(Dahan Story)
মণ্ডপে ভীষণ ভিড় এখন! দূরে তাকালে শুধু কালো কালো মাথা। সেই বনমালী সরকার স্ট্রিটের মুখ থেকে হয়তো লাইন পড়েছে। আজ ষষ্ঠী, মায়ের বোধন। ঝড় জল কাদা পেরিয়ে মন্দ্র স্বরে বেজে উঠেছে রাত জাগা আগমনী গান। বাঙালির সব থেকে বড় উৎসবের আজ অফিসিয়াল ওপেনিং! আনঅফিসিয়ালি শহরে কিন্তু পুজো শুরু হয়ে গেছে সেই মহালয়া থেকেই।
শহরের আর চার-পাঁচটা পুজোর মতো কুমারটুলি পার্ক সর্বজনীনেরও উদ্বোধন হয়ে গেছে মহালয়ার দিন। না, পুজো উদ্বোধন লেখা যাবে না! বরং লিখি মণ্ডপ উদ্বোধন! এটাই এখন রীতি! আসলে মহালয়ার পরেই ঝড় বৃষ্টির তোড় এত বাড়ল! মানুষও তাই ঠায় ঘরবন্দি! ঠাকুর দেখা, প্যান্ডেল হপিং, লেট নাইট চিল, পেট খারাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোগ্রাসে স্ট্রিট ফুড খাওয়া, এসব বাকিই রয়ে গেছে এখনও! অবশেষে গত দু’দিনের প্রকৃতির রুদ্ররোষের পর আজ সকালেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছে শরৎ! ব্যস মানুষও আজ তাই ফুল নিজের ফর্মে!
আরও পড়ুন: কবিতা: শীত, স্মৃতি ও ঈশ্বর
প্যান্ডেলটা এবারে নিজের খুব একটা পছন্দ হয়নি রুপালির। কেমন যেন পোড়া পোড়া চারিদিকে সব কিছু! যেন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে একরাশ গাঢ় ছাই! আধ খাওয়া সাজসজ্জার গভীরে যেন যত্ন করে লুকোনো আছে অকপট হাহাকার! থিমের ঠাকুর! কিন্তু মা দুগ্গার গায়ের রং কালো! অজস্র কালো কালো হাত, কালো মুখ মাকে ঘিরে রেখেছে। পুরো প্যান্ডেল জুড়ে ভারী করুণ সুরে নীরবতার থিম সং বাজছে। সুরটা অনেকক্ষণ বসে একমনে শুনলে অতলতার ঘ্রাণে পৌঁছানো যায় ! তারপর শুধু সোনার সফর! নরম উপকূল! মধুময় ধোঁয়ার রাজ্য!
রুপালি ভাবে গায়ের রং কালো হলেই তো আর দুগ্গা ঠাকুর মা কালী হয়ে যায় না! আসলে কালীর সঙ্গে তো কালোর কোনও সম্পর্ক নেই। ওই যে একটা গান আছে না, ‘মহাকালের কোলে চড়ে গৌরী হল মহাকালী’! অনন্ত ঘন ছায়াপথের কোনও অজানা গহ্বরে অনেকখানি শক্তি পুঞ্জীভূত হলে কুলকুণ্ডলিনী ঠেলে দেবী জাগ্রত হন। ব্যাপারটা হয়তো অনেকটা আবর্ত গতিতে ঘোরা নাগরদোলার মতো!

কথাগুলো ও শুনেছিল পাড়ার শনি-কালী মন্দিরের পুরোহিত জ্যেঠুর থেকে। জ্যেঠু প্রত্যেক বছর মহালয়ার কয়েকদিন আগে থেকে মন্দিরের চাতালে বসে গলা ছেড়ে সুর করে চণ্ডী পড়তেন। সুরটা মনে আসতেই এখন গা’টা কেমন যেন শিরশির করে রুপালির! উপস্থিত সব শব্দকে অতিক্রম করে শুধুমাত্র এই মায়াবী মুহূর্তে একজন ধর্মপ্রাণ যাজকের মুখ আর সেই মুখ নিঃসৃত সত্য বিরাজ করে চরাচর জুড়ে।
বাকি সব অসমাপ্ত এখন! রুপালি লক্ষ করে মায়ের মুখ এবারে কেমন যেন শক্ত! চোয়াল দুটো চাপা! মা দুগ্গার মুখে যেমন একটা টোল-টাল ব্যাপার থাকে, তেমনটা নয় মোটেও! চোখ বুজে তেমন একটা মুখের কথা মনে করার চেষ্টা করে রুপালি। স্মৃতিজর্জরিত নীল খাতাটার আত্মশূন্য পাতাগুলোর ভিতর দিয়ে এঘর-ওঘর ঘুরে শেষে বনমালী সরকার স্ট্রিটের গোস্বামী বাড়ির জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায় রুপালির।
সেদিন দলে কতজন ছিল! কে কী পোষাক পরেছিল! ক’জন ওর হাত চেপে ধরেছিল! পা ফাঁক করেছিল ক’জন! সেই রাতের পর প্রথম চোখ খুলে রুপালি কী দেখেছিল!
– গোঁসাই বাড়ির জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের মুখের গড়ন অনেকটা তেকোনা ছিল না? ভাইফোঁটার পরের দিন নাটদালানের এক কোণে উল্টানো অবস্থায় পড়ে থাকত। হেমন্তের ভাঙা রোদ আর বাসি পুজোর গন্ধ বুকে করে নাকি সুরে শ্যামাসংগীত ভেসে আসত পাড়ার কোনও কালীপুজোর ভাঙা মণ্ডপ থেকে, ‘শ্যামা কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি, কখনও শূন্যাকার হে।’
– না না, তেকোনা নয় হয়তো।
– হয়তো বা চৌকো! কিন্তু গোলগাল ছিল না মোটেই!

ওর চোখের উপর এখন ভিড় করে আসে অনেক যুগের ওপার থেকে ভেসে আসা কিছু হিম হিম ছায়ার দল, এঁদো গলির পেচ্ছাপের গন্ধ আর বেলা বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে ভোরের শিশিরের মত উবে যাওয়া লাল নীল ইচ্ছেরা। সেদিন দলে কতজন ছিল! কে কী পোষাক পরেছিল! ক’জন ওর হাত চেপে ধরেছিল! পা ফাঁক করেছিল ক’জন! সেই রাতের পর প্রথম চোখ খুলে রুপালি কী দেখেছিল!
চিন্তার পাতাল হাতড়ে সেরকম যুৎসই জবাব কিছু মেলে না। উল্টে মাথার ভিতরটা গুলিয়ে সাঁজোয়া আলোর পেছনের কালো নর্দমার মতো অন্ধকার আর মল-মূত্রে মাখামাখি করে ফেলে। বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মাঝে ঠিক যতখানি তাড়না, দৃশ্যের সহনশীলতার উপরে বাড়াবাড়ি না করে ভেসে থাকে, হেরে যাওয়া সংসারী মানুষের মুখ হয়ে, তার থেকে ঠিক দুই পরত কম বিষণ্ণতা নিয়ে, নিজের মুখে হাত ছোঁয়ায় রুপালি।
রুপালি দাস এই কুমোরটুলিরই মেয়ে। না, মাটির প্রতিমার বারোমাস্যার চৌহদ্দিতে থেকেও ওর বাড়িতে কেউ কোনওদিন ঠাকুর বানায়নি।
তেমন একটা মুখ হয়তো আজও ওর আছে। ঠিকঠাক ঠাকুর ঠাকুর একটা মুখ! রুপালির মনে পড়ে যায়, বেশ অনেকটা ছোটবেলায় ওর মা ওকে পাশে বসিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তেন,
“সতত কুক্রিয়া রত নর-নারীগণ।
অসহ্য যাতনা পায় দুর্ভিক্ষ ভীষণ।।
অন্নাভাবে শীর্ণকায় বলহীন দেহ।
ক্ষুধা কষ্টে আত্মহত্যা করিতেছে কেহ।।
কেহ প্রিয় প্রাণাধিক পুত্র কন্যাগণে।
করিতেছে পরিত্যাগ অন্নের কারণে।।”
একটা অদ্ভুত সুর এই সময়টায় উপর থেকে নিচে খেলা করে যেত ওর মায়ের গলায়, মহাকরুণার মতো! বিশেষ করে এইখানটায় এসে মায়ের গলাটা অনেকটা হেমন্তের সন্ধ্যার কোমল নিষাদের মতো শোনাত রুপালির কানে।
রুপালি দাস এই কুমোরটুলিরই মেয়ে। না, মাটির প্রতিমার বারোমাস্যার চৌহদ্দিতে থেকেও ওর বাড়িতে কেউ কোনওদিন ঠাকুর বানায়নি। এমনকি সেই ছোট থেকে রোদ-ঝড়-জলে তাল তাল কাদামাটি, প্রতিমার উদলা বুক, উল্টানো মুখ, এমনকি মাটির স্বেদে রেখা মুছে যাওয়া শীর্ণ হাতে পাকানো আঙুলের সারি দেখে বড় হয়েও, ও নিজে কোনওদিন প্রতিমা শিল্পী হওয়ার কথা ভাবতেই পারেনি।
ওর মা ওকে লক্ষ্মীমন্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বরং। ওর প্যাকাটির মতো শরীরের উপর বসানো গোলগাল ঢাল মুখে কূলভাসা নৌকার মতো জেগে ওঠা ডাগর ডাগর চোখ দুটোয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পেলবতার এক অস্তিত্বহীন মায়াদর্পণ! ‘লক্ষ্মীর মতো গড়ন মাইয়ার আমার! নারানের মতো বর জোটে যেন দেইখ্য ঠাকুর, মাইয়াডা যেন ভাল ঘরে যাইবার পারে!’, কথাগুলো বিড়বিড় করে আওড়াতে আওড়াতে শীর্ণ হাতদুটো কুঁচকে যাওয়া কপালে এসে ঠেকতো তাঁর।
ব দেখার পেছনেই ইতিহাস ভূগোল নিয়ে জুড়ে থাকে সেই মানুষ! লেজুড় হিসেবে! এই যে এখন পুজো প্যান্ডেল জুড়ে এত মুখ! এর মধ্যে যে কোনও মুখই কি প্রতিমার মুখ হতে পারে?
‘অন্নাভাবে শীর্ণকায় বলহীন দেহ’, কথাগুলোর আক্ষরিক প্রতিফলন যেন চোখের সামনে দেখতে পেত রুপালি। ওর বেশ মনে আছে, একবার প্রখ্যাত প্রতিমা শিল্পী চায়না পালের গোলার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ঠাকুর গড়া দেখছিল। চায়নাদি তখন সদ্য শুরু করেছেন এসব। এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে, চায়নাদির সঙ্গে চোখাচুখি হতেই হাত বাড়িয়ে ওকে কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। কাদা মাখা দুটো হাত রেখেছিলেন ওর মুখের উপর।
বন্ধ ঘরের এক পাট খোলা জানালা দিয়ে ফিনফিনিয়ে ঢোকা উত্তুরে হওয়ার মতো একটা শিরশিরানি ছিল সেই স্পর্শে! বেশ বুঝতে পেরেছিল রুপালি, ওর আদরের চায়নাদি প্রতিমা গড়া দক্ষ হাতে ওর মুখের লম্বা চওড়া উঁচু নিচু জরিপ করে নিচ্ছেন! চোখ বুজে! বেশ একমনে! ঠিক সেই সময় বড় এক স্বপ্ন-লোভ-স্বাদ-আহ্লাদকে মেঘ হয়ে ঝুলে থাকতে দেখেছিল রুপা ওঁর চোখে মুখে!

যেন শূন্যতার গর্ভে রুক্ষ্ম চুন সুরকি ইটের তলায় চাপা পড়ে থাকা সেলিব্রেটেড স্মৃতির অতল হাতড়ানো চলছে ছুটোছুটি, হুল্লোড়, কান্না, ভয় নিয়ে যানজট ও হ্যালোজেনের পাশা খেলার মধ্য দিয়ে! কিন্তু কোনও দেখাই তো আর শূন্য থেকে হয় না! সব দেখার পেছনেই ইতিহাস ভূগোল নিয়ে জুড়ে থাকে সেই মানুষ! লেজুড় হিসেবে! এই যে এখন পুজো প্যান্ডেল জুড়ে এত মুখ! এর মধ্যে যে কোনও মুখই কি প্রতিমার মুখ হতে পারে?
মণ্ডপ জুড়ে ভিড় বাড়তে থাকে ক্রমশ! গুনগুন কলরবের উত্তাল তরঙ্গ ওঠে। রুপালি সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু মুহূর্তটায় এক দেখার ভিতরে আরেক দেখা, তার ভিতর আরেক, এরকম করে দৃশ্যগুলো বেড়ে চলে পরজীবী গুল্মলতার মতো! উদ্বেল জনতার কণ্ঠস্বর ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে। রূপালির চোখে মুখে খেলা করে যায় উদাসীনতা!
রসহীন ফলের গন্ধে বোঁ বোঁ করতে থাকা মাছির দলের মতো হলুদ রঙের স্মৃতিরা মিছিল করে হেঁটে চলেছে ওর মেরুনরঙা মণিবন্ধের পুব থেকে পশ্চিমে, প্রিজম বর্ণালীর বিচ্ছুরণ তুলে।
এখন ও নিজেই নিজের বন্ধু! নিজেই নিজের অভিভাবক! থিমের প্যান্ডেলের এন্ট্রি এক্সিটের মাঝে আটকে পড়া সেলফি প্রিয় আদেখলা জনগণ, স্রেফ যাদের বিনোদনের কথা ভেবে ফি বছর নতুন নতুন থিমের পরীক্ষানিরীক্ষা চালায় পুজো কমিটিগুলি, যাদের সুরক্ষা দেওয়া বা যাদের অতি কৌতূহলের হাত থেকে মণ্ডপটাকে রক্ষা করাটাই রুপালির একমেবদ্বিতীয়ম কর্তব্য, শুনতে অনৈতিক লাগলেও, এই মুহূর্তে শুধু তাদের দিকেই নিজের মনোযোগ আটকে রাখতে পারছে না রুপালি।
বরং ওর একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে একটা বেহিসেবি বিষণ্ণতা এবং একইভাবে এলোমেলো চিন্তায় মাথার ভিতর পুড়ে যাচ্ছে সুন্দরের ধ্যান! রসহীন ফলের গন্ধে বোঁ বোঁ করতে থাকা মাছির দলের মতো হলুদ রঙের স্মৃতিরা মিছিল করে হেঁটে চলেছে ওর মেরুনরঙা মণিবন্ধের পুব থেকে পশ্চিমে, প্রিজম বর্ণালীর বিচ্ছুরণ তুলে।
বনমালী সরকার স্ট্রিটের ঝুলন মেয়ে নয়, কিন্তু মেয়েদের মতোই ছিল কিছুটা! ঝুলনকে এখন খুব মনে পড়ছে রুপালির! একটানা বৃষ্টির মতো ঘ্যানঘ্যানে অলসতার মাঝে উঁকি দেওয়া পুরনো ক্যালেন্ডারের পাতা অতিক্রম করে ঠিক লঘু ফলের রসের ঘনত্ব নিয়ে ভেসে উঠছে ওর অমাবস্যার মতো মায়াবী চোখ, মেয়েলি চোয়াল, ঘন ভুরু, পাতলা ঠোঁট!
ডাইনে-বাঁয়ে অসংযত চোখে একবার দেখে রুপালি। চোখের সামনে কল্পনা করে একটা দৃশ্য, ঝুলনের আগের দিন রাত্রে আকাশভাঙা বৃষ্টি মাথায় করে, অভয়চরণ মিত্র স্ট্রিটের ৬ নম্বর বাড়িটার সামনের রোয়াকে গোল হয়ে জুটেছে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। তার মধ্যে রুপালি নিজেকে আর ঝুলনকে দেখতে পায়। গোপীহারি পুতুলটা তুলে নিয়ে গিরিগোবর্ধন পাহাড়ের নিচে রাখল ঝুলন। তারপর একবার চাইল রুপালির দিকে। শব্দহীন সেই দৃষ্টিতে হয়তো গাঢ় ছাই রঙের কলঙ্ক লেগে আছে, স্পর্শে বিষাক্ত লতা! তবু সেই সদ্য পোড়া চিতার মতো কালো চোখেই আটকা পড়ে গিয়েছিল রুপালি, সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে!
ওর সেই ভুল ভেঙে গেল সেদিন শোভাবাজারের অন্ধকার গলিতে। যেদিন একদল শক্ত পশুর শিশ্ন ছিন্নভিন্ন করে খুঁড়ে দেখেছিল ওর কুমারী যোনিগহ্বর!
আচ্ছা ঝুলন কি বসে পেচ্ছাপ করত! আর চার-পাঁচটা কোমল পুরুষের মতো হাত পা নেড়ে, লতানে রোগা শরীরটা এঁকিয়ে বেঁকিয়ে কথা বলত না কখনওই! বরং হেমন্তের কুয়াশামাখা ভোরে ফুসফুসে আটকানো একটা সাদা পালকের মতো নির্বিবাদী নীরবতাই ছিল ওর পরম আশ্রয়।
চোখ বুজে আসে রূপালির। সারা জীবন ওর মনে হয়ে এসেছে ঝুলনের সেই গোঁফ দাড়ি না ওঠা মুখটা দিব্যি চলে যায় দেবীমুখ হিসাবে। ওর সেই ভুল ভেঙে গেল সেদিন শোভাবাজারের অন্ধকার গলিতে। যেদিন একদল শক্ত পশুর শিশ্ন ছিন্নভিন্ন করে খুঁড়ে দেখেছিল ওর কুমারী যোনিগহ্বর! তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রুপালি দেখেছিল ওর ভীরু ভালবাসা তখন কাপুরুষের মতো মুখ লুকোচ্ছে ডাস্টবিনের পিছনে উন্মুক্ত পেচ্ছাপখানায়! হাটু গেঁড়ে বসে!

গোঁসাইদের বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় তখন ঢাক বাজছে তারস্বরে! একদল ধর্ষকের হাতে রাহাজানি হয়ে যাওয়ার পর হয়তো রুপালি উপলব্ধি করেছিল, বিপদে ভয় পেয়ে কুঁচকে যাওয়া মুখে আর যাই হোক, দেবীত্ব আরোপ করা যায় না! একটা শরীরকে ছয়-ছয়টা শরীর মিলে অশুচি করার পর হয়তো, নষ্ট হয়ে শরীরের ভিতর থেকে আসল মানুষটা বেরিয়ে আসে! তীব্র ঘৃণা, আত্মশ্লাঘা আর আতঙ্কের বোধ নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে রূপালিকে,
– কেন মিশেছিল ও ঝুলনের সঙ্গে!
– কী দেখেছিল ও ওই ঝিম ধরা মেয়েলীপনায়!
– কেন সেদিন মরতে ওকে বিশ্বাস করে, শোভাবাজারের অন্ধকার কানা গলিটায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল!
আজ আবার যেন বহু শতাব্দী পরে, আলো আঁধারির রাস্তা পেরিয়ে ফিরে এল। তেরো বছর বয়সেই রীতিমতো এলাকায় খবরের শিরোনামে উঠে আসা রুপালি দাস, এই ঘটনার পর থেকে শরীরে ও মনে পাল্টেছে খুব তাড়াতাড়ি।
– স্বেচ্ছায় তেরো বছর বয়সের উদ্দীপনায় নিজের সদ্য ফুটতে শুরু করা যৌবনকে মিশিয়ে দিয়েছিল ওর লতানে শরীরে! – কেন! কেন! কেন!
এইসব প্রশ্নের কাছে আজও বড় অসহায় লাগে রুপালির! এর থেকে বেশি কষ্টের দৃশ্য ও এর আগে সামনে থেকে দেখেনি আর! হয়তো এর থেকে বেশি ভালবাসার দৃশ্যও না! হ্যাঁ ভালবাসা! ভালবাসার দৃশ্য! ওকে আবর্জনার মতো রাস্তায় ফেলে রেখে লোকগুলো চলে যাওয়ার পর সেই ঝুলনই তো আশপাশ থেকে লোক ডেকে এনেছিল! ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল!
ঝুলন তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেছিল! আজ আবার যেন বহু শতাব্দী পরে, আলো আঁধারির রাস্তা পেরিয়ে ফিরে এল। তেরো বছর বয়সেই রীতিমতো এলাকায় খবরের শিরোনামে উঠে আসা রুপালি দাস, এই ঘটনার পর থেকে শরীরে ও মনে পাল্টেছে খুব তাড়াতাড়ি।
নারীত্ব মানে ওর কাছে এখন অসহায়তা! নারী শরীর যদি এমন হয়, যা পেয়ে জানোয়ারের দল ছিড়ে খুঁড়ে খাবে, তাহলে সে শরীর থাকা না থাকা সমান। যে শরীর ‘নতুন প্রাণ তৈরি করতে পারবে একদিন’ ধরে নিয়ে ও ভিতর ভিতর গর্ব করত খুব, সেই শরীরটাকেই ধীরে ধীরে পাল্টে ফেলেছিল রুপালি! ক্যারাটে, সেলফ ডিফেন্স শিখেছে আট বছর! মাথার চুল ছোট ছোট করে কেটে ফেলেছে আর্মির লোকেদের মতো!
তার ঢাল প্রতিমার ছাঁচের মতো মুখ এখন অনেক ধারালো! চোয়াল দুটো চাপা! অনেকটা এবারের ঠাকুরের মতো! আবার অনেকদিন ধরে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ওর নিজের গায়ের রং নষ্ট হয়ে গিয়ে তামাটে আকার নিয়েছে! মেয়েদের কোন রংটা নিরাপদ! দুধে আলতা! নাকি পিচ কালো! নাকি তামাটে! এসব হিসেবে কষতে কষতে ক্রমশ ভিতর বাইরে পুরুষের কাছাকাছি একটা অবস্থায় নিজেকে নিয়ে গেছে ঝুলন। একটা সিকিউরিটি এজেন্সির চাকরি থেকে শুরু করে আজ নিজেই একটা এজেন্সির মালিক। পুলিশের পাশাপাশি এখন নিজের পাড়ার পুজোতে ভলান্টিয়ার সার্ভিস দেয় রূপালি আর ওর টিম।
সভ্যতার আদিকাল থেকে সযত্নে লালিত পুরুষের চরিত্রের বর্বর দিকটি, যার ভিতর লুকিয়ে রয়েছে সমাজবোধের ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস!
মহালয়ার পরের দিন তুমুল বৃষ্টিতে পুরো কলকাতা বানভাসি! ওদের পুজোতেও জল থৈ থৈ! থিমের প্যান্ডেল, ঠাকুর প্রায় সব কিছুরই মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে! উদ্বোধনের পরই প্রায় বিসর্জনের অবস্থা যেন! পুজোর সেক্রেটারি ন্যানোদা মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে এককোণে! অনেকদিন পর রুপালির মন আবার কেঁদেছিল ন্যানোদাকে দেখে। পুরুষ আজ কত অসহায়! পিছন থেকে গিয়ে ওঁর পিঠে হাত রেখেছিল রুপালি।
প্রায় এক রাতের ভিতর প্রশাসন, মণ্ডপ শিল্পী আর ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে, ওর নিজের টিমকে নিয়ে অবশেষে সব কিছু গুছিয়ে আনতে পেরেছে। ন্যানোদার মুখে এখন চওড়া হাসি! দিব্যি টিভি চ্যানেলে বাইট দিয়ে বেড়াচ্ছে! সত্যি যৌথযাপনের ভিতর একখানা ভীষণ বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, কাল্পনিক সত্য লুকিয়ে থাকে যেন! সূর্য ডুবে গেলে ঠিক তার পাশেই আড়াআড়ি জুড়ে যাওয়া নদীর মতো জীবন ও মৃত্যু ভাঙাগড়ার আড়ালে মুখ রেখে শুয়ে থাকে।

কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীনের এবারের থিম ‘দহন’। অ্যাসিড অ্যাট্যাকড মেয়েদের জীবন সংগ্রাম, তাদের নিত্য বয়ে চলা দিনকালের খুঁটিনাটি তুলে ধরাই এবারের পুজোর আসল উদ্দেশ্য। ‘সেরেনাটা থিয়েটার্স’ বলে একটি নাট্যগোষ্ঠী, যারা মূলত এইসব ভিতর বাইরে ক্ষয়ে যাওয়া মেয়েদের নিয়ে কাজ করে, সুষম-বিষমের বেড়াজাল টপকে দিব্যি এদের নিয়ে একটা নাটকের দল খুলে ফেলেছে। যেখানে এই মেয়েরা নিজেদের জীবনের কথা বলতে পারে সবার সামনে মাথা উঁচু করে, তাদের এবারে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।
সেই সকাল থেকে রাত, ঠায় একের পর এক মেয়ে নাটকের মতো করে পারফর্ম করে চলেছে নিহিত আত্মকথন! মাঝে মাঝে সেদিকে বিবর্ণ কৌতূহলের বোধ নিয়ে তাকিয়েছে রুপালি। এ-যেন মানুষ আর তার অন্তহীন অসহায়তার কাহিনি! সভ্যতার আদিকাল থেকে সযত্নে লালিত পুরুষের চরিত্রের বর্বর দিকটি, যার ভিতর লুকিয়ে রয়েছে সমাজবোধের ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস! সেই ইতিহাস জুড়েই যেন সর্বত্র ফেটে গড়িয়ে পড়ে নাটকের কথাগুলি! তার দৃশ্যান্তর! ট্রাজেডি ও মানসিক শুদ্ধির ক্ষেত্রটি!
চোয়াল শক্ত করল রূপালি! বিপদ বুঝি আসন্ন! হাতের ওয়াকিটকিতে জরুরি মেসেজ পাঠাল ওর টিমকে, ‘চার্লি টু আলফা, চার্লি টু আলফা, ওভার!’
তবে একটা সমস্যার কথা হল, এদের দেখতে গিয়ে মণ্ডপের ভিতর অহেতুক ঠেলাঠেলি বাড়ছে। বিশেষ করে এদের মধ্যে একটি মেয়ের অভিনয় যেন একদম জ্যান্ত! যেন একতাল বিষাক্ত বারুদ পুরে রেখেছে ও নিজের ভিতর! পুরো পুজোর সুরক্ষার দায়িত্ব যার একজোড়া সতর্ক চোখে, সেই রুপালির দৃষ্টিতে এখন দৃশ্যের আচ্ছন্নতা! মেয়েটির পরনে গোলাপি চুড়িদার আর টাইট ফিট লেগিন্স। একটি কাপড় দিয়ে নিজের মুখের এক-দিক সে ঢেকে রেখেছে। তার অন্য চোখে কি ভীষণ এক দীপ্তি! ও চোখে যেন নেশা আছে! ও চোখে তাকিয়ে আকাশজোড়া এক নিয়ন্ত্রণহীনতার বোধ যেন কাজ করে যায় রূপালির সারা শরীর জুড়ে!
ওদিকে হঠাৎ করেই মন্ডপ জুড়ে তখন হৈ হৈ কাণ্ড! কিছু মহিলার চিল চিৎকার, আর্তনাদে ঘোর ভাঙল রূপালির! ভিড়ের উত্তেজনায় কান পেতে ও বুঝতে পারল, এদের মধ্যে কেউ সামনের নীল চুড়িদার মহিলাটির গলার চেন ধরে টান মেরেছে, তারপর সুযোগ বুঝে ভিড়ে গা মিলিয়ে দিয়েছে। চোয়াল শক্ত করল রূপালি! বিপদ বুঝি আসন্ন! হাতের ওয়াকিটকিতে জরুরি মেসেজ পাঠাল ওর টিমকে, ‘চার্লি টু আলফা, চার্লি টু আলফা, ওভার!’
ওপাশ থেকে ঈষৎ কর্কশ এক যান্ত্রিক উত্তর এল, ‘আলফা টু চার্লি ওভার!’
‘মহিলার চেন ছিনতাই হয়েছে! এন্ট্রি এক্সিট ক্লোস করো কুইক! ওভার!’
‘কপি চার্লি! ওভার!’
ততক্ষণে মণ্ডপের ভিতরে বেশ একটা গুমোট ভাব কাজ করছে। ভাগ্যিস এসিটা ঠিকঠাক কাজ করছে এখনও। হাতে মাইকটা তুলে নিয়ে রুপালি এবার অ্যানাউন্স করে ‘নমস্কার! কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীনের পক্ষ থেকে বলছি। ভিড়ের মধ্যে একজনের গলার হার ছিনতাই হয়েছে। আমি জানি চোর এখানেই লুকিয়ে আছেন। আমি অনুরোধ করছি, তিনি নিজে থেকে বেরিয়ে আসুন। এতে তার পক্ষে মঙ্গল! অন্যথায় আমরা পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব এবং পুলিশ না আসা অবধি এন্ট্রি বা এক্সিট খোলা হবে না।’
পুরো মণ্ডপ আবার হৈ হৈ করে উঠেছে। রুপালি জানে সামনের মহিলা একা নয়, ওর পুরো দলটাই এখন ভিড়ে মিশে আছে। সামনের ভারী চেহারাটি ক্রমশ পিছোচ্ছে ওর থেকে। সটান একটা লাফ দিয়ে তাকে নিয়ে মাটিতে পড়ল রুপালি।
হাতে মাইকটা ধরে একই কথা বেশ কয়েকবার বলতে থাকে রুপালি। ওর তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি বলছে এতেই কাজ হবে। ঠিক তখনই ওর বাঁ-পাশে ধপাস করে একটা আওয়াজ হল। চকিতে দেখল একজন মোটা গোছের অবাঙালি মহিলা, নাটকের জন্য ঘেরা জায়গাটায় ঢুকে পড়েছেন আচমকাই! সেদিক দিয়ে প্রতিমার পিছন দিকে যাওয়ার একটা রাস্তা আছে। প্রায় চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় সামনের কর্ডন টপকে সেখানে ঢুকে পড়ল রূপালিও।
পুরো মণ্ডপ আবার হৈ হৈ করে উঠেছে। রুপালি জানে সামনের মহিলা একা নয়, ওর পুরো দলটাই এখন ভিড়ে মিশে আছে। সামনের ভারী চেহারাটি ক্রমশ পিছোচ্ছে ওর থেকে। সটান একটা লাফ দিয়ে তাকে নিয়ে মাটিতে পড়ল রুপালি। ওর টিমের বাকিরা তখন মব সামলাচ্ছে। প্রায় আসুরিক শক্তি এই অবাঙালি মহিলাটির গায়ে। নিতান্ত দেহাতি এক মহিলা, মাথায় চওড়া করে সিঁদুর দেওয়া।

একা রূপালির পক্ষে সামলানো শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই গন্ধমাদনকে। হঠাৎই ও টের পেল, ওর ঠিক পাশটাতেই যেন আরও কেউ সজোরে চেপে ধরেছে সেই ভারী বস্তার মতো শরীরটা। তার শরীরের গোলাপি চুড়িদারটা ততক্ষণে ধ্বস্তাধ্বস্তিতে ছিড়ে আটখানা। মুখের কাপড়টা সরে গিয়েছে অনেকখানি। সেদিকটা জুড়ে শুধু শুকিয়ে যাওয়া পোড়া ক্ষত আর কালো!
ওদিকের চোখটা পুড়ে গুটিয়ে প্রায় বুজেই গেছে! চামড়া মাংসের এমন বেমক্কা হরফ আর শিরার ওপর শিরা জড়িয়ে গড়ে ওঠা কারুকাজ দেখলে, যে কোনও সৃজন পিয়াসী মানুষের মুখ থেকে অস্ফুটে একটাই শব্দ বেরুবে, বীভৎস! কিন্তু না! এই মুহূর্তে দৃশ্যের বিভীষিকায় রূপালির ভয় করছে না মোটেই! বরং সামনের মুখ ওর কাছে এখন উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের গায়ে ফুটে ওঠা মাত্র একটা কালসিটে দাগ! সেইরকম একটা মুখ যাকে অক্লেশে দেবী বলা যায়! অর্ধেক গৌরবর্ণা আর অর্ধেক কালোয় মিলে যেন সাক্ষাৎ অর্ধনারীশ্বর!
হঠাৎ করে সেই মুখটায় এসে মিশে যায় পুরোনো চিঠির খাম ছুঁয়ে আসা আরেকটি মুখ। খুব আবছা! তবু চিনতে পারে রুপালি। ঝুলন!
এখন ওর আর সেই মুখটির মাঝে শুধু একটা মোটা শরীরের ব্যবধান! মাটিতে পরে এখন যে শুধু হাঁসফাঁস করছে। মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। যেন কালো পিচ রাস্তা দিয়ে মোমবাতি হাতে হেঁটে যায় কুসুম কুসুম দীপান্বিতারা! নির্লিপ্ত এক ভাল-লাগা খেলা করে যায় চরাচর জুড়ে!
হঠাৎ করে সেই মুখটায় এসে মিশে যায় পুরোনো চিঠির খাম ছুঁয়ে আসা আরেকটি মুখ। খুব আবছা! তবু চিনতে পারে রুপালি। ঝুলন! নিভে যাওয়া রোম্যান্স থেকে ছিটকে আসা একটা অস্থির ঘেন্নায় ও প্রাণপণে দুহাতে করে সরাতে চেষ্টা করে মুখটা, কিন্তু পারে না! তেঁতুল বিচির আঠায় একেবারে সেঁটে গেছে যেন! শরীরে শরীরে জোড়া লেগে গেছে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত