(Dada Apple Boudi Apple)
‘দাদা, আজ কিন্তু অনেকখানি দেরি করে ফেলেছেন।’ ভ্যানের প্যাডেলে পায়ের চাপ বাড়াতে বাড়াতে বলল জীবন। জীবন দলুই। ‘হ্যাঁ, আসলে অনেকটা দেরি হয়ে হয়ে গেল! তবু দ্যাখো যদি…।’ –ভ্যানের গায়ে আটকানো বাঁকা লোহার রডটা ধরে ঝাঁকুনি সামলাতে সামলাতে বলল সোমনাথ।
সোমনাথ ঘোষাল। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। বাড়ি আমতা। স্টেশন থেকে হাঁটাপথে বড়জোর মিনিট পঁচিশ। এখানে ভিজিটে এলে বাড়ি যাওয়ার জন্য যে স্টেশন থেকে গাড়ি ধরতে হয়, আমতা প্রায় মাইল তেরোর পথ সেখান থেকে। রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, তাতে ট্রেনটা ধরা যাবে কি না, সন্দেহের কাঁটাটা খচখচ করেই যাচ্ছে মনের মধ্যে। জীবনদাকে জোরে টানতে বলার উপায় নেই। একে তো বুড়ো মানুষ, তার ওপর রাস্তার যা অবস্থা।
আরও পড়ুন: দেশের ইতিহাসে রং বদলেছেন যাঁরা
আসলে দেরি তো হয়ে গেল ডিস্ট্রিবিউটারের ঘরে। চেকটা দিতে দিতে এতটা দেরি করে ফেলল। চা আনায় বারবার, একথা-সেকথা, মাঝেমাঝেই সিঙাড়া, জিলিপি কিন্তু চেকটা আর ছাড়ে না। এই এদের একটা স্বভাব। টাকাটা বের করতে যে কী হয়! সেই তো দিতেই হবে রে বাবা। মাঝখান থেকে… গলার মাফলারটা ভাল করে কানেও পেঁচিয়ে বেঁধে নিল সোমনাথ। তারপর শক্ত মুঠোয় ভ্যানের হাতলটা চেপে ধরল ফের।
এইখানে সোমনাথের পরিচয়টা আরেকটু খোলসা করে বলা দরকার। সোমনাথ ঘোষাল। বয়েস আটতিরিশ। একটা নামী মাল্টিন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল মেডিসিন কোম্পানির ক্যানভাসার, আজকাল যার গালভরা নাম হয়েছে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ আর কী। হাওড়া, হুগলি আর বর্ধমানের বড় একটা এলাকা জুড়ে কাজের এরিয়া ওর।

আজকের ভিজিটিং এরিয়াটা বিখ্যাত তার খইচুর* ধানের জন্য। আর সেই ধানের চারায় বিশেষ ধরনের একটা পোকা মারার জন্য সোমনাথদের কোম্পানির একটা ওষুধের প্রচণ্ড চাহিদা এই অঞ্চল জুড়ে। ফলে মাসে অন্তত দু’বার ফিল্ড ভিজিটের জন্য আসতেই হয়। আর বাড়ি ফেরার জন্য এটাই শেষ ট্রেন। এই ট্রেনেই প্রতিবার ফিরতে হয় ওকে। আর সেটা ধরতে পারবে কি না, সেই চাপা টেনশনটাও থেকে যায় বরাবর। তবে আজ দেরিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে।
চাপ চাপ ঘন কুয়াশা আর খানাখোঁদল ভর্তি রাস্তা উজিয়ে এগোচ্ছিল ভ্যান রিক্সা। দুপাশে বিস্তীর্ণ ফসলকাটা মাঠ, নালা, আলপথ, পাতাঝরা গাছ আর আকাশের গায়ে এলিয়ে পড়ে থাকা ফ্যাকাশে একফালি চাঁদ। আরও মিনিট দশেক বাদে ক্ষেতের ওপারে শোনা গেল ট্রেনের হুইসলটা। ছাড়ার বাঁশি দিচ্ছে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্টিন রেল*।
প্রায় মাটির গায়ে মিশে থাকা প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া সরু ন্যারো গেজ রেললাইন ওকে পরিহাস করছে যেন, এরকমটাই মনে হচ্ছিল। এই কড়া শীতেও কপালের রগে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দৌড়জনিত পরিশ্রমের ফল। হাপরের মতো বুকের খাঁচাটা ওঠানামা করছে। সামনে এগিয়ে এলেন স্টেশন মাস্টার গুণময় বৈরাগী। বেঁটেখাটো, ভালমানুষ চেহারা।
‘চলন্ত মার্টিন রেল থেকে নেমে বাহ্যেপেচ্ছাপ সেরে এসেও ফের উঠে পড়া যায়।’ এমনটাই বলে এ লাইনের মানুষ। কিন্তু এখান থেকে স্টেশনে পৌঁছোনোর উপায় বলতে মাঠের মাঝখান চিরে চলে যাওয়া আধ কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা এবড়োখেবড়ো আলপথটা। ঝটিতি স্যাম্পেল ফাইল, সেলস রিপোর্ট আর কাগজপত্র ঠাসা ক্যানভাসারের পেটমোটা চামড়ার ব্যাগটা নামিয়ে, জীবনদার পয়সা মিটিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ফসল কাটা মাঠের আলপথ ধরে দৌড় লাগাল সোমনাথ।
বেদম হাঁফাতে হাঁফাতে যখন প্ল্যাটফর্মে পা রাখল, ততক্ষণে কমপক্ষে এক কিলোমিটার এগিয়ে গেছে রেলগাড়ি। পিছনের লাল আলোটা মেয়েদের কপালের একটা টিপের মতো ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়েই গেল ঠাস ঘন কুয়াশার চাদরের আড়ালে। মার্টিন রেলের শ্লথগতির যতই বদনাম থাক, অতটা দূর ছুটে ওই গাড়িটা ধরা মোটেই সম্ভব নয়, সম্ভব নয় আজ রাতের এই লাস্ট লোকালে চড়ে বাড়ি ফেরাটাও, সেটা বুঝে ফেলতে একটুও সময় লাগল না সোমনাথের।

প্রায় মাটির গায়ে মিশে থাকা প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া সরু ন্যারো গেজ রেললাইন ওকে পরিহাস করছে যেন, এরকমটাই মনে হচ্ছিল। এই কড়া শীতেও কপালের রগে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দৌড়জনিত পরিশ্রমের ফল। হাপরের মতো বুকের খাঁচাটা ওঠানামা করছে। সামনে এগিয়ে এলেন স্টেশন মাস্টার গুণময় বৈরাগী। বেঁটেখাটো, ভালমানুষ চেহারা। এ স্টেশনের টিকিট চেকার, বুকিং ক্লার্ক… এককথায় অল পারপাস জব পারসোনেল। সঙ্গে পোর্টার ছেদিলাল। হাতে তখনও চৌকো পেতলের বাতিটা ধরা। ‘এ হে! গাড়িটা মিস করে গেলেন!’ যেন এটা তাঁরই দোষ, মনে হল গলার স্বরে।
প্রায় পাঁচ ছ’বছর ধরে কাজ করছে এই টেরিটোরিটায়। ফলে ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে গেছে। ততক্ষণে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন গুণময়বাবু। ‘দেখুন দিকিনি কান্ডটা একবার। রাতের বেলা এই ঠান্ডার মধ্যে কোথায় যে থাকতে বলি আপনাকে। আমার কোয়ার্টারের খাটটায় তো একজনেরই জায়গা হয় না ঠিকঠাক, আর ছেদির তো ঘরে ওর বউ, একগাদা আন্ডাবাচ্চা…’ বলতে বলতে চোখমুখের চেহারা ঘোরালো হয় স্টেশন মাস্টার বাবুর।
মাঝারি আকারের ঘর। প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে আলোয় দু-চারটে চেয়ার, দেখা যাচ্ছিল আবছা। একইরকম টিমটিমে আলো ভেতরেও। ছেদিলাল সুইচ টিপতে স্পষ্ট বোঝা গেল সেটা। কোনে ছোট একটা কামরা। ওপরে লেখা বাথরুম। সারা ঘর জুড়ে ভ্যাপসা একটা গন্ধ।
‘চারপাশের অবস্থা মোটেই ভাল না। এই তো দিন পনেরো কুড়ি আগে জিআরপি-র এ এস আই ভজহরি কুশারি। আমাদের ভজহরিবাবু। আগের স্টেশনে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে ভর দুপুরবেলায় সবার চোখের সামনে কেটে ফেলল। আর এদিকে এখানকার শ্যামাপদ দত্ত। তেজারতি কারবারি। অত বড় ব্যাবসা! তার বাড়িতে ঢুকে তাকে তো মারলই, আলমারি খুলে বন্দুকটাও নিয়ে চলে গেল। এই স্টেশনেও ওরা আসে মাঝে মাঝে। ওই দেখুন!’ ত্রাসমাখা চোখে টিকিট ঘরের দিকে আঙুল দেখালেন স্টেশন মাস্টার বাবু। হলুদ দেওয়ালের ওপর আলকাতরা দিয়ে বড় বড় কালো হরফে লেখা – ‘৭০ দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন!’, ‘শ্রেণিশত্রুর মুন্ডু কাটা চলছে চলবে!’ ইত্যাদি।
ফের সোমনাথের দিকে চোখ ঘোরালেন ভদ্রলোক। ‘এ অবস্থায় তো আপনাকে আর খোলা প্ল্যাটফর্মে রাত কাটাতে বলতে পারি না মশাই, তাই…’ পাশে দাঁড়ানো ছেদিলালের দিকে তাকালেন স্টেশন মাস্টার। ‘গেস্ট রুমটার তালা খোল তো।’ আদেশ পাওয়া মাত্র অফিসঘরের দিকে এগিয়ে গেল ছেদিলাল।

মাঝারি আকারের ঘর। প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে আলোয় দু-চারটে চেয়ার, দেখা যাচ্ছিল আবছা। একইরকম টিমটিমে আলো ভেতরেও। ছেদিলাল সুইচ টিপতে স্পষ্ট বোঝা গেল সেটা। কোনে ছোট একটা কামরা। ওপরে লেখা বাথরুম। সারা ঘর জুড়ে ভ্যাপসা একটা গন্ধ।
‘বহুদিন না খুললে যা হয় আর কি।’ হাসলেন স্টেশন মাস্টার। ‘ওই ছেদিই ন’মাসে ছ’মাসে এক-আধবার যা একটু ঝাড়পোঁছ করে! শুনছি তো এ লাইনই আর থাকবে না। দিনে চারটে গাড়ি যাতায়াত করে মাত্তর! লসে চলছে পুরো। তখন…!’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভদ্রলোকের বুক থেকে! “আর আপনার তো কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। কষ্টেসৃষ্টে কাটিয়ে দিন কোনওমতে। দরজা ভেজানো রইল। আমতার ফার্স্ট ট্রেন ছটা চল্লিশ। আমরাও ফিরে আসব ততক্ষণে… আমি আসি তাহলে?” ছেদিলালকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন স্টেশন মাস্টার।
সেই ঘুম ভেঙে গেল ঘন্টাদুয়েক বাদে- ‘কিঁইইচ!’ একটা শব্দে। দরজা ঠেলে ঢুকলেন একজন। রীতিমতো সুটেড বুটেড স্মার্ট চেহারা। চোখে দামি চশমা। গায়ে দামি পারফিউমের গন্ধ ম ম করছে। কোনওদিকে না তাকিয়ে সোজা গটগটিয়ে গিয়ে বসে পড়লেন উল্টোদিকের চেয়ারটায়।
ওরা চলে যাওয়ার পর বাঁ কব্জি উল্টে হাতঘড়িতে সময় দেখল সোমনাথ। এগারোটা বেজে চল্লিশ। তারপর ব্যাগ থেকে খবরের কাগজ বের করে একটা চেয়ার ভাল করে মুছে দিয়ে বসে পড়ল সেখানে। একে সারাদিনের পরিশ্রম। তার ওপর ওই ঘোড়দৌড়। ঘাড়টা চেয়ারে হেলিয়ে দিতেই চোখ লেগে এল কয়েক মিনিটে।
সেই ঘুম ভেঙে গেল ঘন্টাদুয়েক বাদে- ‘কিঁইইচ!’ একটা শব্দে। দরজা ঠেলে ঢুকলেন একজন। রীতিমতো সুটেড বুটেড স্মার্ট চেহারা। চোখে দামি চশমা। গায়ে দামি পারফিউমের গন্ধ ম ম করছে। কোনওদিকে না তাকিয়ে সোজা গটগটিয়ে গিয়ে বসে পড়লেন উল্টোদিকের চেয়ারটায়। হাতের দামি এ্যাটাচি কেস থেকে ইংরেজি একটা খবরের কাগজ বের করে ওই টিমটিমে আলোতেই পড়তে শুরু করলেন বেজায় মন দিয়ে।

এত রাতে একজন চরম সাহেবি কেতার মানুষ এরকমভাবে মাঝরাত্তিরে ন্যারো গেজ লাইনের এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনের গেস্ট রুমে ঢুকে ইংরেজি খবরের কাগজ… ভেবেচিন্তেও কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিল না সোমনাথ। ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, ‘জাস্ট বিয়ন্ড থট!’ এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তাই।
এরপর মিনিট পনেরো কুড়িও কাটেনি। ফের এক ধাক্কায় খুলে গেল দরজাটা। একটা মেয়ে। মোটামুটি সোমনাথের বয়সিই হবে, সিঁথি ভর্তি জ্যাবজ্যাবে সিঁদুর। টানা বড় বড় একজোড়া চোখ। গায়ে জড়ানো ছেঁড়াখোড়া একটা কাঁথা। হাতে একটা পুরোনো বিগ শপারে ঠাসা নোংরা কাপড়চোপড়। কোনওদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ঘরে ঢুকেই ধমাস শব্দে ব্যাগটা নামিয়ে রেখেই নিজেও ধপ করে বসে পড়ল মেঝেয়। তারপর ফিকফিক করে হেসে হাতদুটো জাগলারের মতো বল লোফালুফির ভঙ্গিতে শূন্যে নাড়াতে নাড়াতে ‘দাদা আপেল বৌদি আপেল…’ এই একটাই কথা বলেই চলল ক্রমাগত।
মাঝ পৌষের এই কড়া শীতেও কপাল বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে নামছে ঘামের স্রোত! বেতস পাতার মতো কাঁপছে গোটা শরীর! ত্রাসে, আতঙ্কে ডুবে যেতে যেতে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। খবরের কাগজের আড়ালে সেই মুখ।
আড়চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল সোমনাথ। নির্বিকার চিত্তে কাগজ পড়ে চলেছেন। এই ঘরে যে আরও দু-দুটি প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে সেটা জানাই নেই যেন! সন্দেহ, বিস্ময়ের সঙ্গে এবার শুরু হয়েছে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া হিমেল ঠান্ডা একটা ভয়ের স্রোত! তবে ভয় আর বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল যতক্ষণ না সেটা– ‘ধরাম!’ শব্দে এসে আছড়ে পড়ল দরজায় আর হাঁ হয়ে খুলে গেল পাল্লা দুটো!
একটা লোক। বেজায় ঢ্যাঙাপানা চেহারা। ভয়ংকর নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত, শতচ্ছিন্ন আলপাকার একটা কোট গায়ে, মাথাভর্তি জটপড়া চুল আর একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল, সাইক্লোন ঝড়ের মতো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল! তারপর সোজা এসে বসে পড়ল ঘরের মাঝখানে। চোখে ভাঁটার মতো আগুনে একটা দৃষ্টি নিয়ে সোজা তাকিয়ে রইল সামনে সোমনাথের চোখে চোখ রেখে। ‘লাগ হাড়ে হাড়ে খটখটি!’ থেকে থেকেই ফাঁপা জালা বেয়ে উঠে আসার মতো গুমগুমে গলার আওয়াজে বলে উঠছিল কথাগুলো।

মাঝ পৌষের এই কড়া শীতেও কপাল বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে নামছে ঘামের স্রোত! বেতস পাতার মতো কাঁপছে গোটা শরীর! ত্রাসে, আতঙ্কে ডুবে যেতে যেতে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। খবরের কাগজের আড়ালে সেই মুখ। একইরকম নির্বিকার ও ভাবলেশহীন! ডানহাতের বাহুমূলে বাঁধা পাঁচু ঠাকুরের তাগাটা চেপে ধরে জ্ঞান হারাল সোমনাথ!
জ্ঞান ফিরল চোখমুখে জলের ছিটেয়। খোলা দরজাটা দিয়ে শীতভোরের হাল্কা ফ্যাকাশে আলো এসে পড়ছে ঘরের মধ্যে। সেই আলোয় সামনে দাঁড়ানো রাতের সেই স্যুটেড বুটেড গম্ভীর ভদ্রলোক। হাতে একটা জলের মগ। সম্ভবত ওই বাথরুমের। মুখে গাম্ভীর্যের বদলে মুচকি একটা হাসি। ‘সরি আপনাকে এভাবে বিব্রত করবার জন্য। আসলে আমাদের কাছে সিওর ইনফরমেশন ছিল, ওই যে স্টেশনের দেওয়াল জুড়ে যাদের লেখা রয়েছে, দলটার টপ লেভেলের একজন ইউথ লিডার এই ভোরের ট্রেনটাতেই শেল্টার চেঞ্জ করবে, এরকমই ইনফরমেশন ছিল আমাদের কাছে। সেই অনুযায়ী ঠিক সময়ই ক্যামুফ্লেজে পজিশন নিয়েছিলাম আমরা। আর ঘরে ঢুকেই আপনাকে দেখতে পেলাম।
‘খুব জোর বাঁচা বেঁচে গেলেন মশাই! ভাগ্যিস ভয় খেয়ে পালানোর চেষ্টা করেননি। কারণ হেডকোয়ার্টার থেকে অর্ডার ছিল স্ট্রেইট স্পট এনকাউন্টারের। এখানেই ঝেড়ে দেওয়া আর কী, এতটুকুও রিস্ক না নিয়ে।’
আর কী আশ্চর্য! ওই লোকটার চেহারার সঙ্গে প্রচুর মিল আপনার। তবুও রাতে কম পাওয়ারের আলোয় প্রপারলি আইডেন্টিফাই করতে অপেক্ষা করছিলাম ভোর হওয়ার। কিন্তু বাঁহাত দিয়ে ডানহাতটা ধরা মাত্র চোখে পড়ল আপনার রিস্টওয়াচটা। ব্যস! বুঝে ফেললাম যে আমরা যাকে খুঁজছি, আপনি অন্তত সে নন। কারণ লোকটা ডান হাতে ঘড়ি পরে। ওটাই ওর সিগনেচার মার্ক।’ বলতে বলতে আরেকটু সামনে ঝুঁকে পড়লেন ভদ্রলোক। চোখমুখের চেহারায় সেই থমথমে ভাবটা ফিরে এসছে আবার।
‘খুব জোর বাঁচা বেঁচে গেলেন মশাই! ভাগ্যিস ভয় খেয়ে পালানোর চেষ্টা করেননি। কারণ হেডকোয়ার্টার থেকে অর্ডার ছিল স্ট্রেইট স্পট এনকাউন্টারের। এখানেই ঝেড়ে দেওয়া আর কী, এতটুকুও রিস্ক না নিয়ে।’ মুখের হাসিটা আবার ফিরে আসছে ভদ্রলোকের। ‘ইনফরমেশন ফেইলইওর, বোঝামাত্র গাড়িতে গিয়ে বসতে বললাম সাবর্ডিনেট দু’জনকে। আর নিজে ওয়েট করতে লাগলাম আপনার জ্ঞান ফেরার জন্য। সরি এগেইন, এভাবে আপনাকে ডিসটার্ব করতে হল। আসি তাহলে?’
ত্রাস আর বিস্ময়স্তব্ধ সোমনাথের সামনে দিয়ে গেস্ট রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
*জয়নগরের কনকচূড় ধানের মোয়ার মতই বিখ্যাত ছিল হাওড়া-আমতা লাইনের ওই বিশেষ অঞ্চলটির খইচূড় ধানের মোয়া। খইচূর ধান আর তার মোয়া, সময়ের কালগ্রাসে দুটেই বিলুপ্ত আজ।
*হাওড়া-আমতা এবং হাওড়া-শিয়াখালা, ন্যারো গেজের এই দুই লাইনের মার্টিন রেলই বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭১ সালে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত