(Bhulo Story)
(১)
উফ! কী যে জ্বালা হল আংটিটা নিয়ে! আমার আংটি নয়। তাই আমার মাথাব্যথা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সেই সময় কী ভূতে ভর করেছিল কে জানে! মাথা আমার একখানা আছে, আর সেই মাথায় মাথাব্যথা হতেই পারে, নিজেকে সেটা বোঝাতে গিয়েই মহা ফাঁপরে পড়েছি। আংটিটা দিদির। একেবারে নিজের দিদি। মা জন্মদিনে ওকে দিয়েছে। গতকালই ওর জন্মদিন ছিল। আমি কিন্তু মোটেই হিংসুটে নই।
মা বলে, ‘দিদি কপালে ফোঁটা দেয়, হাতে রাখি পরায়, তাই আমার মনে যেন সবসময় ভাল চিন্তা থাকে।’
আমার কুচিন্তা আসেই না। সেদিন যে কী হল! আসলে দিদিটা মহাভুলো। ব্যাগ থেকে পেন বার করে টেবিলে রেখে আবার ব্যাগেই খোঁজে। খাবার থালা রান্নাঘরে রেখে গোটা বাড়ি তোলপাড় করে বেড়ায়। এই নিয়ে দিনে রাতে ওষুধ গেলার মতো মায়ের কাছে বকুনি খায়। আমি জিনিস খুঁজে পেতে দিদিকে সবসময় সাহায্য করি। সেদিন আংটিটা আমাদের স্নানঘরের সবচেয়ে উঁচু তাকটায় তুলে রেখে দিদি গোটা বাড়ি মাথায় করছিল। সাবান খুঁজতে গিয়ে আমিই প্রথম দেখতে পাই মহার্ঘ্য জিনিসটা।
আরও পড়ুন: কেন উত্তমকুমারকে নেওয়া হয়নি কিরীটী রায়ের চরিত্রে?
দিদা এই আংটি মাকে কোনও এক জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল। মা দিদিকে এই বছর দিল। আংটিটা দেখে আমার কী যে হল! দিদিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আংটিটা ইচ্ছে করে প্যান্টের পকেটে পুরে নিলাম। তারপর সেই প্যান্ট আমার স্মৃতি থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। স্নানের পর একটা অন্য সাদা প্যান্ট পরে আমি খেলতে চলে গেছি। আর যে প্যান্টে দিদির আংটি পুরে নিয়েছিলাম, সেটা কোথায় রেখেছি কিছুতেই মনে করতে পারছি না। আজ স্কুল ছুটি। ফুটবল খেলে ফিরতেই দেখি বাড়িতে হুলুস্থুলু কাণ্ড হচ্ছে। কারণ দিদি আংটি হারিয়েছে। তখন আমার মনে পড়ল প্যান্টটার কথা। কিন্তু আসল বিষয়টা তো ভুলে গেছি। সেই থেকে শুরু অস্বস্তি।
যতটুকু মনে পড়ছে, স্নানঘরের তাক থেকে আংটিটা সরিয়ে আমি কালো প্যান্টটাতেই রেখেছিলাম। সেই কালো প্যান্টটা কোথায় রেখেছি আর মনে করতে পারছি না। হারানো প্যান্ট নিয়ে বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচিও করতে পারছি না। সকলে সন্দেহ করবে। দিদির বকুনিটা তখন আমায় খেতে হবে। দিদি এমনিতেই চার-পাঁচবার আমায় জিজ্ঞেস করে গেছে।

‘জোজো, তুই আমার পর স্নান করতে গিয়েছিলি না, আংটিটা কোথায় ফেললাম কিছুতেই মনে করতে পারছি না, তুই কি দেখেছিস?’
মিনমিনে গলায় বললাম ‘আমি তোর আংটি দেখিনি দিদি।’
দিদিকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই। ‘জোজো, খেতে আয় তাড়াতাড়ি, একবারের বেশি যেন দু’বার ডাকতে না হয়।’ মায়ের কড়া গলার স্বরে ঘুম ভেঙে গেল।
বিছানা থেকে উঠতে যাচ্ছি, মনে হল কেউ যেন আঙুল টেনে ধরছে। ‘আমায় খুঁজে পাচ্ছ না বলে মন খারাপ জোজোবাবু?’ কে কথা বলল! চারপাশে তো কেউ কোথাও নেই। আংটি কথা বলে নাকি!
‘কোথায় গেল মানে! তুমিই তো হারালে, হি হি, তাড়াতাড়ি খেয়ে আমায় খোঁজো!’ সেই সরু, মিহি গলা হাসতে হাসতে আমার কানের কাছে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে।
‘তাড়াতাড়ি আমায় খুঁজে দাও, তোমার দিদির মন খারাপ।’ সরু, মিহি গলায় কেউ কথা বলছে। একেবারে কানের কাছে। আমি ছাড়া কেউ শুনতে পাবে না। দিদিকে শুধু একটু শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম। শেষে কি আমি বিপদে পড়ে যাচ্ছি?
‘তোকে খেতে না দিয়েই তাহলে খাবারগুলো ফ্রিজে তুলে দিই!’ মায়ের রাগী গলার স্বর উপর থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আংটি নিশ্চয়ই উদ্ধার হয়নি। নইলে মা এত রেগে থাকত না। তাড়াতাড়ি আমি নিচে নেমে পড়লাম। খেয়ে এসে একবার আলমারিটা খুঁজতে হবে। যদি প্যান্টটা ভুল করে আলমারির ভেতর রেখে দিয়ে থাকি। নিচে নেমে দেখি দিদি এক গাল ভাত আর দু’হাতার সমান বকুনি খাচ্ছে। সত্যি, আংটিটা যে কোথায় গেল!
‘কোথায় গেল মানে! তুমিই তো হারালে, হি হি, তাড়াতাড়ি খেয়ে আমায় খোঁজো!’ সেই সরু, মিহি গলা হাসতে হাসতে আমার কানের কাছে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে।

(২)
‘দুই ভাই-বোনে তাড়াতাড়ি খেয়ে আমায় উদ্ধার করো।’ মা তেতো কথার সঙ্গে দুটো রুটি ঠুসে ঠুসে আমায় খাইয়ে দিল।
দিদি মোটামুটি একগাল ভাতের সঙ্গে খানিকটা চোখের জল মিশিয়ে খাচ্ছে। আমার ঠিক দুঃখ হচ্ছিল না। তবে একেবারে যে মন খারাপ করছে না, তাও নয়। আংটিসমেত প্যান্টের কথা মাঝে মাঝেই মনে করার চেষ্টা করছি। কিছুতেই মনে পড়ছে না। বাড়িতে যে কাউকে জিজ্ঞেস করব, সেই উপায় নেই। বকুনির সঙ্গে কানমলাও খেতে হবে।
মা এমন করে বকুনি দিল, যেন আমরা ঘুমোলেই আংটি-ভূত টুপ করে মায়ের কাছে আংটি ফেরত দিয়ে যাবে! আমার ভাগ্যটা বড্ড খারাপ। অন্যদিন খাওয়ার পর দিদি বাবার সঙ্গে গল্প করে তারপর শুতে আসে।
দিদি হয়তো রেগে আর ভাইফোঁটাই দিল না। ভাইফোঁটার দিন দারুণ খাওয়াদাওয়া হয়েছে, পেটে ব্যথা করছে, এই বলে পরদিন স্কুল যাই না। দুদিন পরে স্কুলে গিয়ে পিকাই, বিট্টু, সুব্রতদের ভাইফোঁটার গল্প শোনানো হবে না। সত্যিই কষ্ট হচ্ছে। দিদিকে মাঝে মাঝেই ভুলো বলে খেপাই। তার শাস্তি পাচ্ছি বোধহয়। কিন্তু শাস্তিটা দিচ্ছে কে? ওই বদমাশ আংটি!
‘তাড়াতাড়ি শেষ করো খাবার, আমায় খুঁজতে হবে তো।’ সরু, মিহি স্বরে আমার কানের কাছে বলে উঠল। মনে হল কেউ যেন চিমটি দিচ্ছে। বিষম খেলাম। মা আরও রেগে গেল। ‘এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বি দু’জনে, রাতে যেন গলার আওয়াজ না পাই একেবারে।’ রান্নাঘর থেকে মায়ের কথা ভেসে এল।

মা এমন করে বকুনি দিল, যেন আমরা ঘুমোলেই আংটি-ভূত টুপ করে মায়ের কাছে আংটি ফেরত দিয়ে যাবে! আমার ভাগ্যটা বড্ড খারাপ। অন্যদিন খাওয়ার পর দিদি বাবার সঙ্গে গল্প করে তারপর শুতে আসে। আমি ভেবেছিলাম, দিদি আসার আগে একবার আলমারি খুলে ওই আংটিসমেত প্যান্টটা খুঁজবো। মায়ের বকুনির চোটে দিদি আগে এসে আলো বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। এখন আমি আংটি খুঁজি কী করে! নাহ, আজ ভয় পেলে হবে না! আলো জ্বালিয়ে আংটিসমেত কালো প্যান্টটা খোঁজা শুরু করলাম আলমারিতে।
‘জোজো, তুই এত রাতে কী করছিস? আলমারি ঘাঁটছিস কেন! আমার আংটি তার মানে তুই লুকিয়ে রেখেছিস!’ দিদি উঠে বসেছে বিছানায়। কান্নাভরা ফুলো চোখের সঙ্গে গনগনে রাগ মিশিয়ে কথা বলল। এমন করে ধরা পড়ে যাব বুঝিনি! আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম। আলমারির জামাকাপড়ের স্তুপ থেকে টপাটপ জামা প্যান্ট পড়ছে। দিদিকে কী সব বলে দেব নাকি?
গল গল করে ঘামছি। ঘুম ভেঙে গেছে আমার। ঘরের আলো বন্ধ। দিদি পাশে শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। আমি ঠেলা দিলাম। ‘দিদি, ওঠ, ভয় করছে আমার।’ কোনও উত্তর নেই। বরং মাছি তাড়ানোর মতো করে আমার হাতটা সরিয়ে দিল।
সবে কথা বলা শুরু করব কেউ যেন মাথায় এক চাঁটি মারল। ‘দিদিকে বললে দিদির কত কষ্ট হবে জানো?’ আমি সোজা হয়ে বললাম, ‘কাল সকালে আমার ফুটবল ম্যাচ আছে, তাই খেলার জামাকাপড়গুলো বের করছি, তুই আমায় সন্দেহ করছিস দিদি! তোর আংটি তুই কোথায় রেখেছিস আমি কী করে জানব?’ শেষের কথাগুলো বলার সময় আমার গলা বুজে আসছিল। এবার সত্যিই দুঃখ হচ্ছে।
দিদি হঠাৎ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। ‘আসলে মা খুব কষ্ট পেয়েছে, সারাদিন বকাবকি করেছে। দিদার আংটি। আমি কিছুতেই মনে করতে পারছি না, আংটিটা কোথায় ফেলে এসেছি। একবার মনে হচ্ছে বাথরুমেই খুলেছিলাম, কিন্তু সেটাও স্পষ্ট মনে পড়ছে না। তুই যদি আংটিটা দেখে থাকিস আমায় দিয়ে দে ভাই।’
দিদির কথায় সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আংটি-ভূতটা ঠিকই বলেছে, দিদি যদি জানতে পারে দিদির আংটি আমিই রেখে ভুলে গেছি, তাহলে দিদি কষ্ট পাবে। আমি কথা না বাড়িয়ে আলো বন্ধ করে দিদির পাশে শুয়ে পড়লাম।

(৩)
‘এই ছেলে, তুমি ঘুমোচ্ছ যে, আমায় তো তুমি হারিয়ে ফেলেছ, এখন আমায় না খুঁজে দিব্যি ঘুমোচ্ছ!’ সেই সরু গলা। আমার কানের কাছে কথা বলছে। এই আংটিটা ভূতুড়ে। মা যে আংটি নিয়ে কেন এত বকাবকি করছে কে জানে। আমি শুনেছি আমাদের জন্মের আগেই নাকি দিদা মারা গেছে। তার মানে ওই আংটিতে দিদার ভূত রয়েছে!
গল গল করে ঘামছি। ঘুম ভেঙে গেছে আমার। ঘরের আলো বন্ধ। দিদি পাশে শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। আমি ঠেলা দিলাম। ‘দিদি, ওঠ, ভয় করছে আমার।’ কোনও উত্তর নেই। বরং মাছি তাড়ানোর মতো করে আমার হাতটা সরিয়ে দিল। ‘সারাদিন তুমি দিদিকে ভুলো ভুলো বলে খেপাও, এবার কে যে আসল ভুলো সেটা বুঝতে পারছো তো?’ আংটি-ভূত বলে উঠল যেন।
আলমারিটা তখন তাড়াহুড়ো করে বন্ধ করেছিলাম, এই প্যান্টটা পড়েছিল। দেখতে পাইনি বোধহয়। ভোর হতে এখনও দেরি আছে। বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতেই একটা খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। দিদির দিকে মুখ করে নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হওয়ার চেষ্টা করলাম।
‘আমি ভুল করেছি, আমার উচিত ছিল, আংটিটা খুঁজে পেয়ে আগে দিদিকে বা মাকে ফেরত দেওয়া।’ একটু বোধহয় জোরেই বলে ফেলেছিলাম কথাগুলো। ভয়ে তাকালাম দিদির দিকে। দিদিটা কুম্ভকর্ণ। এতেও ঘুম ভাঙেনি। যার আংটি হারিয়েছে সে কেমন দিব্যি ঘুমোচ্ছে। আর আমি না ঘুমিয়ে ঘামছি। আর ঘুম আসবে না। বিছানা থেকে নেমে পায়চারি শুরু করেছিলাম।
পায়ের কাছে এটা নরম মখমলে কী যেন লাগলো। একটা ছাই রঙের প্যান্ট। আমি খেলতে যাওয়ার আগে এটাই পরেছিলাম বোধহয়। নাকি কালো প্যান্টটা! কিছুই মনে পড়ছে না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে! তবুও ছাই রঙের প্যান্টটা দেখে মনে হল এই বুঝি সব মিটে যাবে, একবার যদি আংটিটা এখান থেকে বেরোয়। প্যান্টটা নিয়ে আতি-পাতি খুঁজে দেখলাম। কোথায় কী! আংটি কেন, একটা খুচরো পয়সাও পড়ল না।

আলমারিটা তখন তাড়াহুড়ো করে বন্ধ করেছিলাম, এই প্যান্টটা পড়েছিল। দেখতে পাইনি বোধহয়। ভোর হতে এখনও দেরি আছে। বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতেই একটা খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। দিদির দিকে মুখ করে নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হওয়ার চেষ্টা করলাম।
(৪)
ছাদে যাওয়ার সিঁড়িটা লাল রঙের। দিদির, আমার দুজনেরই খুব পছন্দের জায়গা সিঁড়ির চাতালগুলো। যেখানে অনেকগুলো সিঁড়ির ধাপ জিরিয়ে নেয়। এক সারি সিঁড়ি বাঁক নেওয়ার আগে ওখানে আলাদা হয় অন্য সিঁড়ির সারি থেকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম আমি। দিদি যে কখন সিঁড়ির চাতালে এসে বসেছে খেয়াল করিনি। এমনকী আমি নিজেও কখন এসে পড়েছি মনে নেই।
দিদির কান্নায় সব জামাকাপড় ভিজে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হল ভিজে জামাকাপড়গুলোর ভেতর থেকে আমার সেই কালো প্যান্টটা উঁকি দিচ্ছে। ‘দিদি ওই প্যান্টটাতেই আংটিটা আছে, মা কী মেশিনে কেচে ফেলেছে ওটা! আংটিটা নিশ্চয়ই নষ্ট হয়ে গেছে।’ আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম।
‘কী করছিস দিদি?’
দিদি মুখ নামিয়ে বসে আছে। কোনও উত্তর নেই।
‘মা আবার বকেছে তোকে? আংটিটা পাসনি না রে?’
‘তুই আমায় একটুও সাহায্য করতে পারলি না জোজো?’
দিদি মুখ তুলে তাকিয়েছে। দুটো লাল চোখ।
ছোটবেলায় দিদিকে আমি জুজু বুড়ি বলে ডাকতাম। আর দিদি আমায় জোজো। আমার জুজুবুড়ি ‘দিদিভাই’ হয়েছে। কিন্তু দিদির জোজো তেমনই আছে। হঠাৎ দেখলাম দিদি কাঁদতে কাঁদতে ছাদে চলে এসেছে। আমিও এলাম পেছন পেছন। ছাদে ওয়াশিং মেশিনটা খুলে দিদি একটার পর একটা জামা বের করছে আর বলছে ‘মা আমায় কোনওদিন নতুন জামা কিনে দেবে না বলেছে।’
দিদির কান্নায় সব জামাকাপড় ভিজে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হল ভিজে জামাকাপড়গুলোর ভেতর থেকে আমার সেই কালো প্যান্টটা উঁকি দিচ্ছে। ‘দিদি ওই প্যান্টটাতেই আংটিটা আছে, মা কী মেশিনে কেচে ফেলেছে ওটা! আংটিটা নিশ্চয়ই নষ্ট হয়ে গেছে।’ আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম।
‘আমি একটা পেনসিল নেব বলে তোর পেনসিল বাক্সটা খুলেছিলাম, এই দেখ কী পেয়েছি।’ দিদির মুখে হাসি। আংটির থেকেও উজ্জ্বল। আমি শুধু বললাম, ‘জানিস দিদি আমিও না তোরই মতো ভুলো।’ দিদি শুনলো কি না কে জানে।
‘রবিবার বলে দুই ভাই-বোনের ঘড়ির দিকে খেয়ালই নেই, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে নিচে আয়।’ মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। দিদি উঠে আমাদের ঘরের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাউকে না বলে সোজা ছাদে উঠে গেলাম। ওয়াশিং মেশিনের ঢাকনা খুলে দেখি, সত্যিই কালো প্যান্টটা রয়েছে সেখানে। মা কাচার জন্য রেখেছে।
আজ রবিবার। একটু পরেই মা সব জামাকাপড় কাচবে। তার মানে আমি সেদিন বিছানায় প্যান্টটা ছেড়ে রেখে চলে গিয়েছিলাম। তারপর মা সেটা কাচবে বলে মেশিনে দিয়েছে। কিন্তু এখনও কাচেনি। একটুও সময় নষ্ট না করে কালো প্যান্টটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতেই আমার হাতে এল সেই আংটি। জ্বলজল করছে। সোনার আংটি। আমায় দেখে রীতিমতো হাসছে।

আংটিটা পকেটে পুরে নিচে নামতে নামতে মনে হল কেউ যেন বলছে ‘সরাসরি দিদির হাতে আংটিটা দিলে কিন্তু সত্যি কথাটা বলতে হবে, এটাও বলতে হবে যে কে আসলে ভুলো।’ সেই আংটি-ভূতের গলা। ঘরে গিয়ে দেখি দিদি ঘরে নেই। দিদির পড়ার টেবিলে রাখা পেন্সিল বাক্সের মধ্যে রেখে দিলাম আংটিটা। আমিও যে ভুলো সেটা প্রমাণ হয়ে যাওয়ার ভয়ে নয়, দিদি যদি কষ্ট পেয়ে ভাইফোঁটা না দেয়, রাখি না পরায়, সেই ভয়ে।
নিচে নেমে দেখি দিদি জলখাবার নিয়ে মুখ গোঁজ করে বসে আছে। বাবা বাজার গেছে। মা রান্নাঘরে। চুপি চুপি দিদিকে হাত ধরে উপরে নিয়ে এলাম। ‘আমি একটা পেনসিল নেব বলে তোর পেনসিল বাক্সটা খুলেছিলাম, এই দেখ কী পেয়েছি।’ দিদির মুখে হাসি। আংটির থেকেও উজ্জ্বল। আমি শুধু বললাম, ‘জানিস দিদি আমিও না তোরই মতো ভুলো।’ দিদি শুনলো কি না কে জানে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত