(Gen Z Slogan)
মিছিলের চেনা সংজ্ঞাটাই আজ ওলটপালট হয়ে গেছে। গলার জোর, মাইকের সামনে চিৎকার আর গতানুগতিক স্লোগানের পুরনো বৃত্ত ভেঙে রাজপথ দখল করেছে পপ কালচার, ইন্টারনেটের এক চিলতে বিদ্রূপ, এমনকি ডেটিং অ্যাপের চ্যাট। যে প্রজন্ম বড় হয়েছে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক আর ইউটিউবের স্ক্রিন স্ক্রোল করতে করতে, তাদের প্রতিবাদের ভাষা আর পাঁচটা প্রচলিত রাজনৈতিক ফরম্যাটে বাঁধা থাকে না, সেটাই স্বাভাবিক। ক্ষোভ সেখানে নিছক ক্রোধ নয়; বুদ্ধিদীপ্ত শ্লেষ, মিম ও মেধার রসিকতায় শাণিত এক প্রতিরোধ যেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজপথে ছাত্র আন্দোলনের যে দৃশ্যপট উঠে আসছে, তা প্রমাণ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম— যাঁদের পরিচয় ‘জেন-জি’ (Gen-Z) নামে— ক্ষমতার সঙ্গে বোঝাপড়ার ব্যাকরণটাই চিরতরে বদলে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: হোমস্টে: ঠিক বাড়ি নয়, আবার বাড়িও
এই প্রজন্ম আমাদের বুঝিয়ে দিতে চাইছে নিজ ক্ষেত্রে বড় হও, কিন্তু অহংকারী হয়ে নয়। দৃঢ় হও, কিন্তু কঠোর হয়ে নয়। জীবনের সব ঝড় বয়ে গেলেও নিজের জায়গায় অটল থাকো। সেটাই হবে তোমার নৈতিক জয়। অর্থাৎ, পাহাড়, মানুষকে পাহাড় হতে শেখায়।
আগের প্রজন্ম বা মিলেনিয়ালদের (Millennials) প্রতিবাদের ভাষা ছিল মূলত আদর্শগত, গুরুগম্ভীর এবং সরাসরি রাজনৈতিক বা তাত্ত্বিক তরজায় ভরপুর। সেখানে স্লোগানগুলো হত দীর্ঘ, আক্রমণাত্মক, কিছুটা আনুষ্ঠানিক। কিন্তু জেন-জি প্রজন্মের কাছে প্রতিবাদ কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়, এটা যেন দৈনন্দিন জীবনযাপনেরই অঙ্গ। তাঁরা এমন এক যুগে বড় হয়েছেন, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ফলে তাঁদের প্রতিবাদের ভাষায় অবলীলাক্রমে ঢুকে পড়েছে সিনেমার সংলাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং মিউজিক। রাজপথে শোভা পাচ্ছে বুদ্ধিদীপ্ত শ্লেষ আর আত্মোপলব্ধির বিদ্রূপ।

আজকের ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান আকর্ষণ তাঁদের হাতে তৈরি প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার। অর্থাৎ স্লোগান আর শুধুমাত্র রাস্তার কথা ভেবে লেখা হচ্ছে না। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হওয়ার উপযুক্ত স্লোগান মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ডে ডেটিং অ্যাপের চ্যাট থেকে শুরু করে সিনেমার চরিত্র— সবই জায়গা করে নিচ্ছে। সরকারের সাড়া না দেওয়ার ভঙ্গিটি ফুটিয়ে তুলতে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা হয়েছিল: “Even my ex hadn’t ignored me this much” (আমার প্রাক্তনীও আমাকে এত উপেক্ষা করেনি)। অন্য একটি প্ল্যাকার্ডে ডেটিং অ্যাপের তুলনা টেনে বলা হয়: “My Hinge matches reply faster than they do” (আমার হিঞ্জ ম্যাচরাও এদের চেয়ে দ্রুত রিপ্লাই দেয়)।
ছাত্রছাত্রীদের এই ধরনের হাস্যরসাত্মক তুলনার মধ্যে দিয়ে সরকারের উদাসীনতা বা নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতা তীব্রভাবে বিদ্রূপের শিকার হচ্ছে। কোথাও আবার মশকরা করে বলা হচ্ছে: “Kuchuphu resign de do na” (কুচুপু, একটু পদত্যাগ করে দাও না)। কুচুপু হলো সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় ভাইরাল ট্রেন্ড। এটি একটি আদুরে নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার মিষ্টি করে ‘তুমি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করতেও বলা হয়ে থাকে।

চলচ্চিত্রের চরিত্র বা স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যানের মতো কস্টিউম পরে প্রতিবাদে সামিল হওয়া তরুণরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, প্রতিবাদ মানেই বিষণ্ণতা নয়; প্রতিবাদ হতে পারে শিরদাঁড়া সোজা রেখে এক উৎসব পালনের মতো। তাই বিখ্যাত পরিচালক ওং কার-ওয়াইয়ের ছবি ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ সাম্প্রতিক ভারতের নিরিখে মজাচ্ছলে হয়ে উঠছে ‘ইন দ্য মুড ফর অ্যানাদার পেপার লিক’।
শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা, প্রশ্নপত্র ফাঁস করার মতো বিষয়গুলিও জেন-জিদের হাতে লঘু চালে অথচ অত্যন্ত ধারালোভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, “Our futures weren’t lost. The government leaked them for profit”
নিট পেপার লিক নিয়ে ভারত এই মুহূর্তে উত্তাল, যার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে ন্যস্ত হয়েছে এবং ৪৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। যাকে মূলত জেন-জি আন্দোলন বলা হচ্ছে।

শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পাঠ্যক্রম সঙ্কুচিত করার মতো গুরুতর বিষয়গুলিও জেন-জি প্রতিবাদীদের হাতে লঘু চালে অথচ অত্যন্ত ধারালোভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, “Our futures weren’t lost. The government leaked them for profit” (আমাদের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যায়নি, সরকার মুনাফার লোভে তা ফাঁস করে দিয়েছে)। বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রকে সরাসরি আক্রমণ করে স্লোগানটি। অন্যদিকে, পুলিশি বা প্রশাসনিক দমনপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে গভীর বেদনাবোধ ও সাহসের প্রতীক হয়ে উঠছে, “We are students, not target practice” (আমরা ছাত্র, কোনও টার্গেট প্র্যাকটিসের বস্তু নই)।
শুধু তাই নয়, স্কুলের পাঠ্যক্রম বদল বা ইতিহাস-বিজ্ঞান বইয়ের পরিধি কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও প্ল্যাকার্ডে প্রশ্ন তোলা হয়েছে: “Periodic table? Evolution? Political Science and History books reduced to nothing. Then what’s the syllabus? Dhurandhar script.” (পর্যায় সারণী? বিবর্তন? রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস বইগুলোকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। তাহলে এখন সিলেবাস কী? ধুরন্ধর চিত্রনাট্য)। আরেকটি প্ল্যাকার্ডে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে— “Stop shrinking the syllabus, change the system!” (সিলেবাস ছোট করা বন্ধ করুন, সিস্টেম বদলান!)।

শুধু শিক্ষা নয়, বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলোও উঠে আসছে নতুন প্রজন্মের ভাষায়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে লেখা স্লোগান, “Hume hamare bure din hi wapas kar do” (এর চেয়ে আমাদের সেই খারাপ দিনগুলোই ফিরিয়ে দিন)। আবার সংবিধানের মূল ভিত্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল স্লোগানও দেখা গেছে, যেমন— “You can’t gaslight an entire Gen” (একটা গোটা প্রজন্মকে আপনি গ্যাসলাইট করতে পারবেন না) এবং “Bring back secular India” (ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে ফিরিয়ে আনুন)।
পুলিশি ধাওয়া বা লাঠিচার্জের মতো দমনপীড়নকেও তাঁরা ডিজিটাল কন্টেন্টে রূপান্তর করছেন। যেমন, পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় স্ট্রাভা (Strava) অ্যাপের স্ক্রিনশট শেয়ার করে ট্র্যাকিং ডেটা আপলোড করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়
নারীদের সুরক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে জেন-জিদের প্ল্যাকার্ডে। নতন প্রজন্মের মেয়েরা আওয়াজ তুলছেন, “Too loud? Turn down your ego” (খুব জোরে শোনাচ্ছে? নিজের অহংকার কমান) কিংবা “Queens don’t compete, they co-create” (রানিরা প্রতিযোগিতা করেন না, তাঁরা একসঙ্গে সৃষ্টি করেন)। উঠে আসছে বাংলায় লেখা স্লোগান, “আমি রূপকথা নই, নিজেই নিজের ইতিহাস”, “আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত”, মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে “আগে মন, পরে কাজ”।

খুব সাম্প্রতিক সময়ে এহেন প্রতিবাদের পদ্ধতিতে এক অভিনব পরিবর্তন দেখা গেল। পুলিশি ধাওয়া বা লাঠিচার্জের মতো দমনপীড়নকেও তাঁরা ডিজিটাল কন্টেন্টে রূপান্তর করছেন। যেমন, পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় স্ট্রাভা (Strava) অ্যাপের স্ক্রিনশট শেয়ার করে ট্র্যাকিং ডেটা আপলোড করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, দেখাচ্ছেন— কে কত কিলোমিটার দৌড়ে পালিয়ে বাঁচল! কোথাও আবার ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ গানের সঙ্গে রিল বানিয়ে বলা হচ্ছে: “Parliament ki doorbell baja ke bhag gaya!” (সংসদের দরজায় বেল বাজিয়ে পালিয়েছি!)।
অর্থাৎ, আন্দোলন আজ আর কেবল স্লোগানের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি ভিজ্যুয়াল স্পেকটাকল বা চাক্ষুষ উৎসবে পরিণত হয়েছে। শত শত শিক্ষার্থী একসঙ্গে জমায়েত হয়ে প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরছেন, আর মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি বা ভিডিও পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। অনেক সময় বক্তৃতার শব্দের চেয়ে তাঁদের প্ল্যাকার্ডের ভাষা অনেক বেশি জোরালো হয়ে উঠছে।

জেন-জি আন্দোলনের এই ভাষাগত ও কৌশলগত নতুনত্ব কেবল একটি যুগের ক্ষণস্থায়ী পছন্দ নয়, তা আধুনিক রাজনীতির এক বৈপ্লবিক পুনর্গঠন। সনাতন রাজনৈতিক কাঠামোর গুরুগম্ভীর, আবেগপ্রবণ ও একরৈখিক আন্দোলন যেখানে প্রায়শই স্বৈরাচারী ক্ষমতার কাছে স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে এই নতুন মাধ্যমগুলো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বিদ্রূপ, মিম, পপ-কালচারাল রেফারেন্স ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টকে ব্যবহার করে জনমত গঠনে অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রদর্শন করছে।
মিম কিংবা ছোট কোনও শ্লেষাত্মক প্ল্যাকার্ডের মতো আপাতসাধারণ ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলোই প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষ্যের চেয়ে গভীরতর প্রভাব ফেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক দমনপীড়নের মুখে যখন প্রথাগত গণতান্ত্রিক যোগাযোগের পথগুলো সংকুচিত হয়, তখন বুদ্ধিদীপ্ত উপহাস ও ধারালো ব্যঙ্গাত্মক অভিব্যক্তি ক্ষমতার অন্ধত্বকে উন্মোচিত করার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তরুণ প্রজন্মের এই উৎসবমুখর ও ডিজিটাল-ভিত্তিক ক্ষোভ প্রকাশ বস্তুত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ, যা নাগরিক অধিকার সচেতনতাকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ফলে মিম কিংবা ছোট কোনও শ্লেষাত্মক প্ল্যাকার্ডের মতো আপাতসাধারণ ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলোই প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষ্যের চেয়ে গভীরতর প্রভাব ফেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু ‘আজাদি’ একই থাকে।
মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত