(Jolke Chol 22)
বইপাড়ার অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা সাঁজবাতি। তার কর্ণধার আবীর রায়। ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা চলাকালীন স্টলেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সারাদিন সেভাবে কিছু খাননি। স্টল সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। কর্মচারী মহিম সেদিন আসতে পারেনি। সন্ধের দিকে পরিচিতরা খাবার নিয়ে এসেছিলেন। মটন রোল। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকে ব্যথা শুরু, মুহূর্তের মধ্যেই চিরনিদ্রায় তলিয়ে যান। বয়স হয়েছিল বাহাত্তর।
বইপাড়া চেয়েছিল তাঁর অন্তিম যাত্রার সঙ্গী হতে। কিন্তু বাড়ির লোক অনুমতি দেননি। ফলে মেলা প্রাঙ্গণেই একটা শোকজ্ঞাপন অনুষ্ঠান হয়। এপ্রিলের শেষে কাগজে বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ে মোহনার। সাঁজবাতি প্রকাশনী বেচে দেওয়া হবে। মূল্য ধার্য হয়েছে পঁচিশ লাখ টাকা। দাম শুনে যারা আগ্রহী, তারা পিছিয়ে যান। মোহনা জানে এই টাকাটা তার লস। তবুও কীসের তাগিদে যেন কিনে নিল!
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১)
গাড়িতে বসে মোহনা নিজের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল। তার মন পিছিয়ে যাচ্ছিল চার বছর আগে। তখন সদ্য চৌধুরী সাহিত্য কুটিরের দায়িত্ব নিয়েছে। ‘সাগরিকা’র পাতায় সাঁজবাতির পুরনো বিজ্ঞাপন দেখে শ্বশুরের থেকে ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করেছিল আবীর রায়কে।
অমিত চৌধুরী বলেছিলেন- আবীরবাবুর মতো মানুষ হয় না। একক প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার বই করে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সে কি আজকের কথা! তখন তিনি কত বড় সরকারি আমলা। তবু কোনও অহংকার ছিল না। কাজ শেষ করেই চলে আসতেন অফিসে। আমরাও যেতাম মাঝে মাঝে তাঁর দপ্তরে আড্ডা দিতে। খানাপিনা তো চলতই, তার সঙ্গে সাহিত্য, সিনেমা, সব নিয়ে গভীর আলোচনা। সুচিত্রা সেনের উপর একটা দারুণ বই করেছিলেন। এক বছর ধরে সেটা ছিল বেস্ট সেলার। এক লাখেরও বেশি ছাপা হয়েছিল সে বই।

-আমরা কেন এমন কোনও বই করিনি বাবা?
-উনি করলেন বলে আমার আর আগ্রহ হল না। তবে আমি কাননবালাকে নিয়ে বই করলাম ওঁকে দেখে উৎসাহিত হয়ে। সে বইও ভালই বিক্রি হয়েছিল।
-তোমার কী মনে হয় উনি এখন বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহী হবেন?
-আমি তো দীর্ঘদিন ওঁকে বলিনি। তুমি কথা বলে দেখতে পারো।
আবীর কাকু ফোন ধরে পরিচয় পেয়েই উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিল- তুমি প্রমিতের বউ? তার মানে আমাদের ঘরেরই মেয়ে। চলে এসো যেদিন মনে হবে।
আবীর কাকু ফোন ধরে পরিচয় পেয়েই উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিল- তুমি প্রমিতের বউ? তার মানে আমাদের ঘরেরই মেয়ে। চলে এসো যেদিন মনে হবে।
দু’দিনের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল মোহনা। যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন আবীরকাকু। বলেছিলেন, তুমি যখন দায়িত্ব নিচ্ছ, আমি নিশ্চয়ই বিজ্ঞাপন দেব। সুচির পেজের হাফ পেজ আমার জন্য সারা বছর বুক করলাম।
উনি চেকও দিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গে। বলেছিলেন- ম্যাটার রেডি করে মেল করে দেব।

মোহনা সেদিন সত্যি খুব আনন্দ পেয়েছিল। প্রণামও করেছিল ওঁকে। উনি মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন, তোমার হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়াবে চৌধুরী সাহিত্য কুটির।
যথা সময়ে পাঠিয়েও দিয়েছিলেন ম্যাটার। মোহনার হাতে সেই প্রথম ‘সাগরিকা’র নববর্ষ সংখ্যা প্রকাশ পেল। কপি নিজের হাতে দেবে বলে পৌঁছে গিয়েছিল সে আবীর কাকুর অফিসে।
পত্রিকা দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন তিনি। বললেন, তুমি বসো, আমি একটু চা বলে আসি বাইরে। বলে উঠে গিয়েছিলেন।
হঠাৎ অনুভব করেছিল পেছন থেকে একটা হাত নেমে এসেছে ডান দিকের বুকে। ব্লাউজের মধ্যে দিয়ে সে হাত স্পর্শ করার চেষ্টা করছে… তারপরেই ঘাড়ে ঠোঁটের স্পর্শ পেয়েছিল মোহনা।
মোহনা সেই সময় কাকুর টেবিলে পড়ে থাকা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল। বেশ লাগছিল প্রসিদ্ধ এক লেখিকার জীবনী পড়তে। কখন যে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ অনুভব করেছিল পেছন থেকে একটা হাত নেমে এসেছে ডান দিকের বুকে। ব্লাউজের মধ্যে দিয়ে সে হাত স্পর্শ করার চেষ্টা করছে… তারপরেই ঘাড়ে ঠোঁটের স্পর্শ পেয়েছিল মোহনা।
মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে ছাড়িয়ে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল আবীরের গালে। অবাক হয়েছিল মানুষটা একটুও লজ্জা না পেয়ে বলেছিল- এতে রাগ করার কী হল? একটু আদরই তো করছিলাম। তোমার নিটোল বুকের মায়া ছাড়া যায়? তুমি চড় মারো, চেঁচাও, আমি কিন্তু অন্য বুকটাতেও হাত দেব। নইলে ওটা কষ্ট পাবে তো।

মোহনার চড় থাপ্পড় চললেও তার হাত নিষ্পেষিত করেছিল ওর দুটো বুককে। এক সময় ছেড়ে দিয়ে বলেছিল- আমি তো তোমাকে বিছানায় যেতে বলিনি। চাইও না শুতে। এইটুকু চাওয়াটা অন্যায় নয়।
মোহনা ঘেন্নায় থুথু ছিটিয়েছিল তার মুখে। আর সে হাসতে হাসতে বলেছিল- পাগলি মেয়ে একটা। তোমার এই থুথুটা আমি আনন্দের সঙ্গে নিলাম। এমন মেয়েই আমার পছন্দ। অধিকাংশ মেয়েই নিজের ইচ্ছেতে সব খুলে দেয়। অমন আমার পছন্দ নয়। একটু বাধা না পেলে বুড়ো শরীরের রক্ত গরম হয়? তবে একটা কথা শুনে যাও, তুমি বাইরে বেরিয়ে সকলকে বললে, ফেসবুকে পোস্ট দিলে লোকে তোমাকেই খারাপ বলবে। তুমি তো নতুন, এখনও জানো না এই পরিমণ্ডলটা।
এত বছর কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি করেছে সে। সেখানে থেকে একটা জিনিস বুঝেছে, মেয়েরা না চাইলে ছেলেরা জোর করে সেখানে কিছু করে না। কিন্তু এখানে!
মোহনা মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল সেদিন। সাহিত্য জগতটাকে তার মনে হত স্বর্গের পরের একটা স্তর। সেখানে এসব নোংরামি নেই। কিন্তু সেখানেও এত পাঁক! তবে যে লোকে বলে ফিল্ম লাইনেই নাকি সব নোংরা পারভার্টেড লোকেদের ভিড়! সেখানকার মেয়েরা সব নষ্ট! এত বছর কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি করেছে সে। সেখানে থেকে একটা জিনিস বুঝেছে, মেয়েরা না চাইলে ছেলেরা জোর করে সেখানে কিছু করে না। কিন্তু এখানে!
বাড়ি ফিরে বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার চালিয়ে দিয়েছিল সে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি। শুধু প্রতিজ্ঞা করেছিল, যে প্রকাশনার দম্ভে সে এই জঘন্য কাজ করতে পারল, সেটা একদিন ধূলিসাৎ করে দেব।

নাহ! আর কোনওদিন সে যায়নি সাঁজবাতির দপ্তরে। তার সঙ্গে দেখা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। কথাও বলেছে ভদ্রভাবে।
আবীর বলেছে- আসো না কেন? মাঝে মাঝে এলে তো আড্ডা দেওয়া যায়। তোমরা ইয়ং জেনারেশন কী ভাবছ, তা জানা দরকার আমাদের। তারপর ফিস ফিস করে বলেছে- তোমার অমতে আর হাত দেব না। তবে অনুমতি দিও একটু… তোমাকে ভাবলেই…
লোকটার বাইরের ইমেজটা বড় পরিষ্কার সকলের কাছে। আর সে সবে একটা দায়িত্ব নিতে চলেছে। এখনই কোনও গসিপের শিকার হতে রাজি নয়। বুদ্ধি করে একে কাবু করতে হবে।
মোহনা সরে এসেছে। বহুবার ইচ্ছে করেছে এমন কিছু একটা সবার সামনে করতে যাতে মুখোশটা খুলে যায় লোকটার। কিন্তু সংযত করেছে নিজেকে। লোকটার বাইরের ইমেজটা বড় পরিষ্কার সকলের কাছে। আর সে সবে একটা দায়িত্ব নিতে চলেছে। এখনই কোনও গসিপের শিকার হতে রাজি নয়। বুদ্ধি করে একে কাবু করতে হবে।
ধীরে ধীরে সে অন্য প্রকাশনী সংস্থা, যারা সাঁজবাতির প্রতিযোগী তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলল। কমিটিগুলোর থেকে এত নিঁখুত পরিকল্পনা করে সরিয়ে দিল এক এক করে যে, আবীর নিজেও বুঝতে পারছিল না কী ঘটছে! সব জায়গাতেই তার বয়স ও শরীরের কথাই কারণ হিসেবে বলা হচ্ছিল।

মোহনা চাইছিল লোকটা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ুক, বাড়িতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাক তার কাজ। কিন্তু সব কিছু যে তার ইচ্ছেয় চলে না সেটা বুঝতে পারল, যেদিন বইমেলায় বিনা নোটিশে চলে গেল আবীর।
মোহনা তার সেই প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছেটাই চরিতার্থ করল প্রকাশনা সংস্থাটা কিনে নিয়ে। যদি আত্মা থাকে, তবে লোকটা দেখতে পাবে যে ঘরে বসে সে মোহনাকে অসম্মান করেছিল, স্পর্শ করেছিল তার শরীর, সেই আজ তার অফিসের মালিক। তার ছেলেরা তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল টাকা পেয়ে।
সাফল্যের সিঁড়িটার পেছনে অনেক অন্ধকার জমাট বাঁধা। ক্ষতটা বুকে থাক, কাজে প্রতিপন্ন করে দাও তুমিই বেস্ট। কেউ ছুঁতেও পারবে না তোমাকে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে মোহনা জানলার কাচ নামিয়ে দিল। বৈশাখ মাসের প্রথম বৃষ্টি নেমেছে। সে মুখ বের করে সেই নোনা জলের স্বাদ নিল। তার পর নিজেকে বলল-
এমন কিছু করো না, যা পতনের পথ তৈরি করে মোহনা। সাফল্যের সিঁড়িটার পেছনে অনেক অন্ধকার জমাট বাঁধা। ক্ষতটা বুকে থাক, কাজে প্রতিপন্ন করে দাও তুমিই বেস্ট। কেউ ছুঁতেও পারবে না তোমাকে। অথচ তুমি সবার নাগালের মধ্যেই থাকবে।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত