Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

চাতক

কিশলয় জানা

মার্চ ৩১, ২০২৬

Old Age Home
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Old Age Home)

“এই নিন, আপনার বাড়ি থেকে সম্ভবত এই পার্সেলটা পাঠিয়েছে, খুলে দেখুন।”  

দশ নম্বর রুমের বোর্ডার সত্তরোর্ধ্ব মুখার্জিদা বেশি চলাফেরা করতে পারেন না। সারাদিন প্রায় বিছানাতেই শুয়ে বসে কাটে। কোনওরকমে প্রাত্যহিক কাজ করেন, একটি ওয়াকিং স্টিক আছে, সেটার সাহায্যে ইচ্ছে হলে সামনের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করেন ক্বচিৎ-কদাচিৎ। আর নিউজপেপার পড়েন। এখনও সেটাই পড়ছিলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে রতনের হাত থেকে পার্সেলটা নিলেন। আনন্দবাবু রতনের পাশে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

বিকেল হয়ে গিয়েছে। দুপুরের ডাকে সাধারণত পিওন এসে এই বৃদ্ধাবাসের বোর্ডারদের চিঠিপত্র, পার্সেল দিয়ে যায়। তারপর নাম দেখে দেখে সেগুলি পৌঁছে দেওয়া হয় বোর্ডারদের কাছে। পার্সেলে প্রাপককেই স্বাক্ষর করতে হয়, তবে বৃদ্ধাবাসের বোর্ডারদের সেজন্য আর ব্যতিব্যস্ত করতে চায় না ম্যানেজার রতন পইড়্যা। নিজেই বকলমে সই করে নেয়। আজও তেমনটাই নিয়েছে।


আরও পড়ুন: সেদিন চৈত্রমাস


আগে তেমন কিছু আসত না এত ঘনঘন, আজকাল আসে। প্রায়ই এর-ওর নামে নানা গিফট, দরকারি জিনিস পাঠাচ্ছে বাড়ির লোকে। এটা শুভ লক্ষণ। রতন মাঝে মাঝে ভাবে, এরা আজ উপহার পাঠাচ্ছে, কাল হয়তো আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসবে। এতে বৃদ্ধাবাসের লাভের ভাগটা টালমাটাল হবে সাময়িকভাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে মনে-মনে চায়, বাড়ির লোক এদের ফিরিয়ে নিয়ে যাক। জীবনের শেষ ক’টা দিন নিজের লোকের সঙ্গে না-কাটালে কি আর সুখে মরা যায়!

আনন্দবাবু প্রায় রোজ দুপুরে বাইরের দালানটায় বসে খবরের কাগজ পড়েন, কিংবা বই। কখনও মনে হলে শহরের দিকে যান। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে আনেন। অন্যদের কিছু কেনার থাকলে, তাও এনে দেন। যদিও এই বৃদ্ধাবাসের নিয়ম অনুযায়ী রোজ সকালে লিস্ট চাওয়া হয়, তবুও বয়স হয়েছে, কেউ কেউ ভুলে যান, পরে মনে পড়ে। অনেকে এই বয়সে শিশুদের মতো হয়ে যান। তাঁরা চান, আজকের জিনিস আজই এনে দেওয়া হোক। সেটা সবসময় সম্ভব হয় না।

Old Age Home
প্রায়ই এর-ওর নামে নানা গিফট, দরকারি জিনিস পাঠাচ্ছে বাড়ির লোকে

মূল শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই ‘সুখস্মৃতি’ বৃদ্ধাবাস। মূল অফিস কলকাতায়। তবে বেশ কয়েকটি জেলায় ব্রাঞ্চ আছে। ঝাড়খণ্ড লাগোয়া এই ব্রাঞ্চও তেমনই একটি। পুরুষদের জন্য তৈরি এই বৃদ্ধাবাসে মোট আবাসিকের সংখ্যা তিরিশ। এখনও কুড়িটা সিট ফাঁকা। আজ তিন বছর হল, এই ব্রাঞ্চটা খুলেছে। তিন বছরে তিরিশ জন যদিও মন্দ নয়, তবুও ম্যানেজমেন্ট চাপ দিচ্ছে, বাকি সিটগুলিও যাতে বুক হয়ে যায় তাড়াতাড়ি।

রতন আগে ছিল নদীয়া ব্রাঞ্চে। সেখানে সে ভালই কাজ করছিল। এই ব্রাঞ্চটা হওয়ার পরে সে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে এখানে এসেছে। তার বাড়ি এগরার কাছে। সংসারে মা, বাবা, স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে, ভাই, ভাইয়ের বউ সবাই আছে। সামান্য ধানী জমি আছে, সেখানেই বাবা-ভাই চাষ আবাদ করে। সে বি.কম পাশ করে বসে ছিল, চাষবাস ভাল লাগত না। সরকারি চাকরি এখন সোনার পাথরবাটি। আছে, কিন্তু দেখা যায় না। অতএব এক পরিচিতর মারফত এই বৃদ্ধাবাসের চাকরিটা পেয়ে ভালই লেগেছিল তার।

কারুর উনিশশো স্কোয়্যার ফিটের ‘একচিলতে’ ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে জায়গা দিতে পারছে না বলে, বৃদ্ধাবাসে ফেলে গিয়েছে। হয়তো ফ্ল্যাটটা বাবাই কিনেছিলেন। হয়তো একমাত্র ছেলের কোনও স্বাদ-আহ্লাদ অপূর্ণ রাখেননি কোনওদিন। ভেবেছেন, এখন ছেলেমেয়ের জন্য করছি, শেষ বয়সে ছেলেমেয়ে আমার জন্য করবে। কিন্তু মানুষের ভাবনার সঙ্গে তো আর বাস্তব মেলে না।

প্রাইভেটে কাজ করার হাজার একটা ঝামেলা। তবে তাদের ম্যানেজমেন্ট ভাল। সময়মতো সকলের মাইনেপত্তর দেয়। তার উপর এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছে বলে দরকারে বাড়িতেও যেতে পারে। থাকা-খাওয়ার খরচ নেই, টুকটাক হাত খরচ যা। বাড়িতে অনেকটাই পাঠাতে পারে। কিছু জমিজমাও কিনেছে টাকা জমিয়ে। নেই নেই করে দশ বছর হয়ে গেল এই কাজে।

প্রথম প্রথম তার খারাপ লাগত। এখানে যাঁরা আসেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই নিজের সংসার-আত্মীয়-পরিজন আছে। কিন্তু তাঁরা কোনও কারণে আর দায়িত্ব নিতে চায় না, এঁদেরও অনেকের পোষায় না তাঁদের মর্জিমাফিক চলা। নানা পেশার মানুষ সব। দুঃস্থ কেউ নয়। অনেকের মাস গেলে পেনশন আছে। কেউ এককালীন পেনশনের টাকা নিয়ে রিটায়ার করেছেন। এই একটা ব্যাপারে ম্যানেজমেন্ট কম্প্রোমাইজ করে না। নির্দিষ্ট টাকা না থাকলে বৃদ্ধাবাসে কারুরই ঠাঁই নেই। এককালীন একটা টাকা দিতে হয় আসার সময়, পরে মাসিক খরচ হিসাবে দিতে হয় নির্দিষ্ট টাকা। ওই টাকার মধ্যে তিনবেলার খাওয়া-খরচ, ইলেকট্রিক বিল, রুম ভাড়া সব ধরা।

Old Age Home
আরও দুটি চিঠি এসেছে হৃষিকেশবাবুর নামে

চাকরির প্রথম বছর তাদের ট্রেনিং হয়েছিল কলকাতার হেড অফিসে। সেখানে বোর্ডারদের মধ্যে অনেকের ছেলেমেয়েরা এনআরআই। কারুর উনিশশো স্কোয়্যার ফিটের ‘একচিলতে’ ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে জায়গা দিতে পারছে না বলে, বৃদ্ধাবাসে ফেলে গিয়েছে। হয়তো ফ্ল্যাটটা বাবাই কিনেছিলেন। হয়তো একমাত্র ছেলের কোনও স্বাদ-আহ্লাদ অপূর্ণ রাখেননি কোনওদিন। ভেবেছেন, এখন ছেলেমেয়ের জন্য করছি, শেষ বয়সে ছেলেমেয়ে আমার জন্য করবে। কিন্তু মানুষের ভাবনার সঙ্গে তো আর বাস্তব মেলে না।

ছেলেমেয়ে বড় হলেই তাদের জগৎ আলাদা হয়ে যায়। বোর্ডারদের প্রায় সকলের কাছেই মোবাইল ফোন আছে। কিন্তু থাকলে কী হবে, এঁদের এখানে দিয়ে যাওয়ার পর দুঃখজনকভাবে বাড়ির লোকেরা তাঁদের পুরনো নম্বর বদলে ফেলেন কিংবা সেই নম্বর স্যুইচড‌ অফ করে রাখেন। এঁরা চাইলেই সেই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন না। মোবাইল থেকেও তার কোনও উপযোগিতা নেই এঁদের কাছে এখন।

আজ দুই বছর হল তিনি এসেছেন। কোনও একটি কলেজে পড়াতেন। স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে বছর সাতেক আগে। এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনেই প্রতিষ্ঠিত এবং বিবাহিত। স্বাধীনভাবে বাঁচবেন বলে, রিটায়ার করার দু’বছরের মাথায় চলে এসেছেন এখানে। দেখতে গেলে এই বৃদ্ধাবাসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে তিনি একজন।

এঁদের বাইরে দু’চারজন আছেন, যাঁরা স্বাধীনচেতা। ছেলে-বউয়ের সংসারে থাকবেন না বলে নিজেরাই স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাবাসে চলে এসেছেন। এঁরা সারাদিন গল্প-গুজব করেন, ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ান, বাকিদের মতো বাড়ি থেকে যদি কেউ আসে, সেজন্য প্রতীক্ষায় চাতক পাখির মতো গেটের বাইরের ধুলো ওড়া লাল মোরামের রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে বিকেল ফুরিয়ে দেন না। আনন্দবাবু তেমনই একজন।  

আজ দুই বছর হল তিনি এসেছেন। কোনও একটি কলেজে পড়াতেন। স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে বছর সাতেক আগে। এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনেই প্রতিষ্ঠিত এবং বিবাহিত। স্বাধীনভাবে বাঁচবেন বলে, রিটায়ার করার দু’বছরের মাথায় চলে এসেছেন এখানে। দেখতে গেলে এই বৃদ্ধাবাসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে তিনি একজন।

কলেজে পড়াতেন বলে গম্ভীর, মেপে কথা বলেন, এমন নয়। বরং সকলের সঙ্গেই হইহই করে কাটাতে ভালবাসেন। সকলের খোঁজখবর রাখেন যতদূর সম্ভব। এখানে অনেকেই আছেন যাঁরা মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তির সঙ্গে ঠিক অভ্যস্ত নয়, দরকারে এবং সম্ভব হলে বাড়ির লোকদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া; কারুর হয়তো চিঠি লিখতে গেলে হাত কাঁপে, সেই চিঠি লিখে দেওয়া— নিজের মতো করে আনন্দবাবু এখানে যেন একটা সংসারই পেতে বসেছেন।

শহরে যে কলেজটি আছে, সেখানে পদার্থবিদ্যা বিভাগে তাঁর কে পরিচিত আছেন, তাঁর কাছে যান মাঝেমধ্যে। বেশ কয়েকবার অতিথি হিসাবে স্পেশাল ক্লাসও নিয়েছেন। কখনও গুটিকয় ছেলেমেয়ে আসে পড়া বুঝতে। আগে থেকে জানলে তাদের জন্য আলাদা খাবার আনিয়ে রাখেন। বেশ আছেন তিনি, রতনের মনে হয়।

মুখার্জিদা কোনও এক কর্পোরেটে উচ্চপদে চাকরি করতেন। সারাজীবন রাজার মতো থেকেছেন। কলকাতার গড়িয়া অঞ্চলে চার কাঠার উপর নিজের দোতলা বাড়ি, বাগান। কিন্তু কপাল তাঁকে আজ এখানে এনে ফেলেছে। প্রায়ই একে-ওকে ধরে শোনান, “একমাত্র সন্তান! কী দিইনি তাকে? মুখ না খুলতেই সব হাজির করতুম। ওর মা না হলে রাগ করত। আজ তার প্রতিদান দিল কেমন দেখুন! বিয়ে করল আর বদলে গেল!”

এই বৃদ্ধাবাসে শেয়ারের রুম, যেখানে দুই বা তিনজন একসঙ্গে থাকতে পারেন, তেমনও আছে। আবার একটু বেশি টাকার সিঙ্গল রুমও আছে। আনন্দবাবু সেই রকমই একটি সিঙ্গল রুমে থাকেন। অনেক বইপত্র নিয়ে এসেছেন। সেসব পড়েন আর আড্ডা দিয়ে কেটে যায় তাঁর। যেদিন বৃদ্ধাবাসে থাকেন দুপুরবেলায়, সেদিন খাওয়ার পর রতন জেগে থাকলে তার সঙ্গে কথা বলেন। তার সংসার, এই বৃদ্ধাবাস— আরও কত কী! বেশ লাগে মানুষটিকে রতনের। এখানে সকলেই রতনকে “ম্যানেজারবাবু” বলে ডাকেন, কেবল আনন্দবাবুই ডাকেন নাম ধরে।

আজও জিজ্ঞাসা করছিলেন, “কী হে রতন, আজ আবার কার বাড়ির লোক কী পাঠাল? নাকি আজ খালি হাত?”

রতন বলল, “না, আজ কেবল একটাই পার্সেল আছে। মুখার্জিদার নামে!”

Old Age Home
গেল মাসে আমার ছেলে-বৌমা কী সুন্দর একখানা চাদর পাঠিয়েছে বলো

“বল কী! এ তো দারুণ ব্যাপার। মুখার্জিদা তো রোজ আক্ষেপ করেন, তাঁকে এখানে ফেলে চলে গিয়ে তাঁর একমাত্র ছেলে-ছেলের বউ একদম ভুলে গিয়েছে তাঁকে। আর খোঁজখবর নেওয়ার কথা মাথাতেই আসে না তাদের!”

মুখার্জিদা কোনও এক কর্পোরেটে উচ্চপদে চাকরি করতেন। সারাজীবন রাজার মতো থেকেছেন। কলকাতার গড়িয়া অঞ্চলে চার কাঠার উপর নিজের দোতলা বাড়ি, বাগান। কিন্তু কপাল তাঁকে আজ এখানে এনে ফেলেছে। প্রায়ই একে-ওকে ধরে শোনান, “একমাত্র সন্তান! কী দিইনি তাকে? মুখ না খুলতেই সব হাজির করতুম। ওর মা না হলে রাগ করত। আজ তার প্রতিদান দিল কেমন দেখুন! বিয়ে করল আর বদলে গেল!”

আনন্দবাবু সবসময় বলেন, “আজকালকার ছেলেপিলে, তাদের ভাবনাচিন্তা, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন কি আর আমাদের সঙ্গে মেলে? সবসময় মনে থাকলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। হাতের মুঠোয় মোবাইল থাকতে পারে, কিন্তু এখন যা দিনকাল, লোকের হাতে সময়টা ছোট হয়ে গিয়েছে।”

তারপর থেকে আরও দুটি চিঠি এসেছে হৃষিকেশবাবুর নামে। ভদ্রলোকের এখন চোখের চাউনিই বদলে গিয়েছে। প্রায়ই বলেন, “নাতনি আর একটু বড় হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারপর আমায় নিয়ে যাবে বলেছে এখান থেকে। আসলে কী জানো, মনের টান যদি ঠিক থাকে, আপনজন ভুলতে পারবেই না!” গলার সুরে অহংকার ঝরে ঝরে পড়তে থাকে তাঁর।

পঁচিশ নম্বরের নরেনবাবু বললেন, “তা ঠিক বলেছ তুমি আনন্দ। ক’দিন আগে আমিও তেমনটাই ভাবতাম, ওই মুখার্জিদার মতো। কিন্তু গেল মাসে আমার ছেলে-বৌমা কী সুন্দর একখানা চাদর পাঠিয়েছে বলো। সঙ্গের চিঠিতে লিখেছে, ‘সামনেই শীত আসছে। শীতে কষ্ট পাবেন বলে আগেই পাঠালাম। আমরা সময় সুযোগ করে যাব। ঠাণ্ডা লাগাবেন না। আপনার আবার ঠাণ্ডার ধাত। কান-গলা সব ঢেকে রাখবেন!’ দেখ তো, এখন এই আশ্বিনের শেষ। শীত আসতে ঢের দেরি। কিন্তু তারা ঠিক মনে করে আমায় পাঠিয়েছে। নাহ্, বৌমাকে যেমন ভেবেছিলাম তেমন খারাপ সে নয়!”

সতেরো নম্বরের হৃষিকেশবাবুর বয়স একাত্তর। তবে নীরোগ, সবল মনের মানুষ। রোজ বিকেল হলেই গেটের কাছে পায়চারি করতেন। ভাবখানা এমন, যেন বাড়ির লোক আসবে বলে খবর পাঠিয়েছে। ভদ্রলোকের নাতনি স্কুলে পড়ে। বছর দুই আগে বাবার সঙ্গে এসে দাদুকে বলে গিয়েছিল, খুব শীঘ্রই আবার আসবে। কিন্তু এই দু’বছরে তার আর সে সময় হয়নি। আসা তো দূর, একটা চিঠি বা ফোন পর্যন্ত না। কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেন, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। তা তাঁর নামেও মাস দুয়েক আগে চিঠি এসেছে। নাতনি লিখেছে ক্ষমা চেয়ে, নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় সে তার প্রমিস ভুলে গিয়েছিল। এবার থেকে নিয়মিত চিঠি লিখবে। দাদুকে সে খুব মিস‌ করে ইত্যাদি ইত্যাদি।     

তারপর থেকে আরও দুটি চিঠি এসেছে হৃষিকেশবাবুর নামে। ভদ্রলোকের এখন চোখের চাউনিই বদলে গিয়েছে। প্রায়ই বলেন, “নাতনি আর একটু বড় হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারপর আমায় নিয়ে যাবে বলেছে এখান থেকে। আসলে কী জানো, মনের টান যদি ঠিক থাকে, আপনজন ভুলতে পারবেই না!” গলার সুরে অহংকার ঝরে ঝরে পড়তে থাকে তাঁর।

তবে অহংকার করার মতো ব্যাপার ঘটেছে ন’নম্বরের অবিনাশবাবুর ক্ষেত্রে। ক’দিন আগেই ছিল তাঁর জন্মদিন। এই বৃদ্ধাবাসে যাঁরা থাকেন, তাঁদের সকলেরই প্রোফাইল তৈরি করে রাখা আছে কম্পিউটারে। সেখানে তাঁদের জন্মসাল, তারিখ সবই আছে। রতন সেগুলি থেকে ডেটা নিয়ে একটা আলাদা ফাইল করেছে, যেটা খুললেই জানতে পারা যাবে, কার কোন মাসের কত তারিখে জন্মদিন। ওইদিন একটু পায়েস কিংবা যাঁর জন্মদিন তাঁর প্রিয় খাবারের আয়োজন করার চেষ্টা করে সে। আর কিছুর জন্য না, নিজেদের কাছের মানুষদের যা করার কথা ছিল, অথচ তাঁরা তা করেননি বলে, এই বিজন-প্রবাসে দুঃখী মানুষগুলিকে একটু আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা আর কি। এর বেশি সে আর কী-ই বা করতে পারে? তাও ম্যানেজমেন্ট থেকে এর অনুমতি পেতে কম ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়নি তাকে!

সর্বদাই তাঁর মুখ বিমর্ষ, ভ্রূ কুঞ্চিত। কথাবার্তাও বিশেষ বলেন না কারুর সঙ্গে। কাজ করতেন শিপিং কর্পোরেশনে। দুই ছেলে, এক মেয়ে। এক ছেলে থাকে আমেরিকায়, আর একজন বেঙ্গালুরুতে। মেয়ে বিয়ে করে কানাডা-প্রবাসী। প্রথম প্রথম ফোন করত তারা সকলেই, বছর খানেক হল আর বিশেষ ফোন আসে না কারুরই। তবে মাঝে মাঝে টাকা আসে তাঁর অ্যাকাউন্টে। ব্যস‌, দায়িত্ব শেষ! 

অবিনাশবাবুর জন্মদিনে সে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। খুব চাপা স্বভাবের লোক তিনি। আজ তিন বছর হল আছেন, কিন্তু কী যে পছন্দ করেন, তা বলা মুশকিল।

সর্বদাই তাঁর মুখ বিমর্ষ, ভ্রূ কুঞ্চিত। কথাবার্তাও বিশেষ বলেন না কারুর সঙ্গে। কাজ করতেন শিপিং কর্পোরেশনে। দুই ছেলে, এক মেয়ে। এক ছেলে থাকে আমেরিকায়, আর একজন বেঙ্গালুরুতে। মেয়ে বিয়ে করে কানাডা-প্রবাসী। প্রথম প্রথম ফোন করত তারা সকলেই, বছর খানেক হল আর বিশেষ ফোন আসে না কারুরই। তবে মাঝে মাঝে টাকা আসে তাঁর অ্যাকাউন্টে। ব্যস‌, দায়িত্ব শেষ! 

Old Age Home
সকালে ঢাউস একটা কেক ডেলিভারি দিয়ে গেল ক্যুরিয়ার সার্ভিস

রতন ভেবেছিল, তাঁর জন্মদিনে এবারে পুডিং করে খাওয়াবে তাঁকে। সেইমতো নির্দেশও দেওয়া ছিল। রান্নার লোকটি বলেছিল, “সে কখনও ওসব করে নি, তবে রান্নার চ্যানেল দেখে বানিয়ে দেবে। কিন্তু তার পুডিং বানানোর আগেই জন্মদিনের দিন সকালে ঢাউস একটা কেক ডেলিভারি দিয়ে গেল ক্যুরিয়ার সার্ভিস। প্রেরকের নাম দেখে জানা গেল, কেয়া তার বাবাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসাবে এই কেকটা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। সঙ্গে একগুচ্ছ সুদৃশ্য রক্তরাঙা গোলাপ। যে অবিনাশবাবুকে কেউ কোনওদিন হাসতে দেখেছে কি না সন্দেহ, এই উপহার পেয়ে তিনি একেবারে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। তাঁর মুখের ভাব বুঝিয়ে দিচ্ছিল, চোখের এই জল দুঃখের নয়, আনন্দের।

কারুর নামে উপহার এলে সবাইয়ের মুখ উদ্ভাসিত হয় না, কেউ কেউ নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে মুখ অন্ধকার করে রাখেন। স্বেচ্ছায় এখানে আসা আনন্দবাবু ও ঋত্বিকবাবুকে বাদ দিলে, উপহার না-আসা বেশিরভাগ সদস্যের মুখ নিজেদের কপালের কথা ভেবে নিভে থাকে সবসময়। তবে মনে মনে তাঁরাও চাতকের মতো প্রতীক্ষা করেন।

আগে তেমন দেখা না গেলেও ইদানীং অনেকেই প্রতীক্ষায় থাকেন। কে জানে, হয়তো ম্যানেজারবাবু ডেকে বলবেন, “বিমলবাবু, সত্যদা আপনাদের বাড়ির লোক তো আপনাদের জন্য পার্সেল করে কী সব পাঠিয়েছে। নিয়ে যান, নিয়ে যান। রুমে গিয়ে খুলে দেখুন কী আছে!”

সবসময়ই কি আর খর রোদ থাকে? আকাশের বুকে দুঃখ জমে জমে মেঘ কি জন্মায় না কখনও? সেই বৃষ্টি তাঁদের দিকেও অকৃপণ দাক্ষিণ্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, এই আশায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করেন। বিকেল হতে না হতেই উঁকিঝুঁকি মারেন ম্যানেজারবাবুর অফিসঘরের দরজার বাইরে। আগে তেমন দেখা না গেলেও ইদানীং অনেকেই প্রতীক্ষায় থাকেন। কে জানে, হয়তো ম্যানেজারবাবু ডেকে বলবেন, “বিমলবাবু, সত্যদা আপনাদের বাড়ির লোক তো আপনাদের জন্য পার্সেল করে কী সব পাঠিয়েছে। নিয়ে যান, নিয়ে যান। রুমে গিয়ে খুলে দেখুন কী আছে!” কিন্তু এখনও বেশিরভাগের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। রতনের মন সে কথা ভেবে বিমর্ষ হয়।

মুখার্জিদার পার্সেলটা আজকেই এসেছে। হালকা, চওড়া একটা প্যাকেট। প্রেরকের নাম অস্পষ্ট। পার্সেলটা হাতে নিয়ে একটু ব্যাকুল হয়ে কিছুক্ষণ আনন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন মুখার্জিদা।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of কিশলয় জানা

কিশলয় জানা

১৯৭৪ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। পিতার কর্মসূত্রে আজীবন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বড় হওয়া। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। নানা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে আপাতত হিলিতে এস.বি.এস গর্ভনমেন্ট কলেজে কর্মরত। গ্রন্থকীট। গল্প লেখার সূত্রপাত মাত্র চার বছর আগে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষার নানা পত্রপত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ ও ওয়েবজিনে লেখালেখি করেছেন। সব ধরনের গল্প লিখতেই স্বচ্ছন্দ। একাধিক সংকলনে লিখেছেন গল্প ও ঔপন্যাসিকা। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন 'ড্রাকুলা-শিবির'। এককভাবে সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, স্মৃতিকথা। বাংলার বাবু সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একক বই 'সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাবু'।
Picture of কিশলয় জানা

কিশলয় জানা

১৯৭৪ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। পিতার কর্মসূত্রে আজীবন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বড় হওয়া। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। নানা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে আপাতত হিলিতে এস.বি.এস গর্ভনমেন্ট কলেজে কর্মরত। গ্রন্থকীট। গল্প লেখার সূত্রপাত মাত্র চার বছর আগে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষার নানা পত্রপত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ ও ওয়েবজিনে লেখালেখি করেছেন। সব ধরনের গল্প লিখতেই স্বচ্ছন্দ। একাধিক সংকলনে লিখেছেন গল্প ও ঔপন্যাসিকা। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন 'ড্রাকুলা-শিবির'। এককভাবে সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, স্মৃতিকথা। বাংলার বাবু সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একক বই 'সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাবু'।

One Response

  1. কিশলয়দা, আপনার “চাতক” গল্পটি পড়ে ভালো লাগল। নীরব বিষণ্ণতার মধ্যে দিয়ে গল্পটি আমাদের মানবিক সত্তাকে স্পর্শ করে। বৃদ্ধাবাস এখানে শুধু ভারাক্রান্ত জায়গা নয়, স্মৃতি আর অপেক্ষার এক নীরব ভাণ্ডার, তবু সেই অপেক্ষার ভেতরেও ছোট্ট আশার আলো জ্বলে।

    খুব সুন্দরভাবে আপনি দেখিয়েছেন, মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে অনেক সময় সম্পর্কের টান কমতে থাকে এবং মানুষ একা হয়ে পড়ে। তবে গল্পটি শুধু কষ্টের কথা বলে না, আমাদের একটু থেমে ভাবতে শেখায় কীভাবে আমরা প্রিয়জনদের আরও কাছে রাখতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল
নীলাঞ্জন দরিপা

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com