(Egg Cover Story)
ডিম নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতির সঙ্গে মাখামাখি হয়ে আছে পারিবারিক মতান্তর। উত্তর চব্বিশ পরগনার এক প্রায়-মফস্বল অঞ্চলে ছিল আমাদের যৌথ পরিবার। আমি তিনটি বসন্ত দেখে ফেলার পরে আমার পিসতুতো বোন জন্মায়। মনে পড়ে, বোনের তখন বছরখানেক বয়স। ছোট পিসি লম্বা ছুটিতে আমাদের পৈতৃক বাড়িতে। ছোট, মেজ কাকু ও কাকিমা, বাবা, মা, ঠাকুরদাকে নিয়ে আমাদের তখন ভরা সংসার। আজকের মতো নিউক্লিয়ার যাপনের বদলে ক্রেটভর্তি ডিমের মতো পূর্ণ ছিল। মা প্রতিদিন সকালে আমাকে একটা ফুল বয়েল্ড ডিমসিদ্ধ খাইয়ে বাড়ির কাজে যেত। চঞ্চল ছিলাম তো! হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলত, ‘কবে যে হবি বড়, চুপিসাড়ে?’
বোন উঠত দেরিতে। ছোটপিসিও। বোনকে যে ডিমসিদ্ধটি খাওয়াত ছোটপিসি, তা ছিল হাফ বয়েল্ড। আমি জুলজুল করে চেয়ে থাকতাম। চামচ দিয়ে সেই ডিম ভাঙতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ত ভালবাসা মাখা গাঢ় হলুদরঙা কুসুম। পিসি তা আমার মুখেও তুলে দিত খানিকটা। মা একদিন দেখে ফেলে। ছোটবেলার কত কিছুই মুছে গিয়েছে স্মৃতি থেকে। তবে মনের রেকর্ডারে মা এবং ছোটপিসির এই কথোপকথন এখনও অনেকটাই ভাস্বর। ভুলে যাওয়া জায়গাগুলোতে সেলোটেপ জুড়ে দিলে কথাগুলো ছিল এমন—
আরও পড়ুন: রবিঠাকুর যেভাবে জাগেন
— এ কী করছ তানিয়া? আধসিদ্ধ ডিম আমার ছেলের মুখে তুলে দিলে?
— এ আবার কেমন কথা বৌদি? মেয়েকে খাওয়াচ্ছিলাম। পাশেই দাঁড়িয়েছিল। একটু কি দিতে ইচ্ছে করে না? রোজই তো দিই।
— বেশ করেছ দিয়েছ। তাই বলে হাফ বয়েল ডিম?
— হাফ বয়েলেই তো বেশি পুষ্টি বৌদি।
— কে বলেছে তোমায়? পুরোপুরি সিদ্ধ না করলে ডিমের দোষ কাটে না।
— ভুল বলছ বৌদি। যে ডাক্তারবাবুকে দেখাই, তিনি বলেছেন হাফ বয়েল দিলে কোনও অসুবিধা নেই। বরং, এর স্বাদ ডবল। বাচ্চারা চেটেপুটে খায়।

— ওই ডাক্তার টুকে পাশ। পুরো সিদ্ধ না করলে ডিমের প্রোটিন থেকে ঠিকঠাক পুষ্টি মেলে না।
— মানতে পারলাম না। আমি কি আমার মেয়েকে কিছু না জেনে খাওয়াই?
— আমার ডাক্তার কি ভুল কথা বলেন নাকি?
— অত বলতে পারব না। তবে ছেলেকে ফুল বয়েল ডিমমিদ্ধ খাইয়ে তুমি ঠিক করছ না। পুষ্টি কিছুই পাচ্ছে না ও।
— তুমিও মেয়েকে এই আধা সেদ্ধ, কাঁচা কাঁচা ডিম খাইয়ে খুবই ভুল কাজ করছ। এর ফল তোমায় ভুগতে হবে পরে।
— তুমিও কি ফল ভুগবে না ভাবছ? আজ না হোক, কাল এই ভুল ডিসিশনের মর্ম বুঝবে!
এক পুষ্টিবিশারদ বন্ধু একবার কথায় কথায় সৃষ্টিকর্তার উপর দায় চাপালেন। এই বিষয়ে তাঁর মতামত, ‘সৃষ্টিকর্তা যদি জানতেন, ডিমের সাদা অংশের থেকে কুসুমকে আলাদা করার আগে হাজারবার ভাবতেন। ক্ষণজন্মা মানুষের মধ্যে এ কী উদ্বেগের জন্ম দিয়েছেন তিনি!’
প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, আমি ও আমার বোন এখন মোটামুটি একই অঙ্কের বেতন পাই। দুজনেই মোটাসোটা বেশ। পুষ্টির দৌড়ে কে জিতেছে বলা কঠিন। অবশ্য সামাজিক ব্যাকরণে ‘পুষ্ট’ হওয়ার সংজ্ঞা যে ঠিক কী, কে জানে!
দুনিয়ার বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে হাফ ও ফুল বয়েল্ড ডিমের লড়াই। এ প্রসঙ্গে বহু ডাক্তারবাবু, ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছি। এক দলের কথায়, ‘ডিমে সালমোনেলা ব্যাকটিরিয়া থাকলে তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার জন্য ফুল বয়েল্ড ডিমের জুড়ি নেই।’ আবার অন্য পক্ষ দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলেন, ‘ক’টা ডিমে সালমোনেলা থাকে আজকাল? তার কোনও পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেছ? পুষ্টিগুণে হাফ ও ফুল বয়েল্ড ডিমের মধ্যে বিন্দুমাত্র তফাৎ নেই। তবে হাফ বয়েল্ড ডিমের চলকে ওঠা কুসুমের যে স্বাদ, তার ধারে কাছে যেতে পারবে না ফুল সিদ্ধ ডিমের কুসুম। সেই কুসুম তুমি উপভোগ করবে না সিদ্ধ করে কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাবে, তা তোমার ব্যাপার।’

এক পুষ্টিবিশারদ বন্ধু একবার কথায় কথায় সৃষ্টিকর্তার উপর দায় চাপালেন। এই বিষয়ে তাঁর মতামত, ‘সৃষ্টিকর্তা যদি জানতেন, ডিমের সাদা অংশের থেকে কুসুমকে আলাদা করার আগে হাজারবার ভাবতেন। ক্ষণজন্মা মানুষের মধ্যে এ কী উদ্বেগের জন্ম দিয়েছেন তিনি!’
এই প্রসঙ্গে একটি কর্পোরেট আহারের কথা মনে পড়ছে। বাহারি অনেক পদের মধ্যে একটি ছিল, এগ দোপিঁয়াজা। অ্যাসিন্ট্যান্ট ম্যানেজাররা ভাত দিয়ে গ্রেভি মেখে ডিমটা দুই আঙুলের চাপে ভাঙলেন। এক খণ্ড ডিম খপাৎ করে মুখে পুরলেন। জন্ম হল দৈব মুহূর্তের। ম্যানেজাররা আঙুলের কারুকাজে প্রথমে ডিমের সাদা অংশটি খেলেন। পড়ে রইল কুসুম। আশি শতাংশ ভাতের সঙ্গে ডিমের সাদা অংশ শেষ। শেষের কুড়ি শতাংশ ভাত বরাদ্দ ছিল কুসুমের জন্য, এক্সক্লুসিভলি। সেখানে মিশে গেল হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ, লাভ, লাভ!
হাতের তালুর উপরে ডিমটিকে রেখে মৃদু দোল দেয়। শুঁকেও দেখে কখনও। কী পায় জানি না। তারপরে আসে মোক্ষম প্রশ্ন, সাইজ যে বড্ড ছোট। তাও এত দাম? বলি, আমি তো পাড়িনি। তাও দরাদরি থামে না!
সিনিয়র ম্যানেজাররা একই কাজ করলেন, তবে হাতের বদলে চামচ সহকারে। জেনারেল ম্যানেজার সাদা অংশটি পুরো খেয়ে শেষে চামচ দিয়েই কুসুমের কোণের থেকে সামান্য অংশ ভাঙলেন। মুখে পুরলেন। মুখের ত্রিকোণমিতি জানান দিল, বড় অনিচ্ছায় যেন সেটি খাচ্ছেন তিনি। যেন না খেলেই হত। টেবিলে ছিলেন সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট। উনি সাদা অংশটি খেয়ে ফর্কের মাধ্যমে সাইড কিক দিয়েছিলেন কুসুমটিকে। সেটি ছিটকে প্লেটের বাইরে এসে পড়েছিল।
আমার নামের মধ্যেই কুসুম রয়েছে। এই অবলা জিনিসটির উপরে অবজ্ঞা সহ্য হয় না একদম। এই কথা আমার অফিস মহলও জানত। ভ্রুজোড়াকে দ্বিতীয় বন্ধনীর রূপ দিয়ে ঠায় তাকিয়েছিলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেবের দিকে। আমার চোখে লুকিয়ে থাকা প্রশ্ন আঁচ করতে পেরেছিলেন উনি। কয়েক সেকেন্ড পরে বললেন, ‘ট্রাই টু গেট রিড অফ দিস রাবিশ, এভরি টাইম।’ সেই বছর আমার দু’শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হয়েছিল। কোম্পানি বদলেছিলাম।

কুসুমের সঙ্গে কি আমাদের রেষারেষির সম্পর্ক রয়েছে? কুসুম সেবন কি আমাদের কোনও সামাজিক দাড়িপাল্লায় মাপে? হবে হয়তো। দেখেছি, যাঁরা যত বেশি স্বাস্থ্য এবং ডিগনিটি সচেতন, তাঁরা তত বেশি ডিমের কুসুমকে এড়িয়ে চলেন। চিকিৎসকদের মতে, ডিমের কুসুমে কোলিন, ভিটামিন এ ডি ই কে, আয়রন, সেলেনিয়াম-সহ আরও অনেক কিছু রয়েছে। বড় বড় মানুষরা ডিমের কুসুমটি ফেলে দিয়ে এর থেকে বহু গুণ বেশি খরচ করে মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খান।
আমার এক খাদ্যরসিক ফুড ব্লগার বন্ধু রয়েছে। শহরের এক বিখ্যাত বিরিয়ানির দোকানে গিয়ে ও ওয়েটারকে বলেছিল, ‘আমার জন্য স্পেশাল মটন বিরিয়ানি। দু’পিস দাও তো স্পেশালে? দ্বিতীয়টা একটু চর্বিওয়ালা দেখে দিও।’ আহারপর্ব মেটার পর দেখা গেল, ধোঁয়া ওঠা প্লেটের ‘ধ্বংসস্তূপ’-এ শুধু রয়ে গিয়েছিল পাঁঠার পাঁজরের কঙ্কাল এবং ডিমের কুসুমটি। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কী দোষ করেছিল কুসুমটা?’ ও আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘বলছিস কি তুই? ওটা অস্পৃশ্য। গিজগিজ করছে কোলেস্টেরল।’ চিকিৎসাবিজ্ঞান কিন্তু ডিমের কুসুমকে এই খলনায়কের তকমা দেওয়ার ঘোর বিরোধী। খুব বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া, পরিমিত পরিমাণে কুসুমসহ ডিম খেলে শরীরের ক্ষতি নেই কোনও। এই সুপারফুডে যা রয়েছে, তা হল নির্ভেজাল উপকার।
কোনও বিখ্যাত সাংসদের এক মহিলা অনুগামীর গল্প বলি। তাঁর দল নির্বাচনে হেরে যায়। বিদায়ী দলের জনপ্রতিনিধি ছিলেন যাঁরা, তাঁদের দেখলেই শুরু হয়ে যায় ডিম ছোঁড়াছুঁড়ি। ওই মহিলা খুব অভাবী ঘরের ছিলেন। তিনি কয়েকদিন বাড়িতেই বসে রইলেন ভয়ে। কিন্তু বেরোতে তো হয়ই।
বাজার বিশেষজ্ঞরা এক গাল হেসে জানিয়ে দেন, দুনিয়ায় যে খাবারটি সবচেয়ে বেশি পরীক্ষানিরীক্ষা করে কেনা হয় তার নাম ডিম। পাড়ার শান্তি ডিম ভান্ডারের সত্তরোর্ধ্ব মালিক বললেন, ‘ক্রেতাদের সামনে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে বড় ক্লান্ত, দাদাভাই। বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীর মধ্যে প্রতিটি ডিমকে লম্বালম্বিভাবে সেট করে লোকে প্রথমে কিছু মাপে। চোখে ঝিলমিল লেগে গেলেও সূর্যের সামনে ধরে ডিমের মধ্যে অদৃশ্য কিছু দেখার চেষ্টা করে। নিভৃত প্রাণের দেবতা, সেখানে জাগেন একা? মনে হয় ইউএসজি পরীক্ষা হয়। অথবা, অ্যানোমালি টেস্ট। তারপরে হাতের তালুর উপরে ডিমটিকে রেখে মৃদু দোল দেয়। শুঁকেও দেখে কখনও। কী পায় জানি না। তারপরে আসে মোক্ষম প্রশ্ন, সাইজ যে বড্ড ছোট। তাও এত দাম? বলি, আমি তো পাড়িনি। তাও দরাদরি থামে না!’
আমার এক কবিবন্ধু বর্ষার দিনে খিচুড়ির সঙ্গে গরম ওমলেট পেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শূন্য চোখে বলেছিল, ‘প্রতিটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক একটি অমলেটের জন্ম দেয়।’ এই সামান্য কয়েকটি শব্দের মধ্যে যে অর্থ মিশে রয়েছে, তার প্রকৃত মর্ম বুঝতে ক্রমাগত ব্যর্থ হয়েছি আমি। ‘সম্পর্ক’ শব্দটি কি বহুমাত্রিক ছিল? ধোঁয়া ওঠা অমলেটের একটি টুকরো মুখে দেওয়ার পরে সেই সুহৃদ বলেছিল, ‘এর মধ্যে মিশে রয়েছে ভালবাসার ব্যর্থ ওম্।’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কার?’ উত্তর পেয়েছিলাম, ‘যে নিষ্পাপ প্রাণ ডানা মেলতে চেয়েছিল। কথা রাখেনি হোমো সেপিয়েন্স।’

এক এআই প্ল্যাটফর্মকে বলেছিলাম, ‘ডিম নিয়ে একটা রম্যরচনা লিখছি বুঝলে। এই বাজারে এই বিষয়ের লেখায় একটু পলিটিকাল অ্যাঙ্গল না থাকলে মানায়? বেশি রাজনীতি মেশাতে যেও না আবার। চার্লি চ্যাপলিনের ঢঙে বলো।’ ল্যাপটপের পর্দায় যা উঠে এল, তা হুবহু তুলে দেওয়া যাক।
‘আমি তোমার প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছি। চার্লি চ্যাপলিনের মতো আপাত হাস্যরসের আড়ালে মিশিয়ে দিচ্ছি ক্রন্দনধ্বনি।
কোনও বিখ্যাত সাংসদের এক মহিলা অনুগামীর গল্প বলি। তাঁর দল নির্বাচনে হেরে যায়। বিদায়ী দলের জনপ্রতিনিধি ছিলেন যাঁরা, তাঁদের দেখলেই শুরু হয়ে যায় ডিম ছোঁড়াছুঁড়ি। ওই মহিলা খুব অভাবী ঘরের ছিলেন। তিনি কয়েকদিন বাড়িতেই বসে রইলেন ভয়ে। কিন্তু বেরোতে তো হয়ই। একদিন দোকানে যাওয়ার উদ্দেশে বেরোলেন। লোকজন তাঁর দিকে তাক করে ডিম ছুঁড়ল। অধিকাংশ ডিমই পড়ল তাঁর মাথায়। তিনি বাড়ি ফিরে এলেন। স্নানে গেলেন প্রায় এক ঘণ্টা পর। বাড়িতে বললেন, পার্লারে গিয়ে চুলে ডিম থেরাপি করলে অনেক টাকা নিত। ফ্রিতে হয়ে গেল।
গল্পটি কি আপনার পছন্দ হয়েছে? না হলে আমি আরও হাস্য কিংবা ক্রন্দনরস মিশিয়ে দিতে পারি।’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত