(Africa World Cup)
আফ্রিকা। দুঃখী মহাদেশ। ঘরছাড়াদের একফালি মনখারাপ যেন মিশে আছে ঐ মায়াবী সবুজে। ফুটবল। ফুটবলের নদীতে ভেসে যাচ্ছে হাজার হাজার প্রতিভা। যেমন, গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে আসে মানুষ, আর তার বুকের ভিতর কুসুম কুসুম উষ্ণতায় বাঁচিয়ে রাখে একটা আস্ত ফেলে আসা নিশ্চিন্দিপুর— আফ্রিকান ফুটবলাররাও তেমনই।
২০১০ সাল, মনে পড়ে খুব। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ। জার্মানির সামনে ঘানা। বোয়াতেং-রা দুই ভাই। একজন জার্মানিতে চলে গেলেন, নাগরিকত্ব নিলেন, অন্যজন থেকে গেলেন ঘানাতেই! নিয়তির ফেরে মুখোমুখি বিশ্বকাপে। আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন উদাহরণ যে কত! সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চেয়ে সবুজ মহাদেশের ফুটবল ইতিহাসে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইমিগ্রেশন। বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে যাওয়া একটা মহাদেশে খুব পরিচিত শব্দ— ‘ডায়াস্পোরা’। বাংলায় বলে অভিবাসী। ঘরছাড়া।
গতবারের বিশ্বকাপে মরক্কো অসাধারণ সাফল্য পেল। আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে মরক্কো খেলল সেমিফাইনালে। তাঁদের তৎকালীন কোচ রেগ্রাগুইজ বিশ্বকাপের মাঝে বলেছিলেন, ‘এভরি মরক্কান ইজ মরক্কান…’; এ কথাটি বহুমাত্রিক। অর্থাৎ আফ্রিকার কাঠ, বাদাম, খনিজের মতো পাচার হয়ে যায় আরেকটি সম্পদও, তা হল ফুটবল। মরক্কো— কাসাব্লাঙ্কার ঝলমলে আলোর বাইরে একটা অন্ধকার মরক্কো— যেখানে আগুনে খিদে পেরিয়ে সব্বাই যেন পালাতে চাইছে।

আশরাফ হাকিমি, এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দু’জন সাইডব্যাকের একজন— স্পেনের মাদ্রিদ শহরে কোনও পূর্বপুরুষ গিয়েছিল ওঁর; জন্মের পর থেকে মাদ্রিদই ওঁর শহর, মা অন্যের বাড়ি ক্লিনারের কাজ করে ছেলেকে বড় করেছেন, স্পেনই ওঁর দেশ, এই যে দৈবিক অবয়ব নিয়ে একের পর এক মোক্ষম সেভ করে চলা গোলকিপার ইয়াসিন বোনো— ছেলেটা তো কানাডাতেই জন্মাল, জীবন কাটাল ইউরোপে, মরক্কো কই? এত দুঃখের মাঝে ওরা সবাই ফিরে তো এল!
২০২২ সালে মরক্কোর সাফল্যে ওরা সবাই শরিক। কিন্তু সবাই তো ফিরে আসে না। আসা সম্ভবও না। এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানো তাঁর বিখ্যাত বইতে লিখলেন, ‘রিচনেস ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড ইজ রেজাল্ট অব আদার পিপলস পভার্টি…’; কলোনিয়ালিজম এমন ছিবড়ে করল যে, আফ্রিকানরা কেবল বাঁচার তাগিদে ছুটতে শুরু করল ইউরোপে, আমেরিকায়। একটু নাগরিকত্বের আশায়, একটু উন্নত জীবনের আশায়।

এদের মধ্যে কেউ কেউ জাতিগতভাবে আফ্রিকানই থেকে যান, যেমন এবারের বিশ্বকাপে কঙ্গোর হয়ে প্রথম গোল করা ইওয়ানে উইসে, খেলতেন ফরাসি লিগে, দীর্ঘদিন ফ্রান্সেই বসবাস করছেন, কিন্তু খেলছেন নিজের দেশ কঙ্গোর হয়ে। যেমন, মহম্মদ সালাহ— বহু বছর যিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মহাতারকা, তবু খেলছেন নিজের দেশ মিশরের হয়ে, মিশরকে তুলে এনেছেন বিশ্বকাপে, যেমন সাদিও মানে— সেনেগালের এই তারকা লিভারপুলের প্রিমিয়ার লিগ জয়ী দলের কাণ্ডারী— ইউরোপ হয়ে এখন খেলেন মধ্যপ্রাচ্যের সৌদিতে— তবু সেনেগালের হয়ে জাতীয় দলে তিনি খেলে যান অবিরাম। আফ্রিকান কাপ অব নেশনস চ্যাম্পিয়ন করেন দলকে, তুলে আনেন বিশ্বকাপে, যেমন আমাদ দিয়ালো— ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলা এই তারকা গায়ে তুলে নেন নিজের দেশ আইভরি কোস্টের জার্সি।
২০২৪ সালে বেলজিয়ামে এক ঘানাইয়ান তরুণ ফুটবলার ইউরোপে পৌঁছেছিলেন নৌকায় করে। তিনি লিবিয়া ও ইতালির মধ্যে একটি গোপন ও অবৈধ রুট ব্যবহার করেছিলেন, যেটিকে তাঁর কিছু গাম্বিয়ান বন্ধু ‘দ্য ব্যাকওয়ে’ নামে ডাকত।
আবার, একইভাবে বুকায়ো সাকার কথা ধরা যাক— তাঁর শিকড় নাইজিরিয়ায় হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে, খেলছেনও ইংল্যান্ডের হয়েই। জেরেমি ডকু— বেলজিয়ামের তারকা উইঙ্গারের বাবা চলে এসেছিলেন ঘানা থেকে, ঘাঁটি গেড়েছিলেন বেলজিয়ামের অ্যান্টোয়ের্পে, ডকু খেলেনও বেলজিয়ামের হয়েই। তবে, এই ইউরোপে চলে আসা ইমিগ্র্যান্টরা, যাঁরা নাগরিকত্ব নিয়ে খেলছেন ইউরোপের নানা দেশের হয়ে, লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট বা বৈধ অভিবাসী, তাদের বাইরেও আরেকটা ভয়ানক অন্ধকার দিক অনালোচিত থেকে যায়।

ঘানা, গাম্বিয়া, কোট দিভোয়ার এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোর তরুণ ফুটবলাররা ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য যে কোনও উপলব্ধ পথ বেছে নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা বৈধ নয়। এই পথগুলোর অনেকগুলোরই ক্লাবগুলোর মধ্যে খেলোয়াড়দের আইনি স্থানান্তরের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।
ডাচ ইউনিভার্সিটি গ্রনিনজেনের এক গবেষক উরোস কোভাচ দীর্ঘদিন আফ্রিকান ফুটবলারদের আফ্রিকার বাইরে চলে আসার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০২৪ সালে বেলজিয়ামে তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া এক ঘানাইয়ান তরুণ ফুটবলার ইউরোপে পৌঁছেছিলেন নৌকায় করে। তিনি লিবিয়া ও ইতালির মধ্যে একটি গোপন ও অবৈধ রুট ব্যবহার করেছিলেন, যেটিকে তাঁর কিছু গাম্বিয়ান বন্ধু ‘দ্য ব্যাকওয়ে’ নামে ডাকত।

ইউরোপে পৌঁছানোর পরেই তিনি ইউরোপের ক্লাবগুলোতে ফুটবল খেলার সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। ক্রমে বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে নাগরিকত্বের চেষ্টা শুরু করেন। ইউরোপের একেবারে নিচুতলার ক্লাবগুলিতেও ম্যাচ পিছু যা পারিশ্রমিক, তাতে আফ্রিকার অনাহারক্লিষ্ট জীবন থেকে মুক্তি সম্ভব, সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্লু-কলার্ড জব যেমন বাথরুম ক্লিনিং, রাস্তা সাফাই ইত্যাদি তো রয়েছেই।
আফ্রিকানরা এই অবৈধ অভিবাসী হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘হাসল’ বলে। পশ্চিম আফ্রিকায় এই শব্দটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়— জীবিকা নির্বাহের কোনও উপায় খুঁজে বের করা, যা কঠিন ও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে রোজ— তারই ফলস্বরূপ আসে ‘হাসল’।
দিদিয়ের দ্রোগবাকে মনে পড়ে খুব, মনে পড়ে সেই হাঁটু মুড়ে বসে পরা দ্রোগবা আইভরি কোস্টকে বিশ্বকাপে তুলে, একটা ঢোলা গেঞ্জি পরে বলছেন, ‘We promised you that the celebrations would unite the people— today we beg you on your knees…’; তারপর সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য; আইভরি কোস্টের প্লেয়াররা গাইছেন— ‘উই ওয়ান্ট টু হ্যাভ ফান, সো স্টপ ফায়ারিং ইয়োর গানস…’; সত্যিই থেমে গেল আইভরি কোস্টের গৃহযুদ্ধ। সেই আফ্রিকা— গডফ্রে চিতালুর আফ্রিকা, দিদিয়ের দ্রোগবার আফ্রিকা, মহম্মদ ফিলালির আফ্রিকা— সাম্রাজ্যবাদের শোষণে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া আফ্রিকার শেষ সম্পদ— ফুটবলার— তা-ও যেন আঙুলের ফাঁক বেয়ে গলে যাচ্ছে— জীবন বাঁচানোর তাগিদে।
আস্ত দুনিয়ার কাছে, প্রথম বিশ্বের মদতে এইসব আফ্রিকানরা হয়ে যাচ্ছে ‘ঘুসপেটিয়া’। ফুটবলকে ঘিরে আফ্রিকানদের মধ্যে যে অভিবাসনের প্রবণতা, তার বড় অংশই ঘটে চোরাগোপ্তায়। অবৈধ দালালচক্র ও বিদেশে আগে থেকেই বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে। আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত দলবদলের সুযোগ সাধারণত কেবল সবচেয়ে প্রতিভাবান এবং সবচেয়ে ভাগ্যবান খেলোয়াড়দের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকে, যেমন প্যাট্রিস এভ্রা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা।

আফ্রিকানরা এই অবৈধ অভিবাসী হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘হাসল’ বলে। পশ্চিম আফ্রিকায় এই শব্দটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়— জীবিকা নির্বাহের কোনও উপায় খুঁজে বের করা, যা কঠিন ও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে রোজ— তারই ফলস্বরূপ আসে ‘হাসল’। এর পিছনে অবশ্যই আছে প্রথম বিশ্বের কড়া অভিবাসন নীতি, ভিসার অনুমোদন না দেওয়ার মতো হাজার রাজনৈতিক কারণ। এর সবচেয়ে অন্ধকার দিক হল, প্রতি বছর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে কয়েক হাজার অবৈধ অভিবাসী কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের হাতে ধরা পড়ে, ও চিরতরে শেষ হয়ে যায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। জেলের ভিতর বিষ খেয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে গত দশ বছরে।
এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকান ফুটবলারদের জয়জয়কার। কেপ ভার্দে, কঙ্গোর মতো অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকতে থাকা আফ্রিকান দলগুলোর প্রথম রাউন্ডে চমক দেওয়া থেকে শুরু করে, জার্মানি-ফ্রান্স-স্পেনসহ ইউরোপ ও কানাডার বিভিন্ন দেশের আফ্রিকান অরিজিনের খেলোয়াড়দের সাফল্য নজর কাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের ব্রায়ান ব্রবি জোড়া গোল করলেন, কানাডার জোনাথান ডেভিড হ্যাটট্রিক করলেন, ফ্রান্সের বারকোলা গোল পেলেন— এদের সকলের শিকড়ই আফ্রিকার মাটিতে পোঁতা।
গত দশ বছরে আফ্রিকান ফুটবলে এসেছে জোয়ার, আফকনের মতো টুর্নামেন্টে খেলার মান ভাল হয়েছে। ইউরোপের বহু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী আফ্রিকার ফুটবলে বিনিয়োগ করছেন ফুটবলারদের আরও ধারালো করে তোলার আশায়।
কিন্তু এই আলোর বৃত্তে থাকা আফ্রিকানদের বাইরেও প্রতি বছর কয়েক লক্ষ আফ্রিকান হারিয়ে যাচ্ছেন, উন্নত জীবনের আশায় যাঁরা আফ্রিকা থেকে পালিয়ে অন্য দেশে গিয়ে ফুটবল পায়ে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের একটা বড় অংশই শেষাবধি চোট আঘাত কিংবা ইউরোপের কোনও জেলখানায় কাটিয়ে ফেলছেন বাকি জীবন।
গত দশ বছরে আফ্রিকান ফুটবলে এসেছে জোয়ার, আফকনের মতো টুর্নামেন্টে খেলার মান ভাল হয়েছে। ইউরোপের বহু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী আফ্রিকার ফুটবলে বিনিয়োগ করছেন ফুটবলারদের আরও ধারালো করে তোলার আশায়। সেনেগালের ডাকার, মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা, নাইজিরিয়ার আবুজায় অত্যাধুনিক ফুটবল ক্যাম্পের তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে— কিন্তু এ সবই আসলে আফ্রিকার সম্পদকে আফ্রিকার বাইরে নিয়ে এসে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সুকৌশল। হাজার হাজার আফ্রিকান তরুণ, যাঁদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে কয়েকশো বছরের সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, যারা বাঁচার আশায় ফুটবল পায়ে নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে— তাদের কথা ভাববে কে?
এবারের বিশ্বকাপে হাইতি-কঙ্গো-আইভরি কোস্টের সমর্থকদেরই আমেরিকায় ঢোকার ভিসা দিতে চাইছে না মার্কিন প্রশাসকেরা— আফ্রিকার সেই ল্যান্ডমাইনে পা উড়ে যাওয়া ছেলে, সেই দু’পয়সা মজুরির লোভে খনিতে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া আফ্রিকান শ্রমিকের অনাথ মেয়ের কাছে বিশ্বকাপ আসলে ইউরোপিয়ানা-আমেরিকানা-ফিফা-ইনফ্যান্টিনো-মেসি-এমব্যাপ্পে এমনকি তাঁদের শিকড় মোহম্মদ সালাহ কিংবা আশরাফ হাকিমির থেকেও অনেক অনেক আলাদা। বিশ্বকাপের জৌলুসের ভিতর এক আফ্রিকা আমাদের সম্ভ্রম কুড়িয়ে নিচ্ছে, আর বাইরে অন্য এক আফ্রিকা আমাদের কাছে রেখে যাচ্ছে অসহায়তার গল্পগাছা। যদিও বিশ্বকাপমোদী প্রথম বিশ্বের কাছে এ যন্ত্রণার প্রভাব খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী নয় কোনওদিনই…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত