(Toba Tek Singh)
দেশভাগের ইতিহাস মানেই একটা দগদগে ক্ষত। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো, ১৯৪৭ সালের সেই অস্থির সময়টার কথা। সিরিল র্যাডক্লিফ নামের এক ব্রিটিশ, যিনি তার আগে কোনওদিন ভারতবর্ষে পা-ই রাখেননি, তিনি টেবিলে ম্যাপ বিছিয়ে একটা পেনসিল দিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সীমানা এঁকে দিলেন। সেই একটা পেন্সিলের দাগে রাতারাতি কোটি কোটি মানুষের ভিটেমাটি, সম্পর্ক, প্রেম, পরিচয় দু’টুকরো হয়ে গেল।
এই চরম উদ্ভট, মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত ইতিহাসকে সাদাত হাসান মান্টো যেভাবে তাঁর ‘টোবা টেক সিং’ গল্পে তুলে ধরেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। মান্টো জানতেন, সমাজের আসল অসুখটা ধরতে গেলে কেবল বাইরের দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখালে চলবে না, দেখতে হবে মানুষের মনের ভিতরটাও। তাই তিনি গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন লাহোরের এক পাগলাগারদকে।
আরও পড়ুন: নীতিহীনতার রাজনীতি ও ব্যালট বাক্সের নীরব বিদ্রোহ
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে একটা অদ্ভুত তথ্য চোখে পড়ে, যা পড়লে আজ হয়তো আমাদের হাসিই পাবে। দেশভাগের কয়েক বছর পর, ১৯৫০ সাল নাগাদ তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তান সরকার এক আজব চুক্তি করে ঠিক করেছিল, শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পাগলাগারদের পাগলদেরও ভাগাভাগি করা হবে ধর্মের ভিত্তিতে। হিন্দু আর শিখ পাগলরা যাবে ভারতে, আর মুসলিম পাগলদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে পাকিস্তানে।
মান্টো এই চরম হাস্যকর ঐতিহাসিক সত্যকেই তাঁর গল্পের বীজ হিসেবে বেছে নেন। তবে তিনি তো শুধু ইতিহাস লিখতে বসেননি, তিনি সমাজের আয়না। সমাজতত্ত্বের দিক থেকে তাই আমাদের সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে দিলেন।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর ‘ম্যাডনেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ বইতে খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছিলেন, সমাজ আসলে কাদের ‘পাগল’ বলে দাগিয়ে দেয়। ফুকোর মতে, সমাজ তার নিজস্ব একটা নিয়মের ঘেরাটোপ তৈরি করে। সেই নিয়মের বাইরে যারা হাঁটে কিংবা সমাজের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না, তাদেরই পাগল বলে সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। মান্টোর গল্পে এই তত্ত্বই যেন এক নতুন মাত্রা লাভ করে।
লাহোরের সেই পাগলাগারদের ভেতরে থাকা মানুষগুলো যখন শুনল দেশ ভাগ হয়েছে, তারা তো অবাক! তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করতে লাগল— পাকিস্তান ব্যাপারটা আসলে কী? এটা কি কোনও জায়গা, নাকি কোনও কারখানা? তাদের কাছে এই দেশভাগের কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। ফুকোর চোখ দিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, জেলের বাইরের তথাকথিত ‘সুস্থ’ মানুষগুলো যখন ধর্মের নেশায় মেতে একে অপরকে খুন করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, তখন আসল পাগল তো তারাই। আর জেলের ভেতরের সেই মানুষগুলো, যারা এই দাঙ্গার কোনও অর্থই খুঁজে পাচ্ছে না, তারা বরং অনেক বেশি স্বাভাবিক, অনেক বেশি মানবিক।
লাকাঁ বলছেন, মানুষ যখন কোনও অবর্ণনীয় ট্রমা বা মানসিক আঘাতের শিকার হয়, যাকে তিনি ‘দ্য রিয়েল’ বলেছেন; তখন আমাদের প্রচলিত ভাষা সেই যন্ত্রণাকে আর প্রকাশই করতে পারে না। ভাষার কাঠামো তখন ভেঙে খানখান হয়ে যায়।
এই অর্থহীনতার জায়গা থেকেই গল্পের ভিতর দর্শনের এক গভীর স্রোত এসে মেশে। অ্যালবার্ট কামু-র মতো অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা মানুষের জীবনের যে ‘অ্যাবসার্ড’ বা চরম অর্থহীনতার কথা বলতেন, লাহোরের সেই পাগলাগারদ যেন তারই এক নিখুঁত মঞ্চ। একজন পাগল তো গাছেই উঠে পড়ল, বলল সে ভারত বা পাকিস্তান কোথাও যাবে না, সে এই গাছেই থাকবে!
রাষ্ট্র নামক একটা ধারণা যে মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না, তা বোঝাতে মান্টো দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের সেই ‘হোমো সেকার’ (Homo Sacer) বা ‘বেয়ার লাইফ’ (Bare Life) তত্ত্বের এক করুণ ছবি যেন এঁকেছেন বিষাণ সিং-এর চরিত্রের মধ্য দিয়ে। বিষাণ সিং গত পনেরো বছর ধরে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমোয়নি, পা মুড়ে বসেনি পর্যন্ত— তার কাছে একটাই প্রশ্ন, তার নিজের গ্রাম ‘টোবা টেক সিং’ কোথায়?

রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে এই মানুষগুলোর তো কোনও নাগরিক সত্তা নেই, নেই কোনও অধিকার। আগামবেন বলেছিলেন, রাষ্ট্র যখন মানুষকে তার সমস্ত আইনি সুরক্ষা ও পরিচয় থেকে ছিনিয়ে নেয়, তখন মানুষ কেবল একটা মাংসপিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। তাকে রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনও জায়গায় ছুঁড়ে ফেলতে পারে।
ভারত আর পাকিস্তান নামক দুটো রাষ্ট্রও ঠিক সেটাই করছিল। বিষাণ সিং কোথায় যেতে চায়, সেটা কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেনি। দার্শনিক হান্না আরেন্টের ভাষায় তাকে এক ‘রাষ্ট্রহীন’ নাগরিকে পরিণত করেছিল, যার কাছে নিজের ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনও কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
দেশভাগের ফলে নিজের শিকড় থেকে উপড়ে যাওয়ার চরম আতঙ্ক ও যন্ত্রণা বোঝানোর মতো কোনও শব্দ বিষাণ সিং-এর মাতৃভাষায় ছিল না। যে ভাষা দিয়ে রাজনীতিকরা দেশ ভাগ করে, যে ভাষায় মানুষের বুকে ছুরি বসানো হয়, বিষাণ সিং নিজের অবচেতনে সেই ভাষাকেই অস্বীকার করেছিল।
আর যদি মনস্তত্ত্বের দিক থেকে দেখা যায়, তবে বিষাণ সিং-এর সেই বিখ্যাত অসংলগ্ন প্রলাপ আমাদের বুকের ভেতর এক হাহাকার তৈরি করে যায়। “ওপড় দি গুড়গুড় দি অ্যানেক্স দি বেধিয়ানা দি মুঙ্গ দি ডাল অফ দি লালটেন…”— কী অদ্ভুত সব কথা, তাই না? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ নেহাতই এক উন্মাদের প্রলাপ। কিন্তু ফরাসি মনঃসমীক্ষক জাক লাকাঁ-র তত্ত্বের আলোয় দেখলে এর পিছনের ভয়াবহ সত্যিটা আমাদের শিউরে দেয়। লাকাঁ বলছেন, মানুষ যখন কোনও অবর্ণনীয় ট্রমা বা মানসিক আঘাতের শিকার হয়, যাকে তিনি ‘দ্য রিয়েল’ বলেছেন; তখন আমাদের প্রচলিত ভাষা সেই যন্ত্রণাকে আর প্রকাশই করতে পারে না। ভাষার কাঠামো তখন ভেঙে খানখান হয়ে যায়।
দেশভাগের ফলে নিজের শিকড় থেকে উপড়ে যাওয়ার চরম আতঙ্ক ও যন্ত্রণা বোঝানোর মতো কোনও শব্দ বিষাণ সিং-এর মাতৃভাষায় ছিল না। যে ভাষা দিয়ে রাজনীতিকরা দেশ ভাগ করে, যে ভাষায় মানুষের বুকে ছুরি বসানো হয়, বিষাণ সিং নিজের অবচেতনে সেই ভাষাকেই অস্বীকার করেছিল। তার ওই প্রলাপ হয়ে উঠেছিল তার প্রতিবাদের নিজস্ব ভাষা, নিজের আত্মপরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখার এক মরিয়া আর্তি। গল্পের শেষ দিকে দেখা যায়, তার এই প্রলাপের শেষে সে যোগ করেছিল “অফ দি পাকিস্তান গভর্নমেন্ট” এবং একদম শেষে “অফ দি টোবা টেক সিং গভর্নমেন্ট”। অর্থাৎ তার মনস্তত্ত্ব ক্রমাগত এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করে নিজের গ্রামের স্বাধীন অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল।

মান্টোর নিজের জীবনের ছায়াও যেন এই গল্পে লুকিয়ে আছে। দেশভাগের পর মান্টো নিজেও বোম্বে (অধুনা মুম্বাই) ছেড়ে লাহোরে যেতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছিলেন এবং শেকড় হারানোর যন্ত্রণায় তিনিও একসময় মানসিক অবসাদে ভুগে লাহোরের পাগলাগারদে কিছুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিষাণ সিং যেন মান্টোরই অল্টার ইগো।
গল্পের শেষ দৃশ্য এক অনবদ্য ট্র্যাজেডি, যা বারবার আর্দ্র করে পাঠকের চোখ। ওয়াঘা সীমান্তে পাগল বিনিময়ের সময় যখন বিষাণ সিং জানতে পারল, তার প্রাণপ্রিয় ‘টোবা টেক সিং’ পাকিস্তানে পড়েছে, অথচ তাকে জোর করে পাঠানো হচ্ছে ভারতে, তখন সে বিদ্রোহ করে বসল। সে তো হিন্দু বা শিখ নয়, সে তো ভারত বা পাকিস্তানের নাগরিক নয়, সে শুধুই ‘টোবা টেক সিং’-এর একজন বাসিন্দা। পনেরো বছর ধরে নিজের ফুলে ওঠা পা দুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অতিকায় মানুষটা যখন বুঝল, সে তার নিজের মাটিতে আর ফিরতে পারবে না, তখন সে মুখ থুবড়ে পড়ল।
মান্টোর সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া বর্ণনা— ওপারে কাঁটাতারের পিছনে ভারত, এপারে পাকিস্তান, আর মাঝখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডের যে একটুকরো জমির উপর কারও কোনও অধিকার নেই, ঠিক সেখানেই পড়ে রইল টোবা টেক সিং। মান্টো এখানে মানুষ আর মাটিকে একাকার করে দিলেন।
কোথায় পড়ল? মান্টোর সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া বর্ণনা— ওপারে কাঁটাতারের পিছনে ভারত, এপারে পাকিস্তান, আর মাঝখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডের যে একটুকরো জমির উপর কারও কোনও অধিকার নেই, ঠিক সেখানেই পড়ে রইল টোবা টেক সিং। মান্টো এখানে মানুষ আর মাটিকে একাকার করে দিলেন। বিষাণ সিং আর তার গ্রাম যেন ওই একটুকরো মাটি হয়ে গেল। এমন এক আশ্রয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল, যা কোনও রাষ্ট্রের নয়, কোনও বিভেদের নয়।

মানুষের তৈরি ভুয়ো মানচিত্র আর কাঁটাতার যে মানুষের আত্মাকে, মাটির প্রতি তার নাড়ির টানকে কখনও ভাগ করতে পারে না— মান্টো যেন গল্পের ছলে, বিষাণ সিং-এর সেই নিথর দেহের উপর দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্বকে সেই চরম সত্যি বুঝিয়ে দিলেন। কেবল এক ছোটগল্পের গণ্ডি পেরিয়ে এখানেই ‘টোবা টেক সিং’ হয়ে ওঠে মানব ইতিহাসের এক শাশ্বত দলিল।
তথ্যসূত্র:
১। মান্টো, সাদাত হাসান; টোবা টেক সিং
২। ফুকো, মিশেল; ম্যাডনেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন: এ হিস্ট্রি অফ ইনস্যানিটি ইন দ্য এজ অফ রিজন
৩। আগামবেন, জর্জিও; হোমো সেকার: সভারেইন পাওয়ার অ্যান্ড বেয়ার লাইফ
৪। আরেন্ট, হান্না; দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটেরিয়ানিজম
৫। কামু, অ্যালবার্ট; দ্য মিথ অফ সিসিফাস
৬। লাকাঁ, জাক; দ্য ফোর ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্টস অফ সাইকো-অ্যানালিসিস
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত