(Ramananda Chattopadhyay)
তাঁর সমাজ সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম একটি ক্ষেত্র ছিল অসবর্ণ বিবাহের পক্ষে সমর্থন এবং বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। ঔপনিবেশিক শাসনে সাংবাদিকতা খুব সহজ ছিল না। ১৮৯১ সালে রামানন্দ আফিম ব্যবসার বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ করছিলেন ‘ধর্মবন্ধু’ পত্রিকায়। লর্ড লিটনের বিষয়ে একটি শোকজ্ঞাপক প্রতিবেদনে ভারতের পূর্বতন গভর্নর জেনারেলের দমনমূলক নীতিকে উপস্থাপন করেছিলেন তাঁর লেখায়। সিটি কলেজের ছাত্র এবং ওই কলেজেরই সহকারী শিক্ষক থাকার সময় থেকেই রামানন্দ সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২)
হেরম্বচন্দ্র মৈত্র সম্পাদিত ‘ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের কাজে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় নানাভাবে সহযোগিতা করতেন। প্রায় একই সময় কৃষ্ণকুমার মিত্র সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকাতেও তিনি নিয়মিত লিখতেন। ধৰ্মবন্ধু পত্রিকায় তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিষয় থেকে শুরু করে সমাজ সংস্কার, শিক্ষামূলক সাহিত্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখতেন।
ইন্ডিয়ান মিরর এবং তত্ত্বকৌমুদী পত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন লেখা তাঁর অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। এরপরে এলাহাবাদ থেকে ১৯০১ সালে ‘প্রবাসী’ প্রকাশিত হয়। বৈচিত্র বিষয়বস্তু, অলঙ্করণ, প্রকাশনার মান ক্রমেই পাঠকদেরকে আকর্ষিত করতে থাকে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় রবীন্দ্রনাথের কবিতাবলী। এই প্রবাসী পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’, ‘অচলায়তন’, ‘রক্তকরবী’, ‘শেষের কবিতা’। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার প্রতিও প্রবাসীর আগ্রহ লক্ষ করার মতো। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলার সঙ্গে ভারতীয় চিত্রকলার নবধারার চিত্রকরদের কাজ প্রবাসীতে নিয়মিত প্রকাশ পেত। প্রবাসীর পাশাপাশি ‘দ্য মডার্ন রিভিউ’ প্রকাশের কাজও শুরু করলেন।

‘মডার্ন রিভিউ’ আর ‘প্রবাসী’-র মতো অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমগুলি দেশবাসীর দুঃখ, বেদনা এবং ক্রোধ তুলে ধরল পাঠকদের কাছে। পাঞ্জাবের নির্মম হত্যালীলার জবাব চাইতে শুরু করল মানুষ। জনমতের মাত্রা আরও গভীরতা পেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুঞ্জয়ী পত্রের মাধ্যমে। কবি চিঠি লিখেছিলেন ভাইসরয়কে, নাইটহুড উপাধি তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের নিরপরাধ মানুষের ওপর গুলিবৃষ্টি ঘটিয়ে যে হত্যালীলা ঘটানো হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে।
রবীন্দ্রনাথ এন্ড্রুজ সাহেব এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গান্ধীজির আন্দোলনের প্রতিও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থন ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের প্রতি বর্ণবৈষম্যবাদ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন গান্ধীজি। ১৯০৮ সালে ট্রান্সভ্যালে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে যখন গান্ধীজি জেলে যাচ্ছেন, সেই সময় মডার্ন রিভিউতে লেখা হল, ‘সমস্ত সম্মান সেই দৃপ্ত দেশপ্রেমিকদের জন্য বর্ষিত হোক।’
গান্ধীজি তাঁর স্ত্রী কস্তুরবাকে নিয়ে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। যাঁরা গান্ধীজিকে স্বাগত জানাতে স্টেশনে গিয়েছিলেন, তাঁরা উচ্চশ্রেণির কামরায় মহাত্মাকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে যখন ফিরে আসছিলেন, তখন দেখা যায় তৃতীয় শ্রেণির কামরা থেকে নগ্নপদে গান্ধীজি নেমে আসছেন!
ওই বছরই কংগ্রেসে নবাগত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নাম সভাপতি পদের জন্য প্রস্তাব করেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তিন বছর পরে রামানন্দ আবার সেই একই প্রস্তাব করেন। আজ যখন পশ্চিমবঙ্গ দিবস, বাংলা ভাগ নিয়ে নানান বিতর্ক চলছে, তখন ১৯৪৭ সালের জুন মাসের মডার্ন রিভিউ-র সংখ্যা দেখার সুযোগ পেলে পাঠকরা বুঝতে পারতেন, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত এবং কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত এই পত্রিকা অনেক ইতিহাসের দলিল হয়ে রয়েছে।
পত্রিকার জুন মাসের সংখ্যার কথা এই জন্য বললাম কারণ, সেখানে বাংলা ভাগের বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। ১৯১৫ সালে গান্ধীজি তাঁর স্ত্রী কস্তুরবাকে নিয়ে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। যাঁরা গান্ধীজিকে স্বাগত জানাতে স্টেশনে গিয়েছিলেন, তাঁরা উচ্চশ্রেণির কামরায় মহাত্মাকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে যখন ফিরে আসছিলেন, তখন দেখা যায় তৃতীয় শ্রেণির কামরা থেকে নগ্নপদে গান্ধীজি নেমে আসছেন!

এই কথা শুনে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘এই ঘটনাই প্রমাণ করে কেন মহাত্মা এবং তাঁর স্ত্রীর নাম সর্বজনবিদিত আর সর্বশ্রদ্ধেয়। দেশ এবং বিদেশের বহু বরেণ্য মানুষের সঙ্গে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সখ্য গড়ে উঠেছিল নির্ভীক সাংবাদিকতার সূত্রে। প্রাক স্বাধীনতাকালে জাতীয়তাবোধ এবং সাংবাদিকতার নিবিড় বন্ধনের জ্বলন্ত উদাহরণ ছিলেন আধুনিক ভারতের অন্যতম রূপকার রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।
জনাকীর্ণ কলকাতায় সংকীর্ণ বাসস্থান ও নতুন পরিবেশের সমস্যা বড় হয়ে উঠেছিল রামামন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দৈনন্দিন জীবনযাপনে। কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলেন না মডার্ন রিভিউ ভারতবর্ষের সর্বাপেক্ষা সমাদৃত পত্রিকাটিকে। অর্থনৈতিক সমস্যাও চলছিল। সেই সময় অনেকেই তাঁকে বার্ষিক ৬ টাকা চাঁদার হার আরও কিছুটা কমানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। প্রথম বছরে পত্রিকার লোকসান এবং দ্বিতীয় বছরে কিঞ্চিৎ উন্নতির বিষয়টি রামানন্দবাবু বুঝিয়েছিলেন পত্রিকার গ্রাহকদের।
১৯১০ সালে ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আক্ষেপের বিষয়, স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে ঔপনিবেশিক শাসনকালেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়।
আরও একটি বিষয় তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেটা হল বিনা পারিশ্রমিক বা সাম্মানিকে দেশের চিত্রকরদের চিত্রকলা প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার প্রসঙ্গটি। তখন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কোনও সহযোগী সম্পাদক ছিল না। তিনি কোনওরকম সাম্মানিক দক্ষিণাও নিতেন না। মনে করতেন, কোনও মতেই হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। ঈশ্বর চাইলে সাফল্য আসবেই। পত্রিকার সম্পাদক, কর্মী, পাঠক, সবার শুভ ইচ্ছাই সাফল্য এনে দেবে।
১৯৩৪ সালের জুন মাস থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’-র বিভিন্ন অধ্যায়ের ইংরেজি রূপান্তর প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়। অবশ্য এর অনেক আগেই ১৯৩১ সালে রাশিয়ার চিঠি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে অন্যত্র ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সত্যবাদিতাই এই পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল, আর এই বিষয়ের উদগাতা ছিলেন নির্ভীক সত্যদ্রষ্টা সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

কলেজে থাকার সময় থেকেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় দেশের জাতীয় সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৮৮৬ সালে তিনি কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যখন সারা বাংলা গর্জে উঠেছিল, তখন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রবাসীর জানুয়ারি সংখ্যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। এই বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে নিজেকে শুধুমাত্র লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন না, নগ্ন পদে প্রতিবাদ মিছিলেও হাঁটলেন।
১৯০৯ সালে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছাত্রসমাজের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১০ সালে ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আক্ষেপের বিষয়, স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে ঔপনিবেশিক শাসনকালেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লিখিত একাধিক পত্র থেকে জানা যায়, দেশ-বিদেশের বহু লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর সখ্যের কথা। ভারতীয় সাংবাদিকতার ভিত্তি শক্ত করার প্রধান কারিগর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে ভুলে গেলে ইতিহাস বঙ্গবাসীকে ক্ষমা করবে না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত