(Darwish and Rita)
‘আমি আমার জাতির সঙ্গে বেইমানি করে, আমার শহর এবং তার পরাধীনতার শিকলগুলির বেদনা ভুলে গিয়ে হলেও তোমাকে ভালবাসি’- মাহমুদ দারবিশ।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট যদি কারওর প্রেমিকা হয়, তাহলে হয়তো এমন লাইনগুলো অনায়াসে বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। মনে পড়ে টাইগার জোয়ার কথা। বারবার তাদের প্রেমকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বলিউডের ব্লকবাস্টার সব সিনেমা। চিরশত্রু দুই দেশের দুই মানুষ, একে অপরকে কি ভালবাসতে পারে? রাষ্ট্র কি তাদের ভালবাসার অধিকার দেয়? সিনেমা, সাহিত্য, গল্পে এইসব উদাহরণ ভুরি ভুরি থাকলেও বাস্তবে সেই নিদর্শন প্রায় নেই। কিন্তু, ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ এবং ইজরায়েলি ইহুদি তরুণী তামার বেন আমি-র সম্পর্ক তেমনই এক প্রেম, একই সঙ্গে বিশ শতকের সবচেয়ে আলোচিত প্রেম কাহিনিগুলোর একটিও।
আরও পড়ুন: চেনা গদ্যের ছকভাঙা জাদুকর পরিমল ভট্টাচার্য
মাহমুদ দারবিশের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৩ই মার্চ ব্রিটিশশাসিত প্যালেস্তাইনের গ্যালিলি অঞ্চলের আল-বিরওয়া গ্রামে, এক ফিলিস্তিনি কৃষিজীবী পরিবারে। ১৯৪৮ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সময় মাত্র ৭ বছর বয়সে দারবিশের পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। পরে ফিরে এসে দেখে, তাদের গ্রাম ধ্বংস করে সেখানে নতুন ইজরায়েলি বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। শৈশবের এই উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতা তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। নিজের দেশে রিফিউজি হয়ে বাঁচার যন্ত্রণা কতটা বেদনার, দারবিশের ‘আইডেন্টিটি কার্ড’ কবিতায় তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়—
‘লিখে রাখো!
আমি একজন আরব
এবং আমার পরিচয়পত্রের নম্বর পঞ্চাশ হাজার
আমার আটটি সন্তান
আর নবমটি পৃথিবীতে আসবে গ্রীষ্মকালের পর
তোমরা কি ক্ষুব্ধ হবে তাতে?’

নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসেও তিনি আর নিজের বাড়ি বা জমি ফিরে পাননি। ইজরায়েলি আইনে তিনি হয়ে যান এক ‘Present Absentee’ অর্থাৎ শারীরিকভাবে দেশে থাকলেও আইনি অর্থে ‘অনুপস্থিত’। তাঁর সম্পত্তি তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এই পরস্পরবিরোধী পরিচয়ের বেদনা দারবিশের কবিতা ও গদ্যে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর কাছে নির্বাসন শুধু ভৌগোলিক ছিল না, নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাও ছিল সেই নির্বাসনের অংশ।
দারবিশের প্রেমিকা তামার বেন আমি-র জন্ম ইজরায়েলে, এক ইহুদি পরিবারে। আমি-র পরিবার ইউরোপীয় ইহুদি অভিবাসী পটভূমির হলেও, তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা নবগঠিত ইজরায়েল রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও নাগরিক পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই তিনি নাচ, গান ও মঞ্চশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, এবং পরবর্তীকালে পেশাদার শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন।
কবিতা, গান, নাচ, বই এবং দীর্ঘ আলাপচারিতা তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। দারবিশ তামারের সঙ্গে কখনও হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন, কখনও হিব্রুতেই চিঠি লিখতেন।
দারবিশ এবং তামারের পরিচয় হয় ষাটের দশকের গোড়ায়। মাহমুদ দারবিশ তখন ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিয়মিত সদস্য। সেই সময় এই রাজনৈতিক পরিসরটি ছিল বিরল এক মিলনভূমি, যেখানে ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদি তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত ও রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতেন। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দারবিশ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, এবং কিশোরী তামার নৃত্য-সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন। সেখানেই তাঁদের প্রথম পরিচয়, যা পরে গভীর সম্পর্কের রূপ নেয়।
দারবিশ-তামারের এই সম্পর্ক শুরু থেকেই ছিল ইতিহাসের ভারে নত। একদিকে নিজের ভূমিতে থেকেও বৈষম্যের শিকার এক তরুণ ফিলিস্তিনি কবি এবং অন্যদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইজরায়েল রাষ্ট্রের নাগরিক এক তরুণী ইহুদি শিল্পী। দুজনের ব্যক্তিগত অনুভূতির মাঝখানে ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে দুই জাতির রাজনৈতিক বৈরিতা। মাহমুদ দারবিশ ও তামার বেন আমি-র প্রেমের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল, এই সম্পর্ক এমন এক সময়ে তৈরি, যখন আরব ও ইহুদিদের সম্পর্ক আরও শত্রুতাময় হয়ে উঠছিল।

তবু রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে তাঁরা একে অপরকে চিনেছিলেন শিল্পের জগতে। কবিতা, গান, নাচ, বই এবং দীর্ঘ আলাপচারিতা তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। দারবিশ তামারের সঙ্গে কখনও হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন, কখনও হিব্রুতেই চিঠি লিখতেন। সেই ভাষা পরে তাঁর রাজনৈতিক কবিতায় রাষ্ট্রক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠেছিল।
তামার আরবি না জানলেও দারবিশের কবিতার আবেগ বুঝতে চেষ্টা করতেন। তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে গভীর আগ্রহে অনুসরণ করতেন। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। তামার ইজরায়েলি নৌবাহিনীর সাংস্কৃতিক দলে যোগ দেন, এবং দারবিশ ক্রমে ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। দুজনের প্রেম তখন দুই জাতিপরিচয়, দুই ভিন্নধর্মী ইতিহাস এবং দুই বিপরীত রাজনীতির ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
প্রেমে পড়ার সময়, দু’জনের কেউই পরস্পরকে কোনও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেননি। একজন ছিলেন কবি, অন্যজন শিল্পী। পরে এক চিঠিতে দারবিশ লিখেছিলেন, তিনি যেন তামারের ভেতরে সেই রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করছেন।
তামার বেন আমি-র প্রকৃত নাম কবিতায় ব্যবহার করেননি মাহমুদ দারবিশ। তাঁর পরিচয় গোপন রাখার পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রেমকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে প্রিয় মানুষটিকে ‘রিটা’ নামে সম্বোধন করেছিলেন। বহু বছর পরে তামারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দারবিশ স্বীকার করেন, তাঁদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। কিন্তু ইতিহাসের প্রবল স্রোতের সামনে সেই ভালবাসা টিকে থাকতে পারেনি। সম্ভবত, সেই কারণেই দারবিশ তাঁর কবিতায় ‘রিটা’কে কেবল একজন প্রেমিকার বদলে অসম্ভব প্রেমের এক প্রতীকে বদলে দিয়েছিলেন; ভালবাসা ও সংঘাত, আকাঙ্ক্ষা ও ইতিহাস যেখানে একই সঙ্গে জীবন্ত। দারবিশ লিখেছিলেন, ‘তোমার কাছে কিছুই ছিল না যে প্রেম, আমার কাছে সেটা আমার অস্তিত্ব ছিল।’
প্রেমে পড়ার সময়, দু’জনের কেউই পরস্পরকে কোনও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেননি। একজন ছিলেন কবি, অন্যজন শিল্পী। পরে এক চিঠিতে দারবিশ লিখেছিলেন, তিনি যেন তামারের ভেতরে সেই রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করছেন। তবু, একই সঙ্গে তাঁর আশা ছিল, তাঁর পরিচিত প্রেমের মানুষটি এখনও কোথাও একটা বেঁচে আছে। ভালবাসা ও আঘাত, আকর্ষণ ও দূরত্বের এই দ্বৈত অনুভূতি তাঁদের সম্পর্ককে অসাধারণ করে তোলে।

দারবিশ ও রিটার প্রেমের আরেক বিরল দিক ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির বিনিময়। দারবিশ তামারকে হিব্রু ভাষায় প্রেমপত্র লিখতেন, যদিও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল আরবি কবিতার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে, তামার আরবি জানতেন না, তবু দারবিশের কবিতা, চিন্তা ও সংগ্রামকে বোঝার চেষ্টা করতেন। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বহু বছর পরও তামার সেই চিঠিগুলো যত্ন করে রেখেছিলেন এবং এক তথ্যচিত্রে চিঠিগুলোর কথা বলেছিলেন। রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গেলেও ব্যক্তিগত স্মৃতি মুছে যায় না। যখন কবি আবিষ্কার করলেন, তাঁর প্রেমিকা ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করেন, তিনি লিখলেন—
‘রিটা আর আমার চোখের মাঝখানে
একটি রাইফেল দাঁড়িয়ে আছে।
যে-ই রিটাকে চেনে,
সে নতজানু হয়, প্রার্থনা করে
মধুরঙা সেই চোখের দেবত্বের কাছে।
আর আমি চুম্বন করেছিলাম রিটাকে।’
দারবিশের ‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’ পরে লেবাননের প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক মার্সেল খলিফে সুরারোপ করেন। গানটি দ্রুত আরব বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা-সংগীতে পরিণত হয়।
দুজনের ঠোঁটের মাঝে থাকা চুম্বনের স্থান একসময় দখল করেছিল ‘রাইফেল’। এই রাইফেলকে আধুনিককালের সাহিত্য গবেষকরা স্রেফ একটি অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধ, রাষ্ট্র, সামরিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীক হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ যে দু’জন একসময় একে অপরের চোখে শুধু প্রেম দেখেছিলেন, সময় তাঁদের বাধ্য করেছিল পরস্পরের মুখে শত্রু রাষ্ট্রের ছায়া দেখতে। দারবিশের ‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’ পরে লেবাননের প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক মার্সেল খলিফে সুরারোপ করেন। গানটি দ্রুত আরব বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা-সংগীতে পরিণত হয়।
ফিলিস্তিনি সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সাইদ একাধিক লেখায় মাহমুদ দারবিশের কবিতাকে এমন এক সাহিত্য ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম ও জাতীয় নির্বাসনকে আলাদা করা যায় না। তাঁর মতে, দারবিশের প্রেমের কবিতাগুলিও শেষ পর্যন্ত প্যালেস্তাইনের ইতিহাস, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া স্বদেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। তাই ‘রিটা’ প্রেমিকার পাশাপাশি হয়ে ওঠেন ভালবাসা ও বিচ্ছেদের সমান্তরালে হারিয়ে যাওয়া সহাবস্থানের প্রতীক।

দুই শত্রু রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে হওয়া প্রেমের অসংখ্য কাহিনি হয়তো পৃথিবীজুড়ে রয়েছে। কিন্তু খুব কম প্রেমই সাহিত্যের ভাষা বদলে দেয়। দারবিশের ক্ষেত্রে তামার ছিলেন সেই মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত ভালবাসা থেকে ইতিহাসের রূপক হয়ে ওঠেন। আজ যখন ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন থেকে বহু দূরে বসে একজন পাঠক ‘রিটা’কে নিয়ে লেখা কবিতাগুচ্ছ পড়েন, তখন তিনি ডুবে যান যুদ্ধের চেয়ে বড় হতে চাওয়া এক ভালবাসায়।
যুদ্ধের কাছে হার মেনে মানুষের স্মৃতিতে জয়ী হতে হয়েছে দারবিশ-রিটার প্রেমের কাহিনিকে। বাস্তবের তামার বেন আমি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিক জীবনেই ফিরে গেছেন। কিন্তু, দারবিশের কবিতার ‘রিটা’ আজও জীবিত; জীবিত সেইসব পাঠকদের হৃদয়ে, যাঁরা বিশ্বাস করেন প্রেম যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হলেও, সাহিত্য তাকে মৃত্যুর গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম।
তথ্যসূত্র – মিডিয়াম, দ্য টাইমস অব ইজরায়েল
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত