(Electoral Autocracy)
নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র। শুনলে মনে হয় কাঁঠালের আমসত্ত্ব, তা আবার হয় নাকি?
হয়, হয়, zanti পারো না।
হালফিলের দুনিয়ার দিকে মন দিয়ে তাকান, বুঝতে পারবেন— এমন কাঁঠালের আমসত্ত্ব দেশে দেশে কী হারে বিকোচ্ছে, কীভাবে জনতার রায়ে নির্বাচিত শাসক গিরগিটির মতো রঙ বদলাচ্ছেন, কতটা দ্রুত বেগে ছড়িয়ে পড়ছে গণতন্ত্রের এই মারণব্যাধি। অত কষ্ট না পোষালে, স্রেফ নিজের রাজ্যকে মন দিয়ে অবলোকন করুন, দুধ কা দুধ, পানি কা পানি আপনার চোখের সামনে উজ্জ্বল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: ভোটবাক্সের ডানদিক বাঁদিক
হেঁয়ালি ছেড়ে এই বিচিত্র ব্যবস্থার চরিত্র-লক্ষণের দিকে তাকানো যাক। অবাধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বহিরঙ্গটুকু দেখবেন হুবহু একই আছে। গুচ্ছের রাজনৈতিক দল আছে, তাদের রং-বেরঙের পরিচিত ঝান্ডা পতপত করে আগের মতো এখনও হাওয়ায় উড়ছে, ভোট আছে, ব্যালট আছে, মিছিল আছে, টিভি স্টুডিওতে কলতলার ঝগড়া, সবই যেমন থাকার তেমনই আছে। অথচ দিনের শেষে সব রাজপথ, সব অলি-গলি গিয়ে মিশছে একজন ব্যক্তিরই দরজায়। তিনিই স্বর্গ, তিনিই ধর্ম, তিনিই পরম তপস্যা। শেষ পর্যন্ত সব রাস্তা গিয়ে মেশে এক ব্যক্তির দরজায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ইহাকেই বলে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকে এই কাঠামোয় ফেলে দেখুন, ছবিটা আশ্চর্য রকম পরিষ্কার হয়ে যাবে। মানে ‘খাপে খাপ কেদারের বাপ’ যাকে বলে আর কী! বুঝবেন, দূর থেকে যাকে ছলছলরত জলাভূমি বলে বিভ্রম হচ্ছিল, আসলে তা মরীচিকা।
মমতার শাসনের গল্প শুরু হয়েছিল বিদ্রোহ দিয়ে। তিনি এসেছিলেন এক ক্লান্ত, জীর্ণ, আত্মতুষ্ট বাম শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষের ঢেউয়ে ভেসে। মানুষ তাঁকে বেছে নিয়েছিল মুক্তির প্রতীক হিসেবে, একটি শক্ত, কেন্দ্রীভূত, ক্যাডার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে সরিয়ে আরও উন্মুক্ত রাজনীতির হাওয়ায় বাঁচার আশায়। ইতিহাসের পরিহাস এই যে, তিনি শিব গড়তে চেয়ে বাঁদরের মতো দেখতে একটা কিছু গড়ে ফেললেন, এমন একটি ব্যবস্থা যার টেমপ্লেটটি হয়ে দাঁড়াল, ‘আমি, আমি, আমি।’ তাহলে বাকি সব? সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়। ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল। দুনিয়ার বহতা স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রবেশ করল সম্পূর্ণ ব্যক্তি-নির্ভর ব্যবস্থার নিকষ কালো গহ্বরে। মন্ত্রী, সান্ত্রী, ভৃত্য, অমাত্য সব আগের মতোই রইল। বদলে গেল তাদের চরিত্র। জনতা-জনার্দনের বদলে তাঁরা সবাই রাতারাতি বনে গেলেন রানিমার সেবাদাস!

বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের একটা সাধারণ ফর্মুলা আছে। নেতা প্রথমে নিজেকে জনগণের একমাত্র প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের রাজনৈতিক ছায়ায় টেনে আনেন। আদালত পুরো ভাঙেন না, নির্বাচন পুরো বন্ধ করেন না, সংবাদমাধ্যম পুরো বন্ধ করেন না। শুধু এমনভাবে প্রভাবিত করেন যে, তারা আর সত্যিকারের স্বাধীন থাকে না। ভিক্টর অরবান হাঙ্গেরিতে যা করেছেন, এরদোয়ান তুরস্কে যা করেছেন, লাতিন আমেরিকার নানা দেশে যা দেখা গিয়েছে— বাংলায় তার এক স্বদেশি সংস্করণ আমরা দেখি “দিদির সরকারে।”
মমতার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু দল নয়, প্রতিষ্ঠান নয়, মতাদর্শও নয়, তিনি নিজে। তাঁর শাসনে সরকার যেন ধীরে ধীরে এক ব্যক্তির সম্প্রসারিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে। বাংলার প্রশাসনে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, আমলা— সবাই শেষ পর্যন্ত একজনের ইচ্ছার অনুবাদক। রাজ্যের নীতি নির্ধারণে মন্ত্রিসভা আছে, তাঁদের নানাবিধ দফতর আছে, লালবাতি-নীলবাতি সবই অক্ষত আছে। সবাই আসলে রানিমার রাজত্বের চিড়েতন, হরতন, ইস্কাবন। সবাই দেখতে মানুষেরই মতো, কাছে গেলে বোঝা যায় আসলে কাঠের পুতুল। ধ্বনি অন্যত্র, তাঁরা কেবলই প্রতিধ্বনি। একটাই পোস্ট বাকি সব ল্যাম্প পোস্ট।
স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল আসন জয়, রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ, এসব পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতির বহু পুরোনো চিত্রনাট্য। ভোটবাক্স আছে, কিন্তু ভোটের আগের রাস্তা যদি ভয়ের কাঁটাতারে ঘেরা থাকে, তবে সেই নির্বাচন কতটা মুক্ত?
এই ধরনের শাসনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হল সরকার আর দলের মাঝখানের ভেদরেখাটি মুছে যাওয়া। ১৫ বছর ধরে দেখতে দেখতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ জেনে গিয়েছে বিগ্রহের কাছে পৌঁছতে হলে আগে পান্ডা ধরতে হবে। কেন? না সরকার-বাহাদুর এই পান্ডাদের কথাতেই উঠবোস করে। এই পান্ডারা সব্বাই একটি মন্ত্রে বিশ্বাস করে— ফেল কড়ি মাখো তেল। রেশন কার্ড থেকে পঞ্চায়েতের কাজ, সন্তানের চাকরি অথবা বদলি, সরকারি ভাতা থেকে শ্মশান যাত্রার শকটের ব্যবস্থা সব কিছুর গায়ে একটা প্রাইস ট্যাগ আছে, এক এক পান্ডার ক্ষেত্রে এক এক রকম। নজরানা দিলেই যে কাজ হবে তার গ্যারান্টি নেই, আবার কাজ করাতে চাইলে নজরানার কোনও বিকল্পও নেই। সবখানেই পাইক-বরকন্দাজদের মধ্যস্থতার এক অদৃশ্য জাল। সরকারি অফিস সরকারি নয়; দলীয় অনুমোদন ছাড়া দরজা খুলতে চায় না। গণতন্ত্রে নাগরিক সরকারের কাছে যায় অধিকারবোধ নিয়ে, নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রে নাগরিক যায় শাসকদলের কাছে অনুগ্রহ চাইতে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কল্যাণনীতির চতুর ব্যবহার। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী— এই প্রকল্পগুলির সামাজিক মূল্য অস্বীকার করা যাবে না। আবার রাজনৈতিক দিক থেকেও এগুলো অসাধারণ কার্যকর। কারণ এগুলো এমনভাবে ব্র্যান্ড করা হয়েছে, যাতে নাগরিকের মনে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে নেত্রীর সঙ্গে। রাষ্ট্র অদৃশ্য, নেতা দৃশ্যমান। ফলে ভোটার ভাবেন না, “এটি আমার করের টাকায় প্রাপ্য অধিকার”; বরং ভাবেন, “দিদি আমাকে দিয়েছেন।” এটাই নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব: নাগরিককে অধিকারভোগী নয়, কৃতজ্ঞ প্রজায় পরিণত করা।
নির্বাচন এই ব্যবস্থার প্রাণ, কিন্তু সেটি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়। ভোট হয়, বিরোধীরা লড়ে, ফলও আসে। কিন্তু খেলার মাঠ সমতল থাকে না। স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল আসন জয়, রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ, এসব পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতির বহু পুরোনো চিত্রনাট্য। ভোটবাক্স আছে, কিন্তু ভোটের আগের রাস্তা যদি ভয়ের কাঁটাতারে ঘেরা থাকে, তবে সেই নির্বাচন কতটা মুক্ত?

মমতার শাসনের আরেকটি চিহ্ন হল বিরোধী রাজনীতিকে ‘বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী’ নয়, ‘অস্তিত্বগত শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরা। তাঁর বক্তৃতায় বিরোধীরা প্রায়শই শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন; তারা বাংলার শত্রু, ষড়যন্ত্রকারী, বাইরের শক্তির এজেন্ট। এই ভাষা খুব পরিচিত। ট্রাম্পের আমেরিকায়, এরদোয়ানের তুরস্কে, অরবানের হাঙ্গেরিতে— সর্বত্রই শাসক একই কৌশল নেন, যেখানে বিরোধিতা মানেই দেশদ্রোহিতা। ফলে নেতা আর জাতি হয়ে ওঠে সমার্থক।
আর আছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রে শিল্পী-সাহিত্যিকদের জেলে পোরা হয় না, বরং তাদের অনেককে আপন করে নেওয়া হয় ছলে-বলে-কৌশলে। পুরস্কার, পদ, কমিটি, বোর্ড এই সব সস্তা প্রলোভনের মাধ্যমে এক ধরনের নরম আনুগত্য তৈরি হয়। কাউকে হয়তো সরাসরি চুপ করানো হয় না, কিন্তু এমন পরিবেশ গড়ে ওঠে, যেখানে সমালোচনা ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। নীরবতা তখন সেন্সরের ফল নয়, সুবিধাজনক সহাবস্থানের ফল।
নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র কখনও খাঁটি দমনমূলক নয়। এটি মানুষকে কিছু দেওয়া-থোওয়ার ব্যবস্থাও করে- সুবিধা, সুরক্ষা, পরিচয়ের অনুভূতি। একই সঙ্গে বিকল্পকে দুর্বল, বিশৃঙ্খল বা বিপজ্জনক বলে তুলে ধরে।
তবে, মমতার মডেলকে আলাদা করে তোলে তাঁর মতাদর্শহীনতা। অরবানের illiberal democracy-র মতো কোনও সুস্পষ্ট দার্শনিক কাঠামো এখানে নেই। এখানে মূল মতবাদ একটাই— ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। এই শাসন তত্ত্ব নয়, প্রবলভাবে ব্যবহারিক; নীতি নয়, নিয়ন্ত্রণ; আদর্শ নয়, আনুগত্য। তাই এটি একধরনের খাঁটি পপুলিস্ট প্যাট্রনেজ রাষ্ট্র— যেখানে আবেগ, অনুদান, ভয়, আনুগত্য এবং ব্যক্তিপুজো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— মানুষ তাহলে বারবার ভোট দেয় কেন? কারণ নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র কখনও খাঁটি দমনমূলক নয়। এটি মানুষকে কিছু দেওয়া-থোওয়ার ব্যবস্থাও করে- সুবিধা, সুরক্ষা, পরিচয়ের অনুভূতি। একই সঙ্গে বিকল্পকে দুর্বল, বিশৃঙ্খল বা বিপজ্জনক বলে তুলে ধরে। ফলে ভোটার অনেক সময় শাসককে ভালবেসে নয়, অনিশ্চয়তার ভয় থেকে বেছে নেন। এই ভয়ই নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের আসল ভোটব্যাঙ্ক।

শেষ পর্যন্ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গ আমাদের এক গভীর শিক্ষা দেয়— গণতন্ত্র কেবল ভোট নয়। গণতন্ত্র হল প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা, বিরোধিতার নিরাপত্তা, নাগরিকের মর্যাদা, এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা। ভোট যদি থাকে, কিন্তু প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট হয়; সংবাদমাধ্যম ভয় পায়; বিরোধী কণ্ঠ চাপে থাকে; দল রাষ্ট্রের উপরে বসে পড়ে— তাহলে গণতন্ত্রের শরীর থাকে, আত্মা শুকিয়ে যায়।
বাইরে থেকে সবকিছু তখন ঠিকঠাকই দেখায়— পোস্টার আছে, প্রচার আছে, ভোটের দিন লাইনও আছে। শুধু অদৃশ্যভাবে বদলে যায় একটি জিনিস— নাগরিক আর রাষ্ট্রের মালিক থাকেন না, তিনি হয়ে যান শাসকের দর্শক অথবা সেবক। সেই মুহূর্তেই গণতন্ত্র নিঃশব্দে নিজের ছায়ায় পরিণত হয়।
যখন নেতার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, ভোটে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তদন্তের ভয় আসে, বা উত্তরসূরি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়— দলের ভিতরে ফিসফাস শুরু হয়। আগে যারা নেতার সামনে মাথা নত করত, তারা আড়ালে বিকল্প পথ খোঁজে। প্রকাশ্যে বিদ্রোহের আগে আসে নীরব দূরত্ব— সভায় করতালি কমে যায়, ফোন ধরতে দেরি হয়, নির্দেশ পালনে ঢিলেমি বাড়ে।
নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ধাঁধা হল, এরা বাইরে থেকে অনেক দিন পর্যন্ত অটুট, অজেয়, প্রায় অপরাজেয় বলে মনে হয়। এরা ভোটে জেতে, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে রাখে, বিরোধীদের দুর্বল করে, সংবাদমাধ্যমকে বশ মানায়। সব দেখে মনে হয়, এই শাসন বুঝি অনন্তকাল চলবে। অথচ ইতিহাস বলে, এই ধরনের ব্যবস্থার পতন সাধারণত খুব ধীরে ধীরে নয়, বরং হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যেন দীর্ঘদিন ধরে বাঁধে ফাটল জমছিল, বাইরে কেউ দেখেনি; একদিন আচমকা জলোচ্ছ্বাসে সব ভেসে গেল।
পতনের প্রথম লক্ষণ দেখা যায়, শাসকের অবিনশ্বরতার মিথ ভাঙতে শুরু করলে। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর— “ওদের হারানো যায় না।” যতদিন মানুষ, আমলা, দলীয় কর্মী, এমনকি বিরোধীরাও বিশ্বাস করে শাসক অপরাজেয়, ততদিন ব্যবস্থাটি স্থিতিশীল। কিন্তু কোনও এক উপনির্বাচনে অপ্রত্যাশিত হার, কোনও বড় শহরে পৌর নির্বাচনে ধাক্কা, অথবা কোনও আন্দোলনে সরকারের পশ্চাদপসরণ এই ছোট ছোট ঘটনাই প্রথম সংকেত দেয়— সম্রাট আসলে খড়ের পুতুলও হতে পারেন।

দ্বিতীয় লক্ষণ হল, অভ্যন্তরীণ আনুগত্যে চিড় ধরা। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রে শাসকদল সাধারণত আদর্শে নয়, ক্ষমতার সম্ভাবনায় ঐক্যবদ্ধ থাকে। যতদিন ক্ষমতা লাভজনক, ততদিন সবাই বিশ্বস্ত। কিন্তু যখন নেতার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, ভোটে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তদন্তের ভয় আসে, বা উত্তরসূরি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়— দলের ভিতরে ফিসফাস শুরু হয়। আগে যারা নেতার সামনে মাথা নত করত, তারা আড়ালে বিকল্প পথ খোঁজে। প্রকাশ্যে বিদ্রোহের আগে আসে নীরব দূরত্ব— সভায় করতালি কমে যায়, ফোন ধরতে দেরি হয়, নির্দেশ পালনে ঢিলেমি বাড়ে।
তৃতীয় সংকেত, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক অকার্যকারিতা। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র সাধারণত কিছুদিন পর্যন্ত কল্যাণ প্রকল্প, ভর্তুকি, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জনসমর্থন ধরে রাখে। কিন্তু অর্থনীতি দুর্বল হলে, রাজস্ব কমলে, কর্মসংস্থান না বাড়লে, দুর্নীতি অতিরিক্ত প্রকট হলে এই মডেল ভেঙে পড়ে। কারণ তখন নাগরিক বুঝতে শুরু করেন, অনুদান দিয়ে ক্ষোভ চিরকাল চাপা রাখা যায় না। বাজারে দাম বাড়ছে, চাকরি নেই, রাস্তাঘাট ভাঙা— এই বাস্তবতা রাজনৈতিক প্রচারের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একই মুখ ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, “আর নতুন কিছু নেই?” শাসকের পুরনো ভাষণ তখন অনুপ্রেরণা নয়, পুনরাবৃত্তি মনে হয়। আকর্ষণ পরিণত হয় একঘেয়েমিতে।
চতুর্থ লক্ষণ, ভয় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক বড় শক্তি হল ভয়ের সংস্কৃতি— প্রশাসনিক ভয়, রাজনৈতিক ভয়, সামাজিক ভয়। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন ক্ষোভ ভয়কে ছাড়িয়ে যায়। তখন দেখা যায়, আগে যেখানে পাঁচজন প্রতিবাদে আসত, এখন পাঁচ হাজার আসে। বিরোধী দলের সভায় লোক বাড়ে, সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ তীব্র হয়, বিরুদ্ধ জনমত গড়ে ওঠে। ইতিহাসে বারবার দেখা গিয়েছে, যে মুহূর্তে মানুষ শাসককে ভয় পাওয়ার বদলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে, পতনের কাউন্টডাউনের শুরু সেখানেই।
পঞ্চম লক্ষণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষ শাখা-প্রশাখাগুলি হঠাৎ নীরবে সরে যায়। আমলাতন্ত্র, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, এরা যতদিন শাসকের পক্ষে সম্পূর্ণ সক্রিয় থাকে, নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র ততদিন শক্তিশালী। কিন্তু যখন প্রশাসনের ভিতরে “কেন ঝুঁকি নেব” মনোভাব আসে, তখন নির্দেশ আর আগের মতো কার্যকর হয় না। আমলা ফাইল আটকে রাখেন, পুলিশ অতিরিক্ত আগ্রহ দেখায় না, স্থানীয় নেতা মাঠে নামতে ভয় পান। শাসকের পতনের আগে প্রায়ই দেখা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি আনুগত্য থাকে নামমাত্র, প্রাণ থাকে না।

সবচেয়ে নাটকীয় লক্ষণ হল ব্যক্তিপুজোর ক্লান্তি। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রে নেতা দীর্ঘদিন একই মুখ, একই ভাষা, একই প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে থাকেন। একটা সময় পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতিই স্থিতিশীলতার প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একই মুখ ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, “আর নতুন কিছু নেই?” শাসকের পুরনো ভাষণ তখন অনুপ্রেরণা নয়, পুনরাবৃত্তি মনে হয়। আকর্ষণ পরিণত হয় একঘেয়েমিতে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে। পতনের লক্ষণ স্পষ্ট হলেও পতন অবধারিত নয়। অনেক নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র শেষ মুহূর্তে নিজেকে বদলে নেয়। নতুন মুখ আনে, নরম হয়, জোট করে, বিরোধীদের কিছুটা জায়গা দেয়। কেউ কেউ আবার আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তাই ফাটল মানেই ভাঙন নয়। কিন্তু ফাটল মানে ভাঙনের আশঙ্কা আর অস্বীকার করা যায় না।
জনগণ আর ভয় পায় না, দল আর নিঃশর্ত বিশ্বস্ত থাকে না, এবং রাষ্ট্রযন্ত্র আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। তখন নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র— অপরাজেয়তার ভ্রম— ধসে পড়ে।
সংক্ষেপে, এই ধরনের শাসনের পতন তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন তিনটি জিনিস একসঙ্গে ঘটে— জনগণ আর ভয় পায় না, দল আর নিঃশর্ত বিশ্বস্ত থাকে না, এবং রাষ্ট্রযন্ত্র আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। তখন নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র— অপরাজেয়তার ভ্রম— ধসে পড়ে।
আর একবার সেই ভ্রম ভেঙে গেলে, যা এতদিন পাহাড় বলে মনে হচ্ছিল, দেখা যায় সেটি আসলে ছিল উঁইয়ের ঢিবি, দীর্ঘদিনের জমে থাকা আতঙ্ক, আনুগত্য আর অভ্যাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক রাজনৈতিক মরীচিকা।
শেষ প্রশ্নটি হল, বাংলায় কি নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রেরও পতন আসন্ন? ভাঙনের জয়গান কি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
2 Responses
সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সাংবাদিকতা দু দশক নয়,অন্তত সাড়ে তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে সংবাদ পত্র করছেন,আর এই মূহূর্তেও সাংবাদিকতাই করছেন,যা যোগ করলে সময়টা আরও দীর্ঘ।এই পান্ডিত্য আজকের সংবাদ জগতে অত্যন্ত বিরল।শুভেচ্ছা রইলো……..
অনবদ্য , সঠিক পর্যবেক্ষণ ও বিশলেষণ।