(Constitutional Politics)
One man’s opportunism is another man’s statesmanship – Milton Friedman
রাজনীতিতে আদর্শের মৃত্যু কখনও শোকসভা ডেকে ঘোষণা করা হয় না। তার মৃত্যু হয় অনেক বেশি নীরবে। একদিন সকালে দেখা যায়, গতকাল পর্যন্ত যিনি সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে দলনেত্রীর নামে গলা ফাটাচ্ছিলেন, আজ তিনিই নতুন দরজায় কড়া নাড়ছেন। গতকাল যাঁর কাছে দল ছিল নিজের মায়ের মতো, আজ তাঁর কাছে সেটি প্রায় দুঃস্বপ্নসম। এত দ্রুত গিরগিটিও তার রঙ বদলাতে পারে না, মতাদর্শও বদলে যায় না। তাহলে বদলায় কী?
বদলায় রাজনীতির কারবারিদের সম্পর্কে আমাদের সযত্নে লালিত ধারণা, কিছুটা বিশ্বাস। আয়ারাম-গয়ারামের দলের কিচ্ছুটি যায় আসে না, আমজনতার নিজেকে প্রতারিত লাগে। এই প্রতারণার মাসুল যে অচিরেই তাদের গুণতে হবে, বাবু বদলের ব্রাহ্ম মুহূর্তে দল-বদলুদের তা স্মরণে থাকে না, নির্মম প্রত্যাঘাত যেদিন চোখের সামনে প্রতিভাত হয়, তাঁরা চমকে ওঠেন, তখন আর নিরাময়ের কোনও রাস্তা খোলা থাকে না। এ যেন অনেকটা পিপীলিকার আগুনের চারপাশে ডানা ঝাপটানো, জানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরবে তবু স্বভাব বদলাবে না।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক ভাঙনের দিকে একবার চোখ বোলানো যাক। যাঁরা দল ছেড়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই কোনও নতুন রাজনৈতিক দর্শনের কথা বলছেন না। কেউ বলছেন না যে দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পরে তাঁরা নতুন কোনও আদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন। সত্যি বলতে কী, এঁদের কারও ঝুলিতে দল ছাড়ার যুক্তিগ্রাহ্য কোনও ব্যাখ্যাই নেই। কারণ নির্লজ্জ সুবিধাবাদের কোনও ব্যাখ্যা হয় না।

পরাজয় পরবর্তী চৈতন্যোদয়ের নির্যাসটুকু এই রকম। এক, দলের ভিতরে কথা বলার কোনও অবকাশ ছিল না, ফলে তাঁদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। দুই, দলটি যে চুরি করা ছাড়া গত ১৫ বছরে আর কোনও কাজ করেনি, সেটা তাঁরা বুঝতেই পারেননি। তিন, অভিষেক আর তাঁর ‘গেস্টাপো’ আইপ্যাক দলের ভিতরে অনাচার, দুর্নীতি, দাদাগিরি আর সব্বাইকে অপমান করার যে সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একরকম অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অতএব হে বন্ধু বিদায়!
বিদ্রোহীদের ছুতোগুলো এতটা হাস্যকর ও অকিঞ্চিৎকর যে, দুর্জনের ছলাকলাও এর চেয়ে পাকাপোক্ত, পরিণত হয়ে থাকে। ফলে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় ছেঁদো কথাগুলি ফেলে ব্যবচ্ছেদ করাটা সময়ের অপচয় হবে। যৎপরোনাস্তি সংক্ষেপে, এঁদের বক্তব্যের আদৌ কোনও সারবত্তা নেই গপ্পোটা মোটেই তা নয়, বরং তাঁদের প্রতিটি অভিযোগ যথাযথ। মুশকিলটা করেছে তাঁদের চৈতন্যোদয়ের সময় নির্বাচন। দল গো-হারান হেরে যাওয়ার পরে অতি-উচিত কথাও তার বৈধতা হারায়।
বহু বছর ধরে যদি কোনও দল ক্ষমতায় থাকে, তবে দলের সংগঠন আর প্রশাসনের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়। সেতুটি আইনের বইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না।
আপনি যদি অতি দয়ালু হন, বড়জোর এঁদের বাস্তববাদী সুবিধাবাদী বলতে পারেন। বিরোধী দলে বসে জনরোষ সামলানো কঠিন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ সামলানো কঠিন, প্রশাসনিক সুরক্ষা ছাড়া রাজনীতি করা কঠিন। কথাগুলি শুনতে নির্লজ্জ লাগলেও, রাজনীতির অভিধানে এগুলি নতুন শব্দ নয়। এগুলি ক্ষমতা হারানোর পরের অভিধানেই বড় বড় হরফে লেখা আছে।
আসলে ক্ষমতা কেবল সরকার গঠন করে না; ক্ষমতা একটি রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে। সেই বাস্তুতন্ত্রে নেতা, কর্মী, ঠিকাদার, প্রভাবশালী স্থানীয় মুখ, ব্যবসায়ী, এমনকি সাধারণ সমর্থকও নিজেদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন। বহু বছর ধরে যদি কোনও দল ক্ষমতায় থাকে, তবে দলের সংগঠন আর প্রশাসনের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়। সেতুটি আইনের বইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না। নির্বাচন সেই সেতুটি এক ধাক্কায় ভেঙে দিলে বহু মানুষ হঠাৎ আবিষ্কার করেন, তাঁরা আসলে সাঁতার জানেন না।

এখানেই দলবদলের প্রকৃত মনস্তত্ত্ব লুকিয়ে। রাজনৈতিক নেতারা খুব কম ক্ষেত্রেই শূন্যে ঝাঁপ দেন। তাঁরা সবসময় এমন নৌকায় উঠতে চান, যেটি ডুববে না বলে তাঁদের বিশ্বাস। সেই কারণেই পরাজিত দলের ঘাটে নৌকা কমে যায়, আর বিজয়ী দলের ঘাটে ভিড় বাড়ে। এই দৃশ্য শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়; ভারতের প্রায় প্রতি রাজ্যে, এমনকি বিশ্বের বহু গণতন্ত্রেও দেখা গেছে। ক্ষমতার মাধ্যাকর্ষণ সবসময় প্রবল। আদর্শের চেয়েও অনেক বেশি প্রবল।
তৃণমূলের বর্তমান সংকট তাই কেবল একটি দলের সাংগঠনিক সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে একটি আয়না বিশেষ। সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে, কার আনুগত্য আদর্শের প্রতি ছিল, আর কার আনুগত্য ছিল ক্ষমতার প্রতি। ক্ষমতায় থাকাকালীন এই দুই ধরনের মানুষকে আলাদা করা কঠিন। কারণ তখন সবাই একই পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু পরাজয়ের পরই শুরু হয় প্রকৃত পরিচয়পর্ব। তখন বোঝা যায়, কারা সৈনিক, আর কারা কেবল বিজয় মিছিলে হাঁটার অভ্যস্ত যাত্রী।
মনে হয়, এ এক অদম্য দুর্গ। কিন্তু সেই দুর্গের ইটগুলি কী দিয়ে গাঁথা— আদর্শ, না সুবিধা— সেটা বোঝা যায় একমাত্র ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে। তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি সেই পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, এই দলত্যাগের ভাষা আর আগের মতো লজ্জাবনত নয়। এক সময় দলবদলকারী নেতারা অন্তত আদর্শগত মতভেদের গল্প বলতেন। আজ সেই প্রয়োজনও অনেকের নেই। এখন যুক্তি আরও সরল, ক্ষমতায় না থাকলে খাবটা কী? এই স্বীকারোক্তি যেমন নির্মম, তেমনই তা আমাদের গণতন্ত্রের এক গভীর অসুখেরও লক্ষণ। কারণ এটি জানিয়ে দেয়, রাজনীতি আর জনসেবার ক্ষেত্র নয়; বরং রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত আখের গোছানোর একটি ক্রিয়াশীল পরিকাঠামো।
এই কারণেই তৃণমূলের বর্তমান ভাঙনকে শুধুমাত্র কয়েকজন নেতার দলত্যাগ বলে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে ক্ষমতা হারানো মানে শুধু সরকার হারানো নয়, বহু মানুষের কাছে সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব এবং নিরাপত্তা হারানোর সমার্থক। আর সেই মুহূর্তেই আদর্শের বইটি আলমারিতে উঠে যায়, সামনে খুলে যায় হিসাবের খাতা।

রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে— ক্ষমতা নাকি সবচেয়ে বড় আঠা। যতদিন ক্ষমতা থাকে, ততদিন সংগঠনও অটুট বলে মনে হয়। সভায় লোক হয়, দফতরে ভিড় হয়, নেতার বাড়ির সামনে গাড়ির লাইন পড়ে। মনে হয়, এ এক অদম্য দুর্গ। কিন্তু সেই দুর্গের ইটগুলি কী দিয়ে গাঁথা— আদর্শ, না সুবিধা— সেটা বোঝা যায় একমাত্র ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে। তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি সেই পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।
গত ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলই ছিল সূর্য। বাকিরা ছিল গ্রহ-উপগ্রহ। সূর্যের চারদিকে যেমন সব কিছু ঘোরে, তেমনই প্রশাসন, সংগঠন, ব্যবসা, পঞ্চায়েত, পুরসভা, এমনকি অনেক সামাজিক সমীকরণও একসময় তৃণমূলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এতে দোষের কিছু নেই; দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি দলেই এমনটি ঘটে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন দলের ভিত গড়ে ওঠে সংগঠনের উপর নয়, ক্ষমতার উপর। আর বিশেষ একজনের জনমনহরণী শক্তির ওপর।
দ্বিতীয়জনের কাছে মিছিল মানে সরকারি অনুমতি, প্রশাসনিক সুবিধা, গাড়ির বহর আর ভিড়ের নিশ্চয়তা। ক্ষমতা চলে গেলে প্রথমজনের কাজ বাড়ে, দ্বিতীয়জনের রাজনীতি শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি নতুন আশ্রয় খোঁজেন।
ক্ষমতার সঙ্গে একটি অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। মানুষ ক্ষমতাকে ভালবাসে না, মানুষ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে ভালবাসে। কারণ ক্ষমতার আলোয় দাঁড়ালে নিজের ছায়াটাও বড় দেখায়। অনেক নেতা, যাঁদের এলাকায় বিপুল প্রভাব ছিল বলে মনে হত, আজ হঠাৎ দেখছেন সেই প্রভাবের বড় অংশটাই ছিল ক্ষমতার ধার করা আলো। আলো নিভতেই ছায়াও ছোট হয়ে গেছে। এই বাস্তবতা যত নির্মম, ততই শিক্ষণীয়।
রাজনৈতিক কর্মীর দুই রকম পরিচয় থাকে। একজন সংগঠন তৈরি করেন, অন্যজন সংগঠন ব্যবহার করেন। প্রথমজন বিরোধী দলে বসেও মিছিল করতে পারেন। দ্বিতীয়জনের কাছে মিছিল মানে সরকারি অনুমতি, প্রশাসনিক সুবিধা, গাড়ির বহর আর ভিড়ের নিশ্চয়তা। ক্ষমতা চলে গেলে প্রথমজনের কাজ বাড়ে, দ্বিতীয়জনের রাজনীতি শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি নতুন আশ্রয় খোঁজেন।

তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতাদের বক্তব্যে এই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট। তাঁরা বলছেন, বিরোধী দলে থাকলে জনরোষের মুখে পড়তে হবে। এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্যে একটি অঘোষিত সত্য লুকিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে শাসকদল জনগণের প্রশংসা যেমন পায়, তেমনই তাদের সমস্ত ক্ষোভও জমা হতে থাকে। বিদ্যুতের বিল থেকে চাকরি, রাস্তা থেকে দুর্নীতি, সব অভিযোগ শেষ পর্যন্ত শাসক দলের ঘাড়েই এসে পড়ে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সেই ক্ষোভ অনেক সময় প্রকাশের সুযোগ পায় না। কিন্তু সরকার বদলালে যেন বাঁধ ভেঙে যায়। এতদিন যারা চুপ ছিল, তারাও কথা বলতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলে বসে রাজনীতি করা সহজ নয়। বিশেষ করে যাঁদের রাজনৈতিক জীবন ক্ষমতার নিরাপদ ছাতার নিচে কেটেছে, তাঁদের কাছে এই নতুন বাস্তবতা অনেকটা এয়ার-কন্ডিশনড ঘর থেকে হঠাৎ বৈশাখের রোদে বেরিয়ে পড়ার মতো। তাপমাত্রা একই দেশে, কিন্তু অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানেই শুরু হয় ‘রাজনৈতিক বিমা’ খোঁজার প্রক্রিয়া।
সমস্যা কোনও একটি দলের নয়; সমস্যা সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে আদর্শকে সরিয়ে দিয়ে আনুগত্যের একমাত্র মুদ্রায় পরিণত হয়েছে।
সাধারণ মানুষ যেমন অনিশ্চয়তার দিনে জীবন বিমা করেন, অনেক রাজনীতিকও ক্ষমতা বদলের পরে রাজনৈতিক বিমা করতে চান। সেই বিমার প্রিমিয়াম হল আনুগত্য, আর পরিপক্বতার অর্থ নিরাপত্তা। নতুন ক্ষমতার সঙ্গে দূরত্ব যত কম, ঝুঁকিও তত কম, এমন ধারণা ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গ আজ সেই পুরনো রাজনৈতিক অর্থনীতিরই নতুন সংস্করণ দেখছে।
তবে এর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাব পড়ে গণতন্ত্রের উপর। কারণ ভোটার যখন একজন প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন তিনি শুধু ব্যক্তিকে নয়, একটি রাজনৈতিক অবস্থানকেও সমর্থন করেন। সেই প্রতিনিধি যদি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থানও বদলে ফেলেন, তাহলে ভোটারের রায় কার্যত একটি লেনদেনের বস্তুতে পরিণত হয়। ভোটার ভাবেন তিনি একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন; পরে বোঝেন, তিনি আসলে একজন দর-কষাকষির বিশেষজ্ঞকে নির্বাচন করেছিলেন।
আরও পড়ুন: ভাঙনের জয়গান কি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?
প্রশ্নটি শুধু তৃণমূলের নয়। সম্প্রতি যে দল ক্ষমতা হারিয়েছে, তাকেই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন শিব সেনা কিংবা এনসিপি। আগামী দিনে যে কোনও দল ক্ষমতা হারালে, একই প্রশ্ন তার সামনেও দাঁড়াবে। কারণ সমস্যা কোনও একটি দলের নয়; সমস্যা সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে আদর্শকে সরিয়ে দিয়ে আনুগত্যের একমাত্র মুদ্রায় পরিণত হয়েছে।
একসময় ভারতীয় রাজনীতিতে দলত্যাগ মানেই ছিল আদর্শচ্যুতির দীর্ঘ ব্যাখ্যা। নেতারা বলতেন, দলের আদর্শ বদলে গেছে, নেতৃত্ব পথভ্রষ্ট হয়েছে, নীতিগত আপস হয়েছে। সেই বক্তব্যে সত্য-মিথ্যা যতই থাকুক, অন্তত আদর্শের মুখোশটি বজায় থাকত। এখন সেই মুখোশ পরারও প্রয়োজন বোধ হয় না। যেন সবাই অলিখিতভাবে মেনে নিয়েছেন, রাজনীতি আর দর্শনের লড়াই নয়, অবস্থানের লড়াই। কোথায় দাঁড়ালে নিরাপদ থাকা যাবে, সেটাই প্রধান প্রশ্ন। এখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে সূক্ষ্ম সংকটটি তৈরি হয়।
রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে— দল বড়, না ক্ষমতা? উত্তরটি শুনতে সহজ। প্রায় সব নেতা বলবেন, দলই বড়। আদর্শই বড়। মানুষের বিশ্বাসই বড়।
কারণ একজন বিধায়ক বা সাংসদ যখন নির্বাচিত হন, তখন তিনি শুধু নিজের ব্যক্তিগত পরিচয়ে জেতেন না। তিনি একটি দলের প্রতীক, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং একটি মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভোটার তাঁর হাতে শুধু একটি আসন তুলে দেন না; একটি বিশ্বাসও তুলে দেন। সেই বিশ্বাস যদি পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সুবিধার হিসাবের খাতায় স্থানান্তরিত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল একটি দল নয়, ভোটের নৈতিক ভিত্তিটাই।
ইতিহাস বলছে, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দলগুলি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সংগঠনের জোরে, ব্যক্তিপূজার জোরে নয়। আর যে দলগুলি ক্ষমতাকেই সংগঠন ভেবে বসেছিল, তারা ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছে— রাজনৈতিক প্রাসাদের অনেক স্তম্ভই আসলে ছিল বাঁশের মাচা।
তৃণমূলের বর্তমান ভাঙন সেই কঠিন শিক্ষারই আরেকটি অধ্যায়।
রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে— দল বড়, না ক্ষমতা? উত্তরটি শুনতে সহজ। প্রায় সব নেতা বলবেন, দলই বড়। আদর্শই বড়। মানুষের বিশ্বাসই বড়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হল, তার উত্তর মুখে নয়, আচরণে লেখা থাকে। ক্ষমতার পালাবদলের পরই বোঝা যায়, কে আদর্শের রাজনীতিক, আর কে ক্ষমতার পর্যটক।
তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট সেই পরীক্ষার মুহূর্ত।
রাজনীতির একটি বড় ট্র্যাজেডি, এখানে স্মৃতিশক্তি প্রায়ই নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের চেয়েও ছোট হয়ে যায়। গতকাল পর্যন্ত যাঁরা প্রতিপক্ষকে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ বলে চিহ্নিত করছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই সেই প্রতিপক্ষের সঙ্গেই নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দল ছেড়ে যাওয়া বহু নেতা এখনও দাবি করছেন, তাঁরা নাকি তৃণমূলের প্রকৃত আদর্শের পক্ষেই আছেন। তাঁরা শুধু বর্তমান নেতৃত্বের বিরোধিতা করছেন। রাজনৈতিক ভাষায় এটি অত্যন্ত পরিচিত যুক্তি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটি অনেক সহজ। যদি আদর্শ একই থাকে, তবে পতাকা বদলানোর প্রয়োজন হল কেন? যদি বিশ্বাস অটুট থাকে, তবে আশ্রয় পাল্টানোর তাড়া কোথা থেকে এল? এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন না স্পষ্ট হচ্ছে, ততদিন দলত্যাগকে আদর্শগত বিপ্লব বলে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
রাজনীতির একটি বড় ট্র্যাজেডি, এখানে স্মৃতিশক্তি প্রায়ই নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের চেয়েও ছোট হয়ে যায়। গতকাল পর্যন্ত যাঁরা প্রতিপক্ষকে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ বলে চিহ্নিত করছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই সেই প্রতিপক্ষের সঙ্গেই নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, এই রূপান্তর ঘটতে কখনও কখনও কয়েক সপ্তাহও লাগে না। মতাদর্শের বিবর্তন সাধারণত দীর্ঘ সময় নেয়; কিন্তু ক্ষমতার বিবর্তন এক রাতেই ঘটে।

তৃণমূলের ভাঙন তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ভারতের রাজনীতির এক পুরনো রোগের নতুন উপসর্গ। এই রোগের নাম ক্ষমতানির্ভর আনুগত্য। যতদিন ক্ষমতা আছে, ততদিন দল মানেই পরিবার, নেতা মানেই প্রেরণা, কর্মসূচি মানেই আদর্শ। ক্ষমতা চলে গেলে হঠাৎই পরিবার ভেঙে যায়, প্রেরণা ফুরিয়ে যায়, আদর্শের নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কৃত হয়। যেন রাজনৈতিক অভিধানের প্রতিটি শব্দের অর্থ নির্ধারণ করে সরকারিভাবে কে ক্ষমতায় আছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। ভোটার ভেবেছিলেন, তিনি একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন। পরে দেখলেন, তিনি আসলে এমন একজনকে নির্বাচিত করেছেন, যিনি রাজনৈতিক আবহাওয়ার খবর সবচেয়ে দ্রুত পড়তে পারেন। ঝড় এলে গাছ যেমন হেলে পড়ে, তেমনই অনেক রাজনীতিকও ক্ষমতার হাওয়া বুঝে দিক পরিবর্তন করেন। পার্থক্য শুধু একটাই— গাছের শিকড় থাকে, অনেক রাজনীতিকের তা-ও থাকে না।
আজ প্রশ্নটি শুধু তৃণমূলকে নিয়ে নয়। আগামী দিনে যে কোনও দল ক্ষমতা হারালে কি একই দৃশ্য দেখা যাবে? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সমস্যাটি কোনও দলের নয়, ভারতীয় রাজনীতির।
অবশ্য দলবদলকে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকও বলা যায় না। গণতন্ত্রে মতবিরোধ হবে, দল ভাঙবে, নতুন দল গড়বে, নতুন জোট হবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিত্তি যদি হয় নীতি, কর্মসূচি, অর্থনীতি, সমাজদর্শন বা সাংবিধানিক প্রশ্ন, তাহলে তাকে গণতান্ত্রিক বিবর্তন বলা যায়। কিন্তু ভিত্তি যদি হয় নিরাপদে থাকা, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অথবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, তাহলে সেটি আর মতাদর্শের যাত্রা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আশ্রয়ের সন্ধান।
তৃণমূলের বর্তমান অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ক্ষমতায় থাকাকালীন করতালির শব্দকে কখনও সাংগঠনিক শক্তি ভেবে বসা উচিত নয়। মন্ত্রীর গাড়ির সামনে ভিড়, নেতার বাড়ির বাইরে লাইন, সভায় হাজার হাজার পতাকা এসবের অনেকটাই ক্ষমতার আকর্ষণ। ক্ষমতা চলে গেলে যদি সংগঠনও উধাও হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে দুর্গটি পাথরের ছিল না; ছিল রঙিন প্লাইউডের। বাইরে থেকে দৃঢ়, ভিতরে ফাঁপা।

তাই আজ প্রশ্নটি শুধু তৃণমূলকে নিয়ে নয়। আগামী দিনে যে কোনও দল ক্ষমতা হারালে কি একই দৃশ্য দেখা যাবে? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সমস্যাটি কোনও দলের নয়, ভারতীয় রাজনীতির। আর যদি আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলাতে হবে। ক্ষমতায় কতদিন ছিলে, সেটাই বড় কথা নয়। ক্ষমতা হারানোর পরও তোমার পাশে কতজন বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, সেটাই প্রকৃত শক্তির পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ইতিহাস একটি নির্মম সত্যই বারবার প্রমাণ করেছে। ক্ষমতা মানুষের চরিত্র বদলায় না; চরিত্রকে প্রকাশ করে। তেমনি পরাজয় কোনও দলের আনুগত্য নষ্ট করে না; আনুগত্যের আসল ভিত্তিটা প্রকাশ করে। তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান ভাঙন সেই কারণেই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি একটি আয়না। সেই আয়নায় শুধু একটি দলের মুখ দেখা যাচ্ছে না; দেখা যাচ্ছে ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘদিনের অভ্যাস, দুর্বলতা এবং আত্মপ্রবঞ্চনাও।
হয়তো এ কারণেই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দলবদল নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর। আমাদের রাজনীতিতে আদর্শ কি এখনও ক্ষমতার চালক, নাকি ক্ষমতাই আদর্শের শেষ অভিধান? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; ভারতের গণতন্ত্রের মানও অনেকখানি নির্ধারণ করবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত