Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

জলকে চল ঊনবিংশ পর্ব

Jolke Chol 19
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Jolke Chol 19)

দোতলা বাড়ির, একতলাটায় নিজের মতো কাটাতে ভালবাসে রূপাঞ্জন। পুরো তলাটাকে হঠাৎ দেখলে যে কেউ লাইব্রেরি বলে ভুল করবে। নিচ থেকে ঘরের সিলিং অবধি কাঠের তাক। আর তাতে সারি সারি সাহিত্যের ভাণ্ডার। হেন কোনও বিষয় নেই, যার ওপর সংগ্রহের বই এখানে পাওয়া যাবে না। সে অর্থে বিশ্ব সাহিত্যের যত বাংলা বই, সবই তার নখ দর্পণে। অবশ্য তার নিজের আগ্রহের বিষয় মেয়েদের মানে লেখিকাদের, সিনেমা ও নাট্যব্যক্তিত্বদের উপর লেখা। এই ফিল্ম, নাটক তার মনোজগতের একটা বড় অংশ জুড়ে।

প্রতিটি তাকের বই দু’ভাবেই সাজানো। কোনও লেখকলেখিকার নাম দিয়ে, এবং বিষয় দিয়ে। যাতে যখন যেটার প্রয়োজন হবে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা হাতের সামনে পেতে পারে। সে যদি নিজে নাও থাকে, অন্য কেউও চট করে খুঁজে পেয়ে যাবে তার চাহিদার বই।

আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮)

স্নানখাওয়া আর বাথরুম ছাড়া অধিকাংশ সময় এই ঘরটাতে কাটাতেই সে ভালবাসে। নিজের হাতেই নিয়ম করে পরিস্কার করে, ধুলো ঝাড়ে, যেন এগুলো তার আত্মারই একটা অংশ। তারপর মায়া ভরা হাতে তুলে নেয় সেই মুহূর্তে পড়তে ইচ্ছে করা বইটা।

তার এই বই নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা আসক্তি মিতুলের বিরক্তির কারণ। এটাও বোঝে, সিনেমা থিয়েটার নিয়ে তার পাগলামিকেও খুব ভালভাবে মেনে নিতে পারেনি মিতুল। এই নিয়ে তার ওপর রাগ করে না রূপাঞ্জন। প্রত্যেক স্ত্রী চায়, তার স্বামী সংসারের খুঁটিনাটি দেখুক, ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমাক। বছরে দু’বার বেড়ানো, সন্তানের উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করে তার জীবন সুনিশ্চিত করে তুলুক।

Jolke Chol 19
একতলাটায় নিজের মতো কাটাতে ভালবাসে রূপাঞ্জন

কিন্তু রূপের এই বিষয়গুলো কখনও সেভাবে গুছিয়ে করার, যাকে বলে, নিখুঁতভাবে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী জীবনকে চালানোর কথা মনে হয়নি। মিতুল যখন তাকে বলেছে— শুনছ, আজ আটা ফুরিয়ে গেছে, চাল বাড়ন্ত, ফেরার পথে নিয়ে এস— সে গেছে বাজারে। গিয়ে ভুলে গেছে কী আনতে বলেছিল মিতুল। আটার বদলে ডাল, চালের বদলে তেল নিয়ে এসেছে। আর তার সঙ্গে এনেছে সামনের কোনও কিয়স্কে রাখা ম্যাগাজিন। এই ম্যাগাজিন থেকে সে খুঁজে নিতে চেয়েছে নতুন কোনও লেখকলেখিকাকে। এটাই যেন তার নিজের কাছে এক আবিষ্কার।

আবার হয়তো মিতুল বলেছে— আজ তাড়াতাড়ি ফিরো, ছেলেকে নিয়ে নিউ মার্কেট যাব। আচ্ছা থাক, তুমি বরং সোজা অফিস থেকে বেড়িয়ে ছটার সময় মেট্রোর সামনে দাঁড়িও… সে ভুলে চলে গেছে রবীন্দ্র সদন। সেদিন হয়তো নাটক ‘টিনের তরোয়াল’।

বিশাল আলিঙ্গন উন্মুক্ত করিয়া জনগণের গভীরে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। যাহারা সৃষ্টিছাড়া, বেপরোয়া, বাঁধনহারা। যাহারা মাতাল, উদ্দাম, সৃষ্টির নেশায় উন্মাদ। যাহাদের মদ্যসিক্ত অঙ্গুলিস্পর্শে ছিল বিশ্বকর্মার জাদু। যাহাদের উল্লসিত প্রতিভায় সৃষ্টি হইল বাঙ্গালীর নাট্যশালা, জাতির দর্পণ, বিদ্রোহের মুখপত্র।

নাটকের শুরুতেই নেপথ্য থেকে ভেসে আসছে উৎপল দত্তের কন্ঠস্বর— ‘বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবার্ষিকীতে প্রণাম করি সেই আশ্চর্য মানুষগুলিকে— যাহারা কুষ্ঠগ্রস্থ সমাজের কোন নিয়ম মানেন নাই, সমাজও যাহাদের দিয়াছিল অপমান ও লাঞ্ছনা। যাহারা মুৎসুদ্দীদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকিয়াও ধনীদের মুখোশ টানিয়া খুলিয়া দিতে ছাড়েন নাই। যাহারা পশুশক্তির ব্যাদিত মুখগহবরের সম্মুখে টিনের তলোয়ার নাড়িয়া পরাধীন জাতির হৃদয়বেদনাকে দিয়াছিল বিদ্রোহ-মূর্তি। যাহারা বহু বাচষ্পতি-শিরোমণি, বহু রাজা মহারাজার শত পদাঘাতে জর্জরিত, যাহারা অপাংক্তেয় ছোটলোকের আশীর্বাদধন্য, যাহারা ভালবাসার বিশাল আলিঙ্গন উন্মুক্ত করিয়া জনগণের গভীরে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। যাহারা সৃষ্টিছাড়া, বেপরোয়া, বাঁধনহারা। যাহারা মাতাল, উদ্দাম, সৃষ্টির নেশায় উন্মাদ। যাহাদের মদ্যসিক্ত অঙ্গুলিস্পর্শে ছিল বিশ্বকর্মার জাদু। যাহাদের উল্লসিত প্রতিভায় সৃষ্টি হইল বাঙ্গালীর নাট্যশালা, জাতির দর্পণ, বিদ্রোহের মুখপত্র। যাহারা আমাদের শৈলেন্দ্রসদৃশ পূর্বসূরী।’

Jolke Chol 19
বই নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা আসক্তি মিতুলের বিরক্তির কারণ

নাটকের শুরুতে কাশ্মীরের যুবরাজকে নিয়ে রচিত ‘ময়ূরবাহন’ নাটকের পোস্টার দেখে মেথরের প্রশ্ন— ‘এত  নেকাপড়া করে টিনের তলোয়ার পরে ছেলেমানুষী কর কেন?’ আর নাটকের শেষে এই টিনের তলোয়ার‌ই হয়ে ওঠে বিদ্রোহের প্রতীক।

এই নিয়ে প্রবল ঝড় উঠেছে দাম্পত্যজীবনের প্রথম কয়েক দশক জুড়ে। একদিকে নাটক, অন্য দিকে অভিনয়। দুই নিয়ে মেতে থাকা আত্মভোলা এক মানুষ, দু’চোখে একটাই স্বপ্ন। অভিনেতা হওয়া। বাকি পৃথিবীর কোনও স্বরই তাকে প্রভাবিত করত না। অতঃপর দু’জনেই কীভাবে যেন বুঝে গেল, এভাবেই পরস্পরকে মানিয়ে গুছিয়ে চলতে হবে। আসলে সে কখনওই লাভ ক্ষতি ক্যালকুলেশন করে চলতে পারেনি। আর, পারেনি বলেই নিজেকে ব্যর্থ মানুষ বলে মনে হয়।

এই নিয়ে মোহনার সঙ্গে তার কথা হয়। সেই কথাগুলোই হয়, যেগুলো মিতুল কোনওদিন শুনতে চায়নি। কিংবা সে-ও বুঝিয়ে বলতে পারেনি। হয়তো সফল মানুষ হলে সে বুক ফুলিয়ে বলত, মিতুল শুনত।

সে তুমি নিজেকে চেনাতে চাওনি দীর্ঘ সময় ধরে। অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থেকেছ। অফিস, নাটকের দল, বইয়ের ভুবন তোমাকে বেশি টেনেছে, তাই ধীরে ধীরে বড় পর্দা, ছোট পর্দা থেকে সরে গেছ।

অবশ্য মোহনা বলে— সফল অসফল শব্দগুলো কেমন বল তো! এর কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তুমি পর্দায়, থিয়েটারে, কাগজে যাদের কথা শুনে, পড়ে মুগ্ধ হচ্ছ; ভাবছ, আমি কেন ওখানে পৌঁছাতে পারলাম না; সেই একই মানুষকে হয়তো তার পরিবার মনে করে চরম ব্যর্থ। একটা জিনিস মনে রাখবে, মানুষ কিন্তু সময়ের স্রোতে যত বড় শিল্পীই হোক না কেন, তাকে ভুলে যাবে। হয়তো কোনও বিশেষ কারণে তার চর্চা হবে,  সেটাও সাময়িক। কিন্তু মানুষ থেকে যাবে তার পরিবারের কাছে চিরস্থায়ী হয়ে।

– কিন্তু আমি তো অন্যভাবে নিজেকে দেখতে চেয়েছি সবসময়। পর্দায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী মারাত্মক পরিশ্রম করেছি, তুমি ভাবতেও পারবে না। সেই কোন ভোরে বসিরহাট থেকে ট্রেন ধরে স্টুডিও, সারাদিন কাজের জন্য পরিচালকদের ঘরে ঘরে ঘোরা। সেখানে আমি কোনও ফাঁকি দিইনি।

– দাওনি বলেই অনেকগুলো ছবিতে কাজ করেছ, জনপ্রিয় হয়েছ, বাংলা মেগা সিরিয়ালের মুখ্য চরিত্র হয়েছ। মোহনা বলেছে।

Jolke Chol 19
সেদিন হয়তো নাটক ‘টিনের তরোয়াল’

– কিন্তু সেগুলো সব অতীত হয়ে গেছে। এখন আর কেউ আমাকে চেনে না মোহনা। 

– সে তুমি নিজেকে চেনাতে চাওনি দীর্ঘ সময় ধরে। অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থেকেছ। অফিস, নাটকের দল, বইয়ের ভুবন তোমাকে বেশি টেনেছে, তাই ধীরে ধীরে বড় পর্দা, ছোট পর্দা থেকে সরে গেছ।

– আমি আবার ফিরতে চাই সেখানে।

– সত্যি কি চাও?

– তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা?

তুমি জানো না, কত বড় বড় পরিচালক আমাকে বলেছেন— তুমি অভিনয়কে অন্য স্তরে নিয়ে যাও। তুমি হয়তো ভাববে বাড়িয়ে বলছি। আমি সেই সময়ের অনেক নাম করা হিরোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছি।

– বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা আসছে কোথা থেকে! আমি বলছি, যদি পর্দাই তোমার প্রথম প্রেম ছিল, তবে এতদিন কেন সেখানেই থাকলে না? তুমি আমাকে যখনই ফোন করো, কোনও না কোনও সাহিত্যর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনী, তাদের লেখা, এসব নিয়ে বেশি বল। সেখানে তুমি কতটুকু নাট্য মঞ্চ, সিনেমা হলের স্ক্রিন নিয়ে কথা বল? আসলে দীর্ঘদিন ধরে বই নিয়ে নাড়া-ঘাঁটা করতে করতে তুমি নিজেই কখন ওই ক্যামেরা, রোল অন, অ্যাকশন থেকে দূরে চলে গেছ, টের পাওনি।

– পেয়েছি, পেয়েছি, প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছি। অভিনয় আমার রক্তের ধারার মধ্যে অবিরাম ঝঙ্কার তোলে। সেই তিন চার বছর বয়স থেকে মঞ্চ, লাইট, সাউন্ড এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছিলাম। তখন বুঝতামও না ঠিক করে কী করছি। যা শিখিয়ে দিতেন, যেভাবে করতে বলতেন বড়রা সেভাবেই করতাম। তারপর একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম অভিনয় ছাড়া আমার কোনও অস্তিত্ব নেই। দিন রাত গলার নানা মডিলিউশন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখের অভিব্যক্তি অনুশীলন— কী না করেছি! তুমি জানো না, কত বড় বড় পরিচালক আমাকে বলেছেন— তুমি অভিনয়কে অন্য স্তরে নিয়ে যাও। তুমি হয়তো ভাববে বাড়িয়ে বলছি। আমি সেই সময়ের অনেক নাম করা হিরোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছি। হয়তো খুব বড় রোল নয়, আবার দেখলাম অনেক বড় রোল করলাম, কিন্তু মূল ছবিতে সেটা ছোট করে দেওয়া হল…।


আরও পড়ুন: রবিঠাকুর যেভাবে জাগেন


– সেটাই তো বলছি, যতদিন এটা তোমার ধ্যানজ্ঞান ছিল, ততদিন তুমি পাচ্ছিলে তো কাজ। আমি তো দেখেছি তোমার অভিনয়, তুমি তো আমাকে বলনি, আমাকে রাই দেখিয়েছিল প্রথম জি বাংলায়। তোমার কোর্টের গাউন পরা দৃশ্য, আর অভিনয় দেখেই সে চিৎকার করে ডেকেছিল আমায়।— মা রূপাঞ্জন আঙ্কেলকে সিনেমাতে দেখাচ্ছে। তার কত পরে তুমি আমাকে তোমার অভিনীত নাটক দেখিয়েছ। তাই বলছি মন খারাপ করো না।

– আমি একবার নিজেকে প্রুফ করতে চাই মোহনা। রূপাঞ্জনের গলায় একসঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও দ্বিধা দুটোই টের পায় মোহনা।

সেটা লক্ষ করে মোহনা বলে— করবে। লেগে থাকো, হবে। কত শিল্পী তো যৌবনে সাফল্যই পাইনি। বয়সকালে গিয়ে তাঁরা সফল। তুমি পরান বন্দোপাধ্যায়কে দেখ। অল্প বয়সে কোথায় তাঁর ছবি? আর এখন? যেখানেই ভিন্ন মাত্রিক অভিনয়, সেখানেই উনি। কাজেই মন খারাপ না করে পজেটিভ ভাবো। সব হবে।

আমার ধারণা তোমাদের পুরোনো সংখ্যায় প্রায় সকলের লেখাই পাবে, চন্দ্রাবতী বা তাঁদের সমসাময়িকদেরগুলো পাবে না। সেগুলো নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমার সংগ্রহে আছে।

– তোমার সঙ্গে কথা বললে ভরসা পাই। বাড়ির সাবাই তো আমাকে বাতিলের দলে ফেলে দিয়েছে।

– এটা ঠিক বললে না। তুমি যখন আবার নিয়মিত পর্দায় আসবে, দেখো এঁরাই সবচেয়ে আনন্দ পাবেন।

– বলছ?

– হ্যাঁ।

মোহনার কথাগুলো যে ভেতর থেকে বলা, নিছক সান্তনা বাক্য নয়, সেটা রূপ বোঝে। 

Jolke Chol 19
মোহনার কথাগুলো যে ভেতর থেকে বলা, নিছক সান্তনা বাক্য নয়, সেটা রূপ বোঝে

– শোনো, তুমি নারীদের লেখা নিয়ে একটা সংখ্যা করো। চন্দ্রাবতী দেবী থেকে শুরু করে এখনকার যদি নাও হয়, এই ষাটের দশক অবধি লেখিকাদের নিয়ে। আর সংখ্যা যদি না করতে চাও, একটা বই করো প্রকাশনা থেকে। আমার ধারণা তোমাদের পুরোনো সংখ্যায় প্রায় সকলের লেখাই পাবে, চন্দ্রাবতী বা তাঁদের সমসাময়িকদেরগুলো পাবে না। সেগুলো নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমার সংগ্রহে আছে।

মোহনা হেসে ফেলল। দেখলে তুমি সেই সাহিত্যে চলে এলে। এখন এটাই তোমার মাথায় সব সময় ঘোরে।

রূপাঞ্জন বিব্রত স্বরে বলে— আরে না। আমার বইপত্র ঘাঁটতে গিয়ে মনে হল, বলে দিলাম। 

বিবেকানন্দ বলেছিলেন— জন্মেছিস যখন একটা দাগ রেখে যা। এটাও খুব ভাবায়। আসলে এমন অনেক কিছুই ভাবায়, যা ভাবতে চাই না। যেমন আমি খুব বেশি আসক্ত নই সংসার— জীবন নিয়ে।

– বাবা, উপরে এসো। মা ডাকছে।

ছেলের কথায় সম্বিত ফিরে পেল রূপাঞ্জন। নাহ! তার হাতে মোবাইল নেই। তার মানে এতক্ষণ এইসব কথাগুলো ভাবছিলাম। ভেবে উত্তর দিল, হ্যাঁ যাচ্ছি।

ওপরে উঠে চার্জে লাগানো মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, মোহনার মিসড কল। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ-

এ জীবন লইয়া কী করিব!

এ প্রশ্ন বহু বছর আগে একজন করেছিলেন। আমাকে এই প্রশ্নটা মাঝে মাঝেই খুব আলোড়িত করে।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন— জন্মেছিস যখন একটা দাগ রেখে যা। এটাও খুব ভাবায়। আসলে এমন অনেক কিছুই ভাবায়, যা ভাবতে চাই না। যেমন আমি খুব বেশি আসক্ত নই সংসার— জীবন নিয়ে। তবু সেই যে ২৫ বছর ধরে সংসার সংসার খেলা খেলছি, সে খেলা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাই না।

আবার ধরা যাক, প্রাচীনকাল থেকে সবাই প্রায় বলে এসেছেন, মানুষ বেঁচে থাকে তার সন্তানসন্ততির জন্য। সেই চিরন্তন পঙক্তি— আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। সব মানুষই হয়তো সন্তানের জন্য এমনই ভাবেন। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বয়স হয়ে যাওয়ার পর সন্তান কী ভাবে? সে হয়তো ভাবে, বাবা মা তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। হতেই পারে তার ভাবনা সঠিক। আবার মা বাবা যেটা ভাবছেন, সেটাও হয়তো তাদের দিক থেকে ঠিক।

আসলে এই সবই বোধহয় আসক্তি। জীবনের প্রতি, নিজের প্রতি, অন্য কারওর প্রতি।

আসক্তি মানুষের কীসে আসে! সংসার ছাড়া নিজের খ্যাতি, কাজের জগৎ, যারা সৃষ্টিশীল মানুষ, তাদের সৃষ্টির প্রতি আসক্তি জন্মায় হয়তো। আমার আবার এখানেও একটা অদ্ভুত নির্লিপ্তি কাজ করে।

আমার আবার দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললে মনে হয়, কেন বলছি? যাকে বলছি, সে কি একইভাবে বলতে চাইছে? নাকি আমি বলছি বলে সে বলছে বা উত্তর দিচ্ছে? হয়তো শুরুতে অনেক কথা হল, তারপর সেখানে ক্রমশ একঘেয়েমি। আমি হয়তো চাইছি, সে চাইছে না। কিংবা সে চাইছে আমি চাইছি না। এই আমিটা কে?

Jolke Chol 19
মোহনার মিসড কল, একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ

‘ঘরে কুরুক্ষেত্র বাইরে কুরুক্ষেত্র
কুরুক্ষেত্র মনে
অর্জুন কিছু বলছেন
কৃষ্ণ কি তা শোনেন?
বাইরে কুরুক্ষেত্র ঘরে কুরুক্ষেত্র
কুরুক্ষেত্র মনে
কৃষ্ণ কিছু বলেন
অর্জুন কি তা শোনেন?’

বাবার মুখে শোনা এই লেখাটাও ভাবি। এত কথা কে শোনে! যাকে বলা হচ্ছে সে কেন শুনবে, আমিই বা কেন শুনব?

আবার মাঝে মাঝে মনে হয়— আসক্তি মানুষের কীসে আসে! সংসার ছাড়া নিজের খ্যাতি, কাজের জগৎ, যারা সৃষ্টিশীল মানুষ, তাদের সৃষ্টির প্রতি আসক্তি জন্মায় হয়তো। আমার আবার এখানেও একটা অদ্ভুত নির্লিপ্তি কাজ করে। যেমন ধরা যাক আমি যে কাজগুলো করি, দেখা গেল বেশ কয়েকমাস ধরে তাতে বেশ সফল। পরপর বিভিন্ন মিডিয়ায়, কাগজে, পত্রিকায় সাক্ষাৎকার বেরোলো। যেমন চেয়েছিলাম, পত্রিকা সুপার হিট, প্রকাশনা থেকে যে বই বেরোচ্ছে, তাই বাজারে গৃহীত হচ্ছে। 

এটাই বোধহয় আসক্তিহীন একটা জীবনবোধের জন্ম দেয়। অন্তত আমার মনে হয়, খুব বেশি বেঁধে বেঁধে থাকার চেয়ে, একটা দূরত্ব থাকা ভাল। যে দূরত্ব অতিক্রম করলে মন ক্লান্ত হয়, রক্তাক্ত হয়, এমনকি বিষণ্ণও হয়।

কিন্তু তারপর! হোয়াট নেক্সট? যা বেরিয়ে গেল, তা নিয়ে আলোচনা শেষ। দিন শেষে আমার আমিই পড়ে আছি। সেখানে কোনও পরিবর্তন নেই। সেই সংসার, সমালোচনা, আলোচনা এবং ক্লান্তিকর কাজের পুনরাবৃত্তি। তখন মনে হচ্ছে কী এমন করলাম যাতে প্রকৃতি রং বদলালো। একটা অতিমারি ভ্যানিশ হয়ে গেল… 

এসব প্রশ্ন কি আমারই মনে হয় নাকি বহু মানুষের হয়? 

সেই শ্লোকটা কতটা সঠিক— কাজ করে যাও ফলের আশা করো না… 

এটাই বোধহয় আসক্তিহীন একটা জীবনবোধের জন্ম দেয়। অন্তত আমার মনে হয়, খুব বেশি বেঁধে বেঁধে থাকার চেয়ে, একটা দূরত্ব থাকা ভাল। যে দূরত্ব অতিক্রম করলে মন ক্লান্ত হয়, রক্তাক্ত হয়, এমনকি বিষণ্ণও হয়।

অথচ, দূরত্ব বজায় রাখার যে নির্দিষ্ট আর্ট রয়েছে, সেটাও রপ্ত করা হয়ে ওঠে না সবসময়।

সব ভাবনাগুলোই হিজিবিজি। একটা ছায়া ছায়া অশরীরী। শরীর খুঁজে চলি রূপ দেওয়ার জন্য… তখন হয়তো অন্য মন বলে— চলো, আর একটু হাঁটা যাক-

ফোন করেছিলাম। পেলাম না। একটু দেখে দিও, ভাবনাটা ঠিক আছে কি না! কাল একটা সাক্ষাৎকারে এটা বলব।

(ক্রমশ)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল
নীলাঞ্জন দরিপা

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com