(Eli Cohen 20)
অনেক সময় এমন কোনও কোনও মানুষের সঙ্গে কথোপকথন হয়, যা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বুয়েন্স এয়ার্সে সিরীয় দূতাবাসের সান্ধ্য পার্টিতে জেনারেল আমিন অল-হাফেজের সঙ্গে এলি কোহেনের কথাবার্তাও সেই স্তরের।
শুরু হল এলি কোহেন বিংশতিতম পর্ব
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯)
‘জেনারেল, আপনিই সেই নেতা’
‘শুনলাম সিরিয়া এখন গণবিক্ষোভে উত্তাল।’
বুয়েন্স এয়ার্সের সিরীয় দূতাবাসের স্বল্পভাষী সামরিক অ্যাটাসে জেনারেল আমিন অল-হাফেজের দিকে প্রশ্নটা প্রায় ছুঁড়েই দিলেন এলি কোহেন। যেনতেনপ্রকারেণ বাথ পার্টির এই উদীয়মান নেতার সঙ্গে ভাব জমাতেই হবে। কে জানে, হয়তো এই জেনারেলই পরবর্তীকালে দামাস্কাসে তাঁর নেটওয়ার্ক বিস্তারের আদি চাবিকাঠি।

বুয়েন্স এয়ার্সের অভিজাত এলাকা আভেনিদা ভায়ামন্তেতে সিরীয় দূতাবাস। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারির মাসের সেই সান্ধ্য পার্টিতে এলি তো গিয়েইছিলেন জেনারেলের ছলে-বলে-কৌশলে ভাব জমাতে। আর্জেন্টিনার রাজধানীতে পা রাখতেই তাঁকে বলা হয়েছিল শহরের সব প্রভাবশালীর সঙ্গে ভাব জমাতে, যাতে ভবিষ্যতে দরকার পড়লে তা কাজে লাগে। আর এই প্রভাবশালীর তালিকায় পয়লা নম্বর নামটাই জেনারেল আমিন অল-হাফেজের।
পার্টিতে ঢুকে অবধি এলি খেয়াল করলেন, নিজের ডাকা অনুষ্ঠানেই জেনারেল অল-হাফেজ যথাসম্ভব স্বল্পভাষী। মোটামুটি করমর্দন, ঠোঁটের কোনায় হাসি ঝুলিয়ে দু’একটা কথা বলেই কাজ সেরেছেন। অতিথি অভ্যাগত সামলানোর কাজটা মূলত তাঁর স্ত্রী করে চলেছেন। তাঁকেই দেখা যাচ্ছে অতিথিদের সঙ্গে সহাস্যে আড্ডা দিতে।
একটু নিচু স্বরে, অনেকটা স্বগতোক্তির মতো জেনারেলের প্রতিক্রিয়া ভেসে এল, ‘ঠিকই বলেছেন। দেশটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নাসের সিরিয়া দখল করতে চাইছে। আমার ক্ষমতা থাকলে অনেক আগেই ইউনিয়ন ভেঙে দিতাম।’
এলি বুঝলেন, বিদেশে বসে থাকলেও জেনারেল অল-হাফেজের মন পড়ে দামাস্কাসে। তাই অন্য কোনও আলোচনায় তাঁর মন বসছে না। তাই জেনে বুঝেই সিরিয়ার রাজনীতি নিয়ে প্রশ্নটা করলেন এলি।
এবং করেই বুঝলেন, অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ হয়েছে।
একটু নিচু স্বরে, অনেকটা স্বগতোক্তির মতো জেনারেলের প্রতিক্রিয়া ভেসে এল, ‘ঠিকই বলেছেন। দেশটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নাসের সিরিয়া দখল করতে চাইছে। আমার ক্ষমতা থাকলে অনেক আগেই ইউনিয়ন ভেঙে দিতাম।’
এলি বুঝলেন, জেনারেল ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সাল অবধি বছর তিনেক চলা মিশর-সিরিয়া ইউনিয়নের কথা বলছেন। এলি এও জানেন, মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসেরের উপর কেন এই সিরীয় বাথ পার্টির নেতা হাড়ে চটা। কারণ, জেনারেলকে লোক দেখানো পদ দিয়ে দেশছাড়া করার পিছনে গামেলের অঙ্গুলিহেলনই কাজ করছে বলে দামাস্কাসের হাওয়ায় খবর ভাসছে। বাথ পার্টির সন্দেহ, মিশরের সঙ্গে গাঁটছড়া ভাঙার পর নাজিম আলি কুদসির যে সরকার দামাস্কাসের মসনদে বসেছে, তাদের সঙ্গে নাসেরের গোপন বোঝাপড়া আছে, না হলে কুদসি সরকার যেই তখতে বসলেন, অমনি বেছে বেছে বাথ পার্টির নেতাদের বিদেশের দূতাবাসে পাঠানোর ধুম পড়ত না।
আদতে নাসেরের সাধের মিশর-সিরিয়া ভাঙার মূলে রয়েছে বাথ পার্টি সমর্থিত সিরীয় সেনা অফিসারদের সফল অভ্যুত্থান। ১৯৬১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর বাথ পার্টির সমর্থক লেফটেনেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম নাহলাহির নেতৃত্বে, সেনা অফিসারদের বিদ্রোহে তৎকালীন সিরীয় সরকারের পতন ঘটে। মিশর-সিরিয়া ইউনিয়নেরও অবসান হয়। ফলে নাসেরের চক্ষুশূল যে সিরীয় বাথ পার্টি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
জেনারেলের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে নিচুস্বরে এলি বললেন, ‘আমজনতা এও জানে, আপনিই হলেন বাথ পার্টির সেই নেতা যে, এই অরাজকতার হাত থেকে দেশকে বার করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’
জেনারেল আমিন অল-হাফেজের স্বগতোক্তি কিন্তু তখনও থামেনি।
‘এখনকার অ্যাসেলম্বলির সব আপাদমস্তক চোর। সব ক’টা ঘুষখোর। নাসেরকে তাড়ালে কী হবে, এগুলো রয়ে গিয়েছে তো। নাসেরের যত বাজে বুকনিই এদের মাথাটা খেয়েছে। এগুলোকে ঝাড়ে-বংশে নিকেশ না করলে কিছুই হবে না।’
এলি বুঝলেন, জেনারেল আমিন অল-হাফেজের বড় ক্ষতের জায়গায় হাত পড়েছে। তাই তিনি মুখ খুলছেন। এলি এই সুযোগ ছাড়তে নারাজ। জেনারেলকে আরও উত্তেজিত করার জন্য বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না জেনারেল। আমজনতা কিন্তু জানে মিশরের সঙ্গে ইউনিয়নের ব্যাপারে বাথ পার্টিই সোচ্চার হয়েছিল।’

কথাটা শুনে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ সোজা তাকালেন কোহেনের দিকে। ঈষৎ বিস্ময় ও সতর্কতা মেশানো সেই চাহনি।
এই রকম খাদের ধারে এলি বারবার পড়েছেন, এবং প্রতিবারই তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এবারও দিল।
জেনারেলের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে নিচুস্বরে এলি বললেন, ‘আমজনতা এও জানে, আপনিই হলেন বাথ পার্টির সেই নেতা যে, এই অরাজকতার হাত থেকে দেশকে বার করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’
এলির কথার পর পাক্কা পাঁচ সেকেন্ড দু’জনেই চুপ। এলি যখন প্রমাদ গুনছেন যে আগ বাড়িয়ে বেশি বলা হয়ে গেল না তো, তখন স্তম্ভিত হয়ে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ ভাবছেন, আমজনতা তাহলে সত্যিই তাঁর নাম জানে, সত্যিই তাঁকে নেতা হিসাবে দেখতে চায়? সামনের সদ্যপরিচিত যুবকটিকে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ সেদিন সেই মুহূর্ত থেকে বিশ্বাস করে ফেললেন (বছর চারেক বাদে এলিকে যখন দামাস্কাসে সিরীয় পুলিশ চরবৃত্তির দায়ে ধরে ফেলল, তখনও বিস্মিত জেনারেল, সেই সময় অবশ্য সিরীয় প্রেসিডেন্ট, বলেছেন যে এলিকে তিনি ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতেন)।
ঘরে ঢুকেই চোখ পড়ল বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল। টেবিলের একপাশে কিছু কাগজপত্র আর একটা কালো চামড়ার ব্যাগ। রয়েছে টেলিফোন। টেবিলের অন্য পাশে দুই সহাস্য কিশোর-কিশোরীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। বোঝাই যাচ্ছে এরা জেনারেলের সন্তান।
নীরবতা ভেঙে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ বললেন, ‘চলুন আমার ঘরে। ভাল করে আড্ডা দেওয়া যাবে।’
এলির ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। দূতাবাসে দাঁড়িয়ে সরকারবিরোধী কথা বলায় জেনারেল তো তাঁকে গ্রেফতারও করতে পারতেন। তা তো করলেনই না, বরং সাদরে নিজের ঘরে যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানালেন।
অর্থাৎ, এখনও পর্যন্ত ঠিকঠাক তাস খেলেছেন এলি। কেন মনে হচ্ছে, এই জেনারেলই দামাস্কারের উচ্চকোটি মহলের চাবি হতে পারেন।
আমার বন্ধু বলে…
দূতাবাসের তিনতলায় জেনারেল আমিন অল-হাফেজের সুসজ্জিত অফিস। সুবিশাল ঘরটায় ঢুকেই এলির তাক লেগে গেল।
ঘরে ঢুকেই চোখ পড়ল বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল। টেবিলের একপাশে কিছু কাগজপত্র আর একটা কালো চামড়ার ব্যাগ। রয়েছে টেলিফোন। টেবিলের অন্য পাশে দুই সহাস্য কিশোর-কিশোরীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। বোঝাই যাচ্ছে এরা জেনারেলের সন্তান। টেবিলের পাশে ঘরের এক কোনায় রয়েছে সেফ। এলি নিশ্চিত, ওই কম্বিনেশন লক করা সেফেই অতি গোপনীয় কাগজপত্র থাকে।
টেবিলের উল্টোদিকে গোটা দুই চেয়ার। তার একটা টেনে নিয়ে বসে পড়লেন এলি। তখনই নজরে পড়ল, ঘরের আরেক কোনায় ক্যাকটাস রয়েছে। রয়েছে সোফাও।
এলি বুঝলেন জেনারেল সহজ হচ্ছেন। তবে এক্ষুনি তাঁর সঙ্গে মদ খেতে বসা বোধহয় ঠিক হবে না। তাই বললেন, ‘না না। ধন্যবাদ। তবে আমি মদ খাই না।’
এলি যখন ঘর দেখতে মনোযোগী, জেনারেল ততক্ষণে ড্রয়ার টেনে খুলে দামি স্কচের বোতল আর দুটো গ্লাস বার করে ফেলেছেন।
এলির চোখে প্রশ্নের ঘনঘটা দেখে সাত তাড়াতাড়ি জেনারেল বললেন, ‘কামেল ডিয়ার, জানি না তুমি জান কি না। আমি কিন্তু ঠিক মুসলিম নই। আমি আলাউই। আমাদের ধর্মে পান করা গুনাহ নয়। তোমার জন্য পেগ বানাব?’
এলি বুঝলেন জেনারেল সহজ হচ্ছেন। তবে এক্ষুনি তাঁর সঙ্গে মদ খেতে বসা বোধহয় ঠিক হবে না। তাই বললেন, ‘না না। ধন্যবাদ। তবে আমি মদ খাই না।’
‘ঠিক আছে। টু বাথ।’ বলে গ্লাস উঁচু করলেন জেনারেল।

‘টু ফ্রি সিরিয়া। জেনারেল, আমি যদি খুব ভুল না করি, তাহলে আলাউই জনগোষ্ঠী সিরিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন। দ্রুজ আর মুসলিমদের আগে।’
জেনারেলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এলির কথা শুনে।
‘ঠিকই বলেছ। আলাউইদের ইতিহাস অতি প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার সালের প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগ থেকে এই জনগোষ্ঠীর খোঁজ মেলে। তারপর হাজার হাজার বছর হত্যা, নিপীড়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা, হাল ছাড়িনি। তবে ফরাসি আমলে সত্যি বলতে কি শান্তিতে ছিলাম।’
এলি মদ খাওয়ার ইস্যু থেকে অত সহজে নড়তে নারাজ। বললেন, ‘আপনাদের ধর্মে তাহলে মদ খাওয়া গুনাহ নয়?’
‘কেমন একটা বামপন্থী বামপন্থী লাগছে না কথাগুলো?’ জেনারেলকে আরও খোঁচানোর জন্যই কথাটা বললেন এলি। দেখা যাক, কূটনীতির আড়ালে থাকা আসল জেনারেল আমিন অল-হাফেজ বেরিয়ে আসে কি না।
‘দেখো একটা সত্যি কথা বলি। ধর্ম ব্যাপারটা এমনিতেই বেশ প্যাঁচালো। তার উপর আমাদের ধর্ম আর এক কাঠি সরেস। কী করা যায় আর কী করা যায় না- এসব কয়েকজন অতিবৃদ্ধ ছাড়া কেউ জানেও না, জানতেও চায় না। সত্যি বলতে কি ইয়াং জেনারেশন এসব নিয়ে আর ভাবেও না। আমিও একই পথের পথিক। অতশত ভাবি না।’
এলি শেষ চেষ্টা করল, ‘তাহলে এটা কোরানের শিক্ষার পরিপন্থী হচ্ছে না?’
এলির চোখে চোখ রেখে জেনারেল বললেন, ‘একটা জিনিস পরিষ্কার হওয়া ভাল। ধর্ম একদিকে। রাষ্ট্র আরেক দিকে। আমরা, বাথ পার্টির সদস্যরা সবাই ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্ম, জাতির ভেদাভেদ ভুলে আমরা সমগ্র আরব জাতিকে এক করতে চাই। আমরা চাই প্রগতি, আর তা করতে গেলে সংস্কার প্রয়োজন।’
‘কেমন একটা বামপন্থী বামপন্থী লাগছে না কথাগুলো?’ জেনারেলকে আরও খোঁচানোর জন্যই কথাটা বললেন এলি। দেখা যাক, কূটনীতির আড়ালে থাকা আসল জেনারেল আমিন অল-হাফেজ বেরিয়ে আসে কি না।
এলির কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড জেনারেল নিশ্চুপ। বোঝাই যাচ্ছে, গুছিয়ে উত্তর দেওয়ার জন্য সময় নিচ্ছেন।
‘বামপন্থী শোনাচ্ছে আমার কথা? দোস্ত, বামপন্থাটা ঠিক কী? সবার জন্য সাম্যবাদ ঠিকই, কিন্তু মার্ক্সের এই রাজনৈতিক তত্ত্বে বড়সড় গলদ রয়েছে। এই তত্ত্বে কোনও দেশ নেই, কোনও মানবিক অনুভূতি নেই। কোনও জাতীয়তাবাদ নেই। বাথ পার্টির মূলমন্ত্র হল সাম্যবাদ ও মনুষ্যত্ব। আরব দেশ হল এক বিশাল পরিবার। আর বাথ এই মতবাদকেই ধারণ করে। তাই সাম্যবাদ ও রাষ্ট্রবাদকে ধারণ করে বাথ। মার্ক্সীয় তত্ত্বে ব্যক্তির না আছে মালিকানা, না আছে মূল্য। কিন্তু বাথ পার্টি ব্যক্তিসত্ত্বাকে গুরুত্ব দেয়। তাকে তার যোগ্যতা, মেধা অনুসারে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়।’
এই তো দোস্ত, গোড়ায় গলদ করলে। পার্টি আজকের নাকি? সেই ১৯৪২ সালে মাইকেল আফলেক স্কুল শিক্ষকতা ছেড়ে তিলে তিলে পার্টি তৈরি করেন।
বাথ পার্টির ঠিকুজি কুষ্টি এলির জানা। এও জানা, আড়ালে আরামে আয়েসে বসে বড় বড় তত্ত্বকথা আওড়ালেই বিপ্লব হয় না। মুখে যতই আরব জাতীয়তাবাদের সমর্থন করুক বাথ পার্টি, প্রথমে যতই মিশর-সিরিয়া ইউনিয়ন সমর্থন করুক, যেই নাসেরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হল, তখনই তারা ইউনিয়নের বিরোধী হয়ে গেল। আর এর কারণটাও জলের মতো স্পষ্ট। বাথ পার্টি ভেবেছিল মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসেরের দু’দেশের ইউনিয়নের প্রস্তাবকে সমর্থন করলে তারাই সিরিয়ার চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
কিন্তু ইউনিয়নের পরে ফল উল্টো হল। নাসের দামাস্কাসের সব ক্ষমতাই কেড়ে নিতে শুরু করলেন। যেই বাথ পার্টি প্রতিবাদ করল, অমনি রাষ্ট্রশক্তির অত্যাচার নেমে এল তাদের উপর। ফলে বাথ পার্টির বহু নেতা-কর্মী হয় সিরিয়া ছেড়ে পালালেন, নয় আত্মগোপন করলেন। মুখে যতই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের বাণী আওড়ানো হোক না কেন, নাসেরের হাত থেকে মুক্তি কিন্তু আসল বাথ পার্টির সমর্থক সেনা অভ্যুত্থানে।

অবশ্য এসব কথা বলে জেনারেলের সঙ্গে অযথা তর্ক-বিতর্কে জড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা এলির নেই। কারণ ফৌজির সঙ্গে ভাব করাই মূল উদ্দেশ্য তাঁর। তার জন্যই তো ধোপদুরস্ত হয়ে এই পার্টিতে আসা। কোনও অবস্থাতেই জেনারেলের বিরাগভাজন হওয়া চলবে না।
অল্পস্বল্প তর্ক যদিও চলতে পারে। বিশেষ করে জেনারেলও যখন অনেকদিন পর মন খুলে রাজনৈতিক আড্ডার মেজাজে রয়েছেন।
‘জেনারেল, বাথ পার্টি তো বলে বেড়াচ্ছে তারা ক্ষমতায় এল বলে। কিন্তু আপনাদের লোকজন কই? এই ক’টা হাতে গোনা লোক নিয়ে কি ক্ষমতায় আসা যায়?’
ব্যস আর দেখতে হল না। একেবারে বুল’স আই হিট যাকে বলে।
হাতের গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ বললেন, ‘এই তো দোস্ত, গোড়ায় গলদ করলে। পার্টি আজকের নাকি? সেই ১৯৪২ সালে মাইকেল আফলেক স্কুল শিক্ষকতা ছেড়ে তিলে তিলে পার্টি তৈরি করেন। ১৯৪৭ সালে যখন ফরাসিরা দেশ ছেড়ে চলে যায়, তখন দেশে পার্টির সদস্য সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে।’
তেরোটা বছর কেটে গিয়েছে ১৯৪৮ সালের সেই ভোটের পর। দামাস্কাসের বরদা নদী দিয়ে লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল বয়ে গিয়েছে। পার্টিও এখন আর আগের মতো নেই। মোট আটটা শাখায় হাজার পঞ্চাশেক সদস্য। ইচ্ছা করলেই আমরা সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারি। বহু লোক উন্মুখ সদস্য হওয়ার জন্য।
এলি অত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়।
‘তাহলে ১৯৪৮ এর ভোটে ওরকম গোহারা হারলেন কেন?’
জেনারেলও দমবার পাত্র নন।
‘কারণ ছিল দোস্ত। মাইকেল আফলক সুন্দরভাবে পরিস্থিতির যথার্থ ব্যাখা করেছেন। আরব দুনিয়া তো শতধাবিভক্ত। আর সিরিয়া সেই দুনিয়ারই অংশ। ফলে এখানেও সতত হানাহানি, অত্যাচার, অবিচার, বৈষম্য চলছে। এরা এখনও নতুনকে গ্রহণ করার মতো মানসিক স্থিতিতে আসেনি। ভোট তারই প্রতিফলন মাত্র। আসলে বাথ তো এই উত্তরণটাই চাইছে।’
‘এখন কী অবস্থা? সেটা ছিল ১৯৪৮, আর এখন এটা ১৯৬১ সাল। পাক্কা ১৩ বছর পার।’
জেনারেলের ঠোঁটে একটা তৃপ্তির হাসি দেখা দিল।
‘ঠিকই বলেছ। তেরোটা বছর কেটে গিয়েছে ১৯৪৮ সালের সেই ভোটের পর। দামাস্কাসের বরদা নদী দিয়ে লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল বয়ে গিয়েছে। পার্টিও এখন আর আগের মতো নেই। মোট আটটা শাখায় হাজার পঞ্চাশেক সদস্য। ইচ্ছা করলেই আমরা সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারি। বহু লোক উন্মুখ সদস্য হওয়ার জন্য। কিন্তু পার্টি এখন বেছে বেছে সদস্য করে। সদস্য হব বললেই সদস্য হওয়া যায় না। সে সব দিন চলে গিয়েছে। তাছাড়া পার্টির শত্রুও তো কম নেই। সদস্যের মুখোশে শত্রুর চর যেন ঢুকে না পড়ে, সে দিকটাও তো দেখতে হবে।’
এলির আবেগঘন কথায় বিশেষ চিঁড়ে ভিজল বলে মনে হল না। জেনারেল আমিন অল-হাফেজ একটু চুপ থেকে বললেন, ‘আজকাল সদস্যপদ পেতে হলে কমপক্ষে দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়।’
সিগারেটের প্যাকেট খুলে সিগারেট ধরালেন এলি। জেনারেলকেও দিলেন। তারপর ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন, ‘তা জেনারেল, পার্টির সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা কীরকম?’
‘কেন তুমি কি দেশে ফিরতে চাও?’
‘মাঝে মাঝে স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন মন চায় ফের জন্মস্থান দেখতে, যে মহল্লায় বড় হলাম সেখানে যেতে, যে রাস্তায় খেলতাম সেখানে যেতে।’

এলির আবেগঘন কথায় বিশেষ চিঁড়ে ভিজল বলে মনে হল না। জেনারেল আমিন অল-হাফেজ একটু চুপ থেকে বললেন, ‘আজকাল সদস্যপদ পেতে হলে কমপক্ষে দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়।’
তারপর এলির দিকে চেয়ে মৃদু হেসে জেনারেল আমিন অল-হাফেজ বললেন, ‘অবশ্য আমার বন্ধু বলে ওই দু’বছরের সময়টা নাও লাগতে পারে।’
এলি কোহেনের ডান হাত করমর্দনের জন্য এগোল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ জেনারেল। আবার দেখা হবে।’
‘কামেল, মনে রাখব তোমাকে।’
এলি বুঝলেন, বাথ পার্টির দরজা খুলে গেল। দামাস্কাস নেটওয়ার্ক তৈরির প্রথম ধাপ সম্পন্ন হল।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস-ইজরায়েল- আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে-এলি কোহেন- দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
(৫) পিটার ম্যান্সফিল্ড, নিকোলাস পেলহাম- আ হিস্টরি অফ দ্য মিডল ইস্ট
(৬) মাইকেল বার- যোহার, নিসিম মিশাল-মোসাদ
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত