(Hul Divas)
সাঁওতাল সমাজে একটি প্রাচীন বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে— ‘দিকু পেড়া জানুম ঝান্টি’— অর্থাৎ, অ-সাঁওতাল (দিকু) কুটুম বা বন্ধু হল গিয়ে কুলের কাঁটাতুল্য। যদিও এই বাক্যে ‘দিকু’ শব্দটির অর্থগত বিস্তার ঘটেছে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে। প্রাথমিকভাবে ‘দিকু’ বলতে উনিশ শতকে ব্রিটিশ আমলে ছোটনাগপুর এবং সাঁওতাল পরগণা অঞ্চলে বহিরাগত জমিদার, জোতদার, সুদখোর মহাজন, ধূর্ত ব্যবসায়ী ও বণিক, ব্রিটিশ কর্মকর্তা, পুলিশ, ধর্মপ্রচারক মিশনারি ও অনান্য বহিরাগতদের বোঝানো হত। কালে কালে ‘দিকু’ চরিত্রের বদলের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থেরও বিস্তার ঘটেছে। ‘দিকু’ শব্দটির অর্থ বর্তমানে আর একমাত্রিক নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে আর্থসামাজিক, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের এক জটিল সমীকরণ।
আরও পড়ুন: হিন্দু-মুসলমানের চোখের জল মুছিয়ে দেন “আনোখা বিবি”
পণ্ডিতেরা মনে করেন, উক্ত প্রবাদটির জন্ম হয়েছিল সাঁওতাল বিদ্রোহেরও বহু আগে, ১৮ শতকের শেষ ভাগে অর্থাৎ যে সময় থেকে নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলে সাঁওতাল সমাজ ‘দিকু’দের দ্বারা নিষ্পেষিত ও অত্যাচারিত হতে শুরু করে। ঐতিহাসিকদের মতে, সাঁওতাল বিদ্রোহ কেবল একবার নয় বরং সমগ্র ১৯ শতক জুড়ে একাধিকবার সংঘটিত হয়েছিল— ১৮১১, ১৮২০, ১৮৩২, ১৮৫৫-৫৬, ১৮৭১, ১৮৭৪-৭৫ এবং ১৮৮০-১৮৮১। তবে একথা সকল ঐতিহাসিকরাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, ১৮৫৫-১৮৫৬ সালের ‘হুল’ই ছিল সবচাইতে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী— যা বিলেতের মাটিতে পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

১৮৫৫ সালের মাঝামাঝি বাংলা-বিহারের সীমান্তে সাঁওতাল বিদ্রোহের যে আগুন জ্বলে উঠেছিল তার কারণ এবং ফলাফল আজ সর্বজনবিদিত। ইতিমধ্যে অসংখ্য দেশি-বিদেশি গবেষকরা অজস্র গবেষণা করেছেন এই নিয়ে।
১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই বন্দোবস্তের মধ্যেই বপিত হয়েছিল ১৮৫৫ ‘হুল’-এর বীজটি। ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক রাজমহল পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ‘দামিন-ই-কোহ’ (ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘পাহাড়ের ওড়না/আঁচল বা প্রান্তদেশ’) নামে ঘোষণা এবং এই অঞ্চলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিষময় ফলস্বরূপ অধিক রাজস্ব আদায়, জঙ্গল কেটে কৃষিজমি উদ্ধার, রেললাইন পাতার কাজে সাঁওতাল শ্রমিক সংগ্রহ, পাহাড়িয়া জনজাতিদের কোণঠাসা করবার চেষ্টা এবং এই অঞ্চলে ঝুম চাষের পরিবর্তে লাঙল চাষের প্রচলন— ইত্যাদি নানা কারণে শাসক ইংরেজ সহজ সরল, অরণ্য-সন্তান সাঁওতালদের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, ওড়িশা প্রভৃতি স্থান থেকে এনে বসতি স্থাপন করায়।
রাজমহল অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে সাঁওতালরা দুর্ভেদ্য জঙ্গলে এসে গ্রাম-বসতি স্থাপন করেন, কৃষিজমি তৈরি করেন, আপন সংস্কৃতির শেকড় চাড়িয়ে দেন এই মাটিতে। একটি প্রাচীন সাঁওতালি গানে এই সময়ের কথা ধরা রয়েছে সুন্দরভাবে –
অকয় মায় চিয়ালেৎ হো বীর দিশম দ
অকয় মায় দহলেৎ আতরে পাঁয়ড়ি।।
মারাং বুরুয় চিয়ালেৎ হো বীর দিশম দ
জাহের এরায় দহলেৎ আতরে পাঁয়ড়ি।।
(কে এই বনভূমি আবিষ্কার করলেন কেই বা এখানে বসতি স্থাপন করলেন? মারাংবুরু এই বনভূমি আবিষ্কার করলেন এবং জাহের এরা এইখানে বসতি স্থাপন করলেন)
১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন ভাগলপুরের বারহেটের ভগনাডিহির প্রান্তরে প্রায় ৪০০ গ্রামের দশ হাজার সাঁওতাল মানুষের জমায়েতে সিধু-কানু, চাঁদ-ভৈঁরো, ফুল-ঝানোর নেতৃত্বে গর্জে ওঠে সমগ্র দামিন-ই-কোহ!
সাঁওতালরা তাঁদের বহু শ্রমে লব্ধ এই সুজলা সুফলা দামিন দেশে বেশি দিন নিরুপদ্রপে থাকতে পারলেন না। সুদখোর বেনিয়া, মহাজন, ব্রিটিশের সঙ্গে সমঝোতাকারী দেশীয় জমিদার, দারোগা, পুলিশের লোলুপ দৃষ্টি পড়ল এই অঞ্চলের উপর। অর্থনৈতিক ছলচাতুরি, বেনিয়ম, বেগার শ্রম, অতিরিক্ত কর আদায়, মহাজনদের শোষণ, সামাজিক-ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ এমনকি সাঁওতাল নারীদের অবমাননা— এইরকম নানবিধ মারের মুখে যখন সাঁওতালদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে, ঠিক সেই আবহে ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন ভাগলপুরের বারহেটের ভগনাডিহির প্রান্তরে প্রায় ৪০০ গ্রামের দশ হাজার সাঁওতাল মানুষের জমায়েতে সিধু-কানু, চাঁদ-ভৈঁরো, ফুল-ঝানোর নেতৃত্বে গর্জে ওঠে সমগ্র দামিন-ই-কোহ!

ভগনাডিহির প্রান্তরে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিদ্রোহীরা সর্বপ্রথম ১৮৫৫ সালের ৭ই জুলাই গুমানী নদীর পাড়ে কুখ্যাত মহেশ দারোগা আর মহাজন কেনারাম ভকতকে হত্যা করেন। এরপর বারহেট বাজারে মহাজনদের গদি দখল করে অনেক বন্দী ক্রীতদাসদের মুক্ত করেন। ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহের আকস্মিকতায় হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রমে তারাও বিদ্রোহ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে। ১৮৫৫ সালের ১১ই জুলাই বিদ্রোহ দমনের জন্য মেজর Burroughs-এর নেতৃত্বে ১৬০ কোম্পানি সৈন্য নিয়ে কলগাঁ আক্রমণ করেন। ক্রমেই আন্দোলনের আগুন ভাগলপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, পাকুড়, বীরভূম, মুর্শিদাবাদের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে।
ভীতসন্ত্রস্ত ইংরেজ বাহিনী ১৮৫৫ সালের ১০ই নভেম্বর সামরিক আইন জারি করে। সাধারণ তীর-ধনুক-টাঙ্গি-কুঠারের সঙ্গে ইংরেজের বন্দুক-কামান গোলা বারুদের লড়াই প্রথম থেকেই ছিল অসম।
দুই পক্ষেই প্রচুর মানুষের প্রাণ যায় ও বিরাট অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৫৫-র জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্রোহ ভয়াবহ চেহারা নেয়। ভীতসন্ত্রস্ত ইংরেজ বাহিনী ১৮৫৫ সালের ১০ই নভেম্বর সামরিক আইন জারি করে। সাধারণ তীর-ধনুক-টাঙ্গি-কুঠারের সঙ্গে ইংরেজের বন্দুক-কামান গোলা বারুদের লড়াই প্রথম থেকেই ছিল অসম। সাঁওতাল বিদ্রোহীরা তবুও পিছু হঠেননি। বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে সিধু-কানু নেতৃদ্বয় অবশেষে ইংরেজের কাছে বন্দী হন, এবং ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁদের হত্যা করার মধ্যে দিয়ে সাঁওতাল বিদ্রোহের কণ্ঠরোধ করে ব্রিটিশ সরকার।

সাঁওতাল বিদ্রোহ পরবর্তীকালে দেশের জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল মুক্তিকামী মানুষের লড়াই হিসেবে। প্রবল ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে সাঁওতাল সমাজের যে লড়াই, তাকে বর্তমানের দেশবাসী বা সংবেদনশীল ইতিহাসসচেতন মানুষেরা ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে কুণ্ঠিত হননি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ইতিহাসের ‘সাঁওতাল বিদ্রোহের’ স্থান অজর অমর।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত