(Social Media)
একেবারে শুরুর দিনগুলোতে, যখন মানুষ সদ্য লেখা শিখেছে; প্যাপিরাস, পাথর কিংবা কাদার তালে ফুটিয়ে তুলছে প্রথম অক্ষরগুলো, তখন এই লেখা চুরির হ্যাপাই ছিল না! প্রথমত, লেখার সরঞ্জাম ছিল নেহাত কম, খরচাও মেলা, আর তাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বাদে (রাজার আদেশ, ঈশ্বরের বাণী) কিছু লেখাও হত না। (Social Media)
একটু পরে যখন একের পর এক ধর্মগ্রন্থের জন্ম হল, তখনও লেখা চুরির কথা কেউ ভাবেনি। মধ্যযুগে ইউরোপীয় সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল ধর্ম। পাণ্ডুলিপি নকল করতেন সন্ন্যাসীরা, এবং সেখানে ব্যক্তি লেখকের ধারণা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বাইবেল, ধর্মীয় ব্যাখ্যা কিংবা দর্শনের গ্রন্থ, এক লেখক থেকে আরেক লেখকের হাতে ঘুরে বেড়াত, প্রায়শই কোনও স্বীকৃতি ছাড়াই। এখানে প্ল্যাজিয়ারিজমের প্রশ্ন ওঠেনি, কারণ জ্ঞানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি না ভেবে ঈশ্বরপ্রদত্ত সত্য হিসেবে ধরা হত। (Social Media)
ল্যাটিনে তো বহুলপ্রচলিত একটা কথাই ছিল— ‘Scripta manent. Verba volant.’ আপাত অনুবাদে, এই ল্যাটিন বাক্য দুটোর মানে ‘লেখা থেকে যায়। ধ্বনি বাতাসে মিলিয়ে যায়’। মজার কথা মূল অর্থ সম্পূর্ণ উলটো। লেখা বা লিখিত শব্দ আবদ্ধ থাকে বই বা পুঁথির পাতায়। সে প্রাণহীন, অচল। একমাত্র নিজের স্বরযন্ত্র দিয়ে উচ্চারণ করে মানুষ সেই মৃত শব্দে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। শব্দ ভেসে চলে বাতাসে। কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে। (Social Media)

আসলে শব্দ তো ঈশ্বর; আর এই শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠকের কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দন্ত, ওষ্ঠ পবিত্র শব্দ পরশে আপ্লুত হয়। ঠিক সে জন্যই ধর্মগ্রন্থদের মনে মনে পড়া হয় না, পাঠ হয়। আর সেই কথক খানিক সময়ের জন্য হলেও হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের অংশ, যার ধ্বনি বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পাঠ শেষে তাই তিনি প্রণাম পান। কারণ তিনিই জড় শব্দে প্রাণ এনেছেন… ‘scripta manent. verba volant.’ (Social Media)
এরপর ধীরে ধীরে ব্যক্তি লেখক সামনে আসতে শুরু করলেন। ভাবতে অবাক লাগে, শেক্ষপীর সাহেব প্রাচীন গ্রিক ও রোমান কাহিনি, এমনকী সমসাময়িক নাটক থেকেও ব্যাপকভাবে উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে সেগুলিকে নতুন ভাষা ও নাট্যগঠনে রূপান্তর করেছিলেন। আজ তাঁকে প্ল্যাজিয়ারিস্ট বলা হয় না, বরং বলা হয় মহান রূপকার। কিন্তু ধীরে ধীরে সরাসরি অনুকরণ নিন্দনীয় হয়ে ওঠে। ১৭১০ সালের ইংল্যান্ডে ‘Statute of Anne’ পাশ হয়, যা প্রথম আধুনিক কপিরাইট আইন হিসেবে পরিচিত। (Social Media)
বিশ্বজোড়া জালের দিনে লেখা প্রকাশ, আগের মতো আর কষ্টকর নয়।
এ তো গেল ইতিহাসের কথা। কিন্তু একেবারে আধুনিক যুগে তাকালে গ্রুপে গ্রুপে, ওয়ালে ওয়ালে একে অপরের উপর বিষোদ্গার দেখতে পাই। বক্তব্য একটাই। ‘ও আমার কন্টেন্ট চুরি করেছে’। বিশ্বজোড়া জালের দিনে লেখা প্রকাশ, আগের মতো আর কষ্টকর নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে আমরা লিটিল ম্যাগাজিন শুরু করি। এই কিছুদিন আগেও, ফেসবুকের এই প্রচণ্ড প্রভাবের আগে অবধি, লিটিল ম্যাগাজিন একটা সাধারণ ধারায় চলত। খুব সম্ভব, এর আগেও সেই ধারাটাই ছিল। প্রথমে সমমনস্ক (এবং প্রায় সমবয়সী) চার-পাঁচজন ছেলে মেয়ে নিজেদের লেখালেখি প্রকাশের তীব্র তাগিদে ঠিক করত, সবাই মিলে একটা লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশ করবে। এক্ষণ, ধ্রুবপদ-এর মতো ম্যাগাজিনগুলি এই হিসেবের বাইরে। (Social Media)
লিটিল ম্যাগাজিনে কোথাও না কোথাও একটা কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ব্যাপার থাকতই। না রেখে উপায় কী? কম্পোজ করতে পয়সা লাগে, প্রুফ চেকারকে ফর্মা গুণে পয়সা দিতে হয়, হাতে অঢেল টাকা নেই যে মোটা পত্রিকা বানানো যাবে। তাই সম্পাদক চেষ্টা করতেন, জ্ঞান-বুদ্ধি মতো সেরা লেখাগুলো দিয়ে সংকলন সাজাতে। (Social Media)

ফেসবুক আর ব্লগ এসে ইদানিং লিটিল ম্যাগাজিনের অদম্য, ভাল লেখার চাহিদাকেই মেরে দিয়েছে। ফেসবুক সাহিত্যের খুব সুন্দর দুটি দিক আছে। এক— যাঁরা আগে কোনও দিন লেখা বা লেখা প্রকাশের কথা ভাবেননি, তাঁরাও লেখার সাহস করছেন। কয়েকজন দারুণ লিখছেনও। দুই— এই বিশ্বজোড়া জালে সবাই সবার উপর নজর রাখছে। তাই, ভাল লিখলে আপনি নজরে পড়বেনই, আর আপনার লেখা প্রকাশের সম্ভাবনা অবশ্যই আগের থেকে অনেক বেশি হবে। (Social Media)
কিন্তু মুশকিল অন্য জায়গায়। পেজ, ব্লগ বা ই-পত্রিকায় ফর্মাগুণে টাকা দেওয়ার ব্যাপার নেই। তাই যে কেউ সম্পাদক। সম্পাদকের কাজ মূলত একে ওকে খুঁচিয়ে লেখা জোগাড় করা। দু-একজনকে দিয়ে ছবি আঁকানো, তারপর শুভদিন দেখে ই-পত্রিকা প্রকাশ করা। কোয়ালিটি কন্ট্রোলের দিকটি ভয়ঙ্করভাবে মার খাচ্ছে। আগে লিটিল ম্যাগাজিন কিনতে হত টাকা খরচ করে। তাই লেখা খারাপ হলে পাঠকও ছেড়ে কথা বলত না। এখন সে সমস্যা নেই। বরং লাইক, লাভ আর ‘কী করে লিখলেন?’, ‘শেষ লাইনটা, উফ’ আর ‘পাশে আছি দাদা’-র চক্করে নিয়মিত সাহিত্যের গর্ভস্রাব প্রসব করা হচ্ছে। (Social Media)
কোভিডের পর আচমকা এই লেখাই পরিনত হল কন্টেন্টে। আজকাল আর কাউকে লিখতে দেখি না। সবাইকে কন্টেন্ট ক্রিয়েট করতে দেখি।
কোভিডের পর আচমকা এই লেখা পরিনত হল কন্টেন্টে। আজকাল আর কাউকে লিখতে দেখি না। সবাইকে কন্টেন্ট ক্রিয়েট করতে দেখি। আর, সেরা কনটেন্টের গুণমান বিচার হয় লাইক ও শেয়ারে। এখানে প্রকাশনার জন্য সম্পাদক নেই, প্রুফ রিডার নেই, এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখকের নামও স্থায়ী নয়। এই অবাধ পরিসরে জন্ম নিচ্ছে নতুন লেখক, কবি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আর এখানেই আসল সমস্যা। (Social Media)
সবাই সমান ক্রিয়েটিভ হন না। কিন্তু লাইক-কমেন্টের লোভ সবার একশো শতাংশ। অতএব উপায় একটাই। ‘কে আর অত দেখছে?’ ভেবে, যেখান থেকে যা পারো তুলে নিয়ে আপন তরীখানা সাজাও। তেমন ভাইরাল হলে ফেসবুক তো ডলার নিয়ে তৈরি হয়ে বসেই আছে। ফলে একই লেখা দেওয়ালে দেওয়ালে শোভা পায়। এদের মধ্যে কিছু অতি চালাক কিংবা ভীতু লেখার তলায় ছোট্ট করে (স.গ) লেখেন। মানে সংগৃহীত। কেউ খেয়াল করলে ভাল, না করলে হরিবোল। (Social Media)

সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়। এই চুরির লেখা ভাইরাল হতে হতে একসময় তাঁর মনে কনফিডেন্স এসে যায়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন (মানে সত্যিই করতে শুরু করেন) যে, তিনি একজন ক্ষমতাবান লেখক। ঠিক এই জায়গাতেই আসছেন কিছু অসাধু প্রকাশক। যাঁরা ব্যবসা বোঝেন। তাঁরা সেই লেখক বা কবিকে ইনবক্সে পাকড়াও করে বলছেন, আধাআধি বখড়ায় বই ছেপে দেবে। ডিস্ট্রিবিউশনের দায় তাঁদের। সরল মনে তাঁদের কথা বিশ্বাস করছে নতুন লেখক। হিসেবে গরমিল দেখিয়ে মাছের তেলে মাছ ভেজে তাঁর টাকাতেই বই হচ্ছে। (Social Media)
ডিস্ট্রিবিশন মানে ফেসবুক পোস্ট। এবার লেখকের হাতেই বই ধরিয়ে বলা হচ্ছে অর্ধেক বিক্রির দায়িত্ব নিতে। সে বেচারা সবাইকে ধরে ধরে বই কিনতে বলছে। এতদিন লাইক দেওয়া বন্ধুরা গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নিয়েছে। যেহেতু, শেষ সময়ের প্রোজেক্ট, তাই বেশিরভাগই ফেসবুক থেকে উঠিয়ে নেওয়া। পাঠকদের কথা, যে জিনিস বিনে পয়সায় পড়েছি, তা পড়তে খরচা করব কেন? সে টাকায় ফুডকোর্টে গান্ডেপিন্ডে গিলব। ফলে লেখক গাল খাচ্ছে, গাল দিচ্ছে। কী মরিয়া দশা! ফেসবুকের দেওয়ালে আছড়ে পড়ছে তাঁদের অসহায়তা। (Social Media)
কান পাতলেই একটা কথা শুনতে পাবেন— ‘কনটেন্ট ইজ দ্য কিং’। কিন্তু সেই রাজা যদি দুরাচার হন, তবে?
অন্য আরেক দিকের কথা বলি, যাঁরা ফেসবুকেই সুখী আর পাবলিকেশনে উঁকি দিতে চান না। কান পাতলেই একটা কথা শুনতে পাবেন— ‘কনটেন্ট ইজ দ্য কিং’। কিন্তু সেই রাজা যদি দুরাচার হন, তবে? মনে রাখতে হবে ফেসবুক, এক্স বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলি নিজেদের ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে তুলে ধরে। তারা কনটেন্ট তৈরি করে না, শুধু হোস্ট করে। ফলে প্ল্যাজিয়ারিজমের দায় পুরোটাই ব্যবহারকারীর উপর বর্তায়। (Social Media)

বাংলা বা অন্য আঞ্চলিক ভাষার কনটেন্টে প্ল্যাজিয়ারিজম আরও বেশি ঘটে। কারণ এখানে আর্কাইভ দুর্বল, সার্চ সুবিধা সীমিত, এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া জটিল। বাংলা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই দেখা যায়, ফেসবুকের কোনও জনপ্রিয় পেজে প্রকাশিত লেখা অন্য পেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, লেখকের নাম বাদ দিয়ে। প্রতিবাদ করলে বলা হয়, ‘এ তো ফেসবুকই, সবাই নেয়’। এই ‘সবাই নেয়’ মনোভাবই প্ল্যাজিয়ারিজমকে দিন দিন স্বাভাবিক করে তুলছে। (Social Media)
এবার দেখবেন, যে-ই কারও লেখা চুরি হিসেবে ধরা পড়ল, অমনি সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে লিখতে শুরু করেন— ‘আপনি এই লোকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন’। কিন্তু বলা যত সহজ, করা ততটাই কঠিন। আইন আছে, কপিরাইট আছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রয়োগ জটিল। একটি ফেসবুক পোস্ট কপিরাইটযোগ্য কি না, তা নিয়ে বহু ধোঁয়াশা আছে। আইনি পথে যাওয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নৈতিক প্রতিবাদ একমাত্র অস্ত্র হয়ে রয়ে যাচ্ছে। যাঁরা এই লেখা চুরি করেন, তাঁদের কাছে এইসব অর্থহীন। তাঁরা দু-তিন হপ্তা গা ঢাকা দিয়ে আবার ‘মনের কথা ফোনের স্ক্রিনে’ কপি পেস্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। (Social Media)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
জন্ম ১৯৮১-তে কলকাতায়। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি-তে স্বর্ণপদক। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার আবিষ্কারক। ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত। জার্মানি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর লেখা ‘কমিকস ইতিবৃত্ত’ (২০১৫), 'হোমসনামা' (২০১৮),'মগজাস্ত্র' (২০১৮), ' জেমস বন্ড জমজমাট'(২০১৯), ' তোপসের নোটবুক' (২০১৯), 'কুড়িয়ে বাড়িয়ে' (২০১৯) 'নোলা' (২০২০) এবং সূর্যতামসী (২০২০) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সম্পাদনা করেছেন ‘সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ’ (২০১৭, ২০১৮)'ফুড কাহিনি '(২০১৯) ও 'কলকাতার রাত্রি রহস্য' (২০২০)।
