Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

জলকে চল: দ্বাদশ পর্ব

বিতস্তা ঘোষাল

জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

Jolke Chol
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Bengali Novel)

ক্লাস শেষ করে ল্যাপটপ অফ করে, চিৎ হয়ে খানিকক্ষণ শুয়ে রইল রাই। সাইলেন্টে থাকা মোবাইলটার সাউন্ড বাটন অন করল। পাশে রেখে দিয়ে চোখ বন্ধ করল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর শুয়ে শুয়েই ফোন করল মোহনাকে। (Bengali Novel)

-কতদূর? বেরিয়েছ?

-না। আর একটু পরে বেরোচ্ছি।

-মিটিং কেমন হল?

-ওই ভার্চুয়াল যেমন হয়।

আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১)

-ওঃ। ভার্চুয়াল ছিল?

-হ্যাঁ।

-তাহলে তো বাড়িতে বসেই করতে পারতে। যাওয়ার দরকার কী ছিল?

-ডকুমেন্টগুলো অফিসে থাকে রাই, এখানে আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি।

-বুঝলাম। তাড়াতাড়ি ফেরো। আমাকে আর জ্বালিও না।

তুমি হয়তো চলছ, কিন্তু বাবুদা? ‘বাবু আবার কী করল?’

-তোকে আবার কী জ্বালালাম?

-সে তুমি বুঝবে না। তোমার একবার কোভিড হয়ে গিয়েছে। শরীরের বারোটা তখনই বেজেছে। প্রচণ্ড রোদ। এখন যদি আবার শরীর খারাপ হয় তাহলে বাঁচবে?

-আরে বাবা! হবে কেন? যথেষ্ট সাবধানতা নিয়েই চলছি।

-তুমি হয়তো চলছ, কিন্তু বাবুদা?

-বাবু আবার কী করল?

Jolke Chol
‘তাড়াতাড়ি ফেরো। আর পারলে আসার সময় আইসক্রিম নিয়ে এসো।’

-যার-তার সঙ্গে বসে খৈনি খায়। যাক, তোমার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি ফেরো। আর পারলে আসার সময় আইসক্রিম নিয়ে এসো।

-ফ্রিজে নেই?

-থাকলে নিশ্চয়ই বলব না।

-তোর ক্লাস শেষ?

-মা সাতটা বাজে।

ঘুমিয়ে গিয়েছে ওই অবস্থাতেই। পাশে মোবাইলটা নিজের মতো বেজে যাচ্ছে। সামনে গিয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে কি না দেখল।

-এত বেজে গিয়েছে! মালতী এসেছে?

-এসেছে। কলিং বেল বাজল, ক্লাস করতে করতেই শুনেছি।

-বেশ। তাহলে যা আম্মার সঙ্গে বসে চা খা। আর রাতে কী খাবি বলে দিস। ফ্রিজে চিকেন আছে। আর আম্মার জন্য পনির বানাতে বলিস। আমি আরেকটু কাজ সেরে বেরোচ্ছি। (Bengali Novel)

ওকে। সাবধানে এসো। বাই। মোবাইল রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল রাই। আম্মার ঘরে গিয়ে উঁকি দিল। আম্মার হাত বুকের উপর, বই ধরা, চোখে চশমা। ঘুমিয়ে গিয়েছে ওই অবস্থাতেই। পাশে মোবাইলটা নিজের মতো বেজে যাচ্ছে। সামনে গিয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে কি না দেখল। আম্মাকে এভাবে ঘুমোতে দেখলেই তার কেমন একটা ভয় হয়। বেঁচে আছে তো! নিশ্চিন্ত হয়ে বইটা হাতের ফাঁক থেকে বের করে মোবাইলটা তুলে নিল। (Bengali Novel)

আম্মার হাত লেগে বোধহয় ফেসবুক অন হয়ে গিয়েছে। একনাগাড়ে সেখানে কেউ কিছু বলেই যাচ্ছে। সে ফেসবুক অফ করে স্নেহলতাকে ডাকল।

Jolke Chol
আম্মাকে এভাবে ঘুমোতে দেখলেই তার কেমন একটা ভয় হয়। বেঁচে আছে তো!

-আম্মা ওঠো। আর কতক্ষণ ঘুমোবে? সূর্য যে পাটে গেল। চা খাবে না?

রাইয়ের গলা শুনে স্নেহলতা তাড়াতাড়ি উঠে বসবার চেষ্টা করল এবং রাইয়ের থেকে ধমক খেল।

-এত তাড়াতাড়ি করে ওঠার কী আছে? আস্তে আস্তে উঠতে হয়। জানো না শাস্ত্রে কী বলেছে?

-এখানে শাস্ত্র এলো কোথা থেকে? তখনও ঘুম লেগে চোখের পাতায় তার।

-শাস্ত্রে বলেছে, মানুষ মানে আমরা যখন ঘুমোই তখন আমাদের আত্মা শরীর থেকে বেরিয়ে চারপাশ ঘুরতে যায়। মানে পাড়া বেড়াতে যায়। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে সে ফিরে এসে আবার শরীরে ঢুকে পড়ে। এখন তুমি যদি তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়তে যাও, তাহলে আত্মা ভয় পেয়ে যাবে, সে বুঝতে পারবে না কোন পথ দিয়ে ভিতরে ঢুকবে। এদিকে শরীরও আত্মাকে না পেয়ে ছটফট করবে, তারপর হাল ছেড়ে পড়ে যাবে। ব্যস। খেল খতম। (Bengali Novel)

-এ গল্প তুমি কোন শাস্ত্রে পেলে রাই?

-পেয়েছি। মহাভারতে। যদিও ঠিক কোন চ্যাপ্টার মনে পড়ছে না। গীতাও হতে পারে। তবে, শিওর। পড়েই বলছি। এবার ওঠো। চা আনি।

বিভিন্ন কোম্পানি তাদের প্রোডাক্টের অফার পাঠাচ্ছে। আসলে ঠিক মডেল নয়। ইনফ্লুয়েন্সার। তাদের প্রোডাক্ট কিনে পরে বা হাতে নিয়ে ছবি দিতে হবে, বলতে হবে অমুক ব্র্যান্ড আমি ব্যবহার করছি।

রাই চা করতে রান্না ঘরে চলে গেল। এই একটি কাজ সে নিজের হাতে করতেই পছন্দ করে। অন্য কেউ করলে চিনি বেশি, নয় দুধ বেশি, কিংবা ফুটিয়ে তেতো। একমাত্র মা করলে ভাল, নতুবা নিজেই করে নেয়। (Bengali Novel)

জল সসপ্যানে ফুটতে দিয়ে সে ইনস্টা চেক করল। কাল রাতে একটা নাচের ভিডিও আপলোড করেছিল। এখন ভিউয়ার্স সাড়ে আট হাজার। ইনস্টাতে তার ফলোয়ার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। (Bengali Novel)

বিভিন্ন কোম্পানি তাদের প্রোডাক্টের অফার পাঠাচ্ছে। আসলে ঠিক মডেল নয়। ইনফ্লুয়েন্সার। তাদের প্রোডাক্ট কিনে পরে বা হাতে নিয়ে ছবি দিতে হবে, বলতে হবে অমুক ব্র্যান্ড আমি ব্যবহার করছি, আমার কোড নাম্বার এত, সেটা লিখে ওখান থেকে পার্চেজ করলে এত পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে দুটি ব্র্যান্ডের মডেল সে। তবে তার নিজের একটা প্ল্যান আছে। সেটার সূচনা পর্বে এই মডেলিংগুলো সে করছে। যাতে যখন সোলো কাজ শুরু করবে, তখন কোনও সমস্যা না হয়। (Bengali Novel)

তার আগে এক্সামটা শেষ করতে হবে। ফার্স্ট ক্লাস না পেলে মুশকিল। এসব ভাবতে ভাবতে রাই নিজের মনেই হাসল। তারপর চা ছেঁকে আম্মার ঘরে গেল। (Bengali Novel)

-বলো, আজ ক্লাস কেমন হল?

-আর ক্লাস! পি আর তো খালি ধর্ম নিয়েই বুঝিয়ে গেল।

-ধর্ম কেন? তুমি তো রিলিজিয়ান নিয়ে পড়ছ না।

Jolke Chol
এই একটি কাজ সে নিজের হাতে করতেই পছন্দ করে।

-শোনো, এই যে বিষয়টা আমি পড়ি, তাতে সব বিষয় যুক্ত। দেখো, তোমাকে বুঝিয়ে বলছি, আমাদের প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত। সেখানে সব কটা যুদ্ধ হয়েছে ধর্মের নামে। কিন্ত মূল বিষয় অখণ্ড রাষ্ট্র। রাষ্ট্র মানেই বিজ্ঞান। সেই বিজ্ঞানও কিন্তু রীতিমতো অংক কষে প্রতিপক্ষকে হারাবার জন্য তৈরি। আবার দেখো, হিন্দু ধর্ম ছেড়ে যদি ইসলাম ধর্মের কথা ভাবি, সেখানেও হজরত মহম্মদ নিজের মতো প্রচার ও প্রসার করার জন্য একাধিক যুদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ এখানেও সেই রাষ্ট্র একটা হাতিয়ার। আর রাষ্ট্র মানেই রাজনীতি। এই দুটো তোমায় উদাহরণ দিলাম।  খ্রিস্টান ধর্ম, কনফুসিয়াস… তুমি যেদিকেই তাকাবে, ধর্ম রাজনীতির একটা বড় অংশ জুড়ে। এই যে আমাদের দেশ ভাগ হল, সেটাও কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে, এবং রাজনীতি তাতে সক্রিয়। (Bengali Novel)

এত বছর পরেও ভোটের আগে সেই ধর্মের বিভাজন চোখে পড়ে। আসলে ধর্ম হচ্ছে আফিম। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর সবকটি শক্তি ধর্ম আর রাষ্ট্রকে একসঙ্গে ব্যবহার করেছে। কাজেই পল সায়েন্স পড়তে গেলে এটাও জানতে হবে। বুঝলে কিছু? (Bengali Novel)

স্নেহলতা ঘাড় নাড়ালেন।

-বাহ! তুমি তো দেখি খুব ভাল ছাত্রী। একবারেই বুঝে গেলে। আমাদের ক্লাসের অনেকেই বুঝতে পারছিল না। খালি প্রশ্ন করছিল। পি আর তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই ক্লাস শেষ। (Bengali Novel)

-সে তোমাদের সঙ্গে যারা পড়ে, সবাই পড়াশোনায় দারুণ। ভবিষ্যতে তারাও নামিদামি কলেজে পড়াবে। তাই ভাল করে বুঝে নিচ্ছে।

বিয়ে হওয়ার পর স্কুলে না গেলেও শাশুড়ি প্রচুর বই পড়তে দিতেন। আমাদের সময় টিভি ছিল না। দুপুরবেলা খেয়ে উঠে বই পড়তাম শুয়ে শুয়ে।

-কী জানি বাপু! আম্মা একটা কথা বলো, তুমি যে এত বই পড়ো তোমার নিজের ইচ্ছে হয়নি চাকরি করতে, বা ঠাকুরদার সঙ্গে অফিস সামলাতে?

-কী যে বলো রাই! আমি কি স্কুলে গিয়ে ডিগ্রি পেয়েছি? কোন ছোট বয়সে আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। যেটুকু পড়াশোনা জ্যাঠাইমার কাছে শেখা। তবে বিয়ে হওয়ার পর স্কুলে না গেলেও শাশুড়ি প্রচুর বই পড়তে দিতেন। আমাদের সময় টিভি ছিল না। দুপুরবেলা খেয়ে উঠে বই পড়তাম শুয়ে শুয়ে। কিংবা সেলাই। আমার একটা সেলাই মেশিন ছিল, কিন্তু সেলাই করতে ভাল লাগত না। ওই টুকটাক শায়া ছিঁড়ে গেল, বা বালিশের ওয়ার এইসব। তবে বই পড়াটা নেশা হয়ে গেল। একটা মজার ঘটনা আছে এই বই নিয়ে। (Bengali Novel)

রাই আম্মার গা ঘেঁষে বসে বলল- বলো, শুনি।

-মোবাইলটা হাত থেকে রাখো, আর প্রমিস করো এটা কাউকে বলবে না।

-বেশ। তাই হবে, এবার তো বলো…

-তখন তোমার বাবা পেটে। এবার সবাই বলেছে বাচ্চা যখন বেরোবার সময় হয়, তখন পেটে ব্যথা হয়। আমার তখন এই ষোলো সতেরো বছর বয়স। অত তো বুঝি না। ব্যথা যখন হবে, তখন বাচ্চা হবে এই ভাবনায় আছি। সেই সময় শাশুড়ি মা আমাকে রোজ গীতা, রামায়ণ এসব পড়তে বলতেন। আমিও বাধ্য মেয়ে হয়ে তাই পড়তাম। তখন সিনেমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দুটো বিখ্যাত পত্রিকা ছিল। উল্টো রথ আর প্রসাদ। (Bengali Novel)

Jolke Chol
রাই আম্মার গা ঘেঁষে বসে বলল- বলো, শুনি।

আমাদের যেহেতু বইয়েরই বাড়ি, নিজেদেরও পত্রিকা, তাই সেসব বইও পড়তাম। একদিন গীতা দত্তকে নিয়ে একটা লেখা পড়ছি, সেই সময় তিনি তো গানের জগতে নক্ষত্র। আহা! কী সব গান তাঁর- ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘এই মায়াবি তিথি’ কিংবা ‘মেরা নাম চিন চিন চু’… আমি তখন পুরো গীতার গানে মজে গেছি। শাশুড়ি মা যতই আমাকে রামায়ণ মহাভারত ধরান, আমি দুপুরে এগুলোই পড়তাম। সেই সময় গুরু দত্ত মানে তাঁর বর তাঁকে ছেড়ে, নতুন নায়িকা ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে, তারপর আত্মহত্যা করলেন। তিনিও প্রচুর মদ খেতেন। মারা গিয়েছিলেন অবশ্য ঘুমের বড়ি খেয়ে। গীতা আগেই এ-সব ভোলার জন্য মদ খেয়ে পড়ে থাকত। (Bengali Novel)

এখন আবার টাকার অভাব দেখা দিল। বাচ্চাদের নিয়ে নাজেহাল তখন। কিন্তু এত মদ খাওয়ার ফলে তাঁর গলা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে গানের সিনেমার জগত আলোড়িত। স্বভাবতই আমিও সেই কাহিনি…। (Bengali Novel)

তার কথা শেষ করতে না দিয়েই, রাই স্নেহলতাকে থামিয়ে দিয়ে বলল- কাহিনি মানে কেচ্ছা কাহিনি বলো।

-হ্যাঁ, তাও বলা যেতে পারে। তা আমি পড়তে পড়তে এত মগ্ন হয়ে গেছি, যে পেটে ব্যথা উঠেছে বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ আমাদের বাড়িতে যে সেই সময় গৃহ সহকারী ছিল, সে চা দিতে এসে দেখে বিছানা ভিজে চারদিক দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। (Bengali Novel)

-জল কোথা থেকে এলো?

তুমি ছেলের নামে কিছু বললে রেগে যাও কেন? তোমার ছেলেটা তো আমারও বাবা! যতই কাছে না থাকি, রক্ত বা জিনটা এক, তাই না?

-এটাই তো! আসলে আমি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ছিলাম। ভরা পেট তখন। ওয়াটার বল ভেঙে গিয়েছিল। তাই জল। ওই মহিলা মানে সাবুর মা না এলে যে কী ঘটত! আমাকে সঙ্গে সঙ্গে আর জি করে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করা হল। তারপর সারারাত কী কান্না আমার! ব্যথার জন্য নয়। গীতা দত্তের সংসার ভেঙে গেল, সে এত মদ খাচ্ছে এই দুঃখে। সবচেয়ে যেটা আশ্চর্যের সেটা কী জানো? তোমার বাবার জন্ম আর গীতা দত্তের জন্ম একই দিনে। মানে তারিখটা। (Bengali Novel)

-মানে ২৩ নভেম্বর?

-হ্যাঁ। ওঁর ১৯৩০ আর তোমার বাবার ১৯৬৮।

-বুঝলাম। আমার বাবাও তাই এত রেকলেস। আসলে এই রাশিটাই গোলমেলে।

-এখানে রাশি এল কোথা থেকে? আর তোমার বাবা কী করল?

-কিছুই করেনি। তুমি ছেলের নামে কিছু বললে রেগে যাও কেন? তোমার ছেলেটা তো আমারও বাবা! যতই কাছে না থাকি, রক্ত বা জিনটা এক, তাই না? রাই একটু বিরক্তি নিয়েই বলল। তারপর পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে ভেবে বলল, আচ্ছা আম্মা মেয়েদের জীবনে এত দুর্ভোগ সহ্য করতে হয় কেন বলো তো? (Bengali Novel)

স্নেহলতা নাতনি কী বলতে চাইছে বুঝতে না পেরে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করল।

নারী পুরুষ মিলিয়েই তো সংসার। একজন না থাকলে আরেকজন কীভাবে সৃষ্টি বজায় রাখবে? স্নেহলতা বোঝাতে চাইল নাতনিকে।

-আসলে মেয়েরা ভাবে তাদের জীবন টেনে নিয়ে যাবে একজন পুরুষ। সে নিজে যতই রোজগার করুক না কেন, স্বাধীন ভাবতে পারে না নিজেকে। আর তাই তার এত দুর্ভোগ। রাই নিজেই উত্তর দিল। (Bengali Novel)

-কিন্তু নারী পুরুষ মিলিয়েই তো সংসার। একজন না থাকলে আরেকজন কীভাবে সৃষ্টি বজায় রাখবে? স্নেহলতা বোঝাতে চাইল নাতনিকে। দেখ না শিব-পার্বতী, আকাশ ও প্রকৃতি সব সময় একসঙ্গে বলেই তো সৃষ্টি-স্থিতি-লয় নিরবিচ্ছিন্নভাবে বহমান। এর একটা না থাকলে আরেকটার কোনও অস্তিত্ব থাকত কী? (Bengali Novel)

-আমি তো নারী পুরুষ একসঙ্গে থাকবে না, এ কথা বলিনি। আমি বলছি দু’জনের প্রতি দু’জনের শ্রদ্ধা ও সম্মান বোধ না থাকলে, আমিই শ্রেষ্ঠ, এ কথা ভেবে নিলে- আর যাই হোক সেই পরিবার সুখী হতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের ছোট করে দেখানোর এই মানসিকতা না পাল্টালে, কখনওই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা হবে না। তা কেবল তত্ত্ব হয়ে থেকে যাবে, তথ্য আলাদা বলবে। আর আমরা বসে বসে সেইসব কিছু মুখস্থ করব। (Bengali Novel)

স্নেহলতা নাতনির পিঠে হাত বোলাল। হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল- আমার রাই সুন্দরী কবে এত বড় হয়ে গেল? আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি এই সেই শিশুটা! হাসপাতাল থেকে নিয়ে এলাম এই তো সেদিন, কোল থেকে নামালেই কাঁদত। তারপর তাকে নিয়ে যখন খোকা আর মোহনা বিদেশ চলে গেল, আমরা বুড়োবুড়ি ভাবতাম কীভাবে এই পুঁচকেটাকে ছেড়ে থাকব? (Bengali Novel)

Jolke Chol
নিজের ঘরে ফিরে এল রাই।

-এখন তো সে সমস্যা নেই। সেই যে পাঁচ বছরে এলাম, তারপর ভুলেই গেছি ওই দেশটা। বাবাও আর নিয়ে গেল না। মা-ও ছাড়তে চায় না। অবশ্য আমার ইচ্ছে আছে যদি চান্স পাই আর হাতে কিছু টাকা জমে সোজা উড়ে যাব সেখানে। (Bengali Novel)

-সেখানে গিয়ে কী করবে? পড়তে গেলে যেও। কিন্তু চাকরি করে বিদেশে থাকতে হবে না।

-পাগল? আমি এদেশেই থাকব। অন্য দেশে গিয়ে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়ে থাকার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। তাছাড়া তুমি জানো ওদেশে আমাদের পুওর নেটিভ বলে।

-তা সত্ত্বেও তো তোমার বাবা দেশে ফিরতে চায় না।

-আম্মা বাবা ওখানে চাকরি করে। এবং সে ভারত সরকারের অফিসার। তাকে এসব বলবে না। কিন্তু আমি যদি ওদেশে চাকরি করি এবং থেকে যাই, আমাকে বলবে। আমি কেন গ্রিন কার্ড হোল্ডার হয়ে বাঁচতে যাব! বেঁচে থাক আমার দেশ। (Bengali Novel)

কবি রজনীকান্ত সেনের এই কবিতাটি ছোটবেলায় মা পড়ে শোনাত। যতই বড় অট্টলিকা হোক, নিজের দেশে নিজের বাড়িতে থাকার মজা, সম্মান সবটাই আলাদা।

-সেই ভাল। সেই যে কবিতাটা ছিল- “বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,/ কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে,/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে/ বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তায়?/ কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়/ পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা/ নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।’ (Bengali Novel)

কবি রজনীকান্ত সেনের এই কবিতাটি ছোটবেলায় মা পড়ে শোনাত। যতই বড় অট্টলিকা হোক, নিজের দেশে নিজের বাড়িতে থাকার মজা, সম্মান সবটাই আলাদা। কিন্তু এটা এখনকার জেনারেশন বুঝতে চায় না। মা বাবারাও সন্তান বিদেশে থাকে বলতে গর্ব অনুভব করে। (Bengali Novel)

-পুরোটা তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না আম্মা। তুমি বা ঠাকুরদা কি চেয়েছিলে বাবা সারাজীবন বাইরে থাক? কিন্তু বাবা যে বিদেশে থাকে এটা নিয়ে তোমার প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল এক সময়। এখন বয়স হয়েছে, ছেলের সঙ্গ চাও, তাই ভাবো দেশে থাকলেই ভাল হত। আর এটাও ঠিক আমাদের এখানে চাকরি কোথায়? ব্যবসা করার পরিবেশও নেই। অতিমারি এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের প্রায় নিঃস্ব করে দিয়েছে। কত মানুষ এই মুহূর্তে চাকরি হারিয়েছে বলো তো! বাইরের কথা বাদই দাও। চৌধুরী সাহিত্য কুটিরের কথা ভাবো।

বই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কত মানুষ রাতারাতি কাজ হারিয়েছেন। মা কাউকে ছাঁটাই করেননি। সেটা মায়ের মহত্ব। কিন্তু ভেবে দেখো, কী বিপুল লসে চলছে এই সংস্থা।

বই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কত মানুষ রাতারাতি কাজ হারিয়েছেন। মা কাউকে ছাঁটাই করেননি। সেটা মায়ের মহত্ব। কিন্তু ভেবে দেখো, কী বিপুল লসে চলছে এই সংস্থা। এই ধাক্কা সামলাতে কতদিন লাগবে কেউ জানে না। সব শিল্পেই এই অবস্থা। কাজেই জীবিকার জন্য, পেটের টানে আবার বহু মানুষ বাইরে চলে যাবে নিরুপায় হয়ে, হাজার অপমান সহ্য করেও। আফটার অল সারভাইভ করতে হবে, টিকে থাকতে হবে তো যেকোনওভাবেই। রাই এক নাগাড়ে বলে গেল। (Bengali Novel)

-তুমি হয়তো ঠিকই বলছ, তবু মন আজকাল মানতে চায় না।

-আচ্ছা আমি এবার যাই। একটু গেম খেলি। মা এসে গেলে আর খেলতে পারব না। এই গেম যেন মায়ের শত্রু। খেলতে দেখলেই চিৎকার শুরু করে দেয়।

-বেশ যাও। তার আগে চুল বেঁধে নাও। এলো চুলে থাকতে নেই সন্ধ্যাবেলায়।

-চুল না বাঁধলে কিছু হবে না আম্মা। আমি তো যাজ্ঞসেনী নই, যে কৌরব ধ্বংস না হলে চুল না বাঁধার প্রতিজ্ঞা করে বসে আছি। যখন ইচ্ছে হবে ঠিক বেঁধে নেব। তুমি ফেসবুক করো। বলে নিজের ঘরে ফিরে এল রাই। (Bengali Novel)

(ক্রমশ)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Author Bitasta Ghosal

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক।

'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত।

বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা।
দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত।

নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে।
ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?

Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিতস্তা ঘোষাল
দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়
জয়িতা বাগচী

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

নির্মাল্য চ্যাটার্জি

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি
নির্মাল্য চ্যাটার্জি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com