(Summer Storm)
চলমান একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে বাংলা যে দু’টি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হয়, তার সময়কাল বিবেচনা করে মনে হতেই পারে জ্যৈষ্ঠের পরিচয় যেন তার ঝড়ে। ২০০৯ সালের ২৫ মে মূলত পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে ঘণ্টায় ১১০-১২০ কিমির বেশি গতিবেগে আছড়ে পড়ে প্রবল বিধ্বংসী ঝড় আয়লা, যার প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে এবং প্রচুর মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।
১১ বছর পর সেই জ্যৈষ্ঠ মাসেই আবার আছড়ে পড়ে আর এক ঘূর্ণিঝড়। অত্যন্ত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আমফান ২০২০ সালের ২০ মে দক্ষিণবঙ্গে আঘাত হানে। ঘণ্টায় ১৬০-১৮৫ কিমি গতির এই সুপার সাইক্লোনের অভিঘাতে সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলসহ দক্ষিণবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসলীলার সম্মুখীন হয়। প্রাণহানি থেকে আরম্ভ করে বাসগৃহের ধূলিসাৎ হওয়া এবং ছোট-বড় গাছের ভূমিসাৎ হওয়াকে কেন্দ্র করে এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় জনজীবনে এক দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের প্রহর নামিয়ে আনে।
অবশ্য শুধু সাম্প্রতিক সময়ে নয়। জ্যৈষ্ঠে ঝড়ের আশঙ্কা পূর্বেও ছিল। তারই চিত্ররূপ বিধৃত হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের প্রারম্ভে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর এই চতুর্থ উপন্যাসে সাহিত্যসম্রাট লিখছেন— ‘নগেন্দ্র দত্ত নৌকারোহণে যাইতেছিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাস, তুফানের সময়; ভার্য্যা সূর্যমুখী মাথার দিব্য দিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন, দেখিও নৌকা সাবধানে লইয়া যাইও, তুফান দেখিলে লাগাইও। ঝড়ের সময় কখন নৌকায় থাকিও না।’
কিছু পরে উপন্যাসের পাতায় আবার উঠে এসেছে— পরে এক দিন আকাশে মেঘ উঠিল, মেঘ আকাশ ঢাকিল, নদীর জল কালো হইল, গাছের মাথা কটা হইল, মেঘের কোলে বক উড়িল, নদী নিস্পন্দ হইল।…

…ঝড় কিছু গুরুতর বেগে আসিল। ঝড় আগে আসিল। ঝড় ক্ষণেক কাল গাছপালার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করিয়া সহোদর বৃষ্টিকে ডাকিয়া আনিল। তখন দুই ভাই বড় মাতামাতি আরম্ভ করিল। ভাই বৃষ্টি, ভাই ঝড়ের কাঁধে চড়িয়া উড়িতে লাগিল। দুই ভাই গাছের মাথা ধরিয়া নোয়ায়, ডাল ভাঙ্গে, লতা ছেঁড়ে, ফুল লোপে, নদীর জল উড়ায়, নানা উৎপাত করে। এক ভাই রহমত মোল্লার টুপি উড়াইয়া লইয়া গেল, আর এক ভাই তার দাড়িতে প্রস্রবণের সৃজন করিল।…
…বিশেষ সন্ধ্যা হইল, ঝড় থামিল না,…। বৃষ্টি থামিল, ঝড়ও অল্পমাত্র রহিল, কিন্তু আকাশ মেঘপরিপূর্ণ; সুতরাং রাত্রে আবার ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও ব্যক্ত হয়েছে জ্যৈষ্ঠকালীন ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস— ‘এমনি করে কালো কাজল মেঘ/ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।’
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৮৯২ তারিখে বোলপুরে লিখিত ‘ছিন্নপত্র’-এর ৪৭ সংখ্যক পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন— ‘কাল যে ঝড় সে আর কী বলব! আমার ‘সাধনা’র নিত্যনৈমিত্তিক লেখা সেরে চা খাবার জন্যে উপরে যাচ্ছি, এমন সময়ে প্রচণ্ড ঝড় এসে উপস্থিত। ধুলোয় আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেল এবং বাগানের যত শুকনো পাতা একত্র হয়ে লাটিমের মতো বাগানময় ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল; যেন অরণ্যের যত প্রেতাত্মাগুলো হঠাৎ জেগে উঠে ভূতুড়ে নাচন নাচতে আরম্ভ করে দিলে। বাগানের সমস্ত গাছপালা পায়ে-শিকলি-বাঁধা প্রকাণ্ড জটায়ুপাখির মতো ডানা আছড়ে ঝটপট ঝটপট করতে লাগল! সে কী গর্জন, কী মাতামাতি, কী একটা লুটোপুটি ব্যাপার!’
রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও ব্যক্ত হয়েছে জ্যৈষ্ঠকালীন ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস— ‘এমনি করে কালো কাজল মেঘ/ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।’ সুনির্মল বসুর কবিতায় অবশ্য ঝড়ের আগমনের সঙ্গে মিশে রয়েছে শৈশবের অমলিন স্মৃতিকাতরতা— ‘মনে কি নাই, আমবাগানে জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝড়ে/ আম কুড়োবার ধুম লাগাতাম সারা সকাল ধরে।’

কিন্তু জ্যৈষ্ঠ মানে তো শুধু ঝড়বৃষ্টি নয়, জ্যৈষ্ঠ যে আসলে গ্রীষ্মকালীন সময়কাল। কবিকঙ্কণের ফুল্লরা তার ‘বারমাস্যা’য় জানিয়েছে— ‘পাপিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচণ্ড তপন।/ রবিকর করে সর্বশরীর দহন।।’ এতটুকু ভুল বলেনি ‘অভয়ামঙ্গল’-এর ফুল্লরা। জ্যৈষ্ঠে কাঠফাটা রোদে জলশূন্য খাল-বিল-পুষ্করিণীর পাঁক পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। শুধু জলাশয়ের মাটি নয়, মাঠও অত্যধিক রোদের তাপে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। রোদ লেগে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, গা-হাত-পা আগুনে রোদে পুড়ে যেতে থাকে। পিপাসায় ফেটে যেতে থাকে বুক। নিদাঘদগ্ধ মানুষ গাছের ছায়ার শীতল আশ্রয় খুঁজতে থাকে।
জ্যৈষ্ঠের এই রুদ্ররূপের চিত্র বাংলা সাহিত্যে দুষ্প্রাপ্য নয়। ‘জলসত্র’ গল্পে বৃদ্ধ মাধব শিরোমণিমশায়ের শিষ্যবাড়ি যাওয়ার বর্ণনায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন— ‘বেলা তখন একটার কম নয়। সূর্য মাথার উপর থেকে একটু হেলে গিয়েছে। জ্যৈষ্ঠমাসের খররৌদ্রে বালি গরম, বাতাস একেবারে আগুন, মাঠের চারিধারে কোনওদিকে কোনও সবুজ গাছপালার চিহ্ন চোখে পড়ে না। এক-আধটা বাবলা গাছ যা আছে তাও পত্রহীন। মাঠের ঘাস রোদপড়া— কটা। ব্রাহ্মণের কাপড়চোপড় গরম হাওয়ায় আগুন হয়ে উঠল, আর গায়ে রাখা যায় না। এক একটা আগুনের ঝলকের মতো দমকা হাওয়ায় গরম বালি উড়ে এসে তাঁর চোখে মুখে তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধছিল।…
পশ্চিম দিকে অনেক দূরে একটা উলুখড়ের খেত গরম বাতাসে মাথা দোলাচ্ছিল। যে-দিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল চকচকে খরবালির সমুদ্র। ব্রাহ্মণের ভয়ানক তৃষ্ণা পেল, গরম বাতাসে শরীরের সব জল যেন শুকিয়ে গেল, জিব জড়িয়ে আসতে লাগল।’
পশ্চিম দিকে অনেক দূরে একটা উলুখড়ের খেত গরম বাতাসে মাথা দোলাচ্ছিল। যে-দিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল চকচকে খরবালির সমুদ্র। ব্রাহ্মণের ভয়ানক তৃষ্ণা পেল, গরম বাতাসে শরীরের সব জল যেন শুকিয়ে গেল, জিব জড়িয়ে আসতে লাগল।’
এমন ক্লেশকর হলেও জ্যৈষ্ঠের পরিচয় কিন্তু শুধু এখানেই শেষ হয়ে যায় না। বহিরঙ্গে যতই নীরস হোক না কেন, অন্তরঙ্গে জ্যৈষ্ঠের মতো এমন সরস মাস আর নেই। রবীন্দ্রনাথ ‘আষাঢ়’ প্রবন্ধে লিখেছেন— ‘গ্রীষ্মকে ব্রাহ্মণ বলা যাইতে পারে। সমস্ত রসবাহুল্য দমন করিয়া, জঞ্জাল মারিয়া তপস্যার আগুন জ্বালিয়া সে নিবৃত্তিমার্গের মন্ত্রসাধন করে। সাবিত্রী-মন্ত্র জপ করিতে করিতে কখনও বা সে নিশ্বাস ধারণ করিয়া রাখে, তখন গুমোটে গাছের পাতা নড়ে না; আবার যখন সে নিশ্বাস ছাড়িয়া দেয় তখন পৃথিবী কাঁপিয়া উঠে। ইহার আহারের আয়োজনটা প্রধানত ফলাহার।’

জ্যৈষ্ঠ আসলে ফলের মধুমাস। সুকুমার রায়ের ‘পাকাপাকি’ কবিতায় লিখিত ‘আম পাকে বৈশাখে’ শিরোধার্য করেও স্বীকার করতে হবে হিমসাগর-ল্যাংড়ার মধুরসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এসে যায় জ্যৈষ্ঠ। শুধু আম কেন, লিচু-কাঁঠাল-জাম-জামরুল-ফলসা প্রভৃতি প্রায় সমস্ত গ্রীষ্মকালীন ফল জ্যৈষ্ঠকে করে তোলে সরস মধুময়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের ‘উৎসর্গ’ কবিতায় সে-কথাই লিখেছেন— ‘জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে/ আমের শাখায় আঁখি ধেয়ে যায় সোনার রসের আশে।/ লিচু ভরে যায় ফলে,/ বাদুড়ের সাথে দিন আর রাতে অতিথির ভাগ চলে।’
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামানুসারে জ্যৈষ্ঠ মাসের নামকরণ করা হয়েছে। এই মাসে সূর্যের জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থানের কারণেই এরূপ নামকরণ। এই মাসেরই শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় বাঙালির এক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক লৌকিক আচার জামাইষষ্ঠী।
‘শাশুড়ী বলেন ওগো জামাই হে দয়ার নিধি,/ তুমি ঘরে এলে আজি, লভিব কি পরমনিধি।’ তাই বুঝি জামাই বাবাজীবনের আপ্যায়নের নিমিত্তে চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় সংগ্রহে শ্বশুর-শাশুড়ি কল্পনাতীতভাবে অকৃপণ হয়ে ওঠেন।
প্রাচীনকালে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ নামে পরিচিত ব্রতই কালক্রমে জামাইষষ্ঠী হয়ে উঠেছে। এই দিন কন্যা ও জামাতাদের সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি প্রার্থনায় শ্বশ্রূমাতারা দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা করেন ও তাঁর আশীর্বাদ চান। জামাইয়ের কল্যাণের জন্য শাশুড়ির এই ষষ্ঠীদেবীর আরাধনা অবশ্য যত না ঠাকুরপুজো, তার থেকে বেশি পেটপুজো হিসেবে বাঙালিজীবনে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

‘শাশুড়ী বলেন ওগো জামাই হে দয়ার নিধি,/ তুমি ঘরে এলে আজি, লভিব কি পরমনিধি।’ তাই বুঝি জামাই বাবাজীবনের আপ্যায়নের নিমিত্তে চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় সংগ্রহে শ্বশুর-শাশুড়ি কল্পনাতীতভাবে অকৃপণ হয়ে ওঠেন। দামি ইলিশ-গলদা চিংড়ি-কচি পাঁঠার মাংস-আম-লিচু-দই-সন্দেশের অফুরান স্রোতে ভেসে যেতে থাকে জামাইয়ের পাত। শুধু একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য এমন বিশাল ভূরিভোজের আয়োজন ভূ-ভারতে আর দ্বিতীয় আছে বলে মনে হয় না।
রসনাতৃপ্তির অবকাশে ভরা জ্যৈষ্ঠ অবশ্য রুদ্রের বাণী শোনাতে কখনও পিছপা হয়নি। নজরুলের ‘ধূমকেতু’র মতো বারে বারে ঘটেছে তার আগমন। আর বাংলা কাব্যসাহিত্যে ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’ কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই তো আক্ষরিক অর্থে জ্যৈষ্ঠ-জাতক। ১১ জ্যৈষ্ঠ তাঁর জন্মদিন। তাই বুঝিবা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সত্তা তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নেয়— ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস;’ শুধু তা-ই নয়— ‘আমি ধূর্জটী, আনি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর।’ আর তাঁর এই উচ্চারণের মধ্য দিয়েই তিনি যেন জ্যৈষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করেন— ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা।’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত