Planning Commission 7

প্ল্যানিং কমিশন

প্রবর্তন থেকে বিসর্জন (পর্ব - ৭)

(Planning Commission 7)

ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় ছিল ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ ১৯৯০-এর মার্চ মাসে শেষ হয়ে গেলেও অস্থির সময়ে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৯০-৯১ এবং ১৯৯১-৯২ আর্থিক বর্ষে শুধুমাত্র বার্ষিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালে, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার (ফরেন এক্সচেঞ্জ বা সংক্ষেপে ফরেক্স সঞ্চয় রিজার্ভ) তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়। এই সময় ভারতের ফরেক্স সঞ্চয় (রিজার্ভ) ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ১৯৯১-এ অর্থনীতি সংস্কারের ঝুঁকি নেয় ভারত সরকার।


আরও পড়ুন: প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব- ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬


কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে এবং প্রশাসনের নেতৃত্বে একটি বড় অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা হয়। সূচনা হয় জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার। সেই সময়ে ভারতে প্রথম মুক্ত বাজার সংস্কার ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা এতদিনের পরিচিত এবং প্রচলিত পথের থেকে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল। ভারতে চালু হল উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ এবং বিশ্বায়নের (এলপিজি) নীতি। LPG বলতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে Liberalisation, Privatisation এবং Globalisation— অর্থাৎ উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়ন বোঝায়।

এলপিজি-র তিনটি স্তম্ভ:–

উদারীকরণ (Liberalisation): সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থা শিথিল করা, শিল্পক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের সুযোগ বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগের বাধা কমানো।

Planning Commission 7
বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি হল বন্দর

বেসরকারিকরণ (Privatisation): রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, সরকারি সংস্থার শেয়ার বিক্রি বা Disinvestment, অর্থনীতিতে সরকারি খাতের একচেটিয়া ভূমিকা কমানো।

বিশ্বায়ন (Globalisation): ভারতীয় অর্থনীতিকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা, বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment) উৎসাহিত করা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়াও শিল্পের আধুনিকীকরণ অষ্টম পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এই পরিকল্পনার অধীনে, ক্রমবর্ধমান ঘাটতি এবং বিদেশি ঋণ সংশোধনের জন্য ভারতীয় অর্থনীতির দরজা ক্রমশ উন্মোচন করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে, ১৯৯৫-র ১লা জানুয়ারি ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (World Trade Organisation বা WTO) সদস্য হয়।

বার্ষিক গড় জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্য ৫.৬ শতাংশ নির্ধারণ করলেও প্রকৃত বৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রকৃত বৃদ্ধি যথেষ্ট বেশি হয়েছিল, যা তৎকালীন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

ভারতের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ছিল ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর এই পরিকল্পনা শুরু হয়। এটি ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও কাঠামোগত সংস্কার শুরুর পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলি ছিল— দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, কাজের সুযোগ বাড়িয়ে বেকারত্ব কমানো, দারিদ্র্য হ্রাস, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন অর্থাৎ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি। একই সঙ্গে পরিকাঠামোর উন্নয়ন না করলেই নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠাও জরুরি। রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য উন্নত করা দরকার। এবং অর্থনীতিতে উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়ন (LPG)-এর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

Planning Commission 7
পেট্রোলিয়াম শোধনাগার

১৯৯১ সালের নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তনের পর অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কার্যকর হয়। কাজেই এই পরিকল্পনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে— উদারীকরণ → বেসরকারি বিনিয়োগ → বিদেশি বিনিয়োগ → আন্তর্জাতিক বাণিজ্য → প্রতিযোগিতা— এই ধারাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যভাবে বলা যায় যে এই প্রথম পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বেসরকারি পুঁজি সংযুক্ত হল। প্ল্যানিং কমিশনের নথিতেও দেশীয় ও বিদেশি প্রতিযোগিতার জন্য অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

বার্ষিক গড় জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্য ৫.৬ শতাংশ নির্ধারণ করলেও প্রকৃত বৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রকৃত বৃদ্ধি যথেষ্ট বেশি হয়েছিল, যা তৎকালীন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

এত কিছুর পরেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে গড় বৃদ্ধি প্রায় ৩.৯ শতাংশ ছিল। খাদ্যশস্য উৎপাদন ১৯৯১–৯২ সালের ১৬৮.৪ মিলিয়ন টন থেকে ১৯৯৬–৯৭ সালে প্রায় ১৯৯.৩ মিলিয়ন টনে পৌঁছোয়। উৎপাদন শিল্পে যথেষ্ট বৃদ্ধি হয় এবং শিল্পক্ষেত্রে সংস্কারের প্রভাব দেখা যায়। রপ্তানি ও আমদানি বৃদ্ধি পায় এবং বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরুর পর অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে নতুন নতুন বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। অপরিশোধিত পেট্রলিয়াম আমদানি করে বেসরকারি শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি উদ্যোগে সমুদ্র বন্দর স্থাপনের সূচনা এই সময়েই হয়েছিল।

Planning Commission 7
বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ছিল ভারত

এত কিছুর পরেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কিছু সামাজিক ও পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে সমস্যা থেকে যায়। আঞ্চলিক বৈষম্যও পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হল— এটি রাষ্ট্রনির্ভর পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজারমুখী ও উদার অর্থনীতিতে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর এই পরিকল্পনাই সংস্কারগুলিকে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যায়।

এই প্রথম কোনও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২৬.৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করে জ্বালানি শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। বার্ষিক গড়ে ৫.৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে, মোট দেশজ উৎপাদনের ২৩.২ শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল।

প্রধান উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক পরিষেবা বিশেষত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি, পরিকাঠামো শক্তিশালীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, সংবিধান সংশোধন করে পঞ্চায়েতি রাজ ও নগর পালিকা ব্যবস্থার প্রবর্তন অর্থাৎ প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ। উন্নয়নের স্বার্থে অ-সরকারি সংস্থা অর্থাৎ এনজিও-কে কাজের সুযোগ প্রদান অবশ্যই অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য অবদান।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয় (১৯৯১–৯২-এর দামে) তথা অনুমোদিত মোট সরকারি খাতের অর্থের পরিমাণ (Plan Outlay) ছিল ৪ লক্ষ ৩৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। প্রকৃত মোট ব্যয় প্রায় ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত ব্যয় অনুমোদিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১৪.২ শতাংশ বেশি।

Planning Commission 7
প্রকৃত বৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ৬.৮ শতাংশ

এই প্রথম কোনও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২৬.৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করে জ্বালানি শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। বার্ষিক গড়ে ৫.৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে, মোট দেশজ উৎপাদনের ২৩.২ শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয় অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বিদেশি উৎস থেকে সংগ্ৰহ করতে হয়েছিল। দেশীয় সঞ্চয়ের হার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২১.৬ শতাংশ এবং বৈদেশিক সঞ্চয়ের হার মোট দেশীয় উৎপাদনের ১.৬ শতাংশ ছিল। 

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিল্প ও পরিষেবা (Service) খাতের দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও টেলিযোগাযোগ খাতের অগ্রগতি হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও তাই। সর্বজনীন ও সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন হয়নি। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়ন শিল্প ও পরিষেবা খাতের তুলনায় ধীর ছিল। সাধারণভাবে আয় বাড়লেও আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

এছাড়াও, নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের গ্রামীণ ও শহর উভয় ক্ষেত্রের উন্নয়নে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলির অবদান ছিল। পর্যাপ্ত সম্পদের সাথে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য পূরণ করতে নবম পরিকল্পনার সময় স্পেশাল অ্যাকশন প্ল্যানের (সংক্ষেপে SAP) আকারে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়।

দুই

ভারতের স্বাধীনতার ৫০ বছর পর নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৯৭-২০০২) শুরু হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুণ প্রকৃত অর্থে ১৯৯৮-৯৯ নাগাদ কাজ শুরু হয়। ১৯৯৭-এ প্রকাশিত হল নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপার (Approach Paper) অর্থাৎ কর্মপদ্ধতির প্রস্তাবনাপত্র বা রূপরেখা।

রাজনৈতিক সুস্থিতি নেই। কাজেই নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তা বাতিল হয়ে গেল। আবার শুরু হল খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপার প্রণয়ন। সবশেষে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল-এর অনুমোদন নিয়ে ১৯৯৯ নাগাদ শুরু হল নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। তবে তার সময়সীমা ১৯৯৭-২০০২ হিসেবেই নথিভুক্ত হয়।

Planning Commission 7
বার্ষিক গড়ে ৫.৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে, মোট দেশজ উৎপাদনের ২৩.২ শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল

নবম পরিকল্পনা প্রাথমিকভাবে দেশের সুপ্ত ও অনাবিষ্কৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। দারিদ্র্যকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রচেষ্টায় দেশের সামাজিক ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সন্তোষজনক বাস্তবায়ন রাজ্যগুলির দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও নিশ্চিত করে। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রচেষ্টাও দেখা গেছে।

এছাড়াও, নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের গ্রামীণ ও শহর উভয় ক্ষেত্রের উন্নয়নে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলির অবদান ছিল। পর্যাপ্ত সম্পদের সাথে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য পূরণ করতে নবম পরিকল্পনার সময় স্পেশাল অ্যাকশন প্ল্যানের (সংক্ষেপে SAP) আকারে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। এসএপিগুলি সামাজিক পরিকাঠামো, কৃষি, তথ্য প্রযুক্তি এবং পানীয় জল সরবরাহের ক্ষেত্রগুলিকে গুরুত্ব দেয়। 

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় কাজ শুরু হলেও বেসরকারি ক্ষেত্রের দুটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুরু হয়। গুজরাটের জামনগরে ২০০০ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি পেট্রোকেমিক্যাল শোধনাগার, উৎপাদন শুরু করে।

নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অনুমোদিত মোট সরকারি খাতের বরাদ্দ ছিল ৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে, কেন্দ্রের অংশ ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য এটি ছিল ৪৩ শতাংশ।

দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিল নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার উপর জোর দিয়ে দেশের বৃদ্ধি বাড়ানো। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দেশের দরিদ্রদের উন্নয়ন করবে এমন নীতির উন্নতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে বৃদ্ধি-ভিত্তিক নীতিগুলিকে একত্রিত করার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ঐতিহাসিক অসমতা সংশোধন করা যা এখনও সমাজে প্রচলিত।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় কাজ শুরু হলেও বেসরকারি ক্ষেত্রের দুটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুরু হয়। গুজরাটের জামনগরে ২০০০ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি পেট্রোকেমিক্যাল শোধনাগার, উৎপাদন শুরু করে। পরের বছর অর্থাৎ ২০০১-এ চালু হল দেশের প্রথম বেসরকারি সমুদ্র বন্দর মুন্দ্রা পোর্ট। মুন্দ্রা বন্দর এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, কারণ গুজরাটের ভূজ জেলায় অবস্থিত এই বন্দরে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন করে। 

নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক বৈষম্য সংশোধন এবং দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, দরিদ্রদের জন্য খাদ্য ও পানীয় জলের যথাযথ প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ। 

স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য রপ্তানির হার বৃদ্ধি করা হয়। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, রেলওয়ে ইত্যাদি পরিষেবা বাড়ানোর জন্য নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয়তার বন্দোবস্ত করা। দেশের সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা রূপায়ণ। তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মতো সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণিগুলির ক্ষমতায়ন। কৃষির ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন। স্থিতিশীল মূল্যের সাহায্যে অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করাও অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

এই লক্ষ্য রূপায়ণের উদ্দেশে ভারতীয় অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর এবং উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়। দেশের অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোগ ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপের সূচনাও হয়। দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দুর্লভ সম্পদের দক্ষ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য রপ্তানির হার বৃদ্ধি করা হয়। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, রেলওয়ে ইত্যাদি পরিষেবা বাড়ানোর জন্য নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠান/সংস্থা এবং নগর পালিকাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫.৪ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির হার অর্জন করে। অথচ ৪.২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কৃষি উৎপাদন ৫.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। দেশে শিল্প বৃদ্ধি ছিল ৪.৫ শতাংশ যা লক্ষ্যমাত্রার ৩ শতাংশের থেকেও বেশি। পরিষেবা শিল্পের বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ।

তবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম ছিল (৫.৪ শতাংশ)। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। কৃষি খাতের প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। আয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য রয়ে যায়। পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর ছিল।

নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে অতীতের দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখা হয়। যে কোনও দেশের একটি সুপরিকল্পিত অর্থনীতির জন্য, সেই দেশের সাধারণ জনসংখ্যার সাথে সরকারি সংস্থাগুলির সম্মিলিত অংশগ্রহণ থাকা উচিত। ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য সরকারি, বেসরকারি এবং সরকারের সকল স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামোন্নয়নের পরিকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতের বিকাশ অব্যাহত থাকে। পঞ্চায়েত ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়।

তবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম ছিল (৫.৪ শতাংশ)। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। কৃষি খাতের প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। আয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য রয়ে যায়। পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর ছিল।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of অমিতাভ রায়

অমিতাভ রায়

প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ ও পরিচিত পরিকল্পনাবিশারদ। পড়াশোনা ও পেশাগত কারণে দেশে-বিদেশে বিস্তর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তার ফসল বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় বই। জোয়াই, আহোম রাজের খোঁজে, প্রতিবেশীর প্রাঙ্গণে, কাবুলনামা, বিলিতি বৃত্তান্ত ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
পূর্ববাংলার মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই কেন বলা হবে? কোনও এক ওপর মহল থেকে যে ব্যাখ্যা শেখানো হয়েছিল তা হল, দুই কুকুর মানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ৷ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের মদতে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ অখণ্ড পাকিস্তানকে ভাঙতে চাইছে, তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের আড়ালে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে৷ মধুময় পালের কলমে পড়ুন দেশভিখারির জমিজিরেত। আজ পর্ব ৭...
Please login to bookmark Close
কলকাতা দূরদর্শন বিশেষ অনুষ্ঠান করল সমরেশ বসুকে নিয়ে। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন মৃণাল সেন। এরপর একদিন মা আমার হাতে দূরদর্শনের কনট্র্যাক্ট ফর্ম দিয়ে পাঠাল ভবানীপুরের বেলতলা রোডে মৃণাল সেনের বাড়িতে, কারণ ওঁকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট ফর্মটা সই করাতে হবে। লিখছেন অরিজিৎ মৈত্র...
Please login to bookmark Close
যে মানুষটাকে আমরা রুপোলি পর্দায় হাসিমুখে দর্শকের মন জয় করতে দেখেছি, তাঁর জীবনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এমন অনেক অধ্যায়, যা প্রকাশ্যে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তাঁর খ্যাতির এই ঝলমলে আলোর পেছনে ছিল কঠিন সংগ্রাম, করুণ ব্যর্থতা, জটিল সম্পর্ক এবং গভীর নিঃসঙ্গতা। সেইসব মিলেমিশে গড়ে ওঠে ‘রহস্যের আড়ালে উত্তম’। লিখছেন প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com