকওয়ানা, আদিল হুসেন, রাজীব সিদ্ধার্থ, অনুভা ফতেহপুরিয়া, লাভলিন মিশ্র, সাদিয়া সিদ্দিকি প্রমুখ
পরিচালনা: রুচির অরুণ
স্রষ্টা ও কাহিনি: শারণ্য রাজগোপাল, দিব্য প্রকাশ দুবের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মুসাফির ক্যাফে’ অবলম্বনে
প্রযোজনা: টেরিবলি টাইনি টেলস ও হোমমেড স্টোরিজ
প্রযোজক: অনুজ গোসালিয়া, বিজয় সুব্রহ্মণ্যম, বিক্রান্ত ম্যাসি
সামনে সাদা বরফে মোড়া পাহাড়! পিছনে টেরাকোটা রঙের বাংলো। সেই বাংলোর দোতলায় সবুজ গ্রিলের ওপারে দাঁড়িয়ে সোনালি চুলের সেই মেয়েটা, যাকে আপনি হারিয়ে ফেলেছিলেন আট বছর আগে। হঠাৎ তাকে দেখলে মনের ভিতরের নুড়িপাথরগুলোতে শব্দ হবে। যে শব্দ পাহাড়ে বারবার ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে। আমাদের জীবনের প্রতিটা বাঁকে একটি করে পাহাড় আছে। পাহাড় আমাদের আসল রূপ টেনে বাইরে আনে। এঁকেবেঁকে যাওয়া পথের বাঁকে লুকিয়ে থাকে কুয়াশাভেজা স্মৃতি। এক জীবন থেকে সহজেই পাড়ি দেওয়া যায় অন্য জীবনের দেউড়িতে।
আরও পড়ুন: উজানে ভাসা এক কবি ও গুপ্তচরের প্রেম
কোনওদিন কোনও প্রেম শেষ হয় না। অন্য কোনও অক্ষরেখায় চলতে থাকে সেই গল্প। ঢিমেতালে, কাহারবা ছন্দে। আমরা তো আজীবন ভালবাসার জন্য উপবাসী হয়ে থাকি। ‘ব্যর্থ’ প্রেমকে আঁকড়ে চেয়ে থাকি প্রথম ফোটা পলাশের দিকে। প্রেম কি ব্যর্থ হতে পারে? একটা জীবনে আমরা কি কেউ কারওর হতে পারি? একটা বিয়ে কি আমাদের বেঁধে ফেলতে পারে ভালবাসার গণ্ডিতে? ভালবাসার কোনও গণ্ডি হয়? বা হতে পারে? এক ভালবাসার জন্যই তো অন্য এক ভালবাসার জন্ম হয়। এক ভালবাসা থেকে হেঁটে যাওয়া অন্য এক ভালবাসায়। কাল দেশ সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে এগিয়ে চলা শুধু। জীবনের অর্থ তো বয়ে চলা। এই নশ্বর জীবনের মানেই তো ‘মুসাফির’ বিলাসিতা।

দিব্য প্রকাশ দুবের বিখ্যাত হিন্দি উপন্যাস ‘মুসাফির ক্যাফে’কে ভিত্তি করে নির্মিত ওয়েব সিরিজটি এখন সমাজমাধ্যমের আদুরে আশ্রয়। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই হিন্দি উপন্যাস সেই সময়ের বেস্টসেলার। নীল-সাদা রঙে প্রচ্ছদ আঁকা বইটির পাতা ওল্টালে পাহাড়ের গন্ধ নাকের কাছে এসে ভিড় করে। বইটির শুরুতে লেখা— আমাদের সবার জীবনেই কিছু না কিছু গল্প লুকিয়ে থাকে। সেই গল্পগুলো যদি কখনও কাউকে না বলা হয়, তাহলে নিজের ভেতরেই যেন এক পাগলামি চলতে থাকে। এই গল্প সেইসব গল্পেরই একটি।
বইয়ের ভূমিকার শুরুতে লেখক লিখেছেন, কথা বইয়ের অনেক আগে জন্ম নিয়েছিল। আমাদের চারপাশে কথার চেয়ে প্রাচীন জিনিস হয়তো খুব কমই আছে। কেউ যখন প্রথম কোনও কথাকে যত্ন করে ধরে রাখতে চেয়েছিল, তখনই হয়তো প্রথম পৃষ্ঠা তৈরি হয়েছিল। আর সেইসব পৃষ্ঠা একের পর এক জুড়ে জন্ম নিয়েছিল প্রথম বই। তাই জীবনকে সত্যি সত্যি বুঝতে হলে শুধু বই পড়লে হয় না, কথাও পড়তে হয়। শুধু উচ্চারিত কথা নয়, যা লেখা নেই, যা কেউ কখনও শেখায়নি, সেগুলোও পড়তে হয়। বুঝে নিতে হয় সেইসব কথা, যা মুখে বলা হয়েছে, আর সেইসবও, যা নীরবতা দিয়ে বলা। জানি না, দু’জন মানুষ একে অপরকে ছুঁয়ে কতটা কাছে পৌঁছতে পারে। তবে এটুকু নিশ্চিত, কথা বলে মানুষ প্রায়ই স্পর্শের চেয়েও অনেক বেশি কাছে চলে আসে।

বইয়ের প্রথম পাতার শুরুটা হয় এইভাবে, ‘আমাদের কি আগে কখনও দেখা হয়েছে?’ সুধা শিশুর মতো দুষ্টু হাসি হেসে বলল, ‘হয়তো।’ ‘হয়তো? কোথায়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। সুধা বলল, ‘হতে পারে, কোনও এক বইয়ের পাতায় আমাদের দেখা হয়েছিল।’ আমাদের জীবনটা তো বইয়ের মতো। আমাদের কাজ শুধু পাতা উল্টে যাওয়া। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলা। নিজের ভিতরে ভ্রমণ করা। নিজেকে খুঁজে পেতে এগিয়ে চলা শুধু।
সুধা তাঁর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চন্দরের দেখা স্বপ্নগুলোতে প্রাণ দিয়েছিল। যে স্বপ্ন চন্দর একা দেখেছিল, সেই স্বপ্নকে আরও বাস্তব করে তুলেছিল সুধা। ড্রিম ক্যাফে থেকে গড়ে তুলেছিল মুসাফির ক্যাফে।
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র চন্দরকে আমরা ওয়েব সিরিজে বিক্রান্ত ম্যাসের ভূমিকায় দেখতে পাই। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার চন্দর বর্তমানে ভোপালে থাকে। সেখানে তার সঙ্গে আলাপ হয় সুধার। ওয়েব সিরিজে সে উকিল। মূলত বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা লড়ে। সুধার প্রেমে পড়ে চন্দর। তবে মেয়েটি একটি শর্ত দেয়, সে বিয়ে করতে ইচ্ছুক না। শুধু চন্দরের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছুক, তাকে পাগলের মতো ভালবাসতে ইচ্ছুক, জীবনের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোর দোসর হতে ইচ্ছুক। কিন্তু কোনও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে সে চায় না।

প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা অনেকে এই ধরনের খুচরো আবদার খুব সাদরে গ্রহণ করি। চন্দরও তাই করেছিল। গুটিগুটি পায়ে এগিয়েছিল তাদের চাঁদের বাড়ি। চন্দরের স্বপ্ন ছিল পাহাড়ে একটা ক্যাফে খোলার। শহুরে জীবন থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে নিজের একটা জীবন বেছে নেওয়ার। যে জীবনে কোনও ভণিতা নেই। সেখানে শুধু নিজের জীবনকে উপভোগ করা যায় যখন তখন। ওয়েব সিরিজের একটি দৃশ্যে তাই চন্দরকে বলতে শোনা যায়, ‘ইন পাহাড়োঁ কি বাত হি কুছ আলগ হ্যায়… ইয়ে পাহাড় ইনসান কো উসকি আসলি জগৎ দিখাতে হ্যায়… ইয়াহাঁ বাস হোনা হি কাফি হ্যায়।’
আমরা সকলেই এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে শুধুই না পাওয়া। শুধুই দ্রুত গতিতে ছুটে চলা। যন্ত্রের মতো গড়িয়ে চলা। নবপ্রজন্মের কাছে পাহাড় মানে মনের আনন্দ, প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি। সবাই চাইছে ছুটে পালিয়ে যেতে। সবাই চাইছে পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট আস্তানা হোক। কিন্তু পারছে ক’জন? কতজন পাচ্ছে তাঁর সঙ্গীর সমর্থন? চন্দর পেরেছিল। সুধা তাঁর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চন্দরের দেখা স্বপ্নগুলোতে প্রাণ দিয়েছিল। যে স্বপ্ন চন্দর একা দেখেছিল, সেই স্বপ্নকে আরও বাস্তব করে তুলেছিল সুধা। ড্রিম ক্যাফে থেকে গড়ে তুলেছিল মুসাফির ক্যাফে।

কিন্তু নিজের জীবনের অর্থ সুধা খুঁজে পায় বম্বে হাইকোর্টে এসে। ভোপাল ছেড়ে চলে আসে। ছেড়ে আসে চন্দরকে। চন্দর বসে থাকে একটা ‘ক্লোজার’-এর অপেক্ষায়। তারপর চন্দরের জীবনে আসে প্রীতি। সে মুসাফির ক্যাফের বাস্তব রূপায়ন করে। মুসৌরির বুকে গড়ে তোলে এক মায়াবী ক্যাফে। কিন্তু চন্দর বিয়ে করেনি প্রীতিকে। করতে চায়নি। কারণ ততদিনে চন্দর বুঝতে শিখেছে সামাজিক রীতির বাইরে একটা জীবন হয়। যে জীবনে ভাল থাকাটাই আসল। যে ভাল থাকাটা তাকে শিখিয়েছিল সুধা।
পরিমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া সেই জুলিয়া গ্রিফিথ এখন কোথায় আছে? কী করছে সে? তাঁর সেই রোদঝরা হাসিমুখের ছবি কি এখনও ভেসে ওঠে দার্জিলিংয়ের বুকে? সময় এগিয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় তরলের মতো ফিনকি দিয়ে উপচে পড়া স্মৃতি।
আমাদের জীবনে এমন কিছু মানুষ আসে, যাদের সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না কোনওদিন। কোনওদিন আর কথা হবে না। তবুও তাঁদের সঙ্গে কাটানো কয়েকটা মুহূর্ত পরবর্তী জীবনের পাথেয় হয়ে যায়। নিজের স্বপ্নের অংশীদার হয়ে যায়। হয়তো তার দেখানো পথে জীবনের বাকিটা অন্য কারওর সঙ্গে কাটিয়ে দেওয়া যায়, শুধু রয়ে যায় সেই চলে যাওয়া মানুষটির স্মৃতি। এটাই হয়তো জীবনের ধর্ম। অমৃতা এবং ইমরোজ বিয়ে না করেই একে অন্যের সঙ্গে চল্লিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। একে অন্যের আশ্রয় হয়ে উঠেছেন প্রতিটা মুহূর্তে। দারবিশ এবং রিটা দু’দেশের ব্যবধান মুছে পরস্পরকে ভালবেসেছিলেন। রিটা কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেলেও দারবিশ তাকে ভোলেনি। ভুলতে পারেনি। তিনিও চন্দরের মতো জীবনে ক্লোজার পাননি। তবুও এগিয়ে গিয়েছেন। মুসাফির হয়ে উঠেছেন তাঁর কবিতার লাইনে।
পরিমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া সেই জুলিয়া গ্রিফিথ এখন কোথায় আছে? কী করছে সে? তাঁর সেই রোদঝরা হাসিমুখের ছবি কি এখনও ভেসে ওঠে দার্জিলিংয়ের বুকে? সময় এগিয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় তরলের মতো ফিনকি দিয়ে উপচে পড়া স্মৃতি। জীবনের অধিকাংশ সম্পর্কেরই তো কোনও শেষ দৃশ্য হয় না। কেউ বিদায় না বলেই হারিয়ে যায়, কেউ অন্য কোনও শহরের ভিড়ে মিশে যায়, কেউ একই ছাদের নিচে থেকেও সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে ওঠে। তবু জীবন থেমে থাকে না। সময় তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে যায়। নতুন মানুষ আসে, নতুন পথ খুলে যায়, নতুন স্বপ্ন জন্ম নেয়। অথচ সেই নতুনের ভিতরেও কোথাও নিঃশব্দে বেঁচে থাকে পুরনো মানুষের রেখে যাওয়া স্পর্শ, ভাষা, অভ্যাস এবং ভালবাসা।

আমরা কাউকে পুরোপুরি পিছনে ফেলে এগিয়ে যাই না। তাকে নিজের ভেতরে আগলে রেখে পরবর্তী যাত্রায় পা বাড়াই। হয়তো মুসাফির হওয়ার অর্থ ভুলে যাওয়া নয়, হারিয়ে ফেলাও নয়। বরং স্মৃতিকে সঙ্গী করেই পথ চলতে শেখা। কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে, আমাদের বদলে দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য। আদর্শ বলে কিছু হয় না। ভাল সম্পর্ক, খারাপ সম্পর্ক বলেও কিছু হয় না। সবটাই আপেক্ষিক। কীভাবে কখন আমরা সেই সম্পর্কে দেখছি, সেটাই আসল হয়ে ওঠে সময়ের প্রেক্ষিতে।
এক জীবনে আমরা হয়তো সম্পূর্ণত কেউ কারওর হতে পারি না। বিয়ের আগেও নয়, পরেও নয়। প্রেমেও নয়, অপ্রেমেও নয়। সব পথের গন্তব্য থাকে না। সব প্রেমও পরিণতি পায় না। তবু মানুষ ভালবাসে, স্বপ্ন দেখে, আবার নতুন পথে হাঁটে। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য। পাহাড় যেমন কুয়াশাকে আটকে রাখে না, তেমন জীবনও কাউকে আটকে রাখে না। শুধু চলতে শেখায়। সেই চলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক মুসাফিরের বিলাসিতা।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
Excellent review and wonderful writing