(Mic Noise)
সত্তরোর্ধ্ব মানুষটি খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলেন ফের। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আবার হাসপাতালমুখো করতে হয়েছিল। কয়েকদিন আগেই বাথরুমে টাল সামলাতে না পেরে দিন দশেক নার্সিংহোমবাসের পরে বাড়ি ফিরেছিলেন। পায়ের একটি হাড় হার মেনেছিল। তখনও ট্র্যাকশন। মেঝেতে পড়ে গিয়ে বলছিলেন, ‘এবারে চলে গেলেই হয়। ওই তো, হিড়িম্বার মতো চিৎকার করে আমার জীবনের চরম সত্য কথা বলছে। এই সংসারে থেকে আর তো কিছু লাভ নেই।’ স্ত্রী-সন্তানের চোখ ছলছল। মানুষটি বলছিলেন, ‘এমন শাস্তি দিয়ে ভগবান আমায় কি বার্তা দিলেন? উনি চান না আমি থাকি আর। ভাল হচ্ছিলাম দিব্যি। আর পারলাম না গো।’ তাঁদের বাড়ির জানালার কানঘেঁষা মাইক থেকে ভয়ংকর আওয়াজে তখনও ভেসে আসছিল বেসুরো গলায়, ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো।’
আরও পড়ুন: মেগার পরে মেঘ জমেছে
কোনও অজ্ঞাত কারণে এই দুটি লাইনই বারবার গাইছিলেন গায়ক। গান শুরুও করেছিলেন এই লাইন দুটি দিয়ে। ভোর পাঁচটা আটান্নোয়, কাক ডাকার সময়ে, হঠাৎ এমন প্রবল শব্দে বৃদ্ধ মানুষটি নিজের শরীরকে সামলাতে পারেননি আর। বিছানা থেকে পড়ে যান। পরে বলেছিলেন, ‘ঘরের দেওয়ালে, ঘড়ির পাশে টাঙিয়ে রাখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফটোর দিকে চেয়েছিলাম ঠায়। উনি কি আমার অভিমানী চোখ বুঝতে পেরেছিলেন? আমি জানি, গুরুদেবও সুখে নেই। ওঁর চোখেও প্রকট হয়েছিল কষ্ট। মনের কথা পড়তে পেরেছিলাম। এমন জন্মদিন তো চাননি উনি।’ গত বছরের ঘটনা। দিনটি ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী।
উনি জানেন, অধিকাংশ পাড়ায় সকাল হওয়ার আগেই শুরু হবে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।’ বিকট সেই ধ্বনি। রবীন্দ্রচর্চায় মশগুল আমার এক বন্ধুর কথায়, ‘কবিগুরু এই গানটি লিখে সম্ভবত এক ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন। কথার মধ্যে আগুন ছিল। পরশমণি ছিল।’
এক বিখ্যাত অর্থনীতিবিদকে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছিলাম, ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এমপ্লয়ারের নাম হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ভাণ্ডারের অমূল্য রতন শুষে নিয়ে আমরা আছি বেশ, আমাদের একমেবাদ্বিতীয়ম আইকনকে নিয়ে। কত মানুষ যে ওঁকে ভাঙিয়ে খেলেন, উনি যে কত হাজার কোটির রেভিনিউ দিলেন আমাদের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে, তার হিসেব কষতে গেলে মাথায় কারফিউ হয়ে যাবে। তিনি নিজেই এক মহা কার্নিভাল। তবে আমাদের রাজার রাজাকে যে শব্দনৈবেদ্য দিয়ে আমরা পুজো করি প্রতি বছর, শান্তিপ্রিয় মানুষটির তা কতটা প্রাপ্য ভাবতে শুরু করলে, মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঁকি মারে। শব্দকে ব্রক্ষ্মজ্ঞান মনে করা মানুষটির জন্য আমরা সাজিয়ে রাখি শব্দরাক্ষস।’

পাড়ায় পাড়ায় থাকা দীর্ঘদেহী মানুষটির মূর্তি প্রতি বছর ২৪শে বৈশাখ একটু আদর পায়। জল দিয়ে মোছা হয় তাঁর প্লাস্টার অব প্যারিস শরীর। ফুলওয়ালারা কয়েকটি বড় মালার বরাত পান, অন্য এক ঠাকুরের জন্য। কোনও এক দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির তলায় দেখেছিলাম— ‘১৮৬১ – পৃথিবী যত দিন, তত দিন’। সেই হিসেবে একশ পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই মানুষটিও শুরু করেন তাঁর নিজের প্রস্তুতি। পাশে মঞ্চ তৈরি হয়ে যায় রাতারাতি। দুদিকে দশ-বারোটি বিরাট সাউন্ড বক্সের মধ্যে, মুখে ফ্লাডলাইট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন একাকী কবি। প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টে মাইক। উনি জানেন, অধিকাংশ পাড়ায় সকাল হওয়ার আগেই শুরু হবে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।’ বিকট সেই ধ্বনি। রবীন্দ্রচর্চায় মশগুল আমার এক বন্ধুর কথায়, ‘কবিগুরু এই গানটি লিখে সম্ভবত এক ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন। কথার মধ্যে আগুন ছিল। পরশমণি ছিল।’
‘তাই কোনও অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সময় প্রদীপের সলতে জ্বালিয়ে এই লাইন। বিখ্যাত ব্যক্তির প্রয়াণ হলে দাহকাজের আগে এই পঙক্তি। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের কৃতী পড়ুয়াদের পুরস্কার দেওয়ার আগেও এই লাইন। শহরের এক ক্লাবকর্তা গত বছর কালীপুজোয় গ্র্যান্ড বাজি ধমাকা উদ্বোধনের আগেও এই লাইনটি গেয়ে উঠেছিলেন। মিচকি হেসে বলেছিলেন, ‘এবারে যা দেখবেন, তা তো আগুনেরই কারুকাজ।’
‘বাঙালির প্রতিটি শ্বাসে জড়িয়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলার উপায় নেই।’
সংসারের মায়া কাটিয়ে ৮৪ বছর বয়সে সম্প্রতি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন আমার এক জেঠামশাই। ভদ্রলোক প্রবল রাবীন্দ্রিক ছিলেন। তবে শেষ কয়েক বছর যে দিনে সবচেয়ে বেশি কুঁকড়ে থাকতেন, তার নাম রবীন্দ্রজয়ন্তী। নিয়মিত ডায়রি লিখতেন। ২০২৪ সালের ৭ই মে, অর্থাৎ রবীন্দ্রজয়ন্তীর আগের দিন তাঁর লেখা ডায়রির পাতাটি হুবহু তুলে দেওয়া যাক।
কাল সকালে বাজ পড়ার মতো ওই আওয়াজ আবার বলবে— কানেক্টেড। এটা নাকি মোবাইলের সঙ্গে স্পিকার তারহীনভাবে যোগ হওয়ার আহ্লাদধ্বনি। তারকাটার হাসি। এই আওয়াজ আমার কাছে বিভীষিকাসম। এর অব্যবহিত পরেই শুরু হয় শব্দের ধ্বংসলীলা। কানেক্টেড কথাটির পরেই শুরু হল— চুন চুনকে মারেঙ্গে।
‘প্রবল গরমের রাতে জানালা খোলা রাখলে ঘরে মৃদুমন্দ বাতাস আসে। আজ আসবে না। দরকার নেই। আমি করজোড়ে শান্তি কামনা করি। সব কটা বন্ধ করে দিলাম। আমি জানি, গত বছরের ন্যায় আগামীকালও কাকভোরে ঘুম ভাঙবে এক প্রবল যান্ত্রিক আওয়াজে। একটি অশ্লীল শব্দের খুব প্রচলন হয়েছে আজকাল। তারকাটা। এর অর্থ কী আমি জানি না। তবে এ যুগের হেডফোন এবং স্পিকারগুলি দেখে এই শব্দটি আমার মাথায় উজিয়ে আসে। গ্যাজেটের কোটিখানেক আঁকশিতে এ প্রজন্ম বন্দি। কিন্তু মুখে বলে, ওয়্যারলেস! আরও একটা শব্দ শুনি। ব্লু টুথ। বাংলা করলে নীল দাঁত। নীল মানে তো বিষ!
আর কত কিছু দেখার বাকি কে জানে! যা বলছিলাম— আমি জানি, কাল সকালে বাজ পড়ার মতো ওই আওয়াজ আবার বলবে— কানেক্টেড। এটা নাকি মোবাইলের সঙ্গে স্পিকার তারহীনভাবে যোগ হওয়ার আহ্লাদধ্বনি। তারকাটার হাসি। এই আওয়াজ আমার কাছে বিভীষিকাসম। এর অব্যবহিত পরেই শুরু হয় শব্দের ধ্বংসলীলা। গত বছরের স্মৃতি মোছেনি এখনও। কানেক্টেড কথাটির পরেই শুরু হল— চুন চুনকে মারেঙ্গে। একটি জীবাণুও বাদ যাবে না। পেশ করা হল অমুক কোম্পানির ওয়াটার পিউরিফায়ার। এরপরই, পিপাসা হায় নাহি মিটিল। গান শেষ হল। দিল কা চাহত, মাত্র দশ মিনিটে। অপেক্ষাপর্ব এখন খতম। ইনস্টল নাউ। কুইক ডেলিভারির অ্যাপ। এরপরই, আমারো পরান যাহা চায়। তার পরে দশ সেকেন্ড ডিজে ডল হয়েই পুরনো সেই দিনের কথা।

আমার কান ঝালাপালা করে। মাথা ঝিমঝিম করে। গা গোলায়। প্রেশার বাড়ে। রবীন্দ্রভক্তির আওয়াজে নিরীহ, অবলা প্রাণীরা কুঁইকুঁই করে। মূর্তির চোখও কি ভিজে যায়?’
আমার বৃহত্তর পাড়ায় গত বছরের রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন সন্ধেবেলা ঘোষণাটি ছিল অনেকটা এইরকম। মঞ্চ আলো করে ছিলেন এক জনপ্রতিনিধি। কোন দল, সে প্রশ্ন গৌণ। সঞ্চালকের আবৃত্তি শেখানোর ক্লাস রয়েছে। প্রবল আওয়াজে এলাকা কাঁপছিল।
‘নমস্কার বন্ধুরা। বাঙালির মননে রবীন্দ্রনাথ তো উপস্থিত রোজই। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাই, আজকের এই পুণ্যদিনে, আমাদের মধ্যে উপস্থিত হতে চলেছেন…বলছি…বলছি…এই অঞ্চলের নয়া রূপকার, মানুষের দুঃখে যাঁর হৃদয় কাঁপে, এই অঞ্চলের বিশিষ্ট সমাজসেবী…বলছি, বলছি, মানুষের অসুবিধায় যাঁর মাথা নত হয়ে যায় প্রতি মুহূর্তে, একটি নমস্কারে, প্রভু একটি নমস্কারে যিনি লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করে নেন, কোনও সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধার চোখের দিকে তাকিয়ে যে মহাপ্রাণ কেন চেয়ে আছো গো মা বলে কেঁদে ফেলেন হাউহাউ করে, দারুণ অগ্নিবাণে কিংবা নিশীথ রাতের বাদলধারায় যিনি মানুষের মাথায় ছাতা ধরার জন্য এগিয়ে আসেন, কী পাননি তার হিসেব মিলাতে কোনওদিন রাজি হননি যিনি, মেঘের সঙ্গী দরাজ মন নিয়ে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হবেন…বলছি বলছি…ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী বলে যখন ব্যাকুল হয়েছিল স্বয়ং গুরুদেবের হৃদয়, রবিকুঞ্জ স্থাপন করে যে মানুষটি নোবেলজয়ী সাহিত্যিককে আরও বেশি করে স্থান দিয়েছেন আমাদের এলাকায়, সেই বিশিষ্ট অমুক কুমার তমুক আজ আমাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হবেন। ওই মহামানব আসে। উনি এসে গিয়েছেন। ওঁর নামে টানা দু’মিনিট সম্মিলিত করতালি হয়ে যাক।’
সাউন্ড বক্সের আওয়াজ হার মানাল হাজার ঘূর্ণির ধ্বনিকে। একটি স্পিকারের পিছনে চিড়িক করে আগুন জ্বলে উঠল। টায়ার বার্স্ট করার মতো আওয়াজ। তারপরেই সব শান্ত, মৌন।
মানুষটি মঞ্চে আসা মাত্র শুরু হল একশো কণ্ঠের কোরাস— বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও। এর পরেই এল মহাপ্রলয়ের মুহূর্ত। তিন বার বাঁধ ভেঙে দাও বলার পরেই মঞ্চের একশো এবং দর্শকাসনের দুশো লোক একসঙ্গে হুঙ্কার করে উঠলেন, “দাআআআআও।” সাউন্ড বক্সের আওয়াজ হার মানাল হাজার ঘূর্ণির ধ্বনিকে। একটি স্পিকারের পিছনে চিড়িক করে আগুন জ্বলে উঠল। টায়ার বার্স্ট করার মতো আওয়াজ। তারপরেই সব শান্ত, মৌন।
কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতা। সঞ্চালক স্পিকারের দিকে তাকিয়ে প্রবল চিৎকার করে বললেন, ‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে। দেখেছেন বন্ধুরা! এখানেও আমার রক্ষাকর্তা রবীন্দ্রনাথ।’ অট্টহাসি দিলেন তিনশো মানুষ। পাশের অশ্বত্থগাছ থেকে হুস করে উড়ে গেল একঝাঁক পাখি। যার শকতি নেই উড়িবার, সেও গেল।

ইলেক্ট্রিশিয়ান এসে স্পিকার ঠিক করে দিলেন তিন-চার মিনিটের মধ্যে। খুশির বাঁধ ভাঙল আবার। স্পিকার বলল— কানেক্টেড। ইওর ব্লুটুথ ডিভাইস ইজ রেডি টু পেয়ার। আনন্দঘন মুহূর্তে ভলিউম বাড়ানো হল আরও। শুরু হল ‘উলাল্লা উলাল্লা উলাল্লা এ ও।’ উদ্বাহু নাচে বাদল দিনে পাগলা হাওয়া এল। ঘামের বাদল। মস্তি।
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশটা পার করার পরে স্টেজের সামনে দাঁড়ালেন কয়েকজন ন্যুব্জ মানুষ। বললেন, ‘বন্ধ করো এবারে। ঘুমহীন রাত আমাদের অসুস্থ করে দেবে।’ শুনলেন, ‘রবিঠাকুর আমাদের আত্মাকে শুদ্ধ করেন। আপনারা বাঙালি?’ আওয়াজ আরও একধাপ বাড়ল। ‘আয় তবে সহচরী’র সঙ্গে নাচতে গিয়ে ধপ করে পড়ে গেলেন বছর ত্রিশের এক যুবক। পকেটের মধ্যে থাকা কাচের বোতল ফেটে চৌচির।
রাত বারোটায় পুলিশের গাড়ি এল। বড়বাবু বললেন, ‘ঠান্ডা করে দেবো ডান্ডা দিয়ে এবারে। সবকটাকে পুরবো জেলে। ফাজলামি হচ্ছে?’ বলেই একটা মেগা-ঢেঁকুর তুললেন।
রাত বারোটায় পুলিশের গাড়ি এল। বড়বাবু বললেন, ‘ঠান্ডা করে দেবো ডান্ডা দিয়ে এবারে। সবকটাকে পুরবো জেলে। ফাজলামি হচ্ছে?’ বলেই একটা মেগা-ঢেঁকুর তুললেন।
এক উদ্যোক্তা বললেন, ‘প্লিজ স্যার। আমাদের শেষ নিবেদন শেষের কবিতা। নির্বাচিত অংশ।’
থানার বড়বাবুর মোবাইল বেজে উঠল। তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল। রিং টোন।
নাহ! এবারে শেষ করি! বড্ড মেলোড্রামাটিক হয়ে যাচ্ছে না?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত