(Rituparno Ghosh)
আশির দশকের মাঝামাঝি কোনও এক সময়ের কথা। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে অবস্থিত ১০৩ নম্বর বাড়িটি- যেটি টিভোলি কোর্ট নামেই খ্যাত- সে-বাড়ির ১/এ ফ্ল্যাটটি হয়ে উঠেছিল বাংলা বিজ্ঞাপণের এক নব্য পীঠস্থান। রেসপন্স অ্যাডভার্টাইসিং নামক এক বাঙালি সংস্থা তখন বাংলা বিজ্ঞাপন ও সাংস্কৃতিক জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল। কর্ণধার শ্রী রাম রায় সদ্য হিন্দুস্তান থমসন অ্যাসসিয়েট্স-এর চাকরি ছেড়ে নিজের বিজ্ঞাপন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করলেন। সম্ভবত বাংলা বিজ্ঞাপন জগতে এক নতুন যুগের প্রবর্তন ঘটল রেসপন্স অ্যাডভার্টাইসিং-এর স্থাপনের মাধ্যমে। (Rituparno Ghosh)
সেই সময় এদেশে বিজ্ঞাপন ব্যবসা জুড়ে অধিকাংশই ছিল বহুজাতিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা। লিন্টাস, হিন্দুস্থান থমসন, ম্যাকক্যান এরিকসন, ত্রিকায়া-গ্রে প্রভৃতি। এছাড়াও আরও বেশ কিছু বড়, মাঝারি মাপের বিজ্ঞাপন সংস্থা। লোকমুখে এককথায় যাকে বলা হত ‘অ্যাড এজেন্সি’ আর যেখানে কাজ করতেন শিল্পী, সাহিত্যিক গোছের মানুষজন। এইসব এজেন্সিতে ছিল বড় বড় কিছু ন্যাশনাল ব্র্যান্ড। সিগারেট, বিস্কিট, সুটিং, শার্টিং, ঘড়ি, জুয়েলারি- কী নেই? কনজ্যুমারিজম এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভারতীয় বাজারে। তার কিছু পরেই দেখা যাবে, বিজ্ঞাপন দেখতে তখন শুধু পত্রিকা দেখতে হচ্ছে না কিম্বা মানুষকে সিনেমা হলে ছুটতে হচ্ছে না- প্রাইভেট টেলিভিশনের দৌলতে আর কেবল-টিভির সাহায্যে রঙিন অডিয়ো-ভিজ্যুয়াল বিজ্ঞাপন তখন সরাসরি হানা দেবে সকলের বেডরুমে। (Rituparno Ghosh)

এমন একটা সময়, কলকাতা শহরে বাংলা বিজ্ঞাপণের কাজ নিয়ে দিগন্তে উদয় হল, এই নতুন বিজ্ঞাপণী সংস্থা। একেবারে স্থানীয় প্রোডাক্ট নিয়ে বাংলা ভাষায় যাঁরা বিজ্ঞাপনের কাজ করবেন- শুধুই দিল্লি বা মুম্বাইতে সৃষ্টি করা ইংরিজি বা হিন্দি বিজ্ঞাপনের নিছক বাংলা তর্জমা নয়। যে বিজ্ঞাপনে আছে মাটির গন্ধ, যে-বিজ্ঞাপনে আছে বাংলা সংস্কৃতির ছোঁয়া, যে-বিজ্ঞাপন থাকবে বাংলা ভাষার নান্দনিক ব্যবহার, যার পিছনে কিছু সৃজনশীল মানুষের ভাবনা কাজ করবে এবং যাঁদের হাত ধরে বাংলা বিজ্ঞাপন উপভোক্তাদের কাছে পরিবেশিত হবে এক নতুন আঙ্গিকে। (Rituparno Ghosh)
বিজ্ঞাপন নিয়ে এমন ভাবনা খুব একটা সহজ বিষয় ছিল না, কারণ বিজ্ঞাপন বা তার কাজকর্মের পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ খুব একটা যে কিছু বুঝতেন তা কিন্তু নয়। পেশা হিসেবে বিজ্ঞাপন কেমন, সেটা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না। ভাল চাকরি মানে একটা যে কোনও সরকারি, আর নয়তো খ্যাত্যনামা বেসরকারি সংস্থা– সে হতে পারে কলকাতার কোনও নামি খবরের কাগজ, অথবা বহুজাতিক কোনও সিগারেট কম্পানি কিম্বা ব্যাংক। বিজ্ঞাপনের চাকরি বলে একটি বস্তু সম্পর্কে ধারণা ছিল না। (Rituparno Ghosh)
অথচ এই কলকাতাই ছিল বিজ্ঞাপন ব্যবসার সূতিকাগৃহ। প্রাচীন শহর কলকাতা। ব্রিটিশ শাসকদের হাত ধরে একটু একটু করে এই শহর নিজেকে গড়ে তুলেছিল বিজ্ঞাপন ব্যবসায়। বেচা কেনার বাজার বলতে তো ছিল সংসারে প্রয়োজনীয় নিত্যদিনের সামগ্রী। চাল, ডাল, বস্ত্র ইত্যাদি- এই ছিল কেনাকাটার এক্তিয়ার সাধারণ মানুষের। সাহেবদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিংবা শখের জিনিসপত্র সমস্ত কিছুই আসত জাহাজ বোঝাই করে। সুন্দরীদের জামা-জুতো, আতর-সেন্ট, সাহেবদের মদ থেকে শুরু করে তামাক, বইপত্র সবটাই আমদানী হত বিলেত থেকে। অতএব স্থানীয় কাগজে বিজ্ঞাপন বলতে তেমন কিছুই থাকত না। বড়োজোর আদালতের কোনও একটা নোটিস কিংবা কোনও টেন্ডারের আহ্বান। এমনকি কোনও মেমসাহেবের কুকুরছানাটি হারিয়ে গিয়েছে— সেই বিজ্ঞাপনও ছাপা হত। (Rituparno Ghosh)
“ছেলেবেলা থেকেই হয়তো বাবাকে দেখেছেন এক প্রবল অনুশাসনের মাঝে কাজ করতে। হ্যাঁ, ঋতুপর্ণ সেই সুনীল ঘোষের পুত্র যাঁর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন নান্দনিক অনেক কিছুই যা তাঁকে পরবর্তী জীবনে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।”
বিগত শতকের তিরিশের দশকে কলকাতা শহরে স্থাপিত হয়েছিল কলকাতা শহরের প্রথম বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো— যাকে সাধারণত ‘অ্যাড এজেন্সি’ বলা হয়। পাশাপাশি গজিয়ে উঠেছিল বেশ কিছু বিদেশি বিজ্ঞাপন এজেন্সিও। এভাবেই তিলে তিলে গড়ে ওঠা কলকাতার বিজ্ঞাপনের ইতিহাসের অংশ হয়ে ছিলেন বহু নামিদামি মানুষ। হ্যাঁ, ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বেশ কিছু পরিচালক আছেন যাঁরা পেশাগত জীবনের প্রারম্ভে কিছুদিন বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের চলচ্চিত্রে অবদান এতটাই যে সেই অবদান ঘিরে তাঁদের চারপাশে এক বলয় সৃষ্টি হয়। যার ফলে তাঁর প্রথম জীবনের কাজকর্ম সম্পর্কে অনেকেই জানতে পারেন না। খুব হাতেগোনা মানুষজন হয়তো জানেন, কিন্তু অধিকাংশই সেই খবর রাখেন না। (Rituparno Ghosh)
তুলনায় যদিও তাঁর আবির্ভাব বেশ পরে কিন্তু বলাই বাহুল্য, ঋতুপর্ণ ঘোষও সেই সৃজনশীল দলের এক গুরত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন যিনি চিত্র-পরিচালকের তকমার আগে, পেয়েছিলেন বিজ্ঞাপন জগতে ক্রিয়েটিভ-রাইটার’এর তকমা। বাজার বিপণন ও বিজ্ঞাপনের রণাঙ্গণে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রথম সারির এক সৈনিক। তাও বেশিদিন আগের কথা নয়– ১৯৮৮ সালে বিজ্ঞাপন এজেন্সির মাধ্যমে পেশাগত জীবনে পা রাখলেন, যখন রেসপন্স অ্যাডভার্টাইসিং’এর সঙ্গে যুক্ত হলেন ঋতুপর্ণ। অদ্ভুত কম্বিনেশন – যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্স নিয়ে পাশ করে বিজ্ঞাপনের কাজে যোগ দিলেন তিনি। (Rituparno Ghosh)
“Not really”, একটু ভেবে বললেন ঋতুপর্ণ, “Actually… Never thought of something like ‘learning for earning’ you see… আসলে আমার profession-এ যদি আমার passion না থাকে, then it’d be fatal I suppose.”
বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন ফিল্ম-মেকার। বেশ কিছু তথ্যচিত্র ছিল তাঁর ঝুলিতে। আর তাই বোধহয় ঋতুপর্ণের রক্তেও ছিল সিনেমা, আর ছিল সিনেমা নির্মাণে সঠিক পদ্ধতি মেনে কাজ করার অভ্যাস। পড়াশোনা, রিসার্চ, ফিল্ম গ্রামার— এসব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাজের অঙ্গ ছিল। ছেলেবেলা থেকেই হয়তো বাবাকে দেখেছেন এক প্রবল অনুশাসনের মাঝে কাজ করতে। হ্যাঁ, ঋতুপর্ণ সেই সুনীল ঘোষের পুত্র যাঁর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন নান্দনিক অনেক কিছুই যা তাঁকে পরবর্তী জীবনে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। সুক্ষ্মতা তাঁর কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল সেটা অনস্বীকার্য। আর তাই, অস্বীকার করার উপায় নেই– বিজ্ঞাপন হোক বা সিনেমা– দুই ক্ষেত্রেই, সেই কারণেই তিনি খুব দ্রুত উন্নতি করেছিলেন। (Rituparno Ghosh)
জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। কলকাতার এক নতুন ‘অ্যাড-এজেন্সি’- রেসপন্স অ্যাডভার্টাইজিং থেকে ডাক এসেছে ঋতুপর্ণর। সদ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এক যুবক সোজা চলে গিয়েছিলেন ইন্টারভিউ দিতে। (Rituparno Ghosh)

কাচের দরজা ঠেলে ঢুকলেন ঋতুপর্ণ। এ কী অদ্ভুত সাজসজ্জা অফিসের। ভিতরে ঢোকার মুখে দরজার পাশেপাশে হোক বা রিসেপশন- সমস্ত এলাকা জুড়ে বিশাল বিশাল সাদাকালো সব ব্রোমাইড ফ্রেম প্রিন্ট ফ্রেম করে ঝোলানো। ভারি মজার সে-ছবির বিষয়গুলো। কোনওটা ট্যাঁশ গোরু, কোনওটা হুঁকোমুখো হ্যাংলা, কোথাও আবার কুমড়োপটাশ কিংবা কাঁধে তার আবিষ্কৃত কল নিয়ে ‘খুড়ো’। ভারি মজা পেলেন ঋতুপর্ণ। অনেক রকমের ছবি ডিসপ্লে হতে দেখেছেন। এই তো কিছুদিন আগে বন্ডেল রোডে হিন্দুস্থান থমসন অ্যাসোসিয়েটের অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে অফিস জুড়ে দেখেছিলেন কোম্পানির নানা সময়ে করা বিজ্ঞাপনের ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে অফিসের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে। (Rituparno Ghosh)
“আসতে পারি?”, দরজা অল্প খুলে চেম্বারে যিনি বসে, তাঁর উদ্দেশে বললেন। কোম্পানির কর্ণধার শ্রী রাম রে (রায়) মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, “Yes, please come in”। (Rituparno Ghosh)
রাম খুব মন দিয়ে ঋতুপর্ণর বায়োডাটা পড়লেন তারপর সেটাকে যত্ন করে সামনে টেবিলের ওপর রেখে ঋতুপর্ণর দিকে তাকিয়ে বললেন, “Economics… Why do you then plan to choose advertising for a career? Or is it just a stop gap arrangement?” (Rituparno Ghosh)
“যেই কাজ আমার মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না কিংবা মনের কথা যেই কাজের মধ্যে দিয়ে আমি প্রকাশ করতে পারি না, সেই কাজটা হয়তো আমি মন দিয়ে করতেই পারব না, পেশা হিসেবে নেওয়া তো দূরের কথা।”
“Not really”, একটু ভেবে বললেন ঋতুপর্ণ, “Actually… Never thought of something like ‘learning for earning’ you see… আসলে আমার profession-এ যদি আমার passion না থাকে, then it’d be fatal I suppose.”
“… and what’s your passion?”, প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন রেসপন্স অ্যাডভার্টাইসিং-এর কর্ণধার রাম রে।
“Everything creative”, উত্তর দিলেন ঋতুপর্ণ, “যেই কাজ আমার মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না কিংবা মনের কথা যেই কাজের মধ্যে দিয়ে আমি প্রকাশ করতে পারি না, সেই কাজটা হয়তো আমি মন দিয়ে করতেই পারব না, পেশা হিসেবে নেওয়া তো দূরের কথা।” (Rituparno Ghosh)
কথাগুলো রাম রে-র ভাল লাগে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে বললেন, “Interesting!”
“ছেলেবেলা থেকেই বই ছিল তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস। যেন বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। এবং সেই জন্যই তাঁর সাহিত্যানুরাগের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কাজেকর্মেও।”
“এই যেমন…”, আবার বলতে আরম্ভ করলেন ঋতুপর্ণ, “আপনার আপিসে ঢুকেই আমার বেশ দারুণ লেগেছে। ভীষণ ক্রিয়েটিভ একটা পরিবেশ… By the way, I loved those huge prints on the walls. অফিসে ঢোকার মুখেই দেখলাম কুমড়োপটাশ, হুঁকোমুখো হ্যাংলা, ট্যাঁশ গোরু— এরা সবাই আমাকে অভ্যর্থনা জানাল মনে হল।” (Rituparno Ghosh)
“তাহলে কি এটা আবোল তাবোল জায়গা?”
“No not really. I think this is what creativity is all about. এরা সাধারণ কল্পনার বাইরে বাস করা কিছু চরিত্র। একজন সৃজনশীল সৃষ্টিকর্তার মগজপ্রসূত ওই চরিত্রগুলো আমাদের মতনই অথচ আমাদের থেকে কতই না আলাদা। Out of the box thinking” (Rituparno Ghosh)
ঋতুপর্ণর কাছে এই চরিত্রগুলো বড্ড প্রিয়। সেই কোন ছোটবেলা থেকেই ওদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা। মনে আছে, সেই সাউথ পয়েন্টে পড়ার সময় একবার ‘হ য ব র ল’ নাটকে ঋতুপর্ণ অভিনয় করেছিলেন। গুলচাঁদ ন্যাড়ার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। খুব সম্ভবত সেই নাটকটি কথাসাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদারের তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। (Rituparno Ghosh)
ছেলেবেলা থেকেই বই ছিল তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস। যেন বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। এবং সেই জন্যই তাঁর সাহিত্যানুরাগের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কাজেকর্মেও। (Rituparno Ghosh)
ঋতুপর্ণ লিখেছিলেন ‘বোরোলিন- বঙ্গজীবনের অঙ্গ’। আর সেই ক্যাপশন রাতারাতি ক্রিম’টিকে বাঙালির কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলল। যদিও সাধারণ মানুষ জানল না তাদের মুখে মুখে যে কথাটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা কার মগজপ্রসূত? কে লিখেছেন? তবে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন কিন্তু নড়েচড়ে বসেছিলেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ নামটি অফিসে অফিসে ভেসে বেড়াচ্ছিল— “কে এই ঋতুপর্ণ? বাংলা ভাষায় ব্র্যান্ড বিল্ডিং? এমনটা তো আগে কখনও শুনিনি!” (Rituparno Ghosh)
পুজোর আর মাত্র একমাস মতন বাকি। সেদিনের সেই গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের পরে রেসপন্সের ক্রিয়েটিভ টিম আর মিডিয়া প্ল্যানিং রণাঙ্গনে নেমে পড়ছিল। (Rituparno Ghosh)
“চন্দ্রানীদি, আমার প্রিয় বিষয় মহাভারত”, উত্তরে বললেন ঋতুপর্ণ, “আমার মনে হয়, মহাভারত যে পড়েছে তার কাছে সবকিছুই সরল হয়ে যায়। এ যেন সেই ক্লাসিকাল গানের মতন।”
বোরোলিনের নতুন ক্যাম্পেনের ‘Big Idea’ নিয়ে একের পর এক Brainstorm Session থেকে অবশেষে উঠে এসেছিল এক অসাধারণ ক্যাম্পেন প্ল্যান। এক দুর্দান্ত সিরিজ যা সে-বছরের প্রিন্ট মিডিয়াতে ভীষণ সাড়া জাগিয়ে ফেলবে। পাশাপাশি ঋতুপর্ণকে বিজ্ঞাপন জগতে আরও গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য করে তুলবে। (Rituparno Ghosh)
বিজ্ঞাপণের আইডিয়াটি কিন্তু ঋতুপর্ণর একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতেই হয়েছিল। পুরো ক্যাম্পেন ডিজাইন রেডি করে একটা প্রেজেন্টেশনের জন্য আবার সবাই উপস্থিত হয়েছিল মিটিংরুমে। টানা দেড় ঘণ্টা প্রেজেন্টেশন মিটিং চলার পর শুরু হল পর্যালোচনা। প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পরে কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁদের এম.ডি. রাম রে’র দিকে। তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি কী ভাবছেন? চোখ বুজে বসেছিলেন তিনি। ঘুমিয়ে পড়েছেন কী না তাও বোঝা সম্ভব না। এমনিতেও ওঁর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, তিনি কিন্তু ইচ্ছে করলেই যে-কোনও পরিস্থিতিতে ঘুমিয়ে পড়তে পারতেন। ভীষণ খুঁতখুঁতে মানুষ রাম। সহজে তাঁকে কোনও কিছু বুঝিয়ে ফেলা যেত না। (Rituparno Ghosh)

সেই মানুষটা কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে থেকে অবশেষে মুখ খুললেন, “Good, I think the campaign has the potential to be successful. Rituparno, this is a great job done. I loved the copy. খুব ভাল লিখেছেন।” (Rituparno Ghosh)
মিডিয়া ম্যানেজার চন্দ্রানী গুপ্ত সহসা বলে উঠলেন, “আচ্ছা ঋতু, এই এত অল্প বয়েসে মাইথোলজি নিয়ে এত পড়াশোনা কী করে করলে? কত কিছু জানো… অবাক করলে!” (Rituparno Ghosh)
“চন্দ্রানীদি, আমার প্রিয় বিষয় মহাভারত”, উত্তরে বললেন ঋতুপর্ণ, “আমার মনে হয়, মহাভারত যে পড়েছে তার কাছে সবকিছুই সরল হয়ে যায়। এ যেন সেই ক্লাসিকাল গানের মতন। কথায় বলে, শুধুমাত্র ইমন রাগ ঠিক মতন শিখলে না কি ধ্রুপদী সংগীত প্রায় অনেকটাই শেখা হয়ে যায়। মহাভারত বিষয়টাও অনেকটা সেইরকম।” (Rituparno Ghosh)
“অসুরের গলায় মালা পরিয়েছে কেন মা? ও তো দুষ্টু!” পাড়ার পুজো মণ্ডপে অষ্টমীর সকালে মায়ের সঙ্গে আসা ছোট্ট শিশুটির কথা শুনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল।”
তাঁর প্রিয় বই সত্যিই মহাভারত ছিল। তাঁর লেখার মূল অনুপ্রেরণা। অসম্ভব সাহিত্য জ্ঞান ছিল তাঁর। শুধু তাই নয় তিনি যে-কোনও লেখকের স্টাইল অনুকরণ করে লিখে ফেলতে পারতেন। আর তাই বুঝি তিনি পেরেছিলেন সেবার এত সুন্দর একটা ক্যাম্পেইন উপহার দিতে। ‘অথ চালচিত্র কথা’ এই ছিল ক্যাম্পেনের থিম। ঋতুপর্ণ লিখেছিলেন দুর্গার চালচিত্রের ইতিহাসের কথা- ‘মহিষাসুরমর্দিনীর উৎস সন্ধানে’। এবং প্রথম বিজ্ঞাপনটির হেডলাইনে লেখা ছিল— “অসুরদলনী বলি পূজি দশভুজা/সঙ্গে কেন করি তবে অসুরেরও পূজা?” (Rituparno Ghosh)
এ তো হঠাৎ লেখা লাইন নয়। এর পিছনে যে আছে দীর্ঘকালের পড়াশোনা। সে সব জানতে তাহলে একবার চলে যেতে হয় ঋতুপর্ণের ছেলেবেলায়-
“অসুরের গলায় মালা পরিয়েছে কেন মা? ও তো দুষ্টু!” পাড়ার পুজো মণ্ডপে অষ্টমীর সকালে মায়ের সঙ্গে আসা ছোট্ট শিশুটির কথা শুনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। শিশুটির মা মুচকি হেসে বলল, “তুমি বড়ো হলে সব বুঝতে পারবে”। (Rituparno Ghosh)
“বাংলা বিজ্ঞাপন তখন তার নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। সে নিছক কোনও ন্যাশনাল ব্র্যান্ডের বাঙালি কনজিউমারের জন্য ইংরিজি বা হিন্দি বিজ্ঞাপনের শুধুমাত্র বাংলা রূপান্তর নয়। আর সেই ভাবেই জন্ম নেয় এশিয়ান পেন্টসের পুজোর জন্য এক নতুন বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেন।”
মনঃপুত হয়নি কথাটা। প্রশ্নের উত্তর না পেলে শিশুটির কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। মন চায় উত্তর খুঁজে পেতে। কৌতূহল সব সীমা লঙ্ঘন করে, যখন সে-শিশুটি দেখে যে, বিসর্জনের দিন বরণের থালা হাতে তার মা অসুরকে সন্দেশ খাওয়াচ্ছে। নাঃ, প্রশ্নের উত্তর বোধহয় কেউ দিতে পারবে না, নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। উত্তর পেতে মলাটবন্দি কিছু পাতা ঘেঁটে ফেলতে হবে। (Rituparno Ghosh)
বই পড়ার অভ্যাস শিশুটির অক্ষরজ্ঞানের পর থেকেই গড়ে উঠেছিল। আর তাই, যে-কোনও প্রশ্নের উত্তর পেতে সে শরণাপন্ন হত বইয়ের। এবারেও ঠিক তাই হল, শিশুটি একটি বইতে পেয়ে গেল তার প্রশ্নের উত্তর। ছুট্টে গেল মায়ের কাছে, “মা! এই দেখ কী বলেছে এই বইতে…” (Rituparno Ghosh)
ছেলের হাতে ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ দেখে অবাক হল তার মা। জিজ্ঞাসা করেছিল, “এটা তুমি কোথায় পেলে?”
“ওই যে, বাবার বুক-র্যাকে ছিল”, উত্তর দিল ছোট্ট শিশুটি, “জানো তো, এই বইটাতে বলছে অসুর দুর্গাঠাকুরকে প্রার্থনা করে বলল— সেও যেন দুর্গাঠাকুরের সঙ্গে সব পুজো পায় আর যেন মা দুর্গার সেবা করতে পারে। জানো মা দুর্গা কী বলল?” (Rituparno Ghosh)
“এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’র অনুরণন। তা না হলে জনপ্রিয় সিনেমার পত্রিকা ‘আনন্দলোক’ নতুন আঙ্গিকে সর্বসমক্ষে এলে তিনি বলেছেন, ‘উলটে দেখুন পালটে গেছে’। ছবিওয়ালা হয়ে ওঠার আগে তিনি ছিলেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।”
মা মুগ্ধ হয়ে ছেলের দিকে চেয়ে ছিলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলল?”
“দুর্গা ঠাকুর বলল…”, ঋতুপর্ণ বইটা টেবিলে রেখে বলতে আরম্ভ করল, “পূজার দায়িত্ব তো সব দেবতার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তাই তুমি তো বাপু সে অধিকার পাবে না। তবে তুমি আমার পায়ের কাছে বসে আমার সেবায় ব্যস্ত থাকবে এবং যেখানে আমার পূজা হবে সেখানে তুমিও পূজা পাবে। তাই দুর্গাপূজার কাঠামোয় অসুরের জায়গা হয়েছে মা দুর্গার পায়ের কাছে। তাই অসুরের পূজা হয়। এটা নিয়ে কেউ কেন ফিল্ম করেনি? বাবাকে বলব একটা ফিল্ম করতে এটা নিয়ে” (Rituparno Ghosh)
মা মুগ্ধ হয়ে চেয়েছিলেন ছেলের পানে। এই বয়েসে তার জানার এত ইচ্ছা! গর্ব হচ্ছিল তার ছেলের জন্য।
“স্বপ্নেরও ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটে; স্বপ্নেরাও একসময় ফুরিয়ে যায়। ঘুম ভাঙে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার তাগিদে। ঋতুপর্ণর সঙ্গেও তেমনটাই হয়েছিল।”
শিশুকালের হাত ধরে সুদীর্ঘ পথ হেঁটে এসে যৌবনের এ এক সুন্দর ছবি। সেই কোন ছেলেবেলায় বাবার ঘরের র্যাকে রাখা সেই বইগুলো যেন ডানা মেলে তাঁর চারপাশে হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল। পাতাগুলো থেকে একটা একটা করে ছোটো ছোটো চরিত্রগুলো টুপটাপ করে খসে পড়ছিল তার খাতার পাতায়। এ যেন এক স্বপ্নের মতন চোখ খুললেই ভেঙে যাবে। শুধুই ছোট ছোট চরিত্রগুলো কেন– অসুর, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ– এরা সামগ্রিকরূপেও শারদোৎসবের মোড়কে যে তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আর তাই তো, রেস্পন্স ছাড়াও সে ডাক পেত অন্য কোনও বিজ্ঞাপন এজেন্সি থেকে– যদি ফ্রিলান্সে সে তাদের ক্যাম্পেন করে দেয়। (Rituparno Ghosh)
বাংলা বিজ্ঞাপন তখন তার নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। সে নিছক কোনও ন্যাশনাল ব্র্যান্ডের বাঙালি কনজিউমারের জন্য ইংরিজি বা হিন্দি বিজ্ঞাপনের শুধুমাত্র বাংলা রূপান্তর নয়। আর সেই ভাবেই জন্ম নেয় এশিয়ান পেন্টসের পুজোর জন্য এক নতুন বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেন। এ তো শুধুমাত্র শারদ সম্মান নয়– বাংলা কপিরাইটিঙের সম্মান। যে সম্মান এনে দিল বাঙালির আপন সৃজনশীল বিজ্ঞাপনের সুলতান ঋতুপর্ণ ঘোষ– যার চোখে বাঙালির দুর্গোৎসব মানে ‘ঐতিহ্যের পুজো, উদ্দিপনার উৎসব’। (Rituparno Ghosh)

নিপাট মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, যার পক্ষে সাধারণ বাঙালির ঘরে ঘরে ব্যবহৃত ‘মার্গো নিম সাবান’ চিনতে বা বুঝতে অসুবিধে হয় না। অসুবিধে হয় না স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতেও যে সাবানটি ‘দেখতে খারাপ মাখতে ভাল’। কিম্বা সকালের চা’কে সহজেই ‘ব্রিটানিয়া’ বিস্কুটের ব্র্যান্ডের সাথে ‘তোমার সকাল– আমার সকাল’ বলে যোগ করে দিতে পারেন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’র অনুরণন। তা না হলে জনপ্রিয় সিনেমার পত্রিকা ‘আনন্দলোক’ নতুন আঙ্গিকে সর্বসমক্ষে এলে তিনি বলেছেন, ‘উলটে দেখুন পালটে গেছে’। ছবিওয়ালা হয়ে ওঠার আগে তিনি ছিলেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। (Rituparno Ghosh)
স্বপ্নেরও ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটে; স্বপ্নেরাও একসময় ফুরিয়ে যায়। ঘুম ভাঙে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার তাগিদে। ঋতুপর্ণর সঙ্গেও তেমনটাই হয়েছিল। তাঁর বিজ্ঞাপনের দিনগুলো তাঁকে এমন একটা স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে তাঁর হয়তো নতুন করে দেওয়ার আর কিছু ছিল না। হয়তো পাওয়ারও কিছু ছিল না। বিজ্ঞাপনের জগতে তাঁর কাজ শেষ হয়ে এসেছিল। আর-এক নতুন স্বপ্ন হাতছানি দিয়ে তাঁকে ডাকছিল। রুপোলি পর্দার আলো-ছায়ার জগতের চুম্বকীয় আকর্ষণ তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। এই সময়েই যখন তিনি স্থির করলেন বিজ্ঞাপনের চাকরি থেকে অবসর নেবেন, তখন কিন্তু তিনি সাফল্যের সোপানে অনেকটাই উঁচুতে উঠে গিয়েছেন। যে-সাফল্য তিনি খুব অল্প সময়েই অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে সাফল্যের চেয়ে তাঁর কাছে জরুরি ছিল অন্তরের ডাকে সাড়া দেওয়া। (Rituparno Ghosh)
আরও পড়ুন: রূপলাল হাউস: ভাঙা কার্নিশে হলুদ শাড়ি আর অন্দরে জৌলুশের মরিচা
ঋতুপর্ণ বলেছিলেন, “বিজ্ঞাপনের শিল্প বড্ড বেশি কেনা-বেচার নাগপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। শিল্পের ওপর বাজারের প্রভাবটা যেন একটু বেশিই। সেই শিল্প-স্বাধীনতা পাওয়া যায় না।”
কিছুটা হয়তো তাই। কিন্তু বিজ্ঞাপন ছেড়ে যে-শিল্প তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেখানেও বাজারের প্রভাব যে প্রখর সে-বিষয়ে হয়তো তাঁর সন্দেহ ছিল না। সেই জন্যই হয়তো তাঁর প্রথম ছবির পরে তাঁর পরবর্তী সবকটা ছবিই প্রায় বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছিল। কে জানে? হয়তো তার পিছনেও কাজ করেছিল তাঁর বিজ্ঞাপনের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। একদিন যে-মানুষটি প্রায় খেলার ছলে লিখে দিয়েছিলেন ‘বোরোলিন: বঙ্গজীবনের অঙ্গ’ তিনি কি জানতেন যে, অজান্তেই তিনি লাইনটি নিজের জন্যেও লিখে ফেলেছিলেন? (Rituparno Ghosh)
ছবি সৌজন্য- আন্তর্জাল
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
সুতীর্থ দাশ জন্ম হরিয়ানার শিল্পনগরী ফরিদাবাদে। পিতার কর্মসূত্রে বাল্য-কৈশোর কেটেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের একাধিক শহরে। কলকাতায় এসে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে শিল্পশিক্ষার পাঠ নেওয়ার পর বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি। দীর্ঘ ১২ বছর বিজ্ঞাপনের পেশায় থাকার পর, পেশা বদল করে আসেন বেসরকারি রেডিও প্রোগ্রামিং’য়ের চাকরিতে। সেখানে আরও ১৮ বছর কাটিয়ে বর্তমানে ভারতের এক স্বনামধন্য মিউজিক কম্পানিতে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের কাজে যুক্ত।
পেশাগত কাজকর্মের পাশাপাশি ভালোবাসেন ছবি আঁকতে এবং লিখতেও। নিজের শিল্পীমন দিয়ে তিনি লেখেন গ্রাম-শহরের নানা কাহিনি। ছোট ছোট গল্পের জাল বুনে তিনি লিখে চলেন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি।
অজস্র প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই তিনি লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি বইও। সেগুলোর মধ্যে শহর কলকাতার বিভিন্ন আখ্যান নিয়ে লেখা ‘তিলোত্তমার গর্ভজাত’ পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়াও জাগিয়েছে। রেডিয়ো নিয়ে তাঁর প্রথম বই ‘তরঙ্গে অন্তরঙ্গে – কলকাতা বেতারের উপকথা’ ইতিমধ্যে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।