(Jersery Color Change)
‘কালশিটেও একটা রং। কে যে কখন, কার দিকে ছুঁড়ে দেয়…’— সম্বিত বসু।
কালশিটের রং সাবান দিয়ে উঠল না কিছুতেই। ছিল খানিক নীল, তার ওপর লাল চাপিয়ে, লাল-নীল ডোরাকাটা হয়ে দিব্বি কেটে গেল আস্ত একটা দশক। সারা গায়ে মাখা সেই নীল আর লালের ডোরাকাটা দেখে আমাদের মন চলে যায় এদেশ-ওদেশ; মনের কি আর ভিসা-পাসপোর্ট লাগে? ডোরাকাটা এই ব্যথার জ্যাকেট গায়ে, পাশাপাশি সবাই গুটিসুটি হয়ে বসল, মতি নন্দীর উপন্যাসের মতো একটা খেলা হল বিশ্বজুড়ে। যে আগুনে আমরা হাত সেঁকলাম, যে আগুন ভিতরে ভিতরে বদলে নিজেও হয়ে গেল লাল-নীল, তাতা-পোড়া গরম থেকে যে হয়ে গেল পশমের আরাম— একদিন দেখি তার রং বদলে গেছে। আমাদের লালে ব্যথা, নীলে মনকেমন— রং বদলালে কি উত্তাপও বদলে যায়? লিওনেল মেসি! অগাস্ট মাসের রাস্তার মতো দীর্ঘ একটা প্রেস কনফারেন্স— সুমন লিখেছিলেন—
‘সময়টাকে কামড়ে ধরো
বাঘ যেভাবে শিকার ধরে…’
সেই কোন হাজার হাজার মাইল দূরের লিওনেল মেসি কি শুনেছিলেন সেই উচ্চারণ? একটা উত্তাল সময়। নয়ের দশকের ছেলেমেয়েদের কৈশোর থেকে যৌবনের যাবতীয় কিস্সাকে মেসি কামড়ে ধরে থাকলেন এতগুলো বছর। স্প্যানিশ মিডিয়া বলে, মারাদোনার মতো লাতিন আমেরিকার আদিম গন্ধ মেসির গায়ে ছিল না কোনওদিনই। বরং, মেসি অনেক বেশি কাতালান। সেই ন্যাপকিন কাগজে সই পর্বের পর থেকে কাতালান বিপ্লবের ক্রুয়েফীয় পতাকা অচিরেই এসেছে মেসির কাঁধে। লাউড্রপ কিংবা রোনাল্ডিনহোর ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি কাতালান জনতার মনে একটা নরম মাটি খুঁজে দিয়েছিল বড়জোর, সেই মাটিতেই মেসির চারা থেকে মহীরুহ হয়ে ওঠার সাক্ষী থাকল বার্সেলোনা।

মেসি কি বার্সাকে সাম্প্রতিক কালে সব খেতাব দিতে পারছিলেন আর? বিগত কিছু বছর অন্তত বড় মঞ্চে বারে বারে ব্যর্থ হয়েছেন মেসি। অ্যানফিল্ডে ৪-০ হার, রোমে লজ্জার হার, একের পর এক নকআউট থেকে বিদায়— বার্সেলোনার জার্সি গায়ে মেসি মাঠে দাঁড়িয়ে দেখেছেন সবটুকু। তবু, তাঁর কলোসাস ইমেজে এতটুকু ছোঁয়া লাগল না ব্যর্থতার। কাতালান জনতা মেসির বার্সা ছাড়ার খবরে রাস্তায় নেমেছেন, কাঁদছেন হাউ হাউ করে। এক সাম্প্রতিককালে ব্যর্থ খেলোয়াড়ের এই প্রভাব জনমানসে কেনই বা থেকে গেল আজও? বার্সেলোনার জনতা মেসিকে ভালবেসেছিল সাফল্যের আলোয়, ব্যর্থতার অন্ধকারেও, তাই সে স্টেডিয়াম জুড়ে জ্বেলে দিয়েছে ভালবাসার জোনাকি।
মেসির প্রতিটা ব্যর্থ ফ্রি কিক, প্রতিটা ওপেন নেট মিস, পেনাল্টি মিস যে যন্ত্রণা দিয়েছে, অচিরে তাকেই কেমন যেন ভালবসে ফেলল বার্সেলোনার কোটি কোটি সমর্থক। ঐ যে এক আগুনে হাত সেঁকা!

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ভাঁড়ারে মেসি একটা সময়ে এনে দিচ্ছিলেন একের পর এক আলোর মোহর, সে তো আজকের কথা নয়। আর্জেন্টাইন জার্সি গায়ে তাঁর খেতাব জয়ের অধরা মাধুরীর স্বপ্নপূরণ হলেও মেসি এখনও ঘোরতর কাতালান ক্লাবেরই।
মেসি খেললেন, মেসি ওয়েম্বলি মাতিয়ে দিলেন, মেসির বাঁ পায়ের ওই শটে কেঁপে গেল আলেক্স ফার্গুসনের হাত। এল ক্লাসিকোয় পেপ-মেসি জমানা জুড়ে ছুটল বার্সার অদম্য রথ। ইকার ক্যাসিয়াসের পাশ দিয়ে মেসি গলিয়ে দেন কিছু অসমাপ্ত গল্প, কখনও টিটো ভিলানোভার মৃত্যুশয্যায় ছুঁয়ে থাকেন হাত। মেসির কান্না হাসির দোদুল্যমান ভেলায় ভাসল বার্সেলোনাকে ভালবাসা একটা গোটা প্রজন্ম।
তাঁর যাবতীয় অর্জনের উপর বিছানো আছে লাল-নীল শামিয়ানা। ২০০৯ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে মেসি কি শুধুই একটা গোল করলেন? না! বরং ফার্দিন্যান্দ-ভিদিচের মাঝখান থেকে ওই লাফ যেন বার্সেলোনাকে মসৃণ রোলস রয়েসের মতো নিয়ে এল সাফল্য সরণীতে। স্প্যানিশ আধিপত্যে কুঁকড়ে থাকা কাতালানদের সামনে মেসি চুমু খেলেন নীল স্পাইকটায়, তারপর এক এনিগমার সাক্ষী থাকল তামাম বিশ্ব। মেসি খেললেন, মেসি ওয়েম্বলি মাতিয়ে দিলেন, মেসির বাঁ পায়ের ওই শটে কেঁপে গেল আলেক্স ফার্গুসনের হাত। এল ক্লাসিকোয় পেপ-মেসি জমানা জুড়ে ছুটল বার্সার অদম্য রথ। ইকার ক্যাসিয়াসের পাশ দিয়ে মেসি গলিয়ে দেন কিছু অসমাপ্ত গল্প, কখনও টিটো ভিলানোভার মৃত্যুশয্যায় ছুঁয়ে থাকেন হাত। মেসির কান্না হাসির দোদুল্যমান ভেলায় ভাসল বার্সেলোনাকে ভালবাসা একটা গোটা প্রজন্ম।

এর মাঝে, জয় গোঁসাই আমাদের কবিতা পড়তে শেখালেন। শরৎকুমার চেনালেন। কী ভীষণ হু হু করা সেই কবিতাটা– ‘পাখি ও ছাতিমগাছ’; যেখানে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে পাখি যখন ছাতিম গাছের ডালে ফিরে এসে ঠোঁট ঘসছে ডালে, আপন মনে অনুশোচনা করছে— সারাদিনের এ বিরহের, তখন ছাতিমগাছ অস্ফুটে বলে ক্ষমা-ক্ষমা-ক্ষমা! আমাদের এই আশ্চর্য মিথোজীবিতাই কি ভালবাসা? এতকাল পর আমরাও কি মেসির সেই বদলে যাওয়া জার্সি, তার আগে ফেলে যাওয়া লাল-নীলে অস্ফুটে ঠোঁট ঘসিনি? মেসির সেই কান্না— আসলে কি সেই ছাতিম গাছের মতোই ক্ষমা চাওয়ার ভাষা ছিল না? রং বদল নিয়ে আমাদের সমস্ত মনকষাকষির পিছনে লুকিয়ে থাকে এক বিষাদ। খেলোয়াড়দের রং বদল হয়, সমর্থকের হয় না। যেন, স্থানু প্ল্যাটফর্মের বুক চিরে চলে যায় একের পর এক ট্রেন।
কোথায় যেন পড়েছিলাম, ট্রেনের জানলা আসলে ক্যামেরার লেন্স, স্টেশনের স্মৃতি বুকে কেবলই এগিয়ে চলে। খেলোয়াড়ের বুকেও এভাবেই হয়তো থেকে যায় সমর্থকের মুখ। ট্রেনের ইঞ্জিনের ধোঁয়া বদলে দেয় রং। বেকহ্যাম-মাইকেল ওয়েন-রোনাল্ডোসহ বিশ্বের কত তাবড় খেলোয়াড়ই তো বদলেছেন জার্সির রং। কিন্তু রং বদলের কিসিমে আমাদের কেবলই মেসির কথা মনে পড়ে— কারণ মেসির শেষ সেই প্রেস কনফারেন্স, সেই কান্না— যেন ভাস্করের সেই অমোঘ লাইন— ‘চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি…’

রং বদলের যে ভিত্তি, তার আখরে বেশ কিছু স্থানু ভাবনা বাঁধা। যেমন, রাজনীতির মঞ্চে একজন মানুষের রং বদল আসলে ধাক্কা দেয় বিশ্বাসে। কারণ, একজন ভোটারের বিশ্বাস জমা হয় প্রার্থীর ঝুলিতে, সে বিশ্বাস রাজনৈতিক। সে চেতনা বা বিশ্বাস বিজড়িত একটি ভোট সেই রাজনৈতিক নেতার হাতে দেয় ক্ষমতা— ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সেই নেতার দলবদল তাই সরাসরি প্রতারণা— কিন্তু খেলার ময়দানে হিসেবটা কিঞ্চিৎ জটিল। খেলোয়াড়ের সঙ্গে সমর্থকের কোনও আর্থিক যোগ থাকে না, থাকে ভালবাসার টান, তাই নৈতিকতার দাঁড়িপাল্লায় খেলোয়াড়ের দলবদল বা রং বদল অক্ষমার্হ অপরাধ নয় কখনই।
কালশিটের রং দিন দিন গাঢ় হয়, বইতে হয় নিঃশব্দে। তবু, রংবদলের এই দু’চার কলমে মেসিকে মনে পড়ে আলাদাভাবে। রোজ। কারণ ওই একটি অগাস্ট মাস, একটি বিচ্ছেদ— যেখানে রং বদলের মুহূর্তে খেলোয়াড় ও সমর্থক দু’জনের গায়েই লেগেছিল কালশিটের নীল— তারপর মেসি বিশ্বজয় করেছেন, এ নীল গোলকের এমন কোনও শিরোপা নেই, যা তিনি পাননি— কিন্তু সবটুকুই করেছেন নীল ব্যথার পশম আঁকড়ে।
যে কালশিটের নীল রং দিয়ে এ লেখার শুরু, ফিরে যাই সেখানেই। খেলোয়াড়ের দলবদল আসলে অমনই একটা কালশিটের রং ছুঁড়ে দেওয়া সমর্থকের দিকে। যেন স্মৃতির চাবুক মেরে চলে যাচ্ছে সময়, মুহূর্ত। এই ঘটনার সঙ্গে পরিচিত প্রতিটি সমর্থক। খেলোয়াড়ের মতো সমর্থকের যে অবসর নেই। এ কালশিটের রং দিন দিন গাঢ় হয়, বইতে হয় নিঃশব্দে। তবু, রংবদলের এই দু’চার কলমে মেসিকে মনে পড়ে আলাদাভাবে। রোজ। কারণ ওই একটি অগাস্ট মাস, একটি বিচ্ছেদ— যেখানে রং বদলের মুহূর্তে খেলোয়াড় ও সমর্থক দু’জনের গায়েই লেগেছিল কালশিটের নীল— তারপর মেসি বিশ্বজয় করেছেন, এ নীল গোলকের এমন কোনও শিরোপা নেই, যা তিনি পাননি— কিন্তু সবটুকুই করেছেন নীল ব্যথার পশম আঁকড়ে।
রং বদলের পৃথিবীতে এমন আশ্চর্য রং বদলের গল্প আর ক’টাই বা আছে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত