আই ঢাই: হেঁসেল ভ্রমণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
অলঙ্করণ: দেবাশীষ দেব

না ছিল নেট সংযোগ , না ছোট ছোট পরিবার। তাই বাড়ি ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকা মানেই অন্তত একমাস আর তা চেনা গণ্ডির চৌহদ্দিতে। রেল কম ঝমাঝম – রাতের ঘুমে গায়ে মাথায় কয়লার গুঁড়ো মেখে ভোর রাতে নামা। তারপর গরুর গাড়িতে বোঁচকা-বুঁচকি সমেত, মাঠ ও মাটির রাস্তা পেরিয়ে একতলা বাড়িটি। এর প্রস্তুতি সাংঘাতিক। এ তো আর সেই ‘উঠলো বাই তো কটক যাই’ নয়, রীতিমতো বাঁধা এবং ছাঁদা করে লটবহর এমনকি পারলে দাঁড়ের টিউ-টি সমেত। প্রথমে কর্তা গিন্নীর ফুসফুস। ক্রমে, গিন্নীর খাস তালুকদার পাঁচুর মা এবং বড়ো ছেলে ও বউমা, বিধবা ঠাকুরঝি, আইবুড়ো ভাসুর। সবশেষে জানতে পারতো বাড়ির ছোটরা, যখন মা কাকিরা তাদের জন্যে গরম জামা গোছাচ্ছে। তাদের বিশেষ হেলদোল নেই, কারণ ছুটি মানেই হয় মামাবাড়ি, নয় দেশের বাড়ি, যেমন মুর্শিদাবাদের বৈদারা, বীরভূমের মুলুক গ্রাম বা চাকদা বা পায়রাডাঙা। আর না হয় তো চৌকিদারের জিম্মায় থাকা আর একটা নিজেদের বাড়িতে –  গিরিডি, মধুপুর, দেওঘর, শিমুলতলা, ঘাটশিলা, পুরুলিয়া বা বাঁকুড়া। তাই, যেখানেই যাও দেদার খেলা আর খোলা মাঠ। কিন্তু গিন্নিদের তো হেঁসেল গোছানো শুরু হয়ে যেত মাসখানেক আগে থেকেই আর তা এক ব্যাপক ঝকোর ঝকোর। রান্নাঘর ছিল সেই গোছগাছের প্রাণকেন্দ্র।

তো, যখন যা মনে পড়ছে এক জায়গায় তাগাড় করা হচ্ছে। দু’তিন সাইজের পেতলের ইকমিক কুকার – কোনটা যাবে ঠিক করতেই শুরু হলো গজালি। শেষে দুটো ঝাড়া মোছা শেষে সাজুগুজু করে হেঁসেলের ওই কোণে। বড় হাঁড়ি , লোহার কড়াই, গামলা আর হাতা, খুন্তি, সাঁড়াশি সে তো যাবেই। তারাও জড়ো হলো কুকারের পাশে। জুটল, তুলে রাখা চাটু, ডজন খানেক থালা, গ্লাস, বাটিও। শীলনোড়া ! পানের পিক ফেলে, মনে করে গিন্নি বললেন, ভাঁড়ার ঘর থেকে খোকা মানে ছোটো শীলনোড়াটি বার করে সময় মতো কাটিয়ে নিতে। গোছানো হবে আঁশ ও নিরামিষ দু’রকম মোড়া-বঁটি। এবার বাড়ির ছেলেদের ধরে নামাতে হবে টিনের তোরঙ্গ। মেয়েদের সাধ্য কী, যে সেই রাক্ষুসে বাক্স ঝপাং করে নামাবে! ফলে সেই সাধাসাধিও চলতে লাগলো সমান তালে। মাচার ওপর থেকে নামানো বা গুদাম ঘর থেকে খুঁজে আনা বা খাটের তলা থেকে শুধু যে টেনে বের করলেই হবে তা নয়, ওটি খালি করার আগেই ভাবতে হবে যে, তাতে কী কী থাকতে পারে ! সেই মতো ভাবতে হবে যে খালি করে সেগুলো আবার কোথায় রাখা হবে। আর খালি করার পর যদি দেখা গেল, যে ডালাটা ঢকঢকাচ্ছে বা নিচের কোনও খোরায় জং বা কোথাও টাল বা তোবড়া তাহলে তো বিরাট কেলো। পথ চেয়ে বসে থাকা, কবে বাড়ির সামনে হাঁক দিয়ে হেঁটে  যাবে – ঝাল দেওয়ার লোক।

একটা মাস্টার-ট্রাঙ্কে সবকিছু ঢুকলেও আরও বাকি থেকে গেল। ঠাকুরের নিত্যপুজোর বাসন! মানে কোশাকুশি, শাঁখ, ঘণ্টা পঞ্চপ্রদীপ, চামর, কুশাসন। সেগুলোর জন্যে আবার ছোটো ট্রাঙ্ক- ঠাকুরের ট্রাভেল কিট, মানে ধূপধুনো, সলতে, দেশলাই, কর্পূর, সর্ষের তেল ও নকুলদানা সমেত। আর তার সঙ্গে ঠাকুমার উদ্বেগে বিড়বিড় – ‘ও ঠাকুর তুমি সামলে থেকো, যেমন আছো তেমন থেকো,পথে বিপথে সঙ্গে থেকো, তোমার জল তুলসীর অভাব হবেনা। এরই সঙ্গে চলবে যার যার নিজস্ব গোছগাছ, মানে যার যেমন দরকার এবং অদরকার বোধ। বড়ো বউ তার বাচ্ছাদের জন্যে দুধের ঘটি, সসপ্যান, ছোটো কাঁসি, গরম ফ্লাস্ক, কর্তার চা খাওয়ার মস্ত কাপ ছাড়াও আরও কিছু এটা সেটা। মেজো বউ ও বড়োর অনুসারী, তাই সেও কিছু স্পেশাল বাটি, ঘটি, গরম ফ্লাস্ক। নতুন বউ শুধু সবার সাহায্যকারী, বর-বোধ এখনও তার আসেনি। বিধবা কাকি, পিসি, ঠাকুমার জন্য পাথরের বাটি, থালা, গেলাস ছাড়াও পিকদানি এবং রাতে বাঁধানো দাঁত খুলে রেখে ভেজাবার বাটিটি। এ ছাড়াও যাবে পানের ডাবর এবং অবশ্যই  অন্তত দুটো জাঁতি, তবে পেতলেরটি নয়। মেজে ঘষে লোহারগুলোই। আর যাবে পান ছাঁচার ছোট্ট হামানদিস্তা, লোহার।

হেঁসেলে তো লাগবেই, তার সঙ্গে আছে চান, পায়খানা, কাচাকাচিও। তাই নানা মাপের লোহার বালতিও জড়ো করা হবে। সঙ্গে টিনের মগ। রাখা হবে কিছু খালি টিন, যেগুলির ঢাকনা বিশেষ কেরামতিতে গিন্নি বানিয়েছেন ঝালদার ডেকে। এইসব টিনে যাবে মুড়ি, মোয়া, চিঁড়ে ছাড়াও মশলাপাতি এবং রান্নার তেল, ঘি ও ডালডা। কোথায় তখন পাউচ প্যাক আর কোথায় বা রিফাইন্ড সাদা তেল! যাবে তো বটে, কিন্তু কিসে করে যাবে! সে ভাবনা মেয়েদের নয়। কর্তাদের তদারকিতে এসে যাবে গুচ্ছের চটের বস্তা।ফর্দ করে জিনিস ভরে মুখগুলি বেঁধে আবার সেলাই করে ফেলা হবে। এছাড়াও আছে গিঁট দিয়ে মোক্ষম বাঁধা বেশ কিছু পুঁটলি, পুরনো শাড়ি বা ধুতিতে। তারপরও টুকটাক যা ভুল হবে সে সবের জন্য তো আছে বিছানা বালিশ নেওয়ার হোল্ডঅল, যাতে এর নামটি সার্থক হয়।

বিশাল বাহিনী তো ইস্টিশনে পৌঁছলো মালপত্র সমেত। বাচ্চা মহিলা আর বুড়ো বুড়িদের আগে তুলে দিয়ে এবার বিক্রমে শ্রেষ্ঠ ‘ব্যাটা ছেলেরা’। বোঁচকা বুঁচকি সিটের নিচে রেখেই শুরু হবে রাতের খাওয়ার বাড়া-বাড়ি। এইবার বেরোবে একটা পুঁটলি যাতে শুধু ট্রেনে খাওয়ার কলাই করা প্লেট আর কিছু চামচ। কাগজ বা প্লাস্টিকের চল শুরু হয়নি। শুরু হয়নি জলের বোতল। তাই বড়ো বড়ো দু’তিনটে ঠান্ডা জলের ফ্লাস্কের সঙ্গে সরু গলার দু’খানি কুঁজোও। ফুরোলেই চলতি ষ্টেশনে টক করে নেমে রেলের জল ভরে নেওয়া।

ভোরবেলা তো নামা হলো। ছেলেরা কেউ কেউ গরম গরম ভাঁড়ের চা। মেয়েরা নয়। ঘরে গিয়ে বাসি কাপড় ছেড়ে, স্নান করে তবে। স্টেশন থেকে বাড়ি যেতে একটা দুটো ‘মোটর’-এ ধরে গেলে ভালো। না হলে মহিষ বা গরুর গাড়িতে তল্পিতল্পা নিয়ে। পাশে পাশেই সঙ্গে সাইকেলে, যদি নিতে আসা কেউ থাকে। একই জায়গায় এবং একই বাড়িতে প্রায় প্রতি বছর আসা হচ্ছে। তবু নাকি সব ভীষণ বদল বা কারোর চোখে কিছুই বদলায়নি, সব সেই একই রকম। মামার বা জেঠুর বাড়ি হলে তো কথাই নেই। বিশাল অভ্যর্থনায় বাগানে কাঠ জ্বেলে হাঁড়ি হাঁড়ি গরম জল, কেটলি ভর্তি চা, গরম লুচি-তরকারি আর রোদে সেঁকতে দেওয়া বিছানা বালিশ। এ বাড়ির লোকেদের জন্যে আনা পাঁপড়, বড়ি-সমেত আরও যা যা, সব বার করে দেওয়া হলো। ব্যস। শুরু হয়ে গেল বদলানো রান্না ঘরে চিরচেনা সেই বাড়ি বাড়ি খেলা। আর এসে যদি নিজেদের খালি বাড়িতে ওঠা হয় তো সে আর এক ব্যাপার। চৌকিদার চৌকিদার ডাকতে ডাকতে সবাই তখন, ছায়াদেবী, পদ্মদেবী, পাহাড়ি সান্যাল বা ছবি বিশ্বাস। ক্রমে গ্রামের হাট, যাত্রা, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, গাদি, ধাপসা, পিটটু, ডাংগুলি। দেখতে দেখতে আপন হয়ে যাবে উঠোনে চরে বেড়ানো পুষি, ভেলো। আসা যাওয়া বাড়বে মালি বউ, কাঠ কুড়ানি মেয়ে আর আদিবাসী বাচ্চাদের। কোনও কোনওদিন আবার তাল তুলে বনভোজন। মাইলের পর মাইল হেঁটে কোনও ঝর্নাতলায়। এয়ারগান চালিয়ে বটের, তিতির, বুনো হাঁস, খরগোশ মেরে ঝলসানো। ঝর্নার জলে স্নান এবং রান্না। সতরঞ্চি পেতে খেয়ে, গড়িয়ে, তাস আর দাবা খেলে শেষে তারা-জ্বলা আকাশের ঝুপঝুপে আলো মেখে ঘরে ফেরা, একই ভাবে সেই মোট-পত্তর সঙ্গে নিয়ে।

দেশে ফেরার সময় আবার গোছ। যা এসেছিল তার থেকে বেড়ে গেছে মাল পত্তর। গ্রামের হাট থেকে কেনা ঝুড়ি, কুলো, মাটির হাঁড়ির ঢল। স্থানীয় দোকান থেকে কেনা চিনামাটির বোয়েমে রেখে এখানকার রোদে বানানো লেবু-জরা আর কুলের আচার। এক বস্তা কুল, পাকা তেতুঁল, মেটে আলুও। আর সে হাওয়া বদল যদি পুরী-কাশি-এলাহাবাদ হয় তো, সেখানকার বাসন ও চ্যাটাই আসন। এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে যাওয়া মানেই হেঁসেল ভারি হয়ে ওঠা। পুরির স্মৃতি এবং কাশির স্মৃতি লেখা থালা বাসন এবং পাথর বাটি নেই এমন বাঙালি হেঁসেল কমই পাওয়া যাবে।

এখন ভ্রমণ অনেক বেড়েছে। তবে সে সব ঝাড়া হাত পায়ে। একটাই ট্রলি ব্যাগ। হোটেলে ওঠা, অর্ডার দেওয়া এবং খাওয়া। সঙ্গে সাইট সিইং এবং শপিং। আর আকাশ পথ হলে তো লাগেজ মাপা। তবে গ্রামে গঞ্জে হোমস্টে হলে গাড়ি নিয়ে হুস, নিজেরা বা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে। পরিজন বলতে তো পরিবারে আর কেউ নেই, তাই ভার বইবার প্রয়োজনও নেই। হেঁসেল ভ্রমণও তাই উঠে গেছে। তবে শৌখিন গিন্নীর চোখে পড়ে যেতেই পারে, পুরনো দিনের নক্সায় নতুন করে বানানো কাঠের ঢাকা দেওয়া কাচের বয়েম, জলের স্ট্যান্ড, কাঠকয়লার ছোট্ট উনোন, কলাইকরা থালা, তামার ঘটি… অর্থাৎ একদিন যেসব আমরা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছি আমাদের সাবেক হেঁসেল থেকে। সেদিন সাবেক ছাঁদে নাক ঢোকাচ্ছিল প্রেসার কুকার আর গ্যাস আভেন। এখন আবার ঝাঁ-চকচক নিঃসঙ্গ মডিউলার কিচেনে এ ঠাকুমা দিদিমার ছিটে ফোঁটা ব্যবহার্য – অ্যান্টিক লুক। কিন্তু তাতে ভ্রমণ নেই শুধু সংগ্রহের সুখটুকু। আহা! তাই সই।

Tags

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

Leave a Reply