(Deshvikharir Jamijiret 4)
বাসুদেব প্রিন্টিং ওয়ার্কস৷ ১, বিধান সরণি৷ সাবেক কর্নওয়ালিস স্ট্রিট৷ কলকাতার ডাক-ঠিকানায় সাত লক্ষ আসার আগেকার স্মৃতি৷ তখন দুপুরের ফাঁকা কর্নওয়ালিস স্ট্রিট ধরে দুলে দুলে উত্তরে ট্রাম ছুটত শ্যামবাজার, বেলগাছিয়া, দক্ষিণে ডালহৌসি, এসপ্লানেড৷ সে এক রোমান্টিক জার্নি৷ এ শহর উন্মাদ উন্নয়নের লালসায় যা খুইয়েছে৷
বিধান সরণি যেখানে পূর্বে কেশব সেন স্ট্রিট, পশ্চিমে মদনমোহন বর্মণ স্ট্রিটের হাত ধরে দাঁড়িয়ে, যেখানে বিখ্যাত কলেজ স্ট্রিট বাটা, যার উইন্ডোয় দেখেছি সাদা সুতো-মিহি তুলো-শুকনো ডাল আর ঝরাপাতা দিয়ে শীত ঋতুর আবহ রচনা করছেন শিল্পী পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, শোরুমের মাথায় ঘোরে ভার্টিকাল BATA (এখন ঘোরে কি না জানা নেই), এইখানে আছে, এখনও আছে ইহুদি মার্কেট, জুতো-চপ্পলের বিশাল বাজার, উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় (শুনতে পাই, আর আগের মতো নেই, দিল্লিওয়ালারা ব্যবসা অনেকটা দখল করে নিয়েছে)৷ এই বাজারের উত্তর প্রান্তে ছিল একটা ছাপাখানা৷ বাসুদেব প্রিন্টিং ওয়ার্কস৷ প্রোপ্রাইটার মনমোহন পাল৷ আমার পিতৃদেব৷
আরও পড়ুন: দেশভিখারির জমিজিরেত পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩,
দু’খানা ট্রেডল মেশিন— হাফ ক্রাউন ভারতী আর হাফ ডিমাই বাণী, হ্যান্ড কম্পোজের চারটে শিট, বর্জাইস-স্মলপাইকা-পাইকা থেকে শুরু করে ৩৬ পয়েন্ট পর্যন্ত টাইপের গোটা পঞ্চাশেক কেস, গালি (কম্পোজ করা ম্যাটার রাখার জায়গা, কাঠের তৈরি), স্টিক (হাতে নিয়ে টাইপ গাঁথার জায়গা, পেতলের তৈরি), প্রুফ মেশিন এবং টুকিটাকি আরও অনেক কিছুর উনিশ শতকীয় প্রিন্টিং ইউনিট৷ ট্রেডল মেশিন হাওড়ার আলামোহন দাসের৷ টাইপ এসেছিল চিৎপুরের কালিকা ফাউন্ড্রি এবং সুকিয়া স্ট্রিটের লাগোয়া মদন মিত্র লেনের রুদ্র ফাউন্ড্রি থেকে৷
বয়স্ক আত্মীয়দের কাছে শুনেছি, ঢাকার ঠাঠারিবাজারে এই নামেই একটি ছাপাখানা ছিল, যার মালিক ছিলেন সুধন্যমোহন পাল৷ আমার পিতামহ৷ তিনি অল্প বয়সে প্রয়াত হন৷ আমার পিতা তখন পাঁচ বছরের৷ যৌথ পরিবারের সদস্যরা অর্থাৎ সুধন্যমোহনের নিকটাত্মীয়রা ব্যবসাটা চালিয়ে যান৷ সেই ছাপাখানায় মেশিন ছিল না৷ হাত বা পায়ের চাপ দিয়ে টাইপ ও ব্লকের ছাপ তোলা হত৷ সবটাই ম্যানুয়াল৷ উন্মেষ যুগের সরঞ্জাম৷ সেই ব্যবসা যে খুব একটা লাভজনক ছিল না, অনুমান করা যায়৷ কতদিন চলেছিল জানা যায় না৷ ‘বাসুদেব’ কোনও পূর্বপুরুষের নাম কি না জানি না৷ এটুকু জেনেছি, আমার পিতৃদেব এই ব্যবসায় ছিলেন না৷ তিনি লেখাপড়া শিখে কুমিল্লা ব্যাংকে চাকরি পান৷

দাদু নলিনীকুমার বসুর মুখে বারকয়েক শুনেছি, বুড়িরে (অর্থাৎ আমার মা) যখন বিয়া দেই, মনমোহন তখন কুমিল্লা ব্যাংকের নারানগঞ্জ ব্রাঞ্চের স্টাফ৷ কিশোরগঞ্জে আমার এক ভাইগ্না ছিল৷ বিজয় সরকার৷ সে মনমোহনের বন্ধু৷ একলগে পড়ছে৷ তারই মাইধ্যমে সম্বন্ধ স্থির হইল৷ বুড়ি তখন আইএ পড়তাছে৷ পড়া বন্ধ কইরা বিয়া দিতে হইল৷ পার্টিশনের পরে পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হয়৷ চাইরদিকে গণ্ডগোলের খবর পাই৷ আমাগো লোকজন পলাইতাছে৷ ঘরবাড়ি জলের দরে বেইচা বা ফালাইয়া পলাইতাছে৷ ভয় পাইলাম৷ কিরণও (আমার দিদিমা) কইল, বুড়িরে বিয়া দিয়া দাও৷ আমরা বিপদে পড়লে অরে কে দেখব?
অল্প বয়সি মাইয়া ঘরে রাখা বিপদ, কলিমে কইল৷ ভাবলাম, পাত্র হাতছাড়া হইলে সব দিক দিয়া সমস্যায় পড়ুম৷ দেশের পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয়, ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়৷ বিজয় সরকারেও চাপ দিতাছিল৷ তাছাড়া পাত্র তো মন্দ না৷ দেখতে শুনতে ভাল৷ ব্যাংকে কাম করে৷ বিয়ার পর হঠাৎ কী হইল৷ ব্যাংকে লালবাতি জ্বলল৷ সেই যে দুর্দশার শুরু, অবস্থা আর পালটায় নাই৷
প্রেস বা ছাপাখানা বলতে যে ছবি আমার জীবনে জুড়ে আছে, তার মলাটে শিক্ষা ও সংস্কৃতি, ভেতরে অনন্ত অনটন ও অর্ধাহার৷ ছোটোবেলায় শিখে গেছি যে আমাদের খিদে লাগতে নেই, শীত লাগতে নেই, আমাদের উৎসব নেই, কষ্টকে কষ্ট ভাবতে নেই৷
দাদুর মুখে এসব শোনা বালক বয়সে, আমরা তখন এন্টালির বস্তিতে, আর দাদু-দিদিমা শুয়োরের খোঁয়াড়ের চেয়ে খারাপ গোবরার বস্তিতে৷ স্বাধীনতার ভাগাড়ে৷
বাবা কীভাবে ছাপাখানার ব্যবসায় এলেন সে ইতিহাস অল্পই জানা৷ মায়ের কাছে শুনেছি, জনৈক কানোরিয়ার পরামর্শে ম্যাঙ্গো লেন-এ প্রেস করেন বাবা৷ জায়গাটা বাবার নামে ভাড়া৷ মেশিনও বাবার কেনা৷ কানোরিয়া অর্ডার আনত৷ সওদাগরি অফিসের ছাপার কাজ৷ পুঁজি জোগাত৷ সেই কড়ারে কানোরিয়া পার্টনার৷ এক রাতে প্রেসে আগুন লাগল৷ কাগজপত্র পুড়ে ছাই৷ ইনসিওরেন্সের টাকার বড় ভাগ মারে কানোরিয়া৷ আগুন কানোরিয়ার বুদ্ধিতে লাগানো হয়, বাবার সন্দেহ৷ ইনসিওরেন্সের লোকজনের সঙ্গে সাঁট ছিল লোকটার৷ এরপর বাবা কয়েকটা স্কুলে খাতা, বই, রেজিস্টার ইত্যাদি সাপ্লাইয়ের কাজ করেন৷ দোকানে দোকানে ঘি সাপ্লাই করেন৷ প্রফেসরদের কোঅপারেটিভে খাতা লেখেন৷ তারপর এই প্রেস৷ একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিন দিয়ে শুরু৷

প্রেস বা ছাপাখানা বলতে যে ছবি আমার জীবনে জুড়ে আছে, তার মলাটে শিক্ষা ও সংস্কৃতি, ভেতরে অনন্ত অনটন ও অর্ধাহার৷ ছোটোবেলায় শিখে গেছি যে আমাদের খিদে লাগতে নেই, শীত লাগতে নেই, আমাদের উৎসব নেই, কষ্টকে কষ্ট ভাবতে নেই৷ দিদিমা বলেছিল, আমি তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেন-এ, প্রেসে ঢুকবি না কোনওমতে, অন্য কোথাও কাজ করলে তবু পেট ভইরা খাইতে পাবি৷ নিজের সন্তানের দুঃসহ দিনাতিপাত দেখে দেখে কিরণবালা সন্তানের সন্তানকে সতর্ক করেছিলেন৷
তবু প্রেসের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ি৷ ক্লাস টেন-এ পড়বার সময় প্রুফ দেখা শিখি৷ বাবা শিখিয়েছিলেন৷ সেদিনের হায়ার সেকেন্ডারি পাঠ্যক্রমে হিউম্যানিটিজ বিভাগে সংস্কৃত আবশ্যিক বিষয় ছিল৷ লেখাপড়ার সঙ্গে আমার দূর দূর অনাত্মীয়তা সত্ত্বেও সংস্কৃতকে কীভাবে যেন ভালবেসে ফেলেছিলাম৷ শ্যামলবরণ দত্ত স্যারের যত্নে কিছু শিখেছিলাম৷ দেবনাগরী হরফ দ্রুত লিখতে পারতাম৷ সেটা কাজে লেগে গেল প্রেসে৷ বিভিন্ন স্কুলের প্রশ্নপত্র ছাপা হত৷ সংস্কৃতের প্রুফ দেখে দিতাম, যদিও আমি তখন ক্লাস টেন৷ বাংলা প্রুফ দেখা আগেই শিখেছি৷
রিফিউজি কর্মচারীরা ছিলেন সবচেয়ে কঠিন অবস্থায়, অনাহারের গা ঘেঁষে বাঁচা৷ ৮ ঘণ্টার নির্দিষ্ট শ্রমের পর ওভারটাইম খাটতেন৷ তাতেই বা কী হত! মূল বেতনটাই যে যৎসামান্য৷ হ্যান্ডকম্পোজের ছাপাখানা বহু মানুষের কাজের সংস্থান করতে পারত, এটা ঠিক, কিন্তু ভরা পেটের ব্যবস্থা করতে পারত না৷
নিজেগো কাজ নিজেরা করতে লজ্জা কী— এই পরামর্শে ও যন্ত্রণাদায়ক শাসনে কম্পোজ শিখলাম৷ প্রথমে ইংরাজি, পরে ধীরে ধীরে বাংলা৷ বাংলা বেশ জটিল৷ চারটে কেস৷ অজস্র খোপ৷ এক খোপে একাধিক হরফ৷ প্রেসে যখন সিজন, অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ছাপার চাপ, টুলে বসে পড়ি, হাতে স্টিক নিয়ে টাইপ তুলে তুলে শব্দ গাঁথি৷ কাজ শেখা, কাজ করা এবং কাজ করার মধ্য দিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে পারার একটা আনন্দ আছে৷ কিন্তু তাতে সংসারে সামান্য সচ্ছলতা এসেছিল কি?
আসলে অল্প পুঁজির সেকেলে ছাপাখানা থেকে কখনওই এমন আয় সম্ভব নয়, যা সচ্ছলতা দিতে পারে৷ মালিক ও শ্রমিক দু-তরফই অভাবে অনটনে বাঁচেন৷ অন্য কোনও জায়গা থেকে অর্থাগমের ব্যবস্থা যদি থাকে, তাহলে বাঁচোয়া৷ হাওড়া ও মেদিনীপুরের কয়েকজন প্রেসমালিককে চিনতাম যাঁদের জমিজমা থেকে সংবৎসরের খাওয়া জুটে যেত৷ প্রেসের আয় পরিবারের বাড়তি প্রয়োজন মেটাত৷ এমন অনেক প্রেস কর্মচারীকে দেখেছি, যাঁদের খাওয়াপরার ব্যবস্থা দেশঘরেই ছিল৷ কলকাতায় কাজ করতে আসতেন অনেকটা শখ মেটাতে, বাকিটা বাসগ্রামে নিজের কদর বাড়াতে৷

রিফিউজি কর্মচারীরা ছিলেন সবচেয়ে কঠিন অবস্থায়, অনাহারের গা ঘেঁষে বাঁচা৷ ৮ ঘণ্টার নির্দিষ্ট শ্রমের পর ওভারটাইম খাটতেন৷ তাতেই বা কী হত! মূল বেতনটাই যে যৎসামান্য৷ হ্যান্ডকম্পোজের ছাপাখানা বহু মানুষের কাজের সংস্থান করতে পারত, এটা ঠিক, কিন্তু ভরা পেটের ব্যবস্থা করতে পারত না৷ আর সংসারে পেট বেশি হলে তো কথাই নেই! আমরা রিফিউজি মালিক, যেখানে মালিক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পায় না, দুঃখের মুখ দেখা তার ফুরোয় না৷ মা ঠোঙা বানিয়েছেন, আমি ফাইফরমাস খেটেছি, গাড়ি ধোয়ার কাজ করেছি৷
রাজনীতিতে আমি যুক্ত হওয়ায় বাবা যে প্রচণ্ড চটেছিলেন, তার অনেক কারণ থাকতে পারে, বড় কারণ কিন্তু এইটা যে একটা সস্তা শ্রমিক হাতছাড়া হল, পেটখোরাকির কাজের লোক ছিটকে গেল৷ আমাদের প্রেসের মূল আয় ছিল প্রশ্নপত্র ছেপে৷ সে তো বছরের তিন মাস কি চার মাস৷ বাকিটা সময় জব কাজ— লেটারহেড, বিল, ক্যাশ মেমো, ভাউচার, ক্যালেন্ডার হেড, বিয়ের চিঠি, শ্রাদ্ধের চিঠি ইত্যাদি এবং জুতোর বাক্সের লেবেল৷
হাওয়াই চপ্পলের ফিতে ছিঁড়ে গেছে৷ সেফটিপিন দিয়ে সোলের সঙ্গে এঁটে পা টেনে টেনে হাঁটি৷ সেফটিপিন বেঁকে খুলে যায়৷ পিনের খোঁচায় রক্তাক্ত হয় পায়ের বুড়ো আঙুলের তলা৷ ঘা হয়৷ যদি বলতাম, ‘নতুন চটি লাগবে’, শুনতে হত, ‘আমি কি চুরি করুম?’
পিতৃদেব যতই বলুন ‘টাকা ছাড়া মানুষের সম্মান নাই’, তিনি এটা বুঝতে চাইতেন না যে এই কাজে সম্মানের টাকা আসে না৷ তাই ছেলেকে ‘হাতের কাজ’ শেখানো, একজন লেবারের পয়সা বাঁচানো৷ ঘরে দু’বেলা খাবার জুটে যেত যেমন তেমন, জামাকাপড় জুটিয়েছি গাড়ি ধুইয়ে৷ ‘এই ছোকরা, রোববার আসবি, সকাল সকাল, ঘষে ধুতে হবে, ৯ টায় বেরব৷’ ডাকগুলো ভোরের রজনীগন্ধার মতো আজও তাজা৷
হাওয়াই চপ্পলের ফিতে ছিঁড়ে গেছে৷ সেফটিপিন দিয়ে সোলের সঙ্গে এঁটে পা টেনে টেনে হাঁটি৷ সেফটিপিন বেঁকে খুলে যায়৷ পিনের খোঁচায় রক্তাক্ত হয় পায়ের বুড়ো আঙুলের তলা৷ ঘা হয়৷ যদি বলতাম, ‘নতুন চটি লাগবে’, শুনতে হত, ‘আমি কি চুরি করুম?’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত