(Arghya Sen)
‘কোন ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি! শুধু একটা ছবি ভাসে— আমার খুব সুন্দর দেখতে মা, অর্গান বাজিয়ে গান গাইছেন। গান মনে পড়ে না, শুধু ছবিটা দেখতে পাই।’ (Arghya Sen)
শেষ মাঘের এক শীতার্ত সকালে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে, বিদায় নিলেন অর্ঘ্য সেন। মায়ের সূত্রেই ছোট থেকে গানবাজনার প্রতি টান। স্মরণালেখের গোড়ার কথাগুলি একদা নিজের সংগীতশিক্ষার প্রসঙ্গে বলেছিলেন প্রয়াত শিল্পী। (Arghya Sen)
অধুনা বাংলাদেশের খুলনার দৌলতপুরে জন্ম অর্ঘ্য সেনের। বাবা হেমেন্দ্রকুমার দৌলতপুর কৃষি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। মা বিন্দু দেবী সংগীতের চর্চা করতেন। মায়ের কাছেই গানে হাতেখড়ি হলেও বেশিদিন মা-কে পাননি। কৃষি কলেজের প্রিন্সিপালের স্ত্রী হাসি বসু ছিলেন শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের মানুষ। ‘বোসদিদি’-র কাছে তালিম নিতে নিতেই রবীন্দ্রসংগীত অর্ঘ্য সেনের প্রথম ভালবাসা হয়ে ওঠে। (Arghya Sen)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এক সংবেদনশীল শিল্পী অর্ঘ্য সেন। তবে অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, কাজী নজরুল ইসলামের গানও তাঁর কণ্ঠে অবিস্মরণীয়। (Arghya Sen)
দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে গান শিখতে শিখতেই একান্ত স্বকীয় গায়কী তৈরি করে নিয়েছিলেন অর্ঘ্য সেন। ভয়েস ট্রেনিং নিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত, ফিরোজা বেগমের কাছে। শিখেছিলেন, কীভাবে মাইক্রোফোনে ভয়েস থ্রো করতে হয়। (Arghya Sen)
শৈশব থেকেই আর্থিকভাবে দুর্বল ছিল তাঁর পরিবার। খুলনা, দিনাজপুর হয়ে বেনারসে থাকাকালীন দেখেছিলেন দেশের প্রথম স্বাধীনতা উদ্যাপন। এরপর চলে আসেন কলকাতা। হাজরা রোডের এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। রেডিওতে পঙ্কজকুমার মল্লিকের ‘সংগীত শিক্ষার আসর’ শুনে শুনে গান তুলতেন। ক্লাস টেনে পড়ার সময় অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কিছু দিন গান শেখেন। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে, গেলেন দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। (Arghya Sen)
১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে, গেলেন দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। তখন দেবব্রত বিশ্বাসের ফি পাঁচ টাকা। বাবার কাছে আবেদন করতেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান। বিষণ্ণবদনে গুরুকে সে কথা জানালেন।
তখন দেবব্রত বিশ্বাসের ফি পাঁচ টাকা। বাবার কাছে আবেদন করতেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান। বিষণ্ণবদনে গুরুকে সে কথা জানালেন। আগেকার দিনে গুরুরা শিষ্যদের নিজেদের বাড়িতে খাইয়ে-পরিয়ে শিক্ষা দিত। দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর স্বভাবসুলভ বাঙাল ভাষায় বললেন, ‘আমি খাওয়াইতে-পরাইতে পারুম না, কিন্তু গান শেখাইতে পারুম।’ (Arghya Sen)
পরবর্তীকালে এই প্রসঙ্গে অর্ঘ্য সেনের স্বীকারোক্তি, ‘আজকের দিনে এমন গুরু আর কোথায় পাব? ওঁর জন্যই বোধহয় আমার গান শেখা হয়েছিল।’
দেবব্রত বিশ্বাসের ক্লাসে গান শেখার কয়েকটি নিয়ম ছিল। একেবারে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে হবে, খাতা দেখে গান গাওয়া চলবে না, গান মুখস্থ থাকতে হবে। একদিন একটা গানের আধখানা, পরের দিন আধখানা গান শিখতেন। গানে শব্দ উচ্চারণ, অভিব্যক্তি কোথায় কীভাবে দিতে হবে, সবই দেখিয়ে দিতেন দেবব্রত। (Arghya Sen)

কেবল সুরে কিছু কথা আউড়ে যাওয়া তিনি একদমই পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘তুমি যখন একটা গাছের ছবি আঁকবা, তহন কী একরকমের সবুজ দিয়াই আঁকবা? বিভিন্ন রকমের সবুজ শেড দিয়া আঁকলে, তবেই একটা গাছের ছবি পরিপূর্ণ হয়।’ (Arghya Sen)
রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে শুভ গুহঠাকুরতার প্রশিক্ষণে অর্ঘ্য সেনের প্রথম রেকর্ড মেগাফোনে—’ছিন্নপাতার সাজাই তরণী’ আর ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর’। ১৯৬১ সালেই শুভ গুহঠাকুরতার ট্রেনিংয়ে ঋতু গুহের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে দুটি গান রেকর্ড করার সুযোগ হয় — ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’ ও ‘আমরা সবাই রাজা’। (Arghya Sen)
সুচিত্রা মিত্র ভালবাসতেন তাঁর গান। পেয়েছিলেন গায়িকার প্রশিক্ষণ। পরে সুচিত্রা মিত্র ও অর্ঘ্য সেন যৌথভাবে রেকর্ড করেন, ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জ ছায়ায়’ আর ‘ওগো কিশোর আজি তোমার দ্বারে’। (Arghya Sen)
১৯৬৬ থেকে তিনি কলম্বিয়া তথা গ্রামোফোন কোম্পানির শিল্পী। কলম্বিয়া থেকে প্রথম রেকর্ড বেরিয়েছিল ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’। তারপর দু-দশক ধরে শুনিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানা স্বাদের নানা পর্যায়ের গান।
১৯৬৬ থেকে তিনি কলম্বিয়া তথা গ্রামোফোন কোম্পানির শিল্পী। কলম্বিয়া থেকে প্রথম রেকর্ড বেরিয়েছিল ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’। তারপর দু-দশক ধরে শুনিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানা স্বাদের নানা পর্যায়ের গান। (Arghya Sen)
একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘…রবীন্দ্রনাথের কথাগুলি প্রায় সকলকেই এমনভাবে স্পর্শ করে যেন মনে হয়, কথাগুলি শুধু রবীন্দ্রনাথেরই নয়, আমাদের নিজেদেরও। তাই আমি যখন গান করি, আমার নিজের মনের কথা ভেবেই গাইবার চেষ্টা করি। ফলে কী যেন একটি বেশি এসে যায়, যা স্বরলিপিতে থাকে না। এমনকি স্বরলিপির মাত্রাভাগেরও এদিক ওদিক হয়।’ (Arghya Sen)
আজও বহু শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায় তাঁর কণ্ঠে গীত ‘আমার প্রিয়ার ছায়া’, ‘জানি গো দিন যাবে’ বা ‘কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে’। তাঁর গায়নে বিশ্বাসী উচ্চারণ হয়ে ওঠে ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে ভাবনা করা চলবে না।’
স্বরলিপির মাত্রাভাগের এদিক ওদিক কোনও কোনও জায়গায় হলেও (সেটা অনুষ্ঠানে, রেকর্ডে নয়) তিনি সবসময়ই স্বরলিপির প্রতি নিষ্ঠ ছিলেন। রবীন্দ্রগানের অন্তরটা ছুঁতে পারতেন, সেইভাবেই প্রকাশ করতেন। গায়নে ছিল একটা পরিমিত নাটকীয়তা, যার সমুজ্জ্বল প্রকাশ ‘খোলো খোলো দ্বার’, ‘দ্বারে কেন দিলে নাড়া’, ‘আর নহে আর নয়’ বা ‘ফল ফলাবার আশা’ ইত্যাদি গানে। (Arghya Sen)
আজও বহু শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায় তাঁর কণ্ঠে গীত ‘আমার প্রিয়ার ছায়া’, ‘জানি গো দিন যাবে’ বা ‘কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে’। তাঁর গায়নে বিশ্বাসী উচ্চারণ হয়ে ওঠে ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে ভাবনা করা চলবে না।’ অর্ঘ্য সেনের রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘এলো যে শীতের বেলা’, ‘এবার অবগুণ্ঠন খোলো’, ‘বসন্তপ্রভাতে এক মালতীর ফুল’, ‘জানি গো দিন যাবে’। (Arghya Sen)

পরের দিকে শিল্পীর গলায় অল্প পরিমাণে ট্রেমেলো দেখা যায়। রবীন্দ্রসংগীত মূল ক্ষেত্র হলেও, অন্য গানেও সাবলীল বিচরণ ছিল। সুপ্রভা সরকার, মঞ্জু গুপ্ত, সন্তোষ সেনগুপ্ত এবং রজনীকান্ত-দৌহিত্র দিলীপকুমার রায়ের কাছে তালিম নিয়ে গেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলামের গান, অতুলপ্রসাদ সেন ও রজনীকান্ত সেনের গান। একটা সময় বেতারে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নজরুলগীতিও গেয়েছেন নিয়মিত। রেকর্ড করেছেন অতুলপ্রসাদী, কান্তগীতি। তাঁর কণ্ঠে মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে রজনীকান্ত সেনের ‘কবে তৃষিত এ মরু’, ‘যদি মরমে লুকায়ে রবে’। অতুলপ্রসাদের ‘তুমি মধুর ছন্দে’-ও প্রাণময়। (Arghya Sen)
বেশ কিছু রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন নানা সময়। কাজ করেছিলেন মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, শান্তি বসুদের সঙ্গে। ‘বহুরূপী’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে গায়ক জানিয়েছিলেন সেই অভিজ্ঞতা— ‘মনে পড়ে, প্রথম দিন গিয়েছি। শম্ভুবাবু (শম্ভু মিত্র) বললেন — বসুন। আমি বললাম— আমাকে আপনি তুমি বলবেন। তিনি বললেন— টিকে থাকুন, আপনি তুমি হবে। টিকে থাকতে পারিনি। কিন্তু কাজ করেছি। ‘রক্তকরবী’, ‘চার অধ্যায়’ আর ‘দশচক্র’তে।’ (Arghya Sen)
রবীন্দ্রনাথের গানে সার্বিক অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে ‘সংগীত নাটক একাডেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত হন অর্ঘ্য সেন।
নির্বাচিত হন ‘টেগোর ফেলো’।
রবীন্দ্রনাথের গানে সার্বিক অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে ‘সংগীত নাটক একাডেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত হন অর্ঘ্য সেন।
নির্বাচিত হন ‘টেগোর ফেলো’। শান্তিনিকেতনে বাড়ি করে নাম রেখেছিলেন, ‘অর্ঘ্য সেনের খোঁয়াড়’। সম্পূর্ণ কালো রঙের বাড়ি। বাড়িটিও তাঁর মতোই ব্যতিক্রমী।
গানের পাশাপাশি আরও নানা বিষয়ে নিজের প্রতিভার পরিচয় রেখে গিয়েছিলেন অর্ঘ্য সেন। রবিবার রান্না করতেন হরেকরকমের। গান শেখাতেন তাঁর ‘ইয়াং স্যাঙাতদের’। (Arghya Sen)
শিল্পীর নিজের কথায়, ‘তাদের এগজিবিশনে যাই। তাদের গার্লফ্রেন্ডদের জামায়, শাড়িতে সূচিশিল্প করে দিই। কোনও মেকিং চার্জ নিই না। শুধু সুতোর দাম। আসলে সূচিশিল্প আমার কাছে এক অবসর।’
শেষদিকে শয্যাশায়ী ছিলেন কিছুদিন। অসুখের সঙ্গে লড়াই শেষে বিদায় নিলেও, শিল্পীর মৃত্যু নেই। গানেই তিনি অমর আপামর সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে। একটা গান খুব গাইতেন তিনি, ‘কূল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে/ সাগর মাঝে ভাসিয়ে দিলেম পালটি তুলে।…যেখানে নীল মরণলীলা উঠছে দুলে/ সেখানে মোর গানের তরী দিলেম খুলে।’ তাঁর প্রয়াণের পর এই গানটাই বারবার মনে পড়ছে। (Arghya Sen)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
স্বপন সোম এ কালের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সংগীত গবেষক। গান শিখেছেন মোহন সোম, মায়া সেন ও সুভাষ চৌধুরীর মতো কিংবদন্তীদের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে 'দেশ' পত্রিকায় সংগীত সমালোচনা করেছেনl গান নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন 'আনন্দবাজার পত্রিকা', 'দেশ', 'আনন্দলোক', 'সানন্দা', 'আজকাল', 'এই সময়', 'প্রতিদিন' প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়l
