(Attention Please)
বৈশাখ মাসের মধ্যরাত। জানলায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই, উল্টোদিকের রাতবিরেতের মাঠে জ্যোৎস্না স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। মাঠভর্তি নানা ধরনের পাতা পড়ে রয়েছে। কত স্মৃতি ও বিস্মৃতি নিয়ে শেষ বৈশাখের মাটিতে ঝরে পড়ে আছে সেই সব পাতা! কতকালের অভিমান, শ্রান্তি ও দুর্বলতা নিয়ে অতিবৃদ্ধ, ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত সেইসব পাতা, দেখলে বলতে ইচ্ছে হয়, জরা-পাতা গো, আমি তোমারই দলে।
এ কথাও মনে পড়ে যে, মানুষের ভাষা এখনও অপরিণত। তাই ভাষাকে নতুন কোনও পদ্ধতির মাধ্যমে উন্নত করে তুলতে হবে। অগভীর মন্তব্যের ভাষা, অগভীর বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে অগভীর সিদ্ধান্তের ভাষা, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সাধারণীকরণ করা এবং অবিচ্ছিন্ন ঘটনাধারাকে ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে তাৎক্ষণিক বলে ভাবার ভাষা, ভুলের পর ভুল করার ভাষা থেকে বেরিয়ে এসে একটা ঠিকঠাক জ্যোৎস্নাভর্তি মাঠে দাঁড়িয়ে সেখানে পড়ে থাকা পাতার ভাষা বুঝে নিতে হবে।
আরও পড়ুন: রবিঠাকুর যেভাবে জাগেন
তখন হয়তো জানা যাবে, জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় উত্তীর্ণ করে যে গভীরতা, পৃথিবীর অতল থেকে রস টেনে টেনে পাতাদের কেউ কেউ এত দারুণভাবে তা অর্জন করেছে যে, যতই এই বৈশাখে পরিত্যক্ত, একা, নিঃসঙ্গ, অবিকশিত, সৃষ্টিহীন মনে হোক তাদের; আসলে তারা তা নয়। ছিলও না কখনও।
এ জীবনে আমরা দেখি তো বহুকিছু। তবে, শুধু দেখিই তো না। দেখেই তো থেমে থাকে না মনটা। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখা প্রতিটি ঘটনার সঙ্গেই নানাভাবে সম্পর্কস্থাপনের একটা অবিরাম এবং সৎ চেষ্টাও চলতে থাকে নিজের ভিতরে। এই যে দেখা এবং নিজের মতো করে দেখার বিষয়গুলোকে জড়িয়ে বেঁচে থাকা ও থাকতে চাওয়া— তার অধিকাংশই নতুন নতুন আরও দেখার স্মৃতির চাপে তলিয়েও যায়। এই তলিয়ে যাওয়াটাও ঘটে একরকম আমাদের অজান্তেই। তা খুব সুশৃঙ্খলভাবে ঘটেও না সবসময়। কোনও এক আবর্তের মধ্যে, ঘূর্ণির মধ্যে, ততটা অর্থবহ নয় এমন চক্রাকার প্রবাহের মধ্যে তা তলিয়ে যায়।

এক সময়ে যা পুরোপুরি মেপেমেপে মনে করে রাখতে পারতাম, তার সামান্যই মনে থাকে। হয়তো একটা চকোলেটের মোড়ক মনে রয়ে গেল। অথবা, নির্জন প্ল্যাটফর্মের রাত সাড়ে ন’টা-দশটার সময় ট্রেন বাতিলের ঘোষণা। বাকি সব একটা বড় অন্ধকার কুয়োর মধ্যে হারিয়ে যায়। অবচেতনের গায়ে গায়েই সেই কুয়ো। যা খুব স্নেহশীল নয়। যে স্মৃতিকে সে খেয়ে নেয় একবার, তা চট করে ফেরত দিতেও চায় না।
তবে, যেগুলো খানিক দয়া করেই হয়তো ফেরত দিল, তার মধ্যে ওই ট্রেন বাতিলের ঘোষণাটাকেও খুঁজে পাই। দু’লাইন লিখতে গিয়ে তিন লাইন কেটে দেওয়ার যে জীবন, সেই জীবনেই, ঠিক যেমন সিনেমায় দেখায় তেমনই এক ঝরা পাতায় ভর্তি প্ল্যাটফর্মে ঘোষণাটি শুনেছিলাম। ডাউন বর্ধমান-হাওড়া লোকাল আর আসবে না। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে আসার কথা ছিল সেই ট্রেনের। এইসব ক্ষেত্রে প্রথমেই যা হয়: এত দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও ট্রেনটি যে আর আসবে না, এই সত্যটা স্বীকার করে ভিতরের তোলপাড়কে থামাতে খানিকটা সময় লাগে। বারবার মনে হয়, ঠকে গেলাম। যার ফলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রবল রাগ হয়।
আমাকে প্রথমে বলেছে ‘অ্যাটেনশন প্লিজ’, তারপর নিয়তির শীতলতা নিয়ে ট্রেন বাতিলের কথাটি জানিয়েছে। এভাবে কেউ একটা দুঃখের খবর দেয়? একদম অপরিচিত— হয়তো প্রকৃতিগতভাবে নিষ্ঠুর— মানুষও তো দুঃসংবাদ দেওয়ার সময় ফুটনোট হিসেবে দু’একটা সান্ত্বনার বাক্য জুড়েই দেয়।
এবার, যে কোনও ধরনের রাগের প্রকাশের জন্যই তো একটা অবয়বের দরকার হয়। একটা মুখের দরকার। শূন্যের উপর তো রাগ দেখানো যায় না! কিন্তু, সেই মুখটা এখানে কে? স্পষ্টতই, মাইকে যার কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছে, সে। সে আসলে কে? মুখ নেই, শরীর নেই, অবয়বহীন একটা কণ্ঠস্বর। যে আমাকে প্রথমে বলেছে ‘অ্যাটেনশন প্লিজ’, তারপর নিয়তির শীতলতা নিয়ে ট্রেন বাতিলের কথাটি জানিয়েছে। এভাবে কেউ একটা দুঃখের খবর দেয়? একদম অপরিচিত— হয়তো প্রকৃতিগতভাবে নিষ্ঠুর— মানুষও তো দুঃসংবাদ দেওয়ার সময় ফুটনোট হিসেবে দু’একটা সান্ত্বনার বাক্য জুড়েই দেয়। কখনও কাঁধে হাত রাখে।
আর, এই প্ল্যাটফর্মে তো আমি থেকে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমার মতো আরও অনেকেই যাঁরা ট্রেন পেলেন না, তাঁরাও আসেননি কেউ। প্ল্যাটফর্মে তো মানুষ দাঁড়ায়ই আসলে চলে যাওয়ার জন্যই। তার আগে একটু চা খেলে বা অসুস্থতার ভান করে পড়ে থাকা গাছ-টাছ বা পুকুর দেখলে মনটা ভাল লাগে। এইমাত্র।

রাত সাড়ে ন’টার এই ঘোষণার পর প্রায় পনেরো বছর আগের বর্ধমান জেলার এক স্টেশনে বসে রইলাম। যেখানে গিয়েছিলাম, তা স্টেশন থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরের একটা গ্রাম। প্রথমে ভ্যানরিকশায় তারপর লাস্ট বাসে করে এসেছি স্টেশনে। ওখানেও আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফোনে চার্জ প্রায় শেষ।
ব্যান্ডেলে নামবেন, আদিসপ্তগ্রামে নামবেন, চুঁচুড়ায় নামবেন— এমন কয়েকজন ছিলেন স্টেশনে। শূন্য থেকে এসে আবার শূন্যেই মিলিয়ে গেলেন সকলে। কয়েকজনকে দেখলাম দিব্যি বাদাম চিবোচ্ছেন, সম্ভবত এই ট্রেন বাতিলের ঘোষণা গত তিনশো বছর ধরে দেখে আসছেন তাঁরা। ট্রেন বাতিলের ওই ঘোষণার পর হৃদয় আর মস্তিষ্কের ভারসাম্য রক্ষা করে প্রথমে বাদাম চিবুনো, তারপর বাঁশবেড়িয়ার বাড়িতে যাওয়ার জন্য ম্যাটাডোরে উঠে পড়া— এইসব তাঁদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। যেন, এমনটা না হলেই কষ্ট পেতেন, গলা দিয়ে বাদামভাজা নামত না, বাড়িতে ঢুকতে গেলে ছোটকাকা ডাঙশ নিয়ে তাড়া করত।
রাজ্যে চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পর সবে মাসখানেক হল একটা সরকার এসেছে আর কোটি কোটি বাঙালি মনে করছে এবার একটা কিছু কাজের কাজ হবে।
রাত গভীর হয়। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হতে হতে ক্রমশ আমি একা। একটা ঝড় উঠব উঠব করেও উঠল না। কেবল স্টেশনে যে পাতাগুলো পড়ে ছিল, তা সংখ্যায় কিছু বাড়ল। দেশে তখনও বর্তমান সরকার আসেনি। রাজ্যে চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পর সবে মাসখানেক হল একটা সরকার এসেছে আর কোটি কোটি বাঙালি মনে করছে এবার একটা কিছু কাজের কাজ হবে।
তার মাঝে বাবু হয়ে বসে আমি রাতজাগা দুঃখিত মানুষ কিছু ব্যক্তিগত কথা বলাবলি করে, বেঁচে আছি না মরে গিয়েছি, তা স্পষ্ট বুঝে নিয়ে স্টেশনের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর যে কাজটা করলাম, সেটা এই বয়সে এসে অর্থহীন মনে হলেও, আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগের ওই পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, বাংলাভাষা দিয়ে দুনিয়া ঘিরে ফেলার স্বপ্ন দেখা সেই একুশ-বাইশ বছরের যুবকটির জন্য প্রয়োজনীয়ই ছিল হয়তো। সে কী করেছিল? বেঞ্চ থেকে উঠে এসে প্ল্যাটফর্মে উবু হয়ে বসে ওই পাতাগুলোকে জড়ো করে অপটু হাতে একটা মুখাবয়ব তৈরি করল।

যতটা সহজে ‘তৈরি করল’ লেখা হল, ততটা সহজ ছিল না অবশ্য কাজটা। কারণ, উল্টোদিক থেকে আসা ঝিলের হাওয়ায় পাতাগুলোকে ঠিকঠাক বসানোই যায় না! কখনও বাঁ-কান উড়ে রেললাইনে পড়ে গেল। কখনও-বা, কপালটা চলে গেল ‘এখানে পানীয় জল পাওয়া যায়’-এর দিকে! রাত আরও একটু গভীর হওয়ার পর হাওয়া কিছুটা কমল।
মুখটা সাজিয়ে সেটাকে থেঁতলে দেওয়ার ভঙ্গিতে পা-টা চেপে দিলাম। পা’টা চেপে দেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থমকে ছিলাম কি? মনে হয়েছিল, যতই কাল্পনিক হোক, একটা মানুষের মুখই তো বানাচ্ছি, তাকে এভাবে থেঁতলে দেবো? সম্ভবত, না। মনে হয়েছিল, যদি মুখটা কথা বলে ওঠে আর একবার ট্রেন বাতিলের ঘোষণাটি করে, তাহলে থেঁতলে দেওয়ার আনন্দ দ্বিগুণ হবে? সম্ভবত, হ্যাঁ!
চোখের সামনে দেখেছি, কীভাবে কর্পোরেটের ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরা ঝাঁ-চকচকে এইচআর এসে অবিকল সেই প্ল্যাটফর্মের অদৃশ্য ঘোষকের ভঙ্গিতেই জানিয়ে দিচ্ছে, এই মুহূর্ত থেকে একটা গোটা ডিপার্টমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হল, এই মুহূর্ত থেকেই সকলে চাকরিহারা।
অনন্ত এক প্ল্যাটফর্মে সঙ্গীহীন মানুষের রাগের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ে রইল।
সব ঘোষণায় মাইক থাকে না। তবে, মাইকের থেকেও বেশি তীব্র হয়ে কখনও কখনও বজ্র-বিদ্যুৎসহ সেইসব ঘোষণা কানে ও মাথায় বাজতে থাকে, তা জীবনের নানা পর্যায়ে বহুবার অনুভব করেছি। চোখের সামনে দেখেছি, কীভাবে কর্পোরেটের ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরা ঝাঁ-চকচকে এইচআর এসে অবিকল সেই প্ল্যাটফর্মের অদৃশ্য ঘোষকের ভঙ্গিতেই জানিয়ে দিচ্ছে, এই মুহূর্ত থেকে একটা গোটা ডিপার্টমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হল, এই মুহূর্ত থেকেই সকলে চাকরিহারা।

এত যান্ত্রিক সেই ভঙ্গি যে প্ল্যাটফর্মের ঘোষককেও হার মানায়। সেখানে তো তবু ঘোষণার আগে একটা ‘অ্যাটেনশন প্লিজ’ বলেছিল! ‘দাদা, এবার আমরা করব কী’ বলে জড়িয়ে ধরা তৎকালীন সহকর্মীদের চোখের জল দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল মুখটা থেঁতলে দিই। কিন্তু, থেঁতলাব কাকে? ভিতর দিয়ে নৈশবায়ু বহে যায়। নিজের ভিতরের অসহায়তার দুর্গন্ধে নিজেরই টেকা দায় হয়ে পড়ে! থেঁতলাব কাকে? তাদের চাকরি চলে গেলেও, আমার চাকরি যে রয়েছে তখনও।
লেখাটির শেষে এসে আরও একটি ঘোষণার কথা বলব। একটি মেলার মাঠে যে ঘোষণা শুনেছিলাম বহু বছর আগে। তবে, এ ঘোষণা একটু অন্যরকম। আমার নাম করে ঘোষক জানালেন, ‘যেখানেই থাকো, চলে এসো মূল মঞ্চের দিকে। মুনাই তোমাকে খুঁজছে।’ প্রথমে একটু চমকে গেলেও তারপর মনে হয়েছিল, এ নিশ্চয়ই আমার মনের ভ্রম অথবা একই নামের অন্য কেউ।

ফের একবার ঘোষণা। এবার আমার নামের সঙ্গে পদবি এবং আমার জন্মস্থানও জুড়ে গেল। নিশ্চিত হলাম যে আমিই। কিন্তু, কে এই মুনাই? তাকে তো আমি চিনি না! নামও শুনিনি কখনও! মূল মঞ্চের দিকে দৌড়তে শুরু করি। যা পিছুটান ছিল, যা দুঃখ-সুখ ও সাধ ছিল, যা টানা এবং পোড়েন ছিল, সব ছেড়ে সেই দৌড়। সে এক অনন্ত অপেক্ষার দৌড়ও বটে। যে অপেক্ষা বহু বছর আগের সেই রাতে বর্ধমান জেলার ওই ততটা বিখ্যাত নয় স্টেশনটিতে বসে করতে হয়েছিল। যে অপেক্ষা বৈশাখ মাসের এই শেষরাতে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকের মাঠে জ্যোৎস্নার স্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেও করে যেতে হচ্ছে।
একটু বাদেই ভোরের আজান শুরু হবে সামনের মসজিদের মাইক থেকে। ভুলত্রুটিময় জীবনে মূলমঞ্চ থেকে আসা সেই ডাকের দিকে যে আর পৌঁছানো হবে না কখনও, এ কথাটি ভেবে চুপ করে থাকি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত