(Bela Mukhopadhyay)
তাঁর গায়িকা সত্তা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল স্বামীর জগৎজোড়া খ্যাতির আড়ালে। এক সময় বাংলা চলচ্চিত্রের নেপথ্য সংগীতশিল্পী হিসেবে খ্যাতিও লাভ করেন হেমন্তজায়া বেলা মুখোপাধ্যায়। ‘কাশীনাথ’ ছবিতে গাওয়া তাঁর গানগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আকাশবাণী কলকাতার একটি ঘরের হাফ ডোরের মাঝে পরিচয় হয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ‘এই আমাদের বড়ো খোকা’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বাণীকুমার।
পরিচয়, প্রেম তারপর পরিণয়। হেমন্তঘরণী হয়ে গানের জগৎ থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়েছিলেন। কখনওসখনও যে গাননি, এমন নয়। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘ভানু সিংহের পদাবলী’ শীর্ষক রেকর্ডে সম্মেলক গানে গলা মিলিয়েছেন। অন্য একটি রেকর্ডে স্বামী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত— ‘ওহে সুন্দর মরি মরি’ এবং ‘ও আমার চাঁদের আলো’। তরুণ মজুমদার পরিচালিত, ‘বালিকা বধূ’ ছবিতে প্লেব্যাক করেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে খুব ছোট থেকে তাঁদের দু’জনকে ভীষণ কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭)
এই ধারাবাহিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখতে গিয়ে জানিয়েছিলাম, আমার মাতামহ কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীর বন্ধু ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁকে ‘হেমন্ত দাদু’ বলে ডাকলেও বেলা মুখোপাধ্যায়কে বাবা-মায়ের দেখাদেখি ‘বেলা কাকিমা’ বলেই ডাকতাম! শৈশব থেকেই দক্ষিণ কলকাতার লেক সংলগ্ন বাড়িতে কাকিমাকে দেখেছি। সেই সময়ের স্মৃতি এখন খুব একটা মনে নেই। কিন্তু, মহালয়ার প্রাক-প্রত্যুষে যে বছর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র পরিবর্তে, ‘দূর্গা দুর্গতিহারিনীম’ প্রচারিত হয়, সেই বছর হেমন্তদাদুর বাড়িতে থেকেই ওই অনুষ্ঠান শোনার আবদার করেছিলাম।

বাবা-মায়ের বকাবকি শুনলেও বেলা কাকিমার প্রশ্রয়ে সেদিন থেকে গিয়েছিলাম ওঁদের বাড়িতে। ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠে কতটা কী শুনেছিলাম মনে করতে পারি না। সেদিনের প্রভাতী অনুষ্ঠান ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, সেটা বোঝার মতো বয়েস তখন হয়নি। হেমন্তদাদুর বাড়িতে থেকে রেডিও শুনছি, সেই আনন্দেই বিভোর হয়েছিলাম!
ওই সময় মাঝে-মাঝেই দেখতাম বেলা কাকিমা বাণী ঠাকুরের বাড়িতে যেতেন। মাঝে শখ করে শাড়ির ব্যবসা করেছিলেন কিছুদিন। সেই সুযোগে অনেক সম্ভ্রান্ত ঘরের কয়েকজন মহিলা একাধিক কিস্তিতে টাকা দেওয়ার নাম করে শাড়ি নিয়ে, আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির চৌকাঠ পেরোননি। তাঁদের কয়েকজনের বাড়িতে কাকিমা আমায় কয়েকবার পাঠালে, বিনয়ের সঙ্গে তাঁরা বলেছিলেন, আগামী বছর দু’য়েকের মধ্যেই তারা শাড়ির সব টাকা শোধ করে দেবেন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, প্রাপ্য টাকার অঙ্ক কিন্তু হাজার দুয়েকের বেশি ছিল না। এসব শোনার পর কাকিমা বারণ করাতে তাঁদের বাড়িতে আর দ্বিতীয়বার যাইনি। সেই টাকাও আর কোনওদিন এসে পৌঁছয়নি।

হেমন্ত দাদুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে থেকে আমি এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাল্যবন্ধু তথা ওঁর সহকারী সঙ্গীত পরিচালক সমরেশ রায়ের বোন মীরা মাসি যেতাম তাঁদের বাড়িতে। বাড়িতে তখন ওঁরা দু’জনে থাকতেন। আর থাকতেন ওঁদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত, গাড়ির চালক সনৎদা এবং বর্ষীয়ান কর্মচারী হরিদা। সেই দিনগুলিতে হেমন্ত অনুরাগীদের বিশেষ দেখা মিলত না। কয়েক মাস যেতে না যেতেই শরতে হেমন্ত বিদায়! বর্ষাশেষের বৃষ্টির জলের সঙ্গে বাঙালির চোখের জল মিশল।
মনে আছে, ১৯৮৯ সালের সকালে যখন হেমন্তদাদুকে তিনতলা থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন বেলা কাকিমা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, ‘ও তো চলে গেল, আর আমার কাছে কেউ আসবে না।’ সেই সময়টা কাকিমাকে পারিবারিক অনেক সমস্যার সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল।

বেলা কাকিমার কথা বলতে গেলে একটি করুণ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। ১৯৮৯ সালের দুর্গা পুজোর অষ্টমীর দিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নিয়মভঙ্গ, কাকিমা, আমার মা, মৌসুমীদি আর আমি সাদার্ন এভিনিউ-এর একটি বাড়িতে অনুষ্ঠানস্থলে গেলাম। সেই বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে তখন সন্ধিপুজো চলছে, ঢাক বাজছে। কাকিমা ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ওখানে কী হচ্ছে?’ মা বলল, ‘সন্ধিপুজো’। কাকিমা কেঁদে ফেলে বলেছিলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
দশটা দিন কেটে যাওয়ার পরে বাবুদাদা, রানুদি সবাই বোম্বে ফিরে গেল। কাকিমা একা হয়ে গেলেন, শুধু রয়ে গেল ওঁর ছোট ভাই গোপালদা। সেই দিনগুলোতে মা বলত, মাঝে-মাঝে কাকিমার কাছে যাস। যেতাম, কাকিমা আর গোপালদা ছাড়তে চাইত না। প্রায় দিনই খেয়ে ফিরতাম। এক একটা দিন থেকেও যেতাম। বুঝতাম বেলাকাকিমা তখনও ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। হেমন্তদাদুকে নিয়েই বেশিরভাগ কথা হত।

তখনও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোকবার্তা আসছিল। রাজ কাপুরের স্ত্রী কৃষ্ণা কাপুর, তালাত মেহমুদ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখের চিঠি এলে, সেগুলো কাকিমাকে পড়ে শোনাতাম। সেই সময় কাকিমার সঙ্গে হেমন্তদাদুর একাধিক স্মরণসভায় যেতাম। দু-একজন খুব নিকট আত্মীয় আর গ্রামোফোন কোম্পানির প্রাক্তন কর্ণধার বিমান ঘোষ ছাড়া প্রায় কেউই আসতেন না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাহায্য নিয়ে যে সব শিল্পীরা নাম করেছিলেন, তাঁরাও কোনও খোঁজ নিতেন না! অবশ্য শিবাজী চট্টোপাধ্যায় মাঝে-মধ্যে আসতেন। আর আসতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মেয়ে সীমা মুখোপাধ্যায়।
কিছুদিন আগে একজন প্রখ্যাত মহিলা সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচরণ করতে গিয়ে শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করেছিলেন! এখানে তাঁর নামটা উল্লেখ করতে রুচিতে বাঁধছে। অথচ বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ধীরেন বসুর কাছে শুনেছিলাম, সেই মহিলা শিল্পী আসানসোল থেকে অনুষ্ঠান করে ফেরার সময়ে ধীরেনদার সামনেই অন্য একজন শিল্পীর সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সমালোচনা করছিলেন! অথচ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় না থাকলে আজ কেউই তাঁকে চিনত না!

মনে পড়ে, হেমন্তদাদু চলে যাওয়ার পরে আমি প্রায় বছর দেড়েক ওঁদের বাড়িতে ছিলাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রয়্যালটি সম্পর্কিত চিঠি এলে কাকিমার ছোট বোনের স্বামী রবিদা এসে প্রয়োজনীয় কাজগুলি করতেন। সপ্তাহে এক-একটা দিন কাকিমা আমাকে নিয়ে লেক মার্কেটে বাজার করতে যেতেন। ওই সময় বেলাকাকিমার পৃষ্ঠাপোষকতায় ‘হেমন্ত স্মৃতি সংসদ’ গড়ে ওঠার কথা আগেই বলেছি। নতুন করে আর সেই প্রসঙ্গের দিকে যাচ্ছি না।
আলমারি গোছাতে গিয়ে কাকিমা আমাকে অনেকগুলো পুরোনো ছবি দিয়েছিলেন। সব ছবিই নানা অনুষ্ঠানের বা পারিবারিক। আর যে দু’টো জিনিস দিয়েছিলেন, সেগুলো অমূল্য। হেমন্ত দাদুর ব্যবহার করা একটা ধুতি আর শার্ট, সঙ্গে দাদুর চিরুনি। আজও সেগুলো যত্নে রাখা আছে আমার কাছে। তখন একটি ছোট ছেলে, বেলা কাকিমার কাছে আসত। সে খুব হেমন্তভক্ত ছিল। আমাদের সঙ্গে নানা অনুষ্ঠানেও যেত। আজ সেই ছেলেটি সঙ্গীত জগতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান গেয়ে বেশ নাম করেছে। কিন্তু, গান করতে গিয়ে বিভিন্ন মিডিয়াতে সে বলে বেড়ায়, সে নাকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখেছে! এর থেকে বড় মিথ্যে আর হয় না, কারণ হেমন্তদাদুর মৃত্যুর তিন-চার বছর পরেও তাকে দেখতাম হাফপ্যান্ট পরে আসত!

সেই সময় আমার মা কলকাতা দূরদর্শনে কর্মরতা। মা একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, যেখানে বেলা কাকিমার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন প্রয়াত বাচিকশিল্পী গৌরী ঘোষ। দাদু চলে যাওয়ার অনেক মাস পরে বেলাকাকিমা হেমন্তদাদুর বাৎসরিক কাজ করতে বোম্বে গিয়েছিলেন। যাওয়ার দিন যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন, তখন আমাকে বললেন, ‘দেখ, ওর হাসিমুখের ছবিটা শূন্য ঘরে রেখে যাচ্ছি আর, “সবাই চলে গেছে” গানটার কথা মনে হচ্ছে।’
হাওড়া স্টেশনে বেলাকাকিমাকে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়ে দেখলাম উনি স্লিপার ক্লাসে বোম্বে যাচ্ছেন! হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী হয়েও বেলা মুখোপাধ্যায়ের জীবনযাপন এতটাই সাধারণ ছিল! কাকিমা আমার কন্যা সুপ্রীতাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। ওর নাম রেখেছিলেন, ‘সুইটি’। একদিন কাকিমাও চলে গেল। যে সব জায়গায় নিয়মিত যেতাম, সেই তালিকায় আর একটা জায়গা কমে গেল। কিন্তু যত দিন যায়, স্মৃতির খাতায় জমার সংখ্যা বেড়ে ওঠে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
