(Wall Writing)
শিরীষের আঠা।
গুঁড়ো, ঝুরো কালো রং।
সাদা বাংলায় ভুষো।
ভুষো কালি।
আলকাতরা— ‘গঙ্গাজল’ মার্কা কোলতার।
ব্ল্যাক জাপান।
‘রবিন ব্লু’ – বড় কৌটো।
আরও পড়ুন: ভাঙনের জয়গান কি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?
চওড়া ব্রাশ,
সরু তুলি, ধর্মতলার জিসি লাহা থেকে কিনলে ভাল হয়।
সরু তুলি, সিনথেটিক নয়, সেবল হেয়ারে তৈরি। যা এখন দুষ্প্রাপ্যই শুধু নয়, নিষিদ্ধ।
রেড অক্সাইড।

এই সব উপাদানই ‘অক্ষরমালা বিভূষণে’ করে দেওয়াল দখলের আন্তরিক জিনিসপত্র। ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেওয়ালে দেওয়ালে কথা-গর্জন, অক্ষরের দারুণ দীপ্তি। কী চমৎকার, নয়ন লোভন, নয়ন শোভন অক্ষরের ছাঁদ— গড়ন।
মনে পড়ে, সাতের দশকের শুরুয়াত আর ছয় দশকের প্রায় শেষ লগ্নে ‘প্রাউটিস্ট ব্লক’— আনন্দমূর্তিজি—প্রভাতরঞ্জন সরকার প্রতিষ্ঠিত ‘আনন্দমার্গ’-এর রাজনৈতিক সংগঠন- যাদের পুরো নাম ছিল ‘প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইনডিয়া’। ‘নোতুন পৃথিবী’- হ্যাঁ, এই বানানেই তাঁদের দৈনিকটি প্রকাশিত হত একটু— একটু নয়, খানিকটা ছোট জায়গা নিয়ে, অর্থাৎ নিউজ প্রিন্টটি, যেখানে খবর ছাপা হয়, তার আয়তন বাংলা ও ইংরেজি এবং হিন্দি অথবা উর্দুতে প্রকাশিত দৈনিকের থেকে তুলনায় ক্ষুদ্রতর।
তো থাক সে সব প্রসঙ্গ। ‘আনন্দ মার্গ’ এবং ‘প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইনডিয়া’-র অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় তাত্ত্বিক নেতা, সংগঠক জগদীশ্বরানন্দজিকে দেখেছি ‘নোতুন পৃথিবী’ নিয়ে সাতের দশকের প্রায় শেষ লগ্নে ‘দৈনিক বসুমতী’র সম্পাদক বিশিষ্ট সংবাদিক প্রশান্ত সরকারের কাছে আসতেন নিজেদের সংগঠনের প্রেস রিলিজসহ ‘নোতুন পৃথিবী’র নবতম সংখ্যাটি দিতে। একদা রেল চাকুরে প্রভাতরঞ্জন সরকার, যিনি পরে আনন্দমূর্তিজি নামে প্রচারিত হন, ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে তো বটেই, দেশের বাইরে পৃথিবীর কোনও কোনও কেন্দ্রে।
তাঁরা দেওয়ালে দেওয়ালে লিখতেন— ‘কমিউনিজমের গেল দিন, প্রাউট দর্শন জেনে নিন’। পাশাপাশি লিখতেন— ‘ক্যাপিটালিজম মেকস দ্য ম্যান বেগার, অ্যান্ড কমিউনিজম মেকস দ্য ম্যান বিস্ট’। তাঁরা— আনন্দমার্গীরা পাটনা জেলে নব্বই দিন অনশনের পর আনন্দমূর্তিজি— প্রভাতরঞ্জন সরকারকে যে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, তা নিয়েও দেওয়াল লিখতেন। এইসব লিখিত উচ্চারণ এই জন্য, ‘আনন্দমার্গ’ বা ‘প্রাউটিস্ট ব্লক’-এর দেওয়াল লিখনের অক্ষরকলা একই রকম। এতে বোঝা যায়, ওয়ালিং করা— দেওয়ালের অক্ষর-কারিগর এক জনই, অক্ষর সাজানোর টানটোন হুবহু এক।

একই কথা বলা চলে, বালক ব্রহ্মচারীর ‘সন্তান দল’ প্রসঙ্গে। তাঁরা দেওয়ালে দেওয়ালে ‘বেদ ভিত্তিক সাম্যবাদ’-এর কথা লিখতেন। বড় বড় ত্রিশূল আঁকতেন, লিখতেন— ‘রাম নারায়ণ রাম’, সেই সঙ্গে মহাকাশের মহাজ্ঞানই হল বেদ। নেতাজি আসছেন যোদ্ধার বেশে। এই যে দেওয়ালে দেওয়ালে লেখার অক্ষর ডিজাইন— লেটারিং ‘সন্তান দল’-এর, তাও এক ছাঁচে বাঁধা। ছয়ের দশকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল— আরএসপি ভেঙে আরএসপি (এম-এল) তৈরি হয়। আরএসপি (এম-এল)— ভারতের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) তৈরি হলে তাঁদের মুখপত্র হয় ‘সন্ধিক্ষণ’। সন্দীপ বাগচী ছিলেন আরএসপি (এম-এল) এর বড়-তাত্ত্বিক নেতা।
ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতার বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ— বিবাদী বাগ, পূর্বতন ডালহৌসি স্কোয়ার— অতি বিখ্যাত কলকাতার অফিসপাড়া, সেখানে আরএসপি (এম-এল)-এর যে যে দেওয়াল লিখন চোখে পড়ত, তার অক্ষর-সৌকর্য বিবাদী বাগের বাইরেও একই রকম। ‘আনন্দমার্গ’— ‘প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইনডিয়া’, ‘সন্তান দল’, আরএসসি- পূর্বতন নামে এমওয়াইএলও— মার্কসিস্ট ইয়ুথ লিগ অর্গানাইজেশন, তাঁদের যে দেওয়াল লিখন, যেমন ‘ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ পুনরায় গণচীন আক্রমণ করলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।’
‘স্টেটসম্যান’-এর পুরনো পাতায় লাল আলতা দিয়ে নির্বাচনী, অথবা দাবিদাওয়া, আন্দোলনের খবরাখবর, নির্বাচনী যুদ্ধে ছাপানো পোস্টার— অখণ্ড কমিউনিস্ট পার্টি— সিপিআই-এর ‘ভোট দেবেন কি সে/ কাস্তে ধানের শীষে’।
‘কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ-অধিকারের দাবি জিন্দাবাদ।’ ‘নাগা-মিজো-কুকি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ জিন্দাবাদ।’ ‘বিশ্বে এনেছে নতুন দিন/ মাও-হোজা-কমরেড লিন’। ‘আরএসসি-এর পুরো কথা রেভেলিউশানারি স্টুডেন্ট কমিটি, তাঁরা বিশ্বাসী ছিলেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব- ‘এসআর’-এর পড়ে। হুগলির কোন্নগর রেল স্টেশন, হাওড়ার বালি ছিল এই সব ওয়ালিং-এর আঁতুড়। একই ধাঁচের অক্ষর-টানটোন।
কোন্নগরের দিলীপ বাগচী, দিলীপ খান, এঁরা ছিলেন আরএসসি-এর বড় নেতা। আসলে এই সব দেওয়াল লিপিতে এক রকম ব্রাশ ও তুলির টান নিয়ে প্রথমেই— শুরুয়াতেই একটু বলে নিলাম। পাঁচের দশকে— ১৯৫২-এর সাধারণ নির্বাচনে সেভাবে ওয়ালিং-দেওয়াল লেখা কই? তখন না-ভাঙা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি— সি পি আই ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ অথবা ‘দৈনিক বসুমতী’, নয়তো ‘স্টেটসম্যান’-এর পুরনো পাতায় লাল আলতা দিয়ে নির্বাচনী, অথবা দাবিদাওয়া, আন্দোলনের খবরাখবর, নির্বাচনী যুদ্ধে ছাপানো পোস্টার— অখণ্ড কমিউনিস্ট পার্টি— সিপিআই-এর ‘ভোট দেবেন কি সে/ কাস্তে ধানের শীষে’। তখন তো দেওয়াল লিখন প্রায় অনুপস্থিত।

ফরওয়ার্ড ব্লক, অখিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ, জাতীয় কংগ্রেস, প্রজা সোসালিস্ট পার্টি— পিএসপি, সংযুক্ত সোসালিস্ট পার্টি, রাম-রাজ্য পরিষদ, আরএসপি, এসইউসি- তখনও এসইউসি হয়নি এসইউসিআই(সি), তাদেরও দেওয়াল লিখন নেই। দেওয়াল লিখনে রমরমানি শুরু হল ছয়ের দশকে, তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের খণ্ডিত অংশ উত্তর ভিয়েতনাম, যার রাজধানী হ্যানয় এবং ভিয়েত কং গোরিলারা— ‘তোমার নাম আমার নাম / ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম…’।
‘পিএল ৪৮০ বাতিল কর।’ ১৯৬৭-র ২৪-২৫ মে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া নতুন করে জেগে উঠল বিদ্রোহী মশাল নিয়ে। সশস্ত্র কৃষকের তীর-কাঁড়, বর্শা-বল্লম টাঙি, দা-কুড়ুল, লাঠি সব মিলিয়ে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের এক দাবানলকামী স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল প্রসাদুজোত, ব্যাঙ্গাইজোত— সর্বত্র লাল স্বপ্নের এক নিবিড় দুন্দুভি।
শিরীষের আঠা মিশ্রিত অক্ষর সঞ্চারে নতুন বাক্য শিখল— ‘তোমার নাম আমার নাম/ নকশালবাড়ি ভিয়েতনাম’, ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘের/মাওয়ের চিন্তা সফল কর’
এই বিদ্রোহ যাপনের সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালেরা— শহর ও গ্রামের পাঁচিল ও দেয়ালগুলি রঙিন অক্ষরমালা অথবা কালো— ব্ল্যাক জাপান, আলকাতরা নয়তো শিরীষের আঠা মিশ্রিত অক্ষর সঞ্চারে নতুন বাক্য শিখল— ‘তোমার নাম আমার নাম/ নকশালবাড়ি ভিয়েতনাম’, ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘের/মাওয়ের চিন্তা সফল কর’, ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান/ চীনের পথ আমাদের পথ’, ‘ভোট ভোট করছে কারা/ সাম্রাজ্যবাদের দালাল যারা।’, ‘সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ/ সাইনবোর্ডে মার্কসবাদী কাজে কংগ্রেস’।
নকশালবাড়ির ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ছয়ের দশকের শেষ থেকেই মেজাজ বদলে দিল দেওয়াল লিপির। অনেক, অনেক বেশি ধারালো, তেজি, ঝাঁঝালো, জঙ্গী হয়ে উঠল দেওয়ালের অক্ষরসজ্জা, বাক্যগঠন। স্লোগান-ছবিও গেল বদলে। ‘রবিন ব্লু’, আলকাতরা ব্ল্যাক জাপান, রেড অক্সাইড, উনুনে ফুটিয়ে তোলার শিরীষ আঠার সঙ্গে ভুষো কালির জ্যাজ, অর্কেস্ট্রা, অ্যাবা— ঝোড়ো পশ্চিমি সংগীতের তীব্র মূর্ছনা।

এই সব অতি পরিশ্রমী দেওয়াল লিখনই ১৯৭২ সালে ‘জোর যার মুলুক তার’, এমন একটা রক্তাক্ত খোঁচাকেই জোর করে মুছিয়ে দিতে থাকে ইন্দিরা কংগ্রেস— সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের খোচড় কাম পুলিশ বাহিনী, সঙ্গে নকশালরা, নব কংগ্রেস— তথাকথিত নব কংগ্রেসের গুণ্ডা, পেশীদাররা যারা জেল থেকে কায়দা করে ছাড়া পেয়েছে, নয়তো পাড়ায় ‘বসে যাওয়া নকশাল’ তাদের দিয়েই দেওয়াল মোছাচ্ছে থানার লোকজন। টিনের বালতির ভেতর গোলা, সাদা কলিচুন, সেই সঙ্গে পাটের গোছা দিয়ে বানানো, হ্যাঁ, বাঁশের পোক্ত টুকরোও আছে তাতে, হ্যান্ডেল হিসেবে সেই বস্তুটির নাম ‘পোঁচড়া’। এই পোঁচড়া দিয়েই মারা হচ্ছে কলিচুনের পোঁচ। একবার, দুবার, ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে গেল— ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান / চীনের পথ আমাদের পথ।’
হাওড়া জেলার বালির শান্তিরাম রাস্তার লাগোয়া বিট্টি বুড়ির মাঠ বা গাবতলার পাশের সব দেওয়ালে দেওয়ালে মোছা হচ্ছে— ‘সেদিন আর বেশি দেরি নেই, যখন বড়লোকের পিঠের চামড়া দিয়ে গরিবরা জুতো বানাবে’, ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া হুঁশিয়ার’, ‘শ্রীকাকুলাম শিক্কা দিলো অস্ত্র কাড়ো শত্রু মারো’ ‘শহীদ কমরেড পঞ্চাদি কৃষ্ণমূর্তি লাল সেলাম’, ‘শহীদ কমরেড নির্মলা কৃষ্ণমূর্তি লাল সেলাম’, ‘তোমার নাম আমার নাম, নকশালবাড়ি ভিয়েতনাম’, ‘বিশ্বে এনেছে নতুন দিন, মাও হোজা চারু লিন’, ‘মহান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নবম কংগ্রেস লাল সেলাম’, ‘লাল চীনের লাল উপগ্রহ লাল সেলাম’। কলিচুনের স্পর্শে, পোঁচড়ার কারিকুরিতে মুছে যাচ্ছে এই সব বিপ্লবী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ— আখরেরা।
যেসব দেওয়ালে সংঘর্ষময় ‘ভোট পাবে কারা, কাস্তে -হাতুড়ি – তারা’, ‘ভোট দিন বাঁচতে তারা- হাতুড়ি- কাস্তে’, ‘সাম্রাজ্যবাদের দুটি ফ্রন্ট, কংগ্রেস আর যুক্তফ্রন্ট’ ‘সিপিআই(এম)-এর জিগরি দোস্ত, সিআরপি আর বি বি ঘোষ’, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও’ ‘সিপিআই(এম)- এর দেওয়াল লেখ মোছাচ্ছে না পুলিশ।
দেওয়ালে দেওয়ালে নতুন করে উদিত হচ্ছেন তথাকথিত এশিয়ার ‘মুক্তিসূর্য’। বহু দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হচ্ছে- ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ’। যেসব দেওয়ালে সংঘর্ষময় ‘ভোট পাবে কারা, কাস্তে -হাতুড়ি – তারা’, ‘ভোট দিন বাঁচতে তারা- হাতুড়ি- কাস্তে’, ‘সাম্রাজ্যবাদের দুটি ফ্রন্ট, কংগ্রেস আর যুক্তফ্রন্ট’ ‘সিপিআই(এম)-এর জিগরি দোস্ত, সিআরপি আর বি বি ঘোষ’, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও’ ‘সিপিআই(এম)- এর দেওয়াল লেখ মোছাচ্ছে না পুলিশ। মোছানো হচ্ছে না নিজেদের আগমার্ক বামপন্থী হিসেবে ঘোষণা করা সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, ওয়াকার্স পার্টি, আরসিপিআই— ভারতের বিপ্লবী সাম্যবাদী দল, এসইউসি— সোসালিস্ট ইউনিটি সেন্টার, ফরওয়ার্ড ব্লক, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক, বলশেভিক পার্টি, কমিউন— কারও দেওয়াল বার্তাই মোছেনি পুলিশ, পুলিশ কাম খোচড়, নব কংগ্রেস— ইন্দিরা কংগ্রেসের বাহিনী।
ব্যতিক্রম না-ভাঙা সিপিআই (এম-এল), এমসিসি— মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র। তখন তো বাড়ির দেওয়াল, নানা ধরনের পাঁচিল, ঘুঁটে দেওয়া পাঁচিল থেকে শুরু করে জালিম লোশন, তাদের নতুন ঔষধ, জিপ শেরোয়ানি-র ‘জিপ টর্চ’, ব্যাটারি, ‘কির্লোস্কার পাম্প’, ‘অশোক ব্লেড’, ‘মারফি রেডিও’, সবাইকে দুয়ো দিয়েই ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’ ইন্দিরা গান্ধী আর তার দল নব কংগ্রেস— ইন্দিরা কংগ্রেসের বন্দনা।

এরপর ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন, হ্যাঁ, ঠিক তিন বছর পরে এমার্জেন্সি— জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর দেওয়ালে দেওয়ালে লিখনে, ছাপা সরকারি পোস্টারে— ‘কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই’, ‘কথা কম কাজ বেশি’, ‘অনুশাসনই অনুধ্যান’, ‘দেশ এগিয়ে চলেছে’ তখন বাতাসে বিরোধীদের কাঁচা রক্তের গন্ধ। দেশের সব জেলখানাই ভর্তি রাজনৈতিক বন্দির ভিড়ে। ছয়ের দশকেই আমরা দেখেছি দেওয়ালে দেওয়ালে লিখন প্রস্তাবে সিসিসিআর— কো-অর্ডিনেশন কমিটি অফ কমিউনিস্ট রেভেলিউশানারিজদের কথা-বিস্ফোরণ। তখনও তৈরি হয়নি সিপিআই (এম-এল)। সিসিসিআর-এর লিপি লিখনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) নির্মাণের প্রস্তুতি। যাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই নতুন কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের, তাঁদের কারও কারও নাম ফুটে উঠছে ওয়ালিং গর্জনে। ‘জেল কা তালা টুটেগা/ জংলা কানু ছুটেগা’, ‘চারু মজুমদার জিন্দাবাদ’, ‘কমরেড কাকা লাল সেলাম’, ‘গোপীবল্লভ পুরের কৃষক সংগ্রাম লাল সেলাম’, ‘লখিমপুর খেরির কৃষক সংগ্রাম লাল সেলাম’
জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক জোড়া বলদ আঁকা ছিল কঠিনতম কর্ম। তুলনায় না-ভাঙা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিআই-এর নির্বাচনী চিহ্ন কাস্তে ধানের শীষ বেশ সহজ, অখিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ-র জ্বলন্ত প্রদীপও। ফরওয়ার্ড ব্লকের সিংহ, এসএসপি— সংযুক্ত সোসালিস্ট পার্টির বটগাছ আঁকা যথেষ্ট ঝামেলার। পিএসপি-র কুঁড়েঘর আঁকা খুব কঠিন কিন্তু নয়। কিন্তু রাম-রাজ্য পরিষদ, রিপাবলিকান পার্টি— এদের রাজনৈতিক প্রতীক— ঘোড়ার পিঠে অশ্বরোহী এবং ঘোড়া আঁকা বেশ কঠিন। ইন্দিরা কংগ্রেসের গাই-বাছুর— ‘দিল্লী থেকে এল গাই/ সঙ্গে বাছুর সি পি আই’ মনে পড়ে যায়।
আদি কংগ্রেস বা সিন্ডিকেট কংগ্রেসের চরকা হাতে মা দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা বেশ ফৈজতের ব্যাপার ছিল। এই সেদিনও এসইউসি— এসইউসিআই—এসইউসিআই (সি/কমিউনিস্ট)-এর নির্বাচনী প্রতীক ছিল সাইকেল, পড়ে তা হলে টর্চ লাইট। ছিল রুমাল, হয়ে গেল ক্যাট। এই সাইকেল মুলায়ম সিং যাদব— অখিলেশ যাদবদের সপা— সমাজবাদী পার্টির নির্বাচনী প্রতীক— চুনাও চিহ্ন আর এনটিআর— এন টি রামকৃষ্ণ রাওয়ের, যা এখন চন্দ্রবাবু নাইডুর দল— তেলুগু দেশম-এরও ভোট প্রতীক।

জোড়া পায়রা আঁকা খুব শক্ত অথবা জোড়া ঘুঘু। সোজা হল মই এঁকে ফেলা আর জোড়া পাতা। গোলাপ ফুল আঁকা আঁকি বেশ কঠিন এবং উট। জোড়া পায়রা থেকে উট পর্যন্ত অঙ্কন কর্মে যথেষ্ট কুশলতার প্রয়োজন। উট ‘অল ইনডিয়া মুসলিম লিগ’-এর প্রতীক। আর মই, জোড়া পাতা, জোড়া পায়রা, জোড়া ঘুঘু, মাছ, দোয়াত কলম, টর্চলাইট, এ সবই নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত নির্দল প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতীক।
মনে পড়ে, ছয়ের দশকের শেষ আর সাতের দশকের গোড়ায় গোড়ায় দাপুটে দেওয়াল-বার্তা লিখনের মধ্য দিয়ে, অক্ষর বিন্যাসে। ‘নির্বাচন বয়কট করুন’ সাতের দশকের ভোর বেলায়- একেবারে শুরুতে কোনও ঝকঝকে দোতলা বাড়ির দোতলাতে লেখা হয়ে গেলে সুন্দর ছন্দের অক্ষর বিন্যাসে সেই বাড়িটি অনায়াসে মর্যাদা পেয়ে যায় ভবনের, শোভা কারিকুরিতে। সেই অঙ্কনে এই গৃহমাত্রা কত কত যে শোভন-সুন্দর— শোভনসুন্দর। অবশ্য বাড়ির মালিক বহু ক্ষেত্রেই, বহু কেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই লেখালিখি মেনে নেননি, ফলে থানা-পুলিশ, বিরোধিতা-ধরপাকড়।

আজ থেকে এক দশক আগে কি দেড় দশকও হতে পারে, দেওয়াল লিখনের রাজনৈতিক অক্ষর মুছে দিত সেই পলিটিক্যাল পার্টি। এখন ইদানিং বোধহয় সেই রাজনৈতিক সৌজন্যের তরঙ্গ— ঘাত-প্রতিঘাত মুছে গিয়েছে। ছয় দশকের মাঝামাঝি থেকে সাত দশকের মধ্যবর্তী পর্যায় পর্যন্ত কলকাতা তথা পশ্চিমবাংলা, এমনকি পশ্চিমবাংলার বাইরেও দেওয়াল-গর্জন ছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দর্পণাভাস। পিকিং, মস্কো, হ্যানয়, সায়গন, তিরানা, কঙ্গো, কিউবা, হাভানা— সব মিলিয়ে এক ধারাবাহিক অগ্নিরথ ঘর্ঘর, অগ্নিতরঙ্গ। জীবনকে নতুন করে চিনিয়ে দিয়েছে এই সব দেওয়ালেরা, তাঁদের চোখ দিয়ে। সেই চক্ষু কতটা— কতখানি জ্ঞানচক্ষু, কতটাই বা নির্জ্ঞান চক্ষু ছিল, তাও অবশ্য যথেষ্ট তর্কের বিষয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত