Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

চাতক: দ্বিতীয় পর্ব

কিশলয় জানা

এপ্রিল ১৩, ২০২৬

Old Age Home 2
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Old Age Home 2)

(প্রথম পর্বের পর)

তারপর থেমে থেমে বললেন, “আমাকে আবার কে কী পাঠাল আনন্দবাবু? আমাকে পাঠাবে কে আর?”

“আপনার নামেই যখন এসেছে, খুলে দেখলেই তো হয়।”

“আপনি খুলুন। আমার হাত যেন বশ পাচ্ছে না!”

“ওটা মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন বলে হচ্ছে। আমি খুলে দিতেই পারি, কিন্তু নিজের নামে পার্সেল এলে নিজে খুলে প্রথম দেখার যে রোমাঞ্চ, তা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করা কি ঠিক হবে?” হাসলেন আনন্দবাবু। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন।

মুখার্জিদা চোখ বুজলেন একবার। বললেন, “ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা। দেখি খুলে!”


আরও পড়ুন: চাতক প্রথম পর্ব


একটা পাঞ্জাবি আর ধুতি। সস্তার নয়। দাম আছে বেশ। সঙ্গে একখানা চিঠি। মুখার্জিদা অবাক হয়ে চিঠিখানা খুললেন। ছোট্ট চিঠি। পড়তে বেশি সময় লাগল না। হতভম্বের মতো তাকালেন একবার হাতে ধরা চিঠিটার দিকে, তারপর আনন্দবাবুর দিকে। ধুতি-পাঞ্জাবির উপর পরম মায়ায় হাত রাখলেন।

আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, “কে পাঠিয়েছে? চেনা কেউ বুঝি?”

গলাটা ধরে এল মুখার্জিদার, “আমার ছেলে। ক্ষমা চেয়ে লিখেছে, সে অনেক অন্যায় করেছে। তাকে যেন ক্ষমা করি। মাঝে মাঝে সে চিঠি লিখবে। নিজেই ফোন করবে সুযোগ পেলে। কী আর করি বলুন, আমি তো বাবা। নিজের সন্তানের উপর রাগ করে কতদিন আর বসে থাকতে পারি? ও যে আমাকে চিঠি লিখবে, তা আশাও করিনি। সত্যি বলতে কি, এই প্রথম আমি তার হাতের লেখা দেখলাম। এর আগে তো কোনওদিন তার চিঠি পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি!”

Old Age Home 2
আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, “কে পাঠিয়েছে? চেনা কেউ বুঝি?”

আনন্দবাবু মুখার্জিদার একটা হাত দু’মুঠিতে ধরলেন। চাপ দিলেন হালকা। বললেন, “আগে কী পেয়েছি না পেয়েছি, তা নিয়ে না ভেবে এখন যা-পাচ্ছি তা-নিয়েই কি আমাদের এই বয়সে খুশি থাকা উচিত নয় মুখার্জিদা? বেটার লেট দ্যান নেভার। ছেলে অবশেষে তো আপনাকে মনে পড়ায় ক্ষমা চেয়েছে, নিজের হাতে কিছু পাঠিয়েছে। এটাই তো অনেক!”

“হ্যাঁ। জানি। সে কথাই ভাবছি। এখন মরলেও দুঃখ নেই।” চোখ বন্ধ করলেন মুখার্জিদা। জল গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে। আনন্দাশ্রু আর জনকের ভালবাসার চিহ্ন।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আনন্দ উঠে পড়লেন, “এখন আসি তবে? আপনি বিশ্রাম নিন।”

আনন্দ হাসলেন। বললেন, “কেবল পার্সেল নয়। ছেলে এই প্রথম বাবাকে দু’কলম চিঠিও লিখেছে। মাঝে মাঝে চিঠি লিখবে বলেছে। মুখার্জিদার আজ খুব আনন্দ।”

বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে যাবেন, দেখলেন, নন্দবাবু আর দত্তদা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখে নন্দবাবু বললেন, “আজ বুঝি মুখার্জিদার নামে পার্সেল এল?”

আনন্দ হাসলেন। বললেন, “কেবল পার্সেল নয়। ছেলে এই প্রথম বাবাকে দু’কলম চিঠিও লিখেছে। মাঝে মাঝে চিঠি লিখবে বলেছে। মুখার্জিদার আজ খুব আনন্দ।”

“সে তো হবেই”, নন্দবাবু পাংশুমুখে বললেন, “আপনার জনের কাছ থেকে কিছু পেলে মনটা ভারি খুশিয়াল হয়ে ওঠে। আমি জানি। সকলে তো আর আমার মতো কপাল করে আসেনি!”

দত্তদা বললেন, “নন্দ, তুমি ভুল করছ। আমিও তোমার দলে আছি। আরও অনেকেই আছে। সবার বাড়ি থেকে তো আর এমন পার্সেল আসে না। চিঠিই আসে না, তার আবার পার্সেল!”

Old Age Home 2
নিঃসঙ্গ মানুষগুলি চাতকের মতো প্রিয়জনের থেকে একটুখানি মনোযোগ পাওয়ার আশায় কেমন মুখিয়ে থাকেন

আনন্দ বললেন, “আজ আসেনি, কাল আসতেও পারে দত্তদা। এত নেগেটিভ মাইন্ড হলে চলে?”

“না হে, ও আপনি বুঝবেন না। আমার ছেলেরা একেকটা অকাল-কুষ্মাণ্ড। ওদের দরকার ছিল জমিটা হাতিয়ে নেওয়া, তা নিয়েছে। প্রোমোটারকে দিয়ে, যে যার ফ্ল্যাট-ক্যাশ টাকা বুঝে নিয়েছে, ব্যস‌। বাবা মরল কি বাঁচল, তাতে ওদের কিস্যু যায় আসে না। ভাগ্যিস পেনশনের টাকাটা ছিল। না হলে রাস্তায় ভিক্ষে করতে হত!”

কী আর বলবেন এই কথার উত্তরে তা ভেবে পেলেন না আনন্দ। চুপ করে রইলেন। মাথা নাড়লেন সমব্যথীর ভঙ্গীতে। নন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তা পার্সেলে কী পাঠিয়েছে? দেখলেন? মুখার্জিদা খুলল নাকি পার্সেলটা আপনার সামনে?”  

আনন্দবাবু বললেন। শুনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন নন্দবাবু। দত্তদার মুখ আরও অন্ধকার হয়ে গেল। আনন্দ আস্তে আস্তে বললেন, “দেখুন। চাইলেই কি আর চাতক মেঘ পায়, বৃষ্টি নামে? তবু সে আশা ছাড়ে না। আমাদের অবস্থাও তেমনি। হয়তো আসবে না কিছুই। কিন্তু তা বলে আশা ছাড়া উচিত নয়!”

দত্তদা তাড়া লাগালেন, “চল-চল নন্দ, নিচে যাই। বাইরের খোলা হাওয়ায় গিয়ে বসি। অন্যের সুখের খবর শুনে আমাদের কী লাভ বল? আমাদের যেমন দুঃখের কপাল, তেমনই থাকবে। চল!”

“সারাজীবন সংসারের জন্য করেছি বুঝলেন। সকলের সব চাহিদা যথাসম্ভব মেটানোর চেষ্টা করেছি। গিন্নির ক্যানসার ধরা পড়ল। তাও লাস্ট স্টেজ। আগে সে বুঝতে পারেনি, নাকি বুঝতে দেয়নি, জানি না। ছেলেরা চাকরিবাকরি করে। মেজটাকে আমিই ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম আমাদের ফার্মে। আহামরি রেজাল্ট ছিল না তার। তা তিন ছেলের সকলেই হাত উপুড় করল। পৃথক হয়ে গেল নিজেরা শলাপরামর্শ করে। দায় এড়ানো আর কি! গিন্নি অবশ্য বেশি দিন জ্বালাননি, জ্বলেনওনি। আমাকে মুক্তি দিয়ে চলে গেলেন। সংসারে মন টিকল না। একজনের কাছে খোঁজ পেয়ে চলে এলুম এত দূরে। চেয়েছিলাম, ওইরকম ছেলেপিলেদের থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই মঙ্গল। কিন্তু দূরে সরে এলেই কি আর দূরে সরিয়ে দেওয়া যায়? হাজার হোক, নিজের তো! একখানা পেন কিংবা একখানা চিরকুটও যদি পাঠাতো, সেটাই মাথায় করে রাখতাম। বয়স মানুষের মনকে দুর্বল করে দেয় আনন্দবাবু! এমনি এমনিই কি আর চাতকের মতো প্রতীক্ষায় থাকি?”

“আপনিও তো তাদের চিঠি লিখতে পারেন নন্দবাবু। ফোন করতে পারেন। করেন না কেন?”

“কে বলল করিনি?” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন নন্দবাবু, “বেশ কয়েকবার ফোন করেছি। রিং হয়ে গিয়েছে, কেউ ধরেনি। আর চিঠি? সে-ও নেই-নেই করে খান-দশেক লিখেছি। কেউ দু’কলম প্রত্যুত্তর দেবে, সে গুড়ে বালি! মিছেই কী আর বলেছে, ‘কা তব কান্তা, কস্তে পুত্রা, সুত-মিত-রমণী সমাজে’? কপাল মশাই কপাল!”

দত্তদা তাড়া লাগালেন, “চল-চল নন্দ, নিচে যাই। বাইরের খোলা হাওয়ায় গিয়ে বসি। অন্যের সুখের খবর শুনে আমাদের কী লাভ বল? আমাদের যেমন দুঃখের কপাল, তেমনই থাকবে। চল!”

আনন্দ ওদের চলে যাওয়া দেখলেন। দু’জনে এক ঘরে থাকেন। একেবারে হরিহর আত্মা। হয়তো দু’জনের প্রায় একইরকম জীবন-অভিজ্ঞতা তাঁদের মনকে বিনিসুতোয় বেঁধেছে। আনন্দ নিজে থাকেন দোতলার কোণের ঘরটায়। সেদিকেই হাঁটা দেবেন, এমন সময় রতন ডাকল। সে উঠে আসছিল উপরে।

“ওহ্‌। আমি আসলে ফোনটা বোধহয় মুখার্জিদার ঘরে বা আর কোথাও ফেলে এসেছি? নাকি নিজের ঘরেই? মনে পড়ছে না। দাঁড়াও খুঁজে পেয়ে ফোন করে নিচ্ছি।” বলে ফোন খুঁজতে চলে গেলেন হন্তদন্ত হয়ে।  

“আপনার কি কাল কলেজে কোনও কাজ আছে? যাবেন?”

“কেন?”

“আপনাকে ফোন করে ওরা পায়নি। আমাকে করেছিল। বলল, আপনি যেন ফোন করে নেন। কী সব কাজ আছে, ওরা বুঝতে পারছে না, কীভাবে করবে!”

“ওহ্‌। আমি আসলে ফোনটা বোধহয় মুখার্জিদার ঘরে বা আর কোথাও ফেলে এসেছি? নাকি নিজের ঘরেই? মনে পড়ছে না। দাঁড়াও খুঁজে পেয়ে ফোন করে নিচ্ছি।” বলে ফোন খুঁজতে চলে গেলেন হন্তদন্ত হয়ে।  

Old Age Home 2
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন নন্দবাবু, দত্তদার মুখ আরও অন্ধকার হয়ে গেল

রতন সেই দিকে তাকিয়ে দেখল খানিকক্ষণ। অনেকদিন থেকে তার মনের মাঝে একটা সন্দেহ জেগেছে, কিন্তু সেটা সত্যি কি না বুঝতে পারছে না। প্রমাণ নেই বলে কাউকে বলতেও পারছে না। এই বৃদ্ধাবাসে সে একেবারে প্রথম থেকে আছে। কোনওদিন এত পার্সেল, চিঠিপত্র আসার হিড়িক দেখেনি সে। কিন্তু মাস ছয়েক হল হঠাৎ করে সকলের বাড়ির লোকজন যেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে গিয়েছে। কেউ ক্ষমা চাইছে, কেউ পার্সেল করে উপহার পাঠাচ্ছে। এক-আধটা হলে কিছু মনে হত না, কিন্তু এ যেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সকলের নামেই আসছে।

গত সপ্তাহে একটা ঘটনা ঘটেছিল। কাউকে বলেনি সে। তখন থেকেই তার সন্দেহটা আরও দৃঢ় হয়ে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গেল হপ্তায় বিশ্বাসবাবু বলে এক রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসারের জন্মদিন ছিল। সেই উপলক্ষ্যে তাঁর নামে তাঁর মেয়ে একখানা উপহার ক্যুরিয়ার মারফত পাঠায়, সঙ্গে ফুল। খুব খুশি হয়েছিলেন বিশ্বাসবাবু। কিন্তু গেল শনিবার সন্ধ্যের সময় একটা ফোন আসে তার কাছে। বিশ্বাসবাবুকে তাঁর মেয়ে ফোন করে পাচ্ছে না। বোধহয় সুইচড‌ অফ আছে। তিনি কেমন আছেন এ কথা জানতে চাইল তাঁর মেয়ে। দুঃখপ্রকাশ করল যে, শ্বশুরবাড়ির ব্যস্ততায় সে খোঁজখবর করতে পারে না। তার দাদাও যে খোঁজখবর রাখে না, সে জানে।

রতন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তাহলে কে পাঠাল? বিশ্বাসবাবুর মেয়েও অবাক। তার নাম করে দাদা পাঠাবে না। পাঠাতে হলে নিজের নামেই পাঠাবে। তবে কি কোনও আত্মীয়স্বজন?

রতন যখন তাঁকে জানাল যে, তাঁর পাঠানো জন্মদিনের উপহার পেয়ে বিশ্বাসবাবু খুব খুশি হয়েছেন, তখন সে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল, “আমি? আমি তো বাবাকে কিছু পাঠাইনি! ইন ফ্যাক্ট আমার মনেই ছিল না বাবার জন্মদিনের কথা। যা চাপের মধ্যে থাকি, নিজের বার্থ ডে-ই ভুলে যাই, তো বাবার!”

রতন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তাহলে কে পাঠাল? বিশ্বাসবাবুর মেয়েও অবাক। তার নাম করে দাদা পাঠাবে না। পাঠাতে হলে নিজের নামেই পাঠাবে। তবে কি কোনও আত্মীয়স্বজন?

রতন ডেকে দিয়েছিল বিশ্বাসদাকে। তবে তার আগে তাঁর মেয়েকে বলতে বারণ করেছিল, উনি যে উপহারটা পাঠাননি, এটা যেন না বলেন। আসলে ছোট ছোট এই সব উপহার-পার্সেল যে কী খুশি বয়ে আনে এই নিঃসঙ্গ মানুষগুলির জীবনে, সে তো জানে। যাই হোক, মেয়ে বুঝেছিল এটাই আনন্দের।

Old Age Home 2
তখন থেকে রতনের মনে সন্দেহ জেগেছে

কিন্তু তখন থেকে রতনের মনে সন্দেহ জেগেছে। এই বৃদ্ধাবাসের কারুর সঙ্গে ষড় করে বাইরের কেউ পাঠাচ্ছে না তো? রতন জানে, যদি কেউ করেও থাকে, তবে সেটা অন্যায় নয়। বরং আড়ালে থেকে এই একা মানুষগুলির মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারছেন, বুকে বল যোগাতে পারছেন, এটাই অনেকখানি। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঘরের সেই লোকটিকে যদি চিনে ফেলা যেত! এই ক’দিন সে সকলের দিকেই নজর রাখছে। কিন্তু এখনও ধরতে পারছে না।

আনন্দ চাবি দিয়ে লক খুলে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। মোবাইলটা সামনেই টেবিলের উপর পড়ে ছিল। মাঝে মাঝেই ভুলে যান তিনি। হাতে নিয়ে দেখলেন, হ্যাঁ, ওরা অনেকবার তাঁকে ফোন করেছে। কলেজের কেউ, কিন্তু কলেজেরই কেবল না। আসলে কলেজে স্পেশাল লেকচার দিতে গিয়ে থার্ড ইয়ারের আত্রেয়ী, দীপ্তেন, অরুণ, বনানী এইরকম আরও একদল ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে তাঁর মধুর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের সাহায্যেই এই ষড়যন্ত্রের গোড়াপত্তন।

এই বৃদ্ধাবাসের নিঃসঙ্গ মানুষগুলি চাতকের মতো প্রিয়জনের থেকে একটুখানি মনোযোগ পাওয়ার আশায় কেমন মুখিয়ে থাকেন, তা নিজের চোখেই দেখেছেন তিনি। খারাপ লাগে তাঁর। এঁদের সঙ্গে সত্যি সত্যি যদি প্রিয়জনকে মিলিয়ে দিতে পারতেন, খুব খুশি হতেন তিনি। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। অতএব, তাঁর অনুগত এই দলের সাহায্যে তিনি নানা জায়গা থেকে পার্সেল পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন যেমন, তেমনি এদের কাউকে দিয়েই চিঠি লিখিয়ে তাও পাঠান নিজের বৃদ্ধাবাসের ঠিকানায়।

তিনি জানেন, এই বৃদ্ধাবাসে তিনিই একমাত্র বোর্ডার যার নামে কখনও কোনও পার্সেল আসবে না। কিন্তু সেজন্য বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই তাঁর।

উপহার কেনার টাকা তিনিই দেন। আজকাল যে-কোনও প্রান্তে বসে যে-কোনও জায়গা থেকেই পার্সেল পাঠানো যায় নির্দিষ্ট ঠিকানায়। অনলাইন কেনাকাটার অ্যাপসগু‌লি তো আছেই। ছেলেমেয়েরাও দারুণ উৎসাহী। তাদের পরিচিত জনদের সাহায্যে তারা বৃদ্ধাবাসের বোর্ডারদের আত্মীয়-পরিজনের নামে পাঠায়। নিজেরাও বেনামে পাঠায়। চিঠি লেখে। গলা সামান্য পাল্টে ফোনও করেছে কয়েকবার। তবে ফোন করাটা অসুবিধাজনক, কারণ ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ওতেই বেশি; ফলে ওই ট্রিকসটা তারা বেশি ব্যবহার করে না। এইসব কাজ করতে করতে আর একটা ব্যাপারও হচ্ছে। ওদের মনে বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমা প্রভৃতি সম্পর্কে একটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীও গড়ে উঠছে। এও কি কম আশার কথা?

রতন ছেলেটি ভাল। ব্যবসায়ী নয়। তার টেবিলের কাচের নিচে সকলের জন্মদিনের ডেটা প্রিন্ট আউট করে রাখা আছে। তার অনুপস্থিতির সুযোগে নিজের মোবাইলে সেটার একটা ছবি তুলে নিয়েছেন তিনি। বাকি প্রিয়জনের নাম ইত্যাদি তিনি জেনে নেন সকলের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ছলে। নিজেদের একটা গ্রুপও তৈরি করেছেন ফোনে। সেখানেই প্ল্যান-প্রোগ্রাম ঠিক হয়। আর কেউ না জানুক, ওরা আর আনন্দ নিজে জানেন, এই সপ্তাহে কার কার নামে পার্সেল আসবে, কিংবা চিঠি।

Old Age Home 2
ফোনটা তুলে নিলেন তিনি, একটা নাম্বারে ডায়াল করলেন

একেবারে নিঃস্বার্থ এই কাজ, তা মনে করেন না তিনি। ওদের চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত বুকে একটুখানি আনন্দ জাগাতে পারলে নিজের বুকের মধ্যে যে আনন্দ অনুভূত হয়, তা আর কিছুতে হয় না। তিনি জানেন, এই বৃদ্ধাবাসে তিনিই একমাত্র বোর্ডার যার নামে কখনও কোনও পার্সেল আসবে না। কিন্তু সেজন্য বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই তাঁর।

ফোনটা তুলে নিলেন তিনি। একটা নাম্বারে ডায়াল করলেন। ও-পার থেকে ফোন তুলতেই চাপা গলায় বললেন, “শোন দীপ্তেন, সামনের সপ্তাহে নন্দবাবু ও দত্তদার নামে পার্সেল কিংবা চিঠি না এলেই নয়-যে!… ব্যবস্থা করতে পারবি না?”…

(সমাপ্ত)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of কিশলয় জানা

কিশলয় জানা

১৯৭৪ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। পিতার কর্মসূত্রে আজীবন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বড় হওয়া। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। নানা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে আপাতত হিলিতে এস.বি.এস গর্ভনমেন্ট কলেজে কর্মরত। গ্রন্থকীট। গল্প লেখার সূত্রপাত মাত্র চার বছর আগে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষার নানা পত্রপত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ ও ওয়েবজিনে লেখালেখি করেছেন। সব ধরনের গল্প লিখতেই স্বচ্ছন্দ। একাধিক সংকলনে লিখেছেন গল্প ও ঔপন্যাসিকা। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন 'ড্রাকুলা-শিবির'। এককভাবে সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, স্মৃতিকথা। বাংলার বাবু সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একক বই 'সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাবু'।
Picture of কিশলয় জানা

কিশলয় জানা

১৯৭৪ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। পিতার কর্মসূত্রে আজীবন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বড় হওয়া। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। নানা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে আপাতত হিলিতে এস.বি.এস গর্ভনমেন্ট কলেজে কর্মরত। গ্রন্থকীট। গল্প লেখার সূত্রপাত মাত্র চার বছর আগে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষার নানা পত্রপত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ ও ওয়েবজিনে লেখালেখি করেছেন। সব ধরনের গল্প লিখতেই স্বচ্ছন্দ। একাধিক সংকলনে লিখেছেন গল্প ও ঔপন্যাসিকা। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন 'ড্রাকুলা-শিবির'। এককভাবে সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, স্মৃতিকথা। বাংলার বাবু সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একক বই 'সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাবু'।

One Response

  1. কিশলয় দা, দ্বিতীয় পর্বটিও অসাধারণ হয়েছে। বিশেষ করে আনন্দ বাবু গোপনে বৃদ্ধাশ্রমের সকলকে খুশি রাখার জন্য ছোট ছোট কৌশল আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মাধ্যমে এক স্নেহময় পারিবারিক আবহ গড়ে তুলেছেন। তিনি নীরবে সবার ভাঙা মন জোড়া লাগান। গল্পটি দেখায়, অল্প যত্ন আর ভালোবাসাও নিঃসঙ্গতায় বড় আলো জ্বালাতে পারে। এই পর্বে তিনি শুধু একজন সহবাসী নন, বরং স্নেহ, ভালোবাসা, সম্পর্ক আর আশার এক উজ্জ্বল প্রদীপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল
নীলাঞ্জন দরিপা

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com