(Ganesh Chaturthi)
মহারাষ্ট্রে জমিয়ে শুরু হয়ে গেছে গণেশ উৎসব। প্রতি বছরের মতো। এই যে আমি মহারাষ্ট্র বললাম, সঙ্গে সঙ্গে মুম্বাই চোখের সামনে ভেসে উঠল বুঝি? বিশাল মণ্ডপ, থিম-ভিত্তিক সাজসজ্জা এবং লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী? কিন্তু গণেশোৎসবের শিকড় খুঁজতে হলে যেতে হবে পুনে। কেন? গণেশ পুজো ভারতে বহু শতক ধরে পালিত হলেও এটি মূলত ঘরোয়া উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৮৯৩ সালে জাতীয়তাবাদী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক গণেশ উৎসবকে পুনেতে সর্বজনীন রূপ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় আবহকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে একত্র করা এবং সামাজিক ঐক্যের একটি শক্তিশালী মঞ্চ গড়ে তোলা।
আরও পড়ুন: হে শারদ সংখ্যা, তব বিবিধ বিপণন
তখন ব্রিটিশ শাসন। দেশের মানুষ একসঙ্গে না থাকলে চলবে কী করে! এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে গণেশোৎসবকে মহারাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম জনউৎসবে পরিণত করে। পুনেতে আজও সেই গণেশোৎসবের ইতিহাস বহমান। পুনেতে এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হল ‘মানাচে পাঁচ গণপতি’ বা পাঁচ সম্মাননীয় গণপতি। এই পাঁচ গণপতি হলেন, কাসবা গণপতি, তাম্বডি যোগেশ্বরী, গুরুজি তালিম, তুলশিবাগ গণপতি, কেশরী ওয়াড়া গণপতি।

পুনের পাঁচ সম্মাননীয় গণপতির মধ্যে আমার মতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুরুজি তালিম গণপতি। মজার বিষয়, ‘তালিম’ শব্দটি এসেছে কুস্তি বা ব্যায়ামের আখড়া থেকে। আর সেই আখড়াতেই প্রথম গণপতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেখান থেকেই নাম ‘গুরুজি তালিম’। ১৮৮৭ সালে, সর্বজনীন গণেশোৎসব জনপ্রিয় হওয়ার আগে, একটি আখড়ায় এর সূচনা। তবে এর থেকেও বেশি অবাক করবে এর প্রতিষ্ঠা-কাহিনি। এই গণপতির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন। তাই এই গণপতি শুধু ভক্তির প্রতীক নন, সম্প্রীতিরও প্রতীক। সম্প্রীতির উদাহরণ মিলেমিশে এই পুজো শুধুই ধর্মের প্রতীক নয়, মানবতার প্রতীকও!

পুনের আরেকটি অনন্য পরিচয় হল ঢোল-তাশা পঠক। ‘ঢোল’ বড় আকারের ঢাকসদৃশ বাদ্যযন্ত্র এবং ‘তাশা’ উচ্চস্বরের কেটল-ড্রাম ধরনের বাদ্যযন্ত্র। এই দুই মিলে যে সংগঠিত দল গড়ে ওঠে, তাকে বলা হয় ঢোল-তাশা পঠক। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সুসংগঠিত বাদ্যদলের অংশ হিসেবে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। ঢোল-তাশার সমবেত ছন্দ শহরের রাস্তাগুলিকে এক অসাধারণ আবহে ভরিয়ে তোলে।
মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসবের সংস্কৃতির শুভ গুণ আগামী প্রজন্ম অনুভব করুক। কারণ, Coretta Scott King বলেই গিয়েছেন, ‘The greatness of a community is most accurately measured by the compassionate actions of its members.’
পুনের কথা বলতে গিয়ে মুম্বাইকে ভুলে গেলে একেবারেই চলবে না। মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসব প্রসঙ্গে মুম্বইয়ের লালবাগচা রাজা-র নাম না বললেই নয়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত এখানে দর্শনের জন্য আসেন। অনেকটা আমাদের বাগবাজার সর্বজনীনের মতো। সেখানকার মায়ের দর্শন যেমন বাঙালিদের মনের আরাম।

গণেশ উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে উকাডিচে মোদক। চালের আটা, নারকেল ও গুড়ের পুর দিয়ে তৈরি বাষ্পে সিদ্ধ মিষ্টান্নকে ভগবান গণেশের সবচেয়ে প্রিয় খাবার বলে মনে করা হয়। মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে এই সময় মোদক তৈরি হয় এবং নৈবেদ্য হিসেবে নিবেদন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে মোদকের নামে সন্দেশ বিক্রি হয়। খাঁটি মোদক অন্যরকম। কতকটা যেন ভাপা পিঠে। বড়ই স্বাদু।
ঐতিহ্যগতভাবে, গণেশ মূর্তি শাডু মাটি (Shadu Clay) দিয়ে তৈরি হত। আধুনিক সময়ে পরিবেশ দূষণ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মহারাষ্ট্রে আবার মাটির মূর্তি, প্রাকৃতিক রং এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার বাড়ছে।

নতুন জামা পরে বাচ্চা থেকে বয়স্ক সবাই গণপতি হাতে ঘরে ঢুকছেন। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল। কোনও বাঙালি এই সময় মহারাষ্ট্রে থাকলে এই দৃশ্য তাঁর কাছে দুর্গা পুজোর ট্রেলার বলে মনে হতে পারে। ঠাকুর এখানে ঘরে ঘরে আসেন এবং ১২ দিন থাকেন। এতদিন ধরে চলা বড় পুজো বাংলায় আছে কী না জানা নেই।
‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, পুধচ্যা বছরি লভকর যা’ অর্থাৎ, হে গণপতি, আগামী বছর আরও তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। গণপতি বাপ্পার পর ‘মোরিয়া’ কেন উচ্চারণ করা হয়, তা নিয়েও খানিকটা বলা দরকার। এ কি গণেশের আরেক নাম? বিভিন্ন গবেষকদের মতে, এই শব্দটি গণেশভক্ত মোরয়া গোসাভি-এর উদ্দেশ্যে বলা হয়। পুনের নিকটবর্তী চিঞ্চওয়াড-এর এই সাধককে শ্রেষ্ঠ সাধক বলে মানা হয়। তাঁর অসামান্য ভক্তির কারণেই মহারাষ্ট্রের মানুষ দেবতা ও এক মহান ভক্তকে একই পঙক্তিতে স্মরণ করেন।

মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসবের সংস্কৃতির শুভ গুণ আগামী প্রজন্ম অনুভব করুক। কারণ, Coretta Scott King বলেই গিয়েছেন, ‘The greatness of a community is most accurately measured by the compassionate actions of its members.’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত