(Parimal Bhattacharya Review)
‘মানচিত্রে তাম্রলিপ্ত আবছা হয়ে মিলিয়ে যাবার সময় থেকেই সাতগাঁ বন্দরের উত্থান। পর্তুগিজ বৈদ্য টম পিরিসের লেখায় তার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। পিরিসের সমসাময়িক বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের মনসামঙ্গল কাব্যেও রয়েছে সাতগাঁর সুসজ্জিত বাড়িঘর আর ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত মন্দিররাজির বর্ণনা। কনৌজের রাজপুত্রদের এই দোয়াবে বেঁধে নিয়েছিল যে মলয় সমীর, তারই টানে একদিন ত্রিকোণ লাটিন পাল তুলে ভেসে এল আরব বণিকদের জোড়া মাস্তুলের ঢাওগুলো। গ্রীষ্মের শুরু থেকে বর্ষা ঋতুর অবসান পর্যন্ত দক্ষিণ দিক থেকে বয় এই মৌসুমী হাওয়া।
সাতগাঁর তাঁতিরা এই হাওয়া গরান কাঠের তাঁতে বেঁধে নিয়ে বুনে তুলত শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক ধরনের বস্ত্র, যা আরবরা নিয়ে যেত সুদূর পশ্চিমে। ওরা এর নাম দিয়েছিল বফত হাওয়া, কেউ বলত মসলিন। চীনের রাজপ্রাসাদ থেকে রোমের হারেম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই মহার্ঘ বস্ত্রের কদর। ফিনফিনে মসলিনে স্বেদসিঞ্চিত অঙ্গ ঢেকে বাদামী ত্বকের ক্রীতদাসীরা জ্যোৎস্নালোকিত বাগানে দুলে দুলে শ্রান্ত সম্রাটদের হিমেল জঘনে অগ্নিসংযোগ ঘটাত।’
আরও পড়ুন: বকেয়া মেটাতে গিয়ে জন্ম নিল কালজয়ী উপন্যাস
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা যতবার পড়া যায়, ততবার এই অংশে আটকে যেতে হবে। সাতগাঁর এই অংশেই পরিমল ভট্টাচার্য বুনে তুলেছেন এক আশ্চর্য ফিকশন এবং নন-ফিকশনের মেলবন্ধন। গড়ে তুলেছেন স্মৃতির প্রত্নসন্ধান। পরিমল ভট্টাচার্য মানেই স্মৃতিমেদুরতা। পরিমল ভট্টাচার্য মানেই গহিন স্মৃতির অরণ্যে একফালি রোদ, ফিনকি দিয়ে ওঠা সুখ।
পরিমল ভট্টাচার্য প্রথম থেকেই নিজের শিকড়ের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন। খুঁড়তে চেয়েছেন অজানা ইতিহাস। যে মানুষটা সমরেশ বসুকে অনুসরণ করতে করতে একদিন নৈহাটির রাস্তায় জাস্ট ফেড আউট হয়ে গিয়েছিলেন, সেই মানুষটা যে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা সেটা বলার প্রয়োজন রাখে না। শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালবাসেন, ভালবাসেন স্মৃতি, প্রেম, ইতিহাসকে তেপান্তরে মিশিয়ে দিতে। উপন্যাসের প্রথাগত ছন্দ ভাঙেন। ইতিহাস, সংলাপ মিশিয়ে ধরতে চান আঞ্চলিক প্রত্নসন্ধানকে।

‘হুগলির তীরবর্তী সুউচ্চ থামে-ঘেরা বিশাল ইমারতির সামনে প্রাচীন শিরীষ গাছের ছায়া। এককালে ফিরিঙ্গি বণিকদের ক্লাব ও সরাইখানা, বর্তমানে ভূমিরাজস্ব দপ্তরের অফিস। সুউচ্চ ছাদের ঘরগুলোর উঁচু করা পুরোনো ধুলোপড়া কাগজ ও ফাইলের ফাঁকে ফোকরে কেরানির দল। দিনভর মানুষের আনাগোনা চলে। সিঁড়ির আশেপাশে বাগানে গাছের ছায়ায় দেখা যায় দেহাতি আধাশহুরে মানুষ, অপেক্ষমান, তাদের চোখেমুখে যতটা উৎকণ্ঠা ঠিক ততটাই নির্লিপ্ত দালাল ও দলিল-লেখকদের মুখে। যত্রতত্র করিডোরে থামের গায়ে, সিঁড়ির নিচে, বাগানে গাছের ছায়ায় মাদুর জলচৌকি টুল টেবিল পেতে বসেছে তারা। সর্বক্ষণ ব্যস্ততার আবহ, মৌচাকের মতো সমবেত কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন। সেই সজীব প্রফুল্লতার অন্তরালে স্পন্দমান জমি ও স্থাবর সম্পত্তিকেন্দ্রিক কত যে করুণ জটিল তমসাময় কাহিনি, মি’লেডি।’
বারবার পড়লে বেরিয়ে আসবে ওঁর শব্দচয়ন এবং ভাষার জাদু। মনে হবে আগে ছবি এঁকেছেন, তার পরে লিখেছেন। আমাদের ছোটবেলায় শেখানো হত শব্দের প্রয়োগ নিয়ে। সেই প্রয়োগের রসায়নকে পাল্টে দিয়েছেন পরিমল ভট্টাচার্য। ব্যক্তিগত পরিসরে বলে থাকেন, ‘পড়তে হবে। অনেক পড়তে হবে। যা লেখা পাওয়া যাবে পড়ে ফেলতে হবে। যত পড়া যাবে, তত শব্দ নিয়ে খেলা যাবে।’
পরিমল ভট্টাচার্য নিজের জীবনের ছবিগুলোকে কথায় তুলে ধরেছেন। ছক ভেঙেছেন চেনা গদ্যের। ইতিহাস এনেছেন। পেরেকে পুঁতে দিয়েছেন আলতো রোদের আদর।
পরিমল ভট্টাচার্য যেভাবে দার্জিলিংকে চিনিয়েছেন, আর কেউ পারবে কি সেইভাবে শৈলচূড়ার বর্ণনা দিতে? সিঙ্গালিলার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখা আর দার্জিলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অনুভূতি কি এক?
দার্জিলিং বইটিতে উনি লিখেছেন, জীবনটা সব জায়গায় এক। শুধু তফাৎ আমরা সেই জীবনটাকে কীভাবে দেখছি। দেখার দৃষ্টি। যে দৃষ্টি দিয়ে এতকাল বাঙালির প্রিয় শৈলরানিকে দেখেছে, উনি সেই দৃষ্টি পাল্টে দিয়েছেন। দার্জিলিং-এর প্রতিটি অধ্যায়ে খুঁড়ে গিয়েছেন নিজের স্মৃতিকে। নিজের চাকরি জীবনের ক্লান্তিকে। তিনি বইয়ের এক জায়গায় বলেছেন, ‘শৈলরানি তুমি কার? – আমি পাহাড়ে আবাসিক স্কুলে পড়তে আসা বালকের এক বুক মনখারাপ।’

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরে এমন কেউ কোনও পর্যটন কেন্দ্রকে নিয়ে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতার সৃষ্টি করেছেন বলে জানা নেই। পেম্বার ছাতার মতো একটি অধ্যায় যুক্ত করেছেন ‘দার্জিলিং, স্মৃতি সমাজ ইতিহাস’ বইটিতে। কী আছে সেই অধ্যায়ে? মনখারাপের ওষুধ আছে। জুলিয়া গ্রিফিথের মতো করে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভালবাসা আছে। যার সঙ্গে অনায়াসে জুড়ে ফেলা যায় নিজেকে।
পরিমল ভট্টাচার্য নিজের জীবনের ছবিগুলোকে কথায় তুলে ধরেছেন। ছক ভেঙেছেন চেনা গদ্যের। ইতিহাস এনেছেন। পেরেকে পুঁতে দিয়েছেন আলতো রোদের আদর।
চেনা শব্দকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। প্রতিটা বাঁকেবাঁকে এঁকে দিয়েছেন গভীর শূন্যতা। অদ্ভুতভাবে সাধু এবং চলিত ভাষার মেলবন্ধন করেছেন এই গ্রন্থে। অথচ লেখা স্বকীয়তা হারায়নি।
তাঁর ‘ড্যাঞ্চিনামা’ একটি স্মৃতির প্রত্নসন্ধান নাকি আত্মজীবনী, তা নিয়ে চিরকাল দ্বন্দ্ব থাকবে। কিন্তু তাঁর ভাষা এবং শব্দের ব্যবহার আগামী প্রজন্মকে গদ্যের প্রতি আকৃষ্ট করবে। ‘সেই কত বছর আগে লাল ব্যথিত বটফল খেয়েছিল এক শাখিল, উড়ে এসে বসেছিল সুতানটির গঙ্গার ধারে একটি খেজুর গাছে। বিনির্গত বটের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে খেজুর গাছটিকে জড়িয়ে বেড়ে উঠল। একদিন সেই বটের ছায়ায় আপিস খুলল ভিনদেশি বণিক। কালে কালে গড়ে উঠল মৃত শালিখের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো মহানগর।’
এই অংশের প্রথম এবং শেষ লাইনে শব্দের প্রয়োগ নিয়ে কী মারাত্মক ছক ভেঙেছেন। চেনা শব্দকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। প্রতিটা বাঁকেবাঁকে এঁকে দিয়েছেন গভীর শূন্যতা। অদ্ভুতভাবে সাধু এবং চলিত ভাষার মেলবন্ধন করেছেন এই গ্রন্থে। অথচ লেখা স্বকীয়তা হারায়নি।

‘এক অর্থে আমাদের এই বইটিও নানান গাছের অরণ্য। এখানে বিভিন্ন অংশ পাতার মতো একে অপরের সঙ্গে ফিসফাস করে কথা বলে সাংকেতিক ভাষায়। ডোডো পাখিদের গানে মুখরিত এই অরণ্যে, বিছানো জালের মতো আলোছায়াময় পথ। আমরা যে যার নিজের মতো পথ নিয়ে চলতে পারি।’
‘ডোডো পাখিদের গান’ বইটির এই অংশে বারবার মুখরিত হয়েছে এক সবীজ পথ চলার গল্প। পরিমল বাবু তাঁর প্রতিটি লেখায় তুলে ধরেছেন সমসাময়িক পরিবেশের কথা। টেনে নিয়েছেন টুকরো ইতিহাস। আঞ্চলিক স্থবিরতাকে প্রাণ দিয়েছেন। বারবার বলেছেন, ‘আমাকে জানতে হলে সাক্ষাৎকার করে নয়, উপরন্তু আমার বই পড়ে আমাকে জানতে চেষ্টা করা শ্রেয়।’
ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। তাঁর লেখা যত পড়া যাবে, তত নিজের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া যাবে। নিজের স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া যাবে।
পরিমল ভট্টাচার্যের কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শাংগ্রিলার খোঁজে’। শরৎ দাশের ইতিহাস উনি সহজভাবে তুলে ধরেছেন এই বইতে, মিশিয়েছেন নিজের দার্জিলিংয়ে থাকা সময়ের কথা। পাঠকদের টেনে নিয়ে গিয়েছেন হিমালয়ের পাদদেশে। অলীক কল্পনা আর রূঢ় বাস্তবকে সহবাসে পাঠিয়েছেন। অনেক পাঠকরা দাবি করেছেন, ‘অপুর দেশে’ পরিমল ভট্টাচার্যের এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ কাজ। তাহলে যে উনি সাতগাঁয়ের জন্য আনন্দ পুরস্কার পেলেন, সেটা সেরা কাজ নয়? এইসব নিয়ে ভাবেন না পরিমল। তাঁর প্রিয় কালো জামা গায়ে চাপিয়ে খুঁজতে বেরোন স্মৃতিকে। গদ্যের নতুন ভাষার জন্ম দেন। বারবার প্রথা ভাঙেন। তিনি বলে থাকেন, ‘লেখায় কোন লাইনের প্রয়োজনীয়তা আছে আর কোনটা নেই, সেটা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে খুব প্রিয় লাইন বাদ দিতে হবে।’

এক যুগের বেশি সময় ধরে লিখছেন পরিমল। তাঁর লেখার একটা ধারা আছে। তিনি কোনও কিছুই কোনও বিশেষ খোপে ফেলতে চান না। ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। তাঁর লেখা যত পড়া যাবে, তত নিজের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া যাবে। নিজের স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া যাবে।
জুলিয়া গ্রিফিথ কি ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ পড়েছে? সে কি জানে আপনি আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন? কী জানি, হয়তো সে কোনওদিনই জানবে না আপনার এই পাহাড় জয়ের কথা। দেবাঞ্জলিও জানবে না আপনি একদিন নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় ফেড আউট হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ দুজনেই আপনার সঙ্গে একটা পথ পেরিয়েছে। একজন দার্জিলিংয়ের, অন্যজন নৈহাটির। একজন ফিকশনে, অন্যজন নন-ফিকশনে। একবার কেউ একজন আপনাকে বলেছিল, ‘একটা প্রেমের স্মৃতিকথা লিখুন!’ শুনে আপনি হেসেছিলেন। ইতিহাস আর প্রেমের মেলবন্ধনের দূরত্ব কি আট কিলোমিটার? উত্তরের আশায় আছে অগণিত পাঠক।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত