(NOTA Voting)
মার্কিন ঐতিহাসিক হোওয়ার্ড জ়িন এককালে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ভিন্নমত পোষণ করাই দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ রূপ।’ একটি সুস্থ, স্পন্দিত ও পরিণত গণতন্ত্রের প্রকৃত নির্যাস লুকিয়ে রয়েছে ওই একটি মাত্র বাক্যে। গণতন্ত্রের আক্ষরিক অর্থ কেবল বাধ্যবাধকতার বশবর্তী হয়ে কাউকে বেছে নেওয়া নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস, অপছন্দ ও প্রত্যাখ্যানকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে ব্যক্ত করার অধিকারই এই ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি। তবে, সমকালীন ভারতের রাজনৈতিক ক্যানভাসের দিকে তাকালে এক গভীর দার্শনিক ও অস্তিত্বের সংকট চোখে পড়ে।
ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর তাঁর শেষ ভাষণে সাংবিধানিক নৈতিকতা বা Constitutional Morality-র উপর জোর দিয়ে সতর্ক করেছিলেন, ‘সংবিধান যত ভালই হোক না কেন, যাঁরা তা প্রয়োগ করবেন তাঁরা যদি নীতিহীন হন, তবে সেই সংবিধান ব্যর্থ হতে বাধ্য।’ আম্বেদকরের সে আশঙ্কাই আজ যেন এক রূঢ় বাস্তব। তাত্ত্বিক গণতন্ত্র এবং বাস্তবের রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে বর্তমানে যে দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা নাগরিক সমাজকে এক চরম বিভ্রান্তির মুখে দাঁড় করায়।
নির্বাচনের পর সাধারণ নাগরিক যখন দেখেন তাঁর দেওয়া মতামতের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতার অলিন্দে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন, তখন গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাই মুখ থুবড়ে পড়ে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ও প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে মানুষ যাঁদের বিরোধী স্বর হিসেবে আইনসভায় পাঠান, তাঁরাই যদি রাতারাতি শিবিরের রং বদলে ফেলেন, তখন সাধারণ ভোটারের মনে এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, তাঁরা কোন ছায়ায় নিরাপদ বোধ করবেন?
সাম্প্রতিক কালের জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করলে এই নীতিহীনতার নগ্ন রূপ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ষাটের দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে যে ‘আয়ারাম গয়ারাম’ সংস্কৃতির জন্ম, তা আজ যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। একুশের বঙ্গীয় নির্বাচনে যে তীব্র মেরুকরণ ও রাজনৈতিক বিভাজনের রেখা স্পষ্ট হয়েছিল, এবার ভোট-পরবর্তী সময়ে তা এক অদ্ভুত রূপ নিল। আদর্শের ছদ্মবেশে এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে দলত্যাগীদের যে স্রোত বইতে শুরু করেছে, তাতে শাসক ও বিরোধীর মাঝের সীমারেখাই বিলুপ্তপ্রায়।

ক্ষমতার অলিন্দে একটু উষ্ণতার বা সুরক্ষার খোঁজে বিরোধী জনপ্রতিনিধিরা যখন অবলীলায় নিজেদের মতাদর্শকে বিসর্জন দেন, তখন আইনসভায় সাধারণ মানুষের হয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কণ্ঠস্বরই আর অবশিষ্ট থাকে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই অবাধ শিবির বদল সাধারণ মানুষের দেওয়া রায়কে যেন এক নির্লজ্জ রাজনৈতিক নিলামে চড়িয়েছে। যে নাগরিক তাঁর নিজস্ব মতাদর্শের উপর ভরসা করে ব্যালটে সিলমোহর দিয়েছিলেন, জনমতের সেই চূড়ান্ত অবমাননার দায়ভার কোনও আইনি প্রলেপ দিয়ে কি আদৌ মোছা সম্ভব?
সংবিধানে দলবদল আটকাতে ১৯৮৫ সালে ৫২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘অ্যান্টি ডিফেকশন ল’ বা দলত্যাগ বিরোধী আইন (দশম তফসিল) আনা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দল ভাঙানোর দুই-তৃতীয়াংশের আইনি ফাঁকফোকর গলে এবং স্পিকারের বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে সে আইনও আজ জনপ্রতিনিধিদের নৈতিকতা শেখাতে এবং ভোটারদের বিশ্বাসের মূল্য রক্ষা করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এই প্রত্যাখ্যানের অধিকারের ধারণাটি নেহাত আধুনিক নয়। ১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যে প্রথম ব্যালট পেপারে ‘নান অফ দিজ় ক্যান্ডিডেটস’ যুক্ত করা হয়েছিল।
একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের নানাবিধ দুর্নীতি, আর অন্যদিকে সুবিধাবাদী রাজনীতির বেপরোয়া দৌরাত্ম্য— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গভীর সংকটে। নীতিহীনতার এই আস্ফালন এবং সাংবিধানিক অসহায়তার মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষ ক্রমশ এক বিকল্পহীনতার রাজনৈতিক এতিমখানায় পরিণত। এই চরম হতাশা এবং রাজনৈতিক বীতশ্রদ্ধার জায়গা থেকেই জন্ম নেয় ব্যালট বাক্সের এক নীরব অথচ প্রখর বিদ্রোহ— যার আইনি নাম ‘নোটা’ বা ‘নান অফ দ্য অ্যাব্যাভ’।
যখন রাজনৈতিক দলগুলো পরিচ্ছন্ন ও নীতিবান প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়, সংবিধানের ধারাগুলোও যখন জনপ্রতিনিধিদের নৈতিকতা শেখাতে হোঁচট খায়, তখন আইনি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেয় এক অহিংস হাতিয়ার। নোটা কেবল ইভিএম-এর শেষ বোতাম নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এ হল রাজনৈতিক মোহভঙ্গের এক যৌথ উদ্যাপন। এর মাধ্যমে ভোটার সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের প্রতি তাঁর অনাস্থা তীব্রভাবে ব্যক্ত করতে পারেন।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এই প্রত্যাখ্যানের অধিকারের ধারণাটি নেহাত আধুনিক নয়। ১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যে প্রথম ব্যালট পেপারে ‘নান অফ দিজ় ক্যান্ডিডেটস’ যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কলম্বিয়া, গ্রিস, ইউক্রেন, স্পেন পেরিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশেও ২০০৮ সালে ‘না ভোট’ হিসেবে এই ব্যবস্থা স্বীকৃতি লাভ করে। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়ার উদাহরণটিই সবচেয়ে চমকপ্রদ।
কলম্বিয়ার নির্বাচনী আইনে নোটা বা ‘ভোটো এন ব্লাঙ্কো’ (Voto en Blanco) সর্বাধিক ভোট পেলে নিয়ম অনুযায়ী সেই নির্বাচন বাতিল হয়। পাশাপাশি পুরনো প্রার্থীদের কাউকে আর পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তাঁর ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে নাগরিকের মতপ্রকাশের যে অবাধ স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, কলম্বিয়ার এই আইন যেন তারই এক আধুনিক ও পরিণত রূপ।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ (১.০৮ শতাংশ) এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ (১.০৬ শতাংশ) নোটা বোতাম টিপেছিলেন।
ভারতের মতো বহুমাত্রিক দেশে নোটার আইনি স্বীকৃতি লাভের পথটি মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০১৩ সালের আগে এ দেশে কোনও ভোটার ভোট দিতে না চাইলে ১৯৬১ সালের নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার ‘৪৯–ও’ (49–O) ধারা অনুযায়ী তা প্রিসাইডিং অফিসারকে জানাতে হত, যা ভোটারের সাংবিধানিক গোপনীয়তাকে লঙ্ঘন করে।
এই অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে, ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ়’-এর দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে, ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দেয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পি. সত্থাশিবমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তাঁদের পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্টভাবে জানায়, নেতিবাচক ভোটের অধিকার আদতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থী দাঁড় করাতে একপ্রকার বাধ্য করবে। শীর্ষ আদালতের মতে, গণতন্ত্র মূলত পছন্দের অধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আর প্রত্যাখ্যানের অধিকার সেই পছন্দেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রাজনীতির ক্রমশ দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে নোটা সাধারণ মানুষের হাতে থাকা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অহিংস হাতিয়ার। অনেকেই মনে করেন, নোটার কোনও বাস্তব উপযোগিতা নেই; পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ (১.০৮ শতাংশ) এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ (১.০৬ শতাংশ) নোটা বোতাম টিপেছিলেন। ২০১৭ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের যে ব্যবধান ছিল, নোটার বাক্সে পড়া ভোটের সংখ্যা ছিল তার চেয়েও বেশি।
দলবদলের রাজনীতির বিরুদ্ধে নোটা কতটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখা যায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে, মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর কেন্দ্রে। ওই কেন্দ্রে বিরোধী শিবিরের প্রার্থী শেষ মুহূর্তে শাসক দলে যোগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতা সুবিধাবাদের এই কদর্য খেলা মেনে নেননি। ফলস্বরূপ, ইন্দোরে নোটা ২ লক্ষ ১৮ হাজারেরও বেশি ভোট (প্রায় ১৪ শতাংশ ভোট শেয়ার) পেয়ে দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড তৈরি করে রানার্স-আপের স্থান দখল করে নেয়।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘ফ্যাক্টলি’ এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, ২০১৪ ও ২০১৯— দুই লোকসভা নির্বাচনেই সাধারণ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় এসসি ও এসটি সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে নোটার ভোট গড়ে প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
বাংলার ক্ষেত্রেও অতি-রাজনৈতিক সচেতন ভোটারদের একাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলবদলু প্রার্থীদের বয়কট করে নোটার দিকে ঝুঁকছেন, যা আসলে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি মানুষের অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃণমূল স্তরে নোটার এক অভিনব ব্যবহার দেখা গিয়েছে। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ বা তামিলনাড়ুর প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নাগরিকরা নোটাকে ব্যবহার করছেন সমষ্টিগত বঞ্চনার প্রতিবাদ হিসেবেও। ‘রাস্তা নেই, তো ভোট নেই’ কিংবা ‘পানীয় জল চাই’ দাবিতে গোটা গ্রামের মানুষ যখন একযোগে ইভিএম-এ নোটা বোতাম টেপেন, তখন তা আর কেবল রাজনৈতিক বীতশ্রদ্ধা থাকে না, হয়ে ওঠে উন্নয়ন আদায় করে নেওয়ার শক্তিশালী নাগরিক দরকষাকষির হাতিয়ার।
তবে নোটার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিকও রয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এই দিকটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। আপাতদৃষ্টিতে নোটাকে রাজনৈতিক পরিচ্ছন্নতার হাতিয়ার বলে মনে হলেও ভারতের মতো জাতিভেদ প্রথায় দীর্ণ সমাজে এর অন্য একটি রূপ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সাধারণ (জেনারেল) কেন্দ্রগুলোর তুলনায় তফসিলি জাতি (এসসি) ও উপজাতি (এসটি) সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে নোটায় ভোট পড়ার হার ধারাবাহিকভাবে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘ফ্যাক্টলি’ এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, ২০১৪ ও ২০১৯— দুই লোকসভা নির্বাচনেই সাধারণ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় এসসি ও এসটি সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে নোটার ভোট গড়ে প্রায় দ্বিগুণ ছিল। ২০১৩–১৪ সালে পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল যে, সর্বাধিক নোটা ভোট পড়া প্রথম ২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩টি কেন্দ্রই ছিল উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত।
সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে নোটার এই বিপুল ব্যবহার নিছক রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রকাশ নয় মোটেই; বরং তা উচ্চবর্ণের ভোটারদের একটি প্রচ্ছন্ন জাতিগত ছুঁৎমার্গ বা বর্ণবাদের আধুনিক প্রকাশ। সামাজিক ভাবে প্রভাবশালী উচ্চবর্ণের ভোটারদের একাংশ কোনও দলিত বা আদিবাসী জনপ্রতিনিধিকে মেনে নেওয়ার প্রবল মানসিক অনীহা থেকেই ইভিএম-এ নোটার বোতামটিকে একটি ‘জাতিগত বয়কট’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ভারতের আইন কমিশনের ২৫৫তম রিপোর্টেও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে, প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্নে, নোটার আইনি ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিকদের ভাষায় এ হল প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের এক ধরনের ‘প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভ রেজ়িস্ট্যান্স’। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক অধিকার কীভাবে প্রাচীন বর্ণবাদের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে, ভারতের সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে নোটার প্রয়োগ তার এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
এখানেই রাজনীতি, সমাজ ও সংবিধানের এক জটিল সংঘাত উপস্থিত হয়। সাংবিধানিক আইনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল, একদিকে যেমন দলত্যাগ বিরোধী আইন বিধায়কদের কেনাবেচা রুখতে ব্যর্থ, ঠিক তেমনই নোটা-ও জাতীয় স্তরে বর্তমানে কার্যত একটি ‘দাঁতহীন বাঘ’। প্রচলিত ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ ব্যবস্থায় নোটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও নির্বাচন বাতিল হয় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ভারতে নোটাকে তাই বলা হয় ‘রাইট টু রেজিস্টার ডিসঅ্যাপ্রুভাল’ বা অসন্তোষ নথিভুক্ত করার অধিকার।

কিন্তু নাগরিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, একে কলম্বিয়ার মতো ‘রাইট টু রিজেক্ট’ বা প্রার্থী বাতিলের শক্তিশালী অধিকারে উন্নীত করা হোক। ভারতের আইন কমিশনের ২৫৫তম রিপোর্টেও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে, প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্নে, নোটার আইনি ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
আশার কথা হল, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা রাজ্য নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালে স্থানীয় পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনে নিয়ম চালু করেছে, নোটা সর্বাধিক ভোট পেলে নির্বাচন বাতিল হবে। ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টেও এমন একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে নোটা সর্বাধিক ভোট পেলে নির্বাচন বাতিলের পাশাপাশি প্রত্যাখ্যাত প্রার্থীদের পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে লড়তে না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থাতেও এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে তা বলাই বাহুল্য।
যতদিন না সংবিধানে দলত্যাগ বিরোধী আইনকে, সমস্ত ফাঁকফোকর বন্ধ করে, আরও কঠোর করা হচ্ছে এবং নোটার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, ততদিন নীতিহীনদের এই রাজনীতি চলতেই থাকবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাধারণ মানুষের মনে একটি বদ্ধমূল ভ্রান্তি হল— নোটা মানেই ভোট নষ্ট। অনেকেই হতাশায় ভোগেন, ‘যেভাবেই হোক কেউ একজন তো জিতবেই, তাহলে নোটা দিয়ে কী লাভ!’ মানুষ ভুলে যায়, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে এই নীরব প্রতিবাদগুলো বিন্দু বিন্দু করে জমা হওয়া ভীষণ জরুরি।
‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালের লোকসভায় প্রায় ৪৩ শতাংশ নির্বাচিত সাংসদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ছিল, এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে সেই গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়া তো দূরের কথা, বরং বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৬ শতাংশে। রাজনীতির আঙিনায় অর্থের আস্ফালন এবং পেশিশক্তির এই দাপটে সাধারণ ও সৎ প্রার্থীদের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়াটা আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। ভারতের গণতন্ত্র ক্রমশ এক ধনিকতন্ত্রে (Plutocracy) পরিণত হচ্ছে। দেশের প্রায় অর্ধেক আইনপ্রণেতা যদি অপরাধমূলক পটভূমি থেকে আসেন, তবে তার মাশুল চোকাতে হয় আপামর জনসাধারণকেই।
আরও পড়ুন: আদর্শ ক্ষমতার চালক, না ক্ষমতাই আদর্শের অভিধান?
যতদিন না সংবিধানে দলত্যাগ বিরোধী আইনকে, সমস্ত ফাঁকফোকর বন্ধ করে, আরও কঠোর করা হচ্ছে এবং নোটার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, ততদিন নীতিহীনদের এই রাজনীতি চলতেই থাকবে। মানুষ যদি নিছক বাধ্যবাধকতার বশে অপছন্দ সত্ত্বেও ‘মন্দের ভাল’ বেছে নেওয়ার পুরনো অভ্যাসে আটকে থাকেন, তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই দুরারোগ্য ব্যাধি কখনই সারবার নয়।
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের যান্ত্রিক শাসন নয়, নীতি ও নৈতিকতারও শাসন। যতদিন না আমরা আমাদের নাগরিক ছুঁৎমার্গ ঝেড়ে ফেলে অযোগ্যতার চোখে চোখ রেখে সজোরে ‘না’ বলতে শিখছি, ততদিন সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির স্বপ্ন এক মরীচিকা হয়ে থেকে যাবে। নোটাকে তাই ব্যালট বাক্সের একটি নিছক বিকল্প বোতাম হিসেবে নয়, আধুনিক নাগরিকের আত্মসম্মান রক্ষা এবং দলবদলু, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির চোখে চোখ রেখে সজোরে প্রত্যাখ্যানের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখার সময় সমাগত।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত