(Aranyer Din Ratri)
ভর সন্ধে। সবেমাত্র কৃত্তিবাসের দফতরে এসেছেন সুনীল। বসে গিয়েছেন লেখা সম্পাদনার কাজে। হঠাৎ দরজায় টোকা। দরজা খুলতেই দাঁড়িয়ে প্রেসের মালিক। গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলন, ‘টাকাটা কবে পাব?’ নবীন লেখকের মুখ কাঁচুমাচু। আশ্বাস দিলেন— ক’দিন পরেই। আসলে কৃত্তিবাস পত্রিকার দু’টি সংখ্যার টাকা বাকি ছিল প্রেসের কাছে। সেই টাকা নিতেই প্রেস মালিকের তাগাদা। ক’দিন পরে ফের দরজায় আঘাত। দরজা খুলতেই একই প্রশ্ন, একই উত্তর। সুনীল লজ্জিত হয়ে আরও একটু সময় চাইলেন।
সেই সময় কৃত্তিবাস ‘জলসা’ নামে একটি সিনে পত্রিকার প্রেস থেকে ছাপা হত। সুনীলও নামজাদা কিছু পত্রিকায় চুটিয়ে লিখছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে চাকরিও করেন। তাই প্রেস মালিক এবারের আশ্বাসবাণীতেও ভরসা করলেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও সেই ধারের অর্থ জোগাড় হল না। তৃতীয়বারে প্রেসের মালিক বলে গেলেন পরের সাক্ষাতে একটা দফারফা করবেন। সুনীল অনেক কষ্টে বোঝালেন, তিনি টাকা মেরে পালাবেন না। আর পালালেও এই কলকাতার জন অরণ্যে তাঁকে খুঁজে পাওয়া বেশ সহজ।
আরও পড়ুন: ভিড়ের আড়ালে যে নগ্ন নির্জনতা দিয়েছিলেন
এবার চতুর্থবারের দৃশ্য। দফতরে বসে একমনে কৃত্তিবাসের কাজ করছিলেন সুনীল। প্রেসের টাকা তখনও জোগাড় হয়নি। প্রেস মালিক আসতেই এবার রীতিমতো লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলেন। অবশেষে প্রেস মালিকই একটি উপায় বাতলালেন। জলসা পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একটি উপন্যাস লেখার প্রস্তাব দিলেন তিনি। উপন্যাস লিখে দিলে, আর দু’টি সংখ্যার বকেয়া টাকা দিতে হবে না। সুনীলও উপন্যাসের পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু নেবেন না।

এই শর্তে রাজি হলেন সুনীল। হাসি ফুটল নীললোহিতের মুখে। কারণ তাঁর মাথার মধ্যে একটি উপন্যাসের প্লট ইতিমধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। তিনি ভাবলেন সেই উপন্যাস লিখেই এ যাত্রায় ধারের টাকা মেটাবেন। তাঁর ভাষায়, ‘কারও কাছে ধার থাকলে সর্বক্ষণ গায়ের জামাটা ঘামে ভেজা মনে হয়। ঋণমুক্ত হওয়া মানে সাঁতার কেটে স্নানের মতন অনুভব।’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে বিষয়টা বেশ সহজ মনে হয়েছিল, কারণ কিছুদিন আগেই তাঁরা চার বন্ধু মিলে ঘুরতে গিয়েছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, ভাস্কর দত্ত ও সুনীল বেরিয়ে পড়েছিলেন এক অনির্দিষ্ট অভিযানে। টিকিট না কেটে উঠেছিলেন ট্রেনে। চেকারকে দিয়ে শুধু একটা রশিদ করিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কেউ অভিযোগ না করতে পারে তাঁরা বিনা টিকিটের যাত্রী। এক সহযাত্রীর পরামর্শে নেমেছিলেন ধলভূমগড়ে। যেখানে সভ্য কেউ ছুটি কাটাতে যায় না। সেখানে নেই বিশেষ আমোদ, আহ্লাদ। তবুও এই অভিযানের রোমাঞ্চকতা তাঁদের পাগল করে দিয়েছিল। তাঁরা চেয়েছিলেন কিছুদিন স্রেফ এই সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নগ্ন নির্জনতা উপভোগ করতে।

সেই সময় ধলভূমগড় ছিল খুবই নিরিবিলি জায়গা, কাছেই ছিল জঙ্গল। মধ্যে মধ্যে আদিবাসীদের গ্রাম। চার বন্ধু ঠিক করেছিলেন আপাতত কিছুদিন নগরজীবন থেকে ছুটি নেবেন। তাই ধলভূমগড়ে স্টেশনের ওভারব্রিজ পার হতেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন খবরের কাগজ। তাঁরা ঠিক করেছিলেন কিছুদিন দাড়ি কামাবেন না। শুধু তাই নয়, তাঁদের ইচ্ছে হয়েছিল ধলভূমগড়ের মায়াবী সন্ধেবেলায় পোশাক পরার কী দরকার? তবে স্টেশন থেকে নেমেই তাঁদের প্রথম কাজ ছিল থাকার বন্দোবস্ত করা। স্টেশন থেকে নেমে, একটু হেঁটেই পেয়েছিলেন একটি বনবাংলো। ভুয়ো পরিচয়ে সেই বনবাংলো দখলও করে নেন চার বন্ধু। বনবাংলোর কাছেই ছিল একটি আইনসম্মত পানশালা, যেখানে শুধু মহুয়ার মদ পাওয়া যেত। চার বন্ধু অনায়াসে শুষে নিয়েছিলেন জীবনদের সেরা রসদটুকু।
এইভাবেই শুরু হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস। চার বন্ধুর নাম দিয়েছিলেন অসীম, হরি, সঞ্জয় এবং শেখর। বনবাংলোর একজন দারোয়ান ছিল, সুনীল তার চরিত্রের নাম দিয়েছিলেন রতিলাল। এছাড়াও আরও কিছু চরিত্রের আনাগোনা ছিল সেই উপন্যাসে। কিন্তু তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অপর্ণা এবং জয়া।

সুনীল একটা উপন্যাস লিখলেন শুধুমাত্র ধারের টাকা শোধ করতে। কিন্তু সেই উপন্যাস কখন যে বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ হয়ে যাবে, তা তিনি টের পাননি। না পাওয়ারই কথা। ভবিষ্যতে বিশ্বাসী ছিলেন না সুনীল। বলতেন, হাতের তালুতে আঁকা রেখা কোনওদিনই ভবিষ্যৎ বলতে পারে না। হয়তো ঠিকই বলতেন, আর বলতেন বলেই শুধুমাত্র ধার শোধ করতে একটি উপন্যাস লিখলেন, এবং অনেক ভেবেচিন্তে নাম রাখলেন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। কে জানত আর কিছু বছর পর সেই উপন্যাসের অবলম্বনে সিনেমা বানাবেন সত্যজিৎ রায়। যে সিনেমা সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে হু হু করে।
সত্যজিৎ রায় তখন তাঁর খ্যাতির মধ্যগগনে, বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক রচনা-নির্ভর তাঁর চলচ্চিত্রগুলি। আধুনিকদের মধ্যে তিনি শুধু নরেন্দ্রনাথ মিত্রের একটি কাহিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেই তুলনায় সুনীল তো প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল। এই ঘটনা চাউড় হতেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়। সমস্ত পত্রিকায় এই প্রশ্নই ধ্বনিত হয়েছিল যে, সত্যজিৎ রায় এইরকম একজন নবীন লেখকের কাহিনি নির্বাচন করলেন কেন?

সেই উত্তর হয়তো এখন পাওয়া যায়, যখন ছবিটি কান ফিল্ম ফেস্টিভালেও দেখানো হয়। আজও দর্শকরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই অরণ্যের দিকে। বিভোর হয়ে পড়ে সম্পর্কের রসায়নে। বারবার নতুন লাগে অরণ্যের দিন, অরণ্যের রাত্রি। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা। সুনীল পরে জেনেছিলেন যে ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসটি পড়েও সত্যজিৎ রায় সেটি নিয়ে সিনেমা করার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু, কিছু বাস্তব অসুবিধার জন্য সে প্রকল্পটি মুলতুবি হয়ে যায়।
‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ অবলম্বনে সিনেমা করার প্রস্তাব জানিয়ে সত্যজিৎ রায় যে দিন সন্ধেবেলা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন, সে রাতে একলহমার জন্যও ঘুমোতে পারেননি লেখক। এরকম একেবারে নিদ্রাহীন রাত কাটাবার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে খুব একটা ঘটেনি। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘এটা যে ঠিক আনন্দের অস্থিরতা, তাও নয়, খ্যাতি কিংবা অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনার উত্তেজনাও নয়, বারবার শুধু মনে হচ্ছিল, আমার জীবনে নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, আমি যেন একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে, কিন্তু অন্য দিকটা দেখতে পাচ্ছি না।’

যে বাঁকের মুখে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার বিপরীত প্রান্তে ছিল আলোর হাতছানি। যে আলোয় ভেসে গিয়েছিল নীললোহিত। ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্যসম্ভার পাখা মেলতে শুরু করে। সিনেমার স্বার্থে মূল গল্পে অনেক কিছুই বদলে যায়। সত্যজিৎ রায় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র আখ্যানের ভূগোল বদলে দিয়েছিলেন। ধলভূমগড় থেকে সরিয়ে চরিত্রদের নিয়ে গিয়েছিলেন জঙ্গলমহলের আরও ভিতরে, পালামৌতে। সেখানে যাওয়ার মাধ্যম ট্রেন না রেখে ব্যক্তিগত গাড়ি দেখিয়েছিলেন।
এই বিষয়টা নিয়েই সুনীলের মূল আপত্তি ছিল। বেশ রেগেই গিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে জানিয়েছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে। কিন্তু সেই সিনেমা রিলিজ করার বহু বছর বাদে কোনও একদিন ঘনিষ্ঠ আড্ডায় তিনি এও স্বীকার করেন যে, সত্যজিৎ মূল গল্পের বিষয়বস্তু পাল্টে দিয়ে ভালই করেছিলেন। সুনীল এবং সত্যজিতের মেলবন্ধন বাংলা সাহিত্য এবং সিনেমা দুই ক্ষেত্রেই ভীষণভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, অরণ্যের দিনরাত্রি, মধ্যবিত্ত বাঙালির ভাল থাকার ঠিকানা।

সাহিত্য জীবনের শুরু থেকেই বিনয়ী ছিলেন নীললোহিত। শুধু তাই নয়, বাকিদেরও বিনয়ী হতে শিখিয়েছেন। তাঁর দরজা সকলের জন্য খোলা থাকত সবসময়। ভোরের প্রথম আলোর মতো স্নিগ্ধ ছিল তাঁর পারাপার। সেই ছোট্ট বয়সে গৃহ শিক্ষক হয়ে রোজগার শুরু। তারপরে ধীরে ধীরে পেশাগত লেখালেখি, সাংবাদিকতা। দেশ বিদেশের গণ্ডি পেরিয়েছেন বহুবার। তবু প্রতিদিন সকালে লেখার অভ্যাস ছাড়েননি। দেশকাল সীমানার গণ্ডি ভাঙতে দেখেছেন, গড়তে দেখেছেন নতুন শহর, তবুও নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি। সহজ থেকেছেন, সহজ রেখেছেন আজীবন।
তাঁর চরিত্রগুলো বারবার পাঠকদের কাঁধে হাত রেখে হেঁটে গিয়েছে। সাহিত্যের ছলে আপামর বাঙালিকে ইতিহাস, ভূগোল পড়িয়েছেন। অরণ্যের দিনরাত্রির মাদকতা দিয়েছেন। কী ভাগ্যিস, প্রেসে টাকা বাকি পড়েছিল। নয়তো কি বাঙালি অরণ্যের মাদকতা এইভাবে উপভোগ করতে পারত? ধলভূমগড় কিংবা পালামৌ, অরণ্যের আদিম নির্জনতাকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল অরণ্যের দিনরাত্রি। সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন নীললোহিত, ছিলেন বলেই অরণ্যের দিনরাত্রির গল্প আজকেও প্রাসঙ্গিক বাঙালির কাছে।
তথ্যসূত্র: অর্ধেক জীবন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
দুর্দান্ত!