(Lionel Messi)
‘আমার সবটুকু দিয়েছি, আর দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
একটা দীর্ঘশ্বাস, একটা যুগের অবসান, আর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকের ভেতর হু হু করে ওঠা এক অদ্ভুত শূন্যতা। অগস্টের শেষ দিনে যখন ৩৯ বছরের এক ক্লান্ত জাদুকর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানালেন; তখন আড্ডার টেবিলে, চায়ের কাপে বা সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে শুধুই একরাশ বিষণ্ণতা। লিওনেল মেসি নামক যে মানুষটা গত দু’দশক ধরে রবিবারের রাতগুলোকে মায়াবী করে তুলেছিলেন, তিনি এবার থামলেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
আরও পড়ুন: মান্টোর কাঁটাতারের প্রলাপ
২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে স্বপ্নের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হোক বা ’২১ ও ’২৪-এর কোপা আমেরিকা জয়— তিনি এখন আক্ষরিক অর্থেই সর্বকালের সেরা, তর্কহীনভাবে। তবে, আজ এই বিদায়বেলায় দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকালে, একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, এই অমরত্বের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বরং এই মহাকাব্যিক সাফল্যের কোনও সাক্ষীই হয়তো থাকত না, যদি না দশ বছর আগে হঠকারী এক সিদ্ধান্ত থেকে তিনি ফিরে আসতেন।
আর্জেন্টিনা এমন এক দেশ, যেখানে ফুটবল কোনও সাধারণ খেলা নয়; বরং এক ধর্ম, বেঁচে থাকার রসদ, দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস। আর্জেন্টিনার সেই ধর্মের ঈশ্বর ছিলেন দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ১৯৮৬-র বিশ্বকাপে মারাদোনা যা করেছিলেন, তা ছিল অতিমানবিক। একা হাতে একটি দেশকে বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দিয়েছিলেন। আর ঠিক সেখানেই মেসির ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য ফাঁদ।

১৩ বছর বয়সে রোজারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানো মেসিকে আর্জেন্টিনার মানুষ ঠিক আপন করে নিতে পারছিল না। তাঁর স্প্যানিশ টান, শান্ত স্বভাব, জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় নীরব থাকা— সবকিছু নিয়েই একটা সন্দেহ ছিল মানুষের মনে।
মারাদোনার মতো সেই আগ্রাসন, সেই লড়াকু মানসিকতা তাঁর ছিল না। বরং তিনি শিল্পের পূজারী, এক শান্ত, অন্তর্মুখী জাদুকর। আর তাই, বার্সেলোনার জার্সিতে আটটি লা লিগা, চারটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জেতা সত্ত্বেও, দেশের মানুষের কাছে মেসি ছিলেন একজন ‘বহিরাগত’। ২০০৮-এ অলিম্পিক সোনা ছাড়া দেশের জার্সিতে তাঁর বড় কোনও সাফল্যও ছিল না। ফলে বারবার তাঁকে শুনতে হত এক নিষ্ঠুর তুলনা— ‘মেসি কখনই দিয়েগোর সমান হতে পারবে না।’
২৯তম জন্মদিনের ঠিক পরেই সেই ব্যর্থতা তাঁকে মানসিকভাবে চুরমার করে দিয়েছিল। দেশের মানুষ, মিডিয়া তাঁকে ডাকতে শুরু করেছিল ‘পেচো ফ্রিও’ বা ‘শীতল বক্ষের মানুষ’ বলে। মানে, তাঁর ধমনীতে রক্ত নয়, বরফ বইছে! দেশের জন্য তাঁর কোনও আবেগই নেই।
ক্রমাগত এই অমানবিক চাপেরই বিস্ফোরণ ঘটে ২০১৪ থেকে ২০১৬— এই তিন বছরে। টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠা এবং হৃদয়বিদারক হার। ২০১৪-র মারাকানায় এক্সট্রা টাইমের শেষদিকে জার্মানির মারিও গোটজের সেই গোল, ২০১৫-র কোপায় চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। তারপরেই ২০১৬-র ২৬ জুন, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা শতবার্ষিকীর সেই অভিশপ্ত ফাইনাল। চিলির বিপক্ষে আবারও টাইব্রেকার— এবং পেনাল্টি মিস স্বয়ং মেসির! বলটা আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার পর জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে সেই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা আজও ফুটবলপ্রেমীদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
২৯তম জন্মদিনের ঠিক পরেই সেই ব্যর্থতা তাঁকে মানসিকভাবে চুরমার করে দিয়েছিল। দেশের মানুষ, মিডিয়া তাঁকে ডাকতে শুরু করেছিল ‘পেচো ফ্রিও’ বা ‘শীতল বক্ষের মানুষ’ বলে। মানে, তাঁর ধমনীতে রক্ত নয়, বরফ বইছে! দেশের জন্য তাঁর কোনও আবেগই নেই।

খোদ মারাদোনা মন্তব্য করে বসেন, ‘ছেলেটা ভাল, কিন্তু ওর লিডার হওয়ার কোনও যোগ্যতাই নেই।’ এই তীব্র অপমান, বারবার তীরে এসে তরী ডোবার গ্লানি, আর গোটা একটা দেশের প্রত্যাশার চাপে মেসি এতটাই ভেঙে পড়েন যে, ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে ঘোষণা করেন, ‘জাতীয় দলে আমার খেলা শেষ। আমি সবটুকু দিয়েছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না। এটাই সবার জন্য ভাল।’
কথাগুলো আছড়ে পড়ে এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতার মতো। যে মানুষগুলো খানিক আগেও তাঁকে তুলোধোনা করছিল, তারা হঠাৎ বুঝতে পারে, কী ভয়ঙ্কর ভুল করে ফেলেছে। নিজেদের সবচেয়ে দামি রত্নকে নিজেদের হাতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে! শুরু হয় এক অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ। মেসিবিরোধী ক্ষোভ নিমেষে বদলে যায় এক বুকফাটা আর্তনাদে। ‘মেসি, প্লিজ যেও না’ (#NoTeVayasMessi)— এই হ্যাশট্যাগে কেঁপে ওঠে গোটা বিশ্ব।
রূপকথার গল্প কি আর এত সহজে শেষ হয়? ফিরে আসার পরও তো কাঁটার পথ পেরোতে হয়েছে তাঁকে। ২০১৮ বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর আবারও সংশয় তৈরি হয়। অনেকেই ধরে নেন, মেসির ভাগ্যে হয়তো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই।
আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মরিসিও ম্যাক্রি থেকে বুয়েনস আইরেসের মেয়র— সবাই তাঁকে ফোন করেন, অনুরোধ করেন সিদ্ধান্ত বদলাতে। মেয়রের উদ্যোগে বুয়েনস আইরেসের পথে তাঁর একটি মূর্তিও বসে। সাধারণ মানুষ পথে নেমে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। এমনকী বর্তমান দলের অন্যতম সেনাপতি এনজো ফার্নান্দেজ, যিনি তখন নেহাতই এক কিশোর, একটা খোলা চিঠি লেখেন মেসিকে, যা আজও ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ঘুরপাক খায়। গোটা দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা আর আকুতি ছুঁয়ে যায় মেসিকে। নতুন কোচ এদগার্দো বাউজা দায়িত্ব গ্রহণ করেই সোজা উড়ে যান বার্সেলোনায় মেসির মান ভাঙাতে। মাত্র ছ’সপ্তাহের ব্যবধানে অভিমানী ছেলেটা বোঝে— দেশ তাকে কতটা ভালবাসে।
শেষমেশ তিনি ফিরে আসেন এবং বলেন, ‘আমি এই দেশটাকে, এই জার্সিটাকে বড্ড ভালবাসি।’

রূপকথার গল্প কি আর এত সহজে শেষ হয়? ফিরে আসার পরও তো কাঁটার পথ পেরোতে হয়েছে তাঁকে। ২০১৮ বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর আবারও সংশয় তৈরি হয়। অনেকেই ধরে নেন, মেসির ভাগ্যে হয়তো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই।
কিন্তু এরপরই দৃশ্যপটে এলেন লিওনেল স্কালোনি। স্কালোনি এসেই এক যুগান্তকারী কাজ করলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মেসিকে মারাদোনা বানানোর চেষ্টাটাই আসলে বোকামি। তাই এমন একটা দল বানালেন, যারা মেসির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং যারা মেসির জন্য মাঠে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। ডি পল, পারাদেস, এমিলিয়ানো মার্টিনেজদের মতো একদল যোদ্ধা তৈরি হল, যাঁরা তাঁদের প্রিয় ‘লিও’র জন্য সবকিছু করতে পারে। আর ঠিক সেই স্ট্র্যাটেজিতেই হল শাপমোচন। ২০২১-এর কোপা আমেরিকায়, চিরশত্রু ব্রাজিলের মাটিতে, মারাকানা স্টেডিয়ামে ঘুচল ২৮ বছরের ট্রফি-খরা। ম্যাচ শেষে মেসির সেই হাঁটু গেড়ে বসে হাউহাউ করে কাঁদার দৃশ্য স্রেফ ম্যাচ জয়ের উদযাপন ছিল না; ছিল দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখা যন্ত্রণার থেকে মুক্তি।
ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। যে মাঠে দশ বছর আগে তিনি চোখের জলে বিদায় নিয়েছিলেন, এক দশক পর সেই মাঠেই খেললেন তাঁর জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।
তারপরের কাহিনি তো ইতিহাস। ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে আমরা দেখলাম এক নতুন মেসিকে। শান্ত, অন্তর্মুখী ছেলেটা যেন এক আগ্রাসী নেতা। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে সেই বিখ্যাত ‘ক্যে মিরাস বোবো’ (কী দেখছিস বোকা) বলা যেন প্রমাণ করে দিল, মেসি এবার আর পিছু হটবেন না। ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ এবং ’২৪-এর কোপা আমেরিকা— ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত যাঁর ভাঁড়ার ছিল শূন্য, পরের তিন বছরে সেই তিনি চার-চারটে মেগা শিরোপা জিতলেন। নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যেখানে মারাদোনা বা পেলের সঙ্গে তাঁর তুলনাও আজ অবান্তর মনে হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, মেসি এখন এই বিতর্কের বহু ঊর্ধ্বে।
অবশেষে এল ২০২৬ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়স, শারীরিক গতি হয়তো আগের মতো নেই, ডিফেন্ডারদের ঘাড়ের উপর দিয়ে বিদ্যুৎবেগে ছুটে যাওয়ার সেই ক্ষমতা হয়তো কমেছে, কিন্তু ফুটবল-মস্তিষ্ক যেন আরও ধারালো, আরও পরিণত। মাঝমাঠে হেঁটে হেঁটে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, নিখুঁত পাসে রক্ষণভাগ চিরে ফেলা— এই বয়সেও তিনি যা খেল দেখালেন, তা যে কোনও তরুণ ফুটবলারের কাছেই ঈর্ষণীয়।

৮টা গোল আর ৪টে অ্যাসিস্ট করে দলকে আবার নিয়ে গেলেন একটা বিশ্বকাপ ফাইনালে। আর ফাইনালটা হল সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে! ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। যে মাঠে দশ বছর আগে তিনি চোখের জলে বিদায় নিয়েছিলেন, এক দশক পর সেই মাঠেই খেললেন তাঁর জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের কাছে হেরে হয়তো শেষবারের মতো ট্রফিটা ছোঁয়া হল না; কিন্তু প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন, ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে মানুষ ফিনিক্স পাখির মতো বারবার ছাই থেকে উড়ে আসতে পারে।
শুধুই নিয়মরক্ষার ম্যাচ হলেও সেই দিন আর্জেন্টিনা তথা গোটা বিশ্ব এক হয়ে দাঁড়াবে; কুর্নিশ জানাবে সেই মানুষটিকে, যিনি তীব্র সমালোচনা, বুকফাটা যন্ত্রণা ও ব্যর্থতার খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসে রচনা করেছেন অমরত্বের নতুন ইতিহাস।
মেসির এবারের বিদায় বড্ড আলাদা। বিশ্বকাপের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় বাবা হোর্হের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে অনেকটা রিক্ত করে দেয়। যে মানুষটা তাঁর কেরিয়ারের শুরু থেকে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, তাঁর চলে যাওয়া মেসিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। এবার আর কোনও অভিমান নেই, আছে শুধু এক পরম তৃপ্তি আর চরম ক্লান্তি। তাই ‘সবটুকু দিয়েছি’ বলার মধ্যে কোনও আক্ষেপ নেই, আছে এক বুক প্রশান্তি।

শোনা যাচ্ছে, আগামী ৬ই অক্টোবর, বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে মেসির জন্য একটা আনুষ্ঠানিক মেগা ফেয়ারওয়েল ম্যাচের আয়োজন করা হচ্ছে, বেনিন-এর বিরুদ্ধে। শুধুই নিয়মরক্ষার ম্যাচ হলেও সেই দিন আর্জেন্টিনা তথা গোটা বিশ্ব এক হয়ে দাঁড়াবে; কুর্নিশ জানাবে সেই মানুষটিকে, যিনি তীব্র সমালোচনা, বুকফাটা যন্ত্রণা ও ব্যর্থতার খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসে রচনা করেছেন অমরত্বের নতুন ইতিহাস। সাধারণ এক ‘পেচো ফ্রিও’ থেকে হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার হৃদস্পন্দন।
লিওনেল মেসি শুধু ফুটবল ম্যাচেই জয়ী হননি, তিনি জয়ী হয়েছেন মানুষের মনেও— সে জয় চিরকালীন জয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত