শারদীয়া সাহিত্য না অর্ডার-সাপ্লাই খেলা

Sharadiya Sahitya Change
Sharadiya Sahitya Change

শারদীয়া সাহিত্য না অর্ডার-সাপ্লাই খেলা

(Sharadiya Sahitya Change)

তখন অনেক রাত। শেষ পর্যন্ত সম্পাদককে অসহায় লেখক জানালেন এ বছর শারদীয়ায় তিনি লেখা দিতে পারছেন না। সম্পাদকের মাথায় যেন বজ্রপাত হল। বিজ্ঞাপন চলে গেছে। এমনকি লেখকের জন্য কয়েক পাতা ফাঁকা রেখে প্রেসে শেষ মুহূর্তে ছাপার কাজ চলছে। এ অবস্থায় তাঁকে সংকট থেকে উদ্ধার করবে কে?

লেখকের বাড়ি থেকে ফিরে সম্পাদক মনের কষ্টে লেকের ধারে বসে সারারাত কাটালেন। কোনও আশা নেই। বড় বেদনা নিয়ে তিনি যখন ভোরবেলা দপ্তরে ঢুকছেন, হঠাৎ দেখলেন তাঁর ঘরে আলো জ্বলছে। টেবিলের উপর বসে লেখক। ছোট /ছোট স্লিপে লিখে প্রেসে পাঠিয়ে দিচ্ছেন লেখাটি।


আরও পড়ুন: বইমেলাই কি বাংলা প্রকাশনার একমাত্র ভবিষ্যৎ?


এভাবেই শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল সুবোধ ঘোষের অসামান্য ‘মা হিংসী’ গল্পটি। লেখকের সেই দ্বিধা-সংকট আজ আর আছে কি না আমরা জানি না। তখন শারদীয়ার পরিবেশ অন্য ছিল। পাঠকের মনমেজাজ ছিল আলাদা। সে যুগে শারদীয়ায় একসঙ্গে অনেক উপন্যাস ছাপা হত না। মূলত ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ ছাপা হত। তাই নিয়ে লেখকদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ছিল। 

হয়তো বিমল মিত্র বরাত পেলেন ৩৮টি গল্পের। নরেন্দ্রনাথ মিত্র ৪০টি। সুবোধ ঘোষ ৪২টি। এই নিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা চলত। গল্পের মান যে নিম্নগামী ছিল, তা বলা যাবে না। তখন এমন দিন যখন একজন লেখকের শারদীয়ার প্রচুর লেখাকে আজকের মতো সন্দেহের চোখে দেখা হত না। লেখক তার ক্ষমতা অনুযায়ী লিখতেন। পাঠক যত্ন নিয়ে পড়তেন। শারদীয় সংখ্যা যে প্রচুর ছিল তাও নয়। কয়েকটি শারদীয়ার মধ্যে দিয়েই পাঠক স্বাদ নিতেন বাংলা সাহিত্যের। 

Sharadiya Sahitya Change
শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল সুবোধ ঘোষের অসামান্য ‘মা হিংসী’ গল্পটি

সে এমন এক সময় যখন শিউলি ফুল, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পূজার গান, পুজো সংখ্যা শারদোৎসবে বঙ্গ জীবনের অঙ্গ ছিল। আজ শিউলি ফুল কোথায় মুখ লুকিয়েছে, আমরা জানি না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর জন্য রাতজাগা অপেক্ষা নেই, কেন না তা সারা বছর ইউটিউবে মেলে। পুজোর গান কালের নিয়মে অবলুপ্ত অনেকদিন। শুধু এখনও টিকে আছে পুজো সংখ্যা।

এক সময় সিনেমা পত্রিকাগুলি অনেকগুলি করে উপন্যাস ছাপতে শুরু করে পূজা সংখ্যায়। ফলত প্রতিযোগিতায় নেমে অন্যান্য শারদীয়াগুলোকেও পাঁচ-ছটি করে উপন্যাস ছাপতে হয়। বিনোদন পত্রিকা হিসেবে নবকল্লোল, বেতার জগৎ, জলসা, উল্টোরথ, প্রসাদ তখন পাঠকের নেকনজরে। পাশাপাশি আছে দেশ, আনন্দবাজার-সহ একাধিক শারদীয়া। সেই সময় পুজোসংখ্যা থেকেই পাঠক বাংলা কথা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি টের পেতেন।

আমরা ভুলে যাইনি নব্বই দশকেও স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘কম্পিউটার গেমস’, নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘সহিস’, রবিশংকর বলের ‘নীল দরজা লালঘর’— এ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ছিল শারদীয়ার ফসল।

রমাপদ চৌধুরীর ‘খারিজ’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঘুণপোকা’, সমরেশ বসুর ‘বিবর’— এমনই কিংবদন্তী লেখাগুলিকে ধারণ করেছিল একদিন শারদীয়া সংখ্যা। তাই নিয়ে কফি হাউসে, চায়ের দোকানে, পাড়ার রকে পাঠক মহলে বিতর্কের ঢেউ উঠেছে। এভাবেই বাংলা সাহিত্যের মান কিংবা গতিপ্রকৃতি নিয়ে এগিয়েছিল তৎকালীন শারদীয়া পত্রিকা। স্পষ্টত সম্পাদকের রুচির ছাপ ছিল সেখানে। পাঠকের রুচি কিছু কম ছিল না। কয়েকজন লেখকের চাহিদা ছিল প্রচুর। ফলে তাঁদের লিখতে হত দু’হাতে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার শারদীয়ায় একাধিক উপন্যাস লিখতেন। আবার বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী বছরে একটি। রমাপদ চৌধুরীর এত সংযম ছিল, যে তাঁর সম্পর্কে ‘না লিখে লেখক’ কথাটি প্রচলিত ছিল। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতেন প্রফুল্ল রায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, নিমাই ভট্টাচার্য প্রমুখ। তাঁদেরও যথেষ্ট পাঠক ছিল। বাংলা সাহিত্যের পাঠক সারা বছর অপেক্ষা করতেন শারদীয় সংখ্যার জন্য। কী লিখছেন রমাপদ চৌধুরী কিংবা বিমল কর অথবা প্রফুল্ল রায় বা সমরেশ বসু, পাঠক তার জন্য চাতকপ্রায় অপেক্ষা করতেন।

Sharadiya Sahitya Change
অর্ডারের সপক্ষে কথা বলেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী

আমরা ভুলে যাইনি নব্বই দশকেও স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘কম্পিউটার গেমস’, নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘সহিস’, রবিশংকর বলের ‘নীল দরজা লালঘর’— এ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ছিল শারদীয়ার ফসল। তখনও বাংলা সাহিত্যে শারদীয়ায় সক্রিয় ছিলেন দেবেশ রায়, আফসার আহমেদ, সাধন চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শৈবাল মিত্র প্রমুখ। 

দেবেশ রায়ের একটি উপন্যাস অশ্লীলতার কারণে একটি বাণিজ্যিক শারদীয়া বাতিল করলে, তা সযত্নে ছাপেন একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক। এই ঘটনা খুব বেশি দিনের নয়। লিটল ম্যাগাজিনের সমালোচকেরা যতই বলুন অর্ডারি লেখা। মাথায় রাখতে হবে লেখকের দিক থেকে যথেষ্ট প্রস্তুতি সেদিন ছিল। এর সপক্ষে কথা বলেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। তিনি বলেছিলেন অর্ডার না দিলে ভাল লেখা হয় না। এই চাপ তাঁদের ক্ষেত্রে, সাহিত্যের পক্ষে স্বাস্থ্যকর। 

কিছুদিন আগে তাঁরা ঝুঁকেছিলেন হররের দিকে, তারপর তন্ত্র-মন্ত্র, জীবনী উপন্যাস। শেষ পর্যন্ত তাঁদের মনে হল একটি শারদীয়ার বাজার চাহিদা ইদানীং তুঙ্গে। আর যাই হোক, এই বঙ্গদেশে মশা আর লেখকের অভাব নেই। সবচেয়ে বড় কথা লেখকের প্রস্তুতি নেই।

তাছাড়া আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই লিটল ম্যাগাজিনও লেখার জন্য অর্ডার দেয়। সেখানে সাপ্লাই দিতে হয় যথাসময়ে। হয়তো তার ডেডলাইন কিছুটা শিথিল। তখনও শারদীয়া আবর্জনা উচ্ছিষ্টে ভেসে যায়নি এতখানি। লেখক তাঁর সেরা লেখাটি শারদীয়ায় দিতেন। সম্পাদক, ডাকে আসা শক্তিশালী ছোটগল্প শারদীয়ার জন্য তুলে রাখতেন। অর্ডার এবং সাপ্লাই ছিল। কিন্তু লেখকের সৎ ভাবনা, মনোগত দ্বিধা, সংযম, শিল্পবোধের যন্ত্রণা এসবের অভাব ছিল না। তাই বলা যায়, গত শতকের শেষ চার দশকের বাংলা কথাসাহিত্য মূলত শারদীয়া সাহিত্য।

তারপর একদিন ধুঁকতে শুরু করে শারদীয়াগুলি। সুনীল-শীর্ষেন্দুর যুগ শেষ হয়ে আসে। সহস্রাব্দের শুরুতে পাঠকও বোঝেন শারদীয়ার আর সেই মান নেই। যাকে মেইনস্ট্রিম সাহিত্য বলি, তার এতখানি অধঃপতন যে অনেক পাঠক খানিকটা শারদীয়া-বিমুখ হলেন।

Sharadiya Sahitya Change
একটি পারিবারিক সাহিত্য অনুষ্ঠানের বাইরে সাগরময় ঘোষ ‘দেশ’ পত্রিকার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উপন্যাস লিখতে বলেন অকস্মাৎ

গত দশ বছরে আরও ভাল করে বললে করোনা-পরবর্তী সময়ে আবার শারদীয়া সংখ্যার হিড়িক উঠেছে। জোয়ার এসেছে শারদীয়া পত্রিকা প্রকাশে। প্রায় সব ছোট প্রকাশনী শারদীয়া প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছেন। কতখানি মান রয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে অবশ্য। ইদানীং শুরু হয়েছে বিজ্ঞাপনমুখরিত শারদীয়ার দিন। নয়ের দশকেও কয়েকজনের কুক্ষিগত ছিল সে সম্পদ। উপন্যাসের শেষ সংযোজন ছিলেন সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়। আজ দিন বদলেছে। ছোট পত্রিকা এবং প্রকাশনীর বাজার এখন ভাবনার বিষয়। যাঁরা শুরু করেছিলেন কবিতার বই দিয়ে, তাঁদেরও এখন লক্ষ্য শারদীয়া। দায়বদ্ধতার স্বপ্ন আপাতত কিছুদিন শিকেয় উঠবে।

কিছুদিন আগে তাঁরা ঝুঁকেছিলেন হররের দিকে, তারপর তন্ত্র-মন্ত্র, জীবনী উপন্যাস। শেষ পর্যন্ত তাঁদের মনে হল একটি শারদীয়ার বাজার চাহিদা ইদানীং তুঙ্গে। আর যাই হোক, এই বঙ্গদেশে মশা আর লেখকের অভাব নেই। সবচেয়ে বড় কথা লেখকের প্রস্তুতি নেই। কাজেই অভাবও নেই। স্তাবকতায় ভরা এই বাংলাবাজারে আত্মমুদ্ধ লেখকের গতিকে রুধিবে কে? পরীক্ষার নম্বর যার আত্মপ্রত্যয়, ফেসবুক যার অভিভাবক লাইক কমেন্ট যার কাছে পাঠকের অভ্যর্থনা; তার মতো অকুতোভয় কে আছে?

ছোট প্রকাশনীর মূলধন নেই, অথচ শখ আছে ষোল আনা। তারও চাই আট-দশটি উপন্যাস। তাই তিনি অপ্রস্তুত লেখকদের নির্দেশ দেন ১৫-২০ হাজার শব্দে একটি উপন্যাস লিখতে। উপন্যাস নামে ছাপা হলেও তা আসলে একটি বড় গল্প।

আর দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা প্রকাশক তো আছেনই, হে মাধবী দ্বিধা কেন বলে স্বাগত কুমিরকে জলে নামাবেই। তাই ছোট পত্রিকা ও প্রকাশনী পিছিয়ে থাকবে কেন? অন্তত যখন চাহিদা ও বাজারদর আছে। অন্তত যখন লেখক মাত্রেই ঔপন্যাসিক! পৌরাণিক, আঞ্চলিক, জীবনী উপন্যাসের খাপে বন্দী। সুতরাং হরেক মাল ছ-টাকায়।

সেইভাবেই হরেক মাল ভিড় করছে নানা শারদীয়ার। এক হাজার কবির ভিড়ে যার একটি কবিতা আছে, তিনিও শারদীয়ার লেখক। কেউ ক্রমানুসারে সমাজমাধ্যমে তালিকা দিচ্ছেন। এই কেউকেটা ভাবটি লক্ষ করে সম্পাদক বললেন উপন্যাস লিখতে, এবং তিনিও লিখে ফেললেন কুড়ি হাজার শব্দ। এই মাপকাঠি যখন বাংলা সাহিত্যের প্রধান লক্ষণ, তখন আর কী প্রত্যাশা করব!

Sharadiya Sahitya Change
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একদা ঘোষণা করেছিলেন একটি দুটি বা তিনটির বেশি উপন্যাস নয়

ছোট প্রকাশনীর মূলধন নেই, অথচ শখ আছে ষোল আনা। তারও চাই আট-দশটি উপন্যাস। তাই তিনি অপ্রস্তুত লেখকদের নির্দেশ দেন ১৫-২০ হাজার শব্দে একটি উপন্যাস লিখতে। উপন্যাস নামে ছাপা হলেও তা আসলে একটি বড় গল্প। কিংবা হয়তো দেখা যাবে একটি ছোটগল্প। ইদানীং অবশ্য উপন্যাসিকা নামে এক আজব বস্তুর চল হয়েছে।

হরেক রকমের পাঠক ধরতে এইসব শারদীয়ায় উপন্যাস ছাপা হয় নানা ধরনের হরর, থ্রিলার, ঐতিহাসিক, জীবনীমূলক, মেডিকেল থ্রিলার ইত্যাদি। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, এইসব শারদীয়ার আসলে কোনও চরিত্র নেই। কোনও বড় উদ্দেশ্য নেই। শুধুমাত্র মাল খালাসের লোভ আছে। ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। তবে তা হাতে গোনা। তা দিয়ে শারদ সাহিত্যের ভবিষ্যৎ বিচার করা চলে না।

আর কে না জানে, পুজোর মরশুমে অস্বস্তিকর লেখা পাঠক চান না। পাঠককে যা বিব্রত করবে, তেমন লেখা শারদীয়ায় না লেখাই তো ভাল! সুতরাং অনেকদিন পর শারদীয়ার আর মননের কাছে কোনও দাবি রইল না। পুরোটাই বিনোদন।

আরেকটি সংকটের কথা এখানে বলা দরকার। সেই সংকট লেখকের দিক থেকে না হলেও, পাঠকের দিক থেকে আছে। যে অর্ডারের সপক্ষে কথা বলেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, সেই অর্ডারের বিপক্ষেও কিছু কথা বলা দরকার। একজন লেখকের যা জরুরি, তা হল প্রত্যাখ্যান। তিনি নিজের ক্ষমতা বুঝে সমস্ত অর্ডার গ্রহণ করবেন না। প্রত্যাখ্যানও করবেন। আজ কোথাও প্রত্যাখ্যান নেই। অর্ডার পেয়ে লেখক ধন্য। আর তাই একটি শারদীয়া মরসুমে ন’টি উপন্যাস লিখে একজন লেখিকা হঠাৎই শিরোনামে চলে এসেছেন। তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা উঠেছে অনেক।

যাঁরা পক্ষে বলছেন তাদের বলার যুক্তি এই ‘যাঁর যেমন ক্ষমতা সে তেমন লিখবে। কোনও ফতোয়া আমরা মানবো না।’ কথায় যুক্তি আছে। আসলে তাঁদের লেখার সংখ্যা এত বেশি, যে আত্মপক্ষ সমর্থন না করলে বিবেকদংশন হয়। শারদীয়া মরসুমে একজন ন’টি উপন্যাস লিখছেন, এটি দোষের নয়। কিন্তু তাঁর সামর্থ্যের দোষ, প্রত্যাখ্যান না করার দোষ আছে। 

হয়তো দেখা যাবে, ন’টি উপন্যাস নামেই উপন্যাস। আসলে প্রত্যেকটি বড় গল্প, যা বাংলা সাহিত্যকে কিছুই দিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত শুধু তরলমতি পাঠককে শারদীয়া বিনোদন দেবে। আর কে না জানে, পুজোর মরশুমে অস্বস্তিকর লেখা পাঠক চান না। পাঠককে যা বিব্রত করবে, তেমন লেখা শারদীয়ায় না লেখাই তো ভাল! সুতরাং অনেকদিন পর শারদীয়ার আর মননের কাছে কোনও দাবি রইল না। পুরোটাই বিনোদন। একতলা থেকে ছতলা পুরোটাই বিনোদন।

বেশ কিছু লেখকের ক্ষেত্রে দেখেছি তাঁরা শারদীয়ায় বনসাই মাপের একটি উপন্যাস কোনওরকমে দেন। তারপর যখন বই হিসেবে বেরোয়, তা কলেবরে পৃথুল হয়ে সম্পূর্ণ বদলে যায়। যখন সময়ের এতখানি অভাব তখন শারদীয়ায় যে উপন্যাসটি পাঠক পাঠ করলেন, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হল নাকি? এমন তালিকায় সত্তরের অনেক বিবেকবান লেখক আছেন। মনে পড়ে একটি শারদীয়া সংখ্যায় ছোট আকারের একটি উপন্যাস লিখেছিলেন দিব্যেন্দু পালিত। উপন্যাসের নিচে লেখা ছিল তা খসড়া মাত্র। সমরেশ বসু তাঁকে জানান উপন্যাসটি সম্পূর্ণ। সুতরাং খসড়া লেখার প্রয়োজন নেই।

ইদানীং পাঠক কিংবা সমালোচকের একটি প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। যিনি বেশি লেখেন তিনি আবর্জনা লেখেন। যিনি কম লেখেন তিনি মহৎ লেখক এমনতর ভাবনা। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি উদাহরণ কম নেই। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিও কম নেই।

এই যে উপন্যাসের চরিত্র নিয়ে একজন সচেতন লেখকের ভাবনা, আজ তা অন্তর্হিত। তাই একটি পুজো সংখ্যায় অনু উপন্যাস নামে যখন একজন লেখিকার একটি লেখা ছাপা হয়, এবং পরবর্তীতে তা যখন ছোটগল্প হিসেবে গ্রন্থে প্রকাশিত হয়, তখন মনে হয় শারদীয়া বিজ্ঞাপন কতভাবেই না প্রতারণা করে পাঠককে।

আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এই শারদীয়া নিয়েই শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন ‘সারহীন সম্ভার’ নামে একটি নিবন্ধ, আনন্দবাজার পত্রিকায়। লিখেছিলেন তাঁর বেদনার কথা। পরবর্তীতে পার্থ বসু। বিতর্কে জড়িয়ে ছিলেন দেবেশ রায়-সহ আরও অনেকেই। তখনও একটি শারদীয়া পত্রিকায় দেবেশ রায় এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস প্রকাশিত হয়। আর আজ তাঁরা কারা? ‘কোথা হইতে আসিয়াছ?’ আমরা জানি না। শুধু দেখি তরুণ এবং প্রবীণের দল মেতেছে উৎসবে। রঞ্জন আর রঞ্জনায় ছেয়ে গেছে শারদীয়া আকাশ। দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি। স্বপ্নের পত্রিকায় লেখা প্রকাশের পর সম্পাদকদ্বয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরই ফেসবুকে লটকে গেছে সদ্য রচিত কবিতা।

Sharadiya Sahitya Change
তিরিশ বছর আগে এই শারদীয়া নিয়েই শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন ‘সারহীন সম্ভার’ নামে একটি নিবন্ধ

অপেক্ষার আজ আর কোনও মূল্য নেই। অপেক্ষা অহেতুক। অপেক্ষা অপ্রয়োজনীয়। দিকে দিকে লেখক উৎপাদনের শারদীয়া কারখানা। একই লেখকের দীর্ঘ শারদীয়া রচনার তালিকা। সবই পারেন এবং কিছুই পারেন না, যার শক্তি পোলট্রি ফার্মকে হার মানায়। এই যে হামলে পড়া, লোভী, ভিক্ষার চেহারা, নিজেকে সন্দেহ না করার আত্মমুগ্ধতা— হয়তো শারদীয়া এই গলিপথেই শেষ পর্যন্ত পথ হারাবে একদিন।

ইদানীং পাঠক কিংবা সমালোচকের একটি প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। যিনি বেশি লেখেন তিনি আবর্জনা লেখেন। যিনি কম লেখেন তিনি মহৎ লেখক এমনতর ভাবনা। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি উদাহরণ কম নেই। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিও কম নেই। খুব কম উপন্যাস লিখেও ট্র্যাশ লিখেছেন এমন লেখক যেমন আছেন, তেমনই অজস্র উপন্যাসের ভিতর দু-একটি চমৎকার উপন্যাস লিখে ফেলেছেন এমন উদাহরণ কম নয়। কমল দাশ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উদাহরণ কিছু কম নেই।

আসলে বাঙালি লেখকেরা কোথায় থামতে হয়, তা জানে না। যদি বা তিনি থামতে চান, প্রকাশক থামতে দেন না। তাঁর টিকি এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কাছে বাঁধা। তাই লক্ষ্য করি, যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একদা ঘোষণা করেছিলেন একটি দুটি বা তিনটির বেশি উপন্যাস নয়, তিনি শেষ জীবনে একটি শারদীয়ার ফরমায়েশি লেখক ছিলেন। তাঁকেও অজস্র উপন্যাস বিয়োতে হয়েছে বছর বছর।

শারদীয়ার এমন দৈন্যদশা কবে সূচিত হল? তার মান এমন তলানিতে ঠেকল কেন? আসলে সকলেই ভেবেছিলেন, অর্ডার এবং সাপ্লাই এই পদ্ধতিতেই সব হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দরকার হয় লেখকের মেধা, কব্জির জোর; সে কথা কেউ মনে রাখেননি।

কেউ কথা রাখেনি। সচেতন লেখক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, মানিক কিংবা অমিয়ভূষণ, দেবেশ রায়— এঁদের গ্রন্থের সংখ্যা কম নয়। এবং, বাংলা সাহিত্যকে তা সমৃদ্ধ করেছে। অথচ আজ দিকে দিকে অপ্রস্তুত লেখক। যাঁর লেখক হওয়ার কথা নয়, তিনিও একাধিক শারদীয়ায় হাজির। এমনকি লিটল ম্যাগাজিনের লেখকও ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন শারদ সংখ্যায় তাঁর কতগুলি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এইভাবে হাস্যকর প্রতিযোগিতায় তিনিও। সুনীল সাগরে ভাসতে চাইছেন অবচেতনে। আর দিকে দিকে রয়েছে নাবালক পাঠ প্রতিক্রিয়ার। শারদীয় সংখ্যা বেরোনোর একদিন পরই পেইড রিভিউ। পিছনে সক্রিয় দালাল লেখক। এরা কিছুদিন প্রকাশককে স্বস্তি দেবেন, তারপর চিরতরে হারিয়ে যাবেন। নিজেরাও জানেন তাই শারদীয়ার হুজুগে কিছুদিন করেকম্মে খাচ্ছেন।

এবার একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার। আজকের শারদীয়া সংখ্যা কি আগের মতোই বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারছে? গত পনেরো বছরে শারদীয়া পত্রিকায় এমন কোনও উপন্যাস পাওয়া গেছে, যা বাংলা সাহিত্যে মাইলস্টোন। এর উত্তর, না। এত নিম্নমানের শারদীয়া গত দশ বছরে বেরিয়েছে, যা বাংলা কথাসাহিত্যের মূল গতিকে ধারণ করতে পারছে না। কী উপন্যাস, কী ছোট গল্প, কী কবিতা আজকের বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত পথটি শারদীয়া বিচ্ছিন্ন।

ব্যতিক্রম কিছু নিশ্চয়ই আছে। মণীন্দ্র গুপ্তের কথা আমরা মাথায় রাখছি। কিন্তু বাদবাকি কী অবস্থা! শারদীয়ার এমন দৈন্যদশা কবে সূচিত হল? তার মান এমন তলানিতে ঠেকল কেন? আসলে সকলেই ভেবেছিলেন, অর্ডার এবং সাপ্লাই এই পদ্ধতিতেই সব হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দরকার হয় লেখকের মেধা, কব্জির জোর; সে কথা কেউ মনে রাখেননি। ইদানীং বাংলা সাহিত্য যে জায়গায় পৌঁছেছে, যদি তার সামান্যতম আন্তর্জাতিকতা থাকে, তবে তা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফসল লেখক বা প্রকাশকের। কোনও শারদীয়ার অবদান নয়। 

পরিমল ভট্টাচার্যের ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’, হিরন্ময় গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কয়লামঙ্গলকাব্য’, তপনকর ভট্টাচার্যর ‘দিগন্ত’, লুৎফর রহমানের ‘হাতেম ছৈয়াল’, অনিমেষ বিদাসের ‘একটি হলুদ কই মাছের মহানিষ্ক্রমণ’, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্কিমচন্দ্র’, অরুণেশ ঘোষের ‘নগ্ন পরিবার’ কিংবা স্বপন পাণ্ডার ‘সিটি বুলেটিন’— কোনও শারদীয়ার ফসল নয়। তাহলে কী প্রয়োজন! পুজোর গান গেছে। শিউলি ফুল গেছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র গেছেন। শারদীয় সাহিত্যের অবসান হলেই বা ক্ষতি কী! যার কালের নিয়মে ধ্বংস হওয়ার কথা, তার অর্ধমৃত লাশ আমরা বয়ে বেড়াব কেন? শুধুমাত্র ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে এই চর্বিতচর্বণ আমাদের কোনও গভীরতায় পৌঁছে দেবে না। তাই লেখা-লেখা খেলা যদি চলতে চায় চলুক, তার জন্য শিল্পের কোনও দোহাই যেন আমরা না দিই, এটুকুই বলার।

আজ কোনও পলাতক নেই। সকলেই অনুসরণকারী। যতক্ষণ না ছিবড়ে করে সমস্ত রস নিংড়ে নিতে পারছেন, ততক্ষণ নৌকো থেকে তাঁরা নামবেন না। সরবরাহ চালু থাকবে। রাবণের চিতার মতো জ্বলতে থাকবে আত্মমুগ্ধ প্রতিভার আলো।

অনেকদিন আগে একটি পারিবারিক সাহিত্য অনুষ্ঠানের বাইরে সাগরময় ঘোষ ‘দেশ’ পত্রিকার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উপন্যাস লিখতে বলেন অকস্মাৎ। তিনি অপ্রস্তুত। কার্যত অসহায়। যেদিন শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হল, সেদিন লজ্জায় তাঁর মনে হয়েছিল কোনও অজানা জায়গায় পালিয়ে গেলে তিনি বাঁচবেন। আজ কোনও পলাতক নেই। সকলেই অনুসরণকারী। যতক্ষণ না ছিবড়ে করে সমস্ত রস নিংড়ে নিতে পারছেন, ততক্ষণ নৌকো থেকে তাঁরা নামবেন না। সরবরাহ চালু থাকবে। রাবণের চিতার মতো জ্বলতে থাকবে আত্মমুগ্ধ প্রতিভার আলো। একদিন যে দ্বিধা ও সংকটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সুবোধ ঘোষ, সেটুকু আত্মসম্ভ্রম আজ আর অবশিষ্ট নেই।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of পঙ্কজ চক্রবর্তী

পঙ্কজ চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৭। লেখা শুরু নব্বইয়ের দশকে। পঞ্চাশের বাংলা কবিতার আতিশয্যর বিরুদ্ধে এযাবৎ কিছু কথা বলেছেন। ভ্রমণে তীব্র অনীহা। কিংবদন্তি কবির বৈঠকখানা এড়িয়ে চলেন। এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - বিষণ্ণ দূরের মাঠ চার ফর্মার সামান্য জীবন, উদাসীন পাঠকের ঘর, লালার বিগ্রহ, নিরক্ষর ছায়ার পেনসিল, নাবালক খিদের প্রতিভা।  গদ্যের বই- নিজের ছায়ার দিকে, মধ্যম পুরুষের ঠোঁট। মঞ্চ সফলতা কিংবা নির্জন সাধনাকে সন্দেহ করার মতো নাবালক আজও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
পুজো সংখ্যা বা পুজোবার্ষিকী আমার ছেলেবেলায় খুব একটা বেশি প্রকাশিত হত না। তখন ‘দেব সাহিত্য কুটির’ একচেটিয়া বই, পত্রিকা প্রকাশ করত। প্রতি বছর পুজোর আগে একটা সুন্দর নাম দিয়ে তারা পুজোসংখ্যা প্রকাশ করত। তাতে গল্প, কবিতা, কার্টুন কমিকস্ থাকত। লিখছেন নির্মলেন্দু মণ্ডল...
Please login to bookmark Close
পাঠকের কাছে যেমন পুজোবার্ষিকী ছাড়া পুজো অসম্পূর্ণ, বিক্রেতাদের কাছেও কি তা-ই? পুজোসংখ্যা বইবিক্রেতাদের জন্য কতটা মরসুমি সুখ বয়ে আনে— এই প্রশ্নের তত্ত্বতালাশ করতে গেলে চোখে পড়ে আড়ালে থাকা নানা রূঢ় বাস্তব, যে বাস্তবগুলো বইবাজার ঢোঁক গিলে নেয় প্রায়ই উৎসবের হাসি হেসে! লিখছেন সংকেত ধর...
Please login to bookmark Close
পুজোয় নতুন জামাকাপড় পাওয়া যতটা আনন্দের, ততটাই একটি শারদীয় পাওয়াও। আমার শৈশবে তা ছিল দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী। ‘তপোবন’, ‘আলপনা’, ‘মনোবীনা’… কিশোর সাহিত্য সেই প্রথম পড়া হয়তো। লিখতেন সেরা লেখকরা। লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী তো পড়তামই, আরও কয়েকজনের কথা খুব মনে আছে যেমন, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যর বিজ্ঞাননির্ভর গল্প। লিখছেন অমর মিত্র...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com